কুমার সৌরভ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
(৩)
শিলাইদহের আকাশে তখন শীতের সূর্য হেলান দেয়ার জন্য পশ্চিমমুখী হয়েছেন। তরতাজা সূর্য তখন নিস্তেজ হয়ে অবকাশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। শরীরে যে বাতাস এসে লাগছে তাতে এখন বেশ শীত শীত ভাব। আমরা যে আমতলায় বসে রয়েছি সেই বয়সী গাছের একটি পাতা টুপ করে এসে সামনে পড়লো ঘাসের উপর। পাতাটি ঘন সবুজ নয়। ধূলিমলিন ও বিবর্ণ। তরতাজাও নয়। অনেকটাই ভারী, যেন বহু কালের ভার নিজ শরীরে নিয়ে এখন ঝরে পড়েছে মহাকালের গর্ভে। আমি ঘাসের উপর থেকে পাতাটি কুড়িয়ে নিলুম। পাতার গায়ে লেগে ধাকা ধূলি আলতো করে মুছে দিতে লাগলাম। এরপর পাতাটি যতেœ পকেটে রাখলাম। এই ঝড়া আম্রপত্রিটির অনেক দূরের কোন পূর্বপুরুষ রবীন্দ্রনাথের স্পর্শ পেয়েছিল অনেক দিন আগে। আমি সেই খবরই পেলাম ঝড়া পাতার কাছ থেকে কানে কানে।
আমরা আমতলার বিশ্রাম সংক্ষিপ্ততর করে ঢুকে গেলাম কুঠিবাড়ির ভিতরে। তিন তলার বিশাল ভবন এটি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে জোঁড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার এই গ্রামটি কিনে নেওয়ার আগে এখানে একটি নীলকুঠি ছিলো। শেলী নামের একজন নীলকর এটি নির্মাণ করেছিলেন বলে জানা যায়। গড়াই এবং পদ্মা নদীর মিলিত প্রবাহের ফলে সৃষ্ট একটি দহ (ঘুর্ণিস্রোত) থেকে গ্রামটি শেলীদহ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। কালক্রমে এটি শিলাইদহে পরিণত হয়। রবীন্দ্রনাথ জমিদারির দায়িত্ব নিয়ে শিলাইদহে প্রথম আসেন ১৮৮৯ সনের নভেম্বর মাসে। ১৯৫৮ সনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় এই কুঠিবাড়িটি সংরক্ষিত আছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কবিগুরুর অনেক শিল্পকর্ম ও শিলাইদহের নানা সামগ্রী নিয়ে বর্তমান জাদুঘরটি গড়ে তোলা হয়। জাদুঘরের নীচ তলা ও দ্বিতীয় তলার ১৬ টি কক্ষ কবি রবীন্দ্রনাথ, শিল্পী রবীন্দ্রনাথ, জমিদার রবীন্দ্রনাথ, প্রজাবন্ধু রবীন্দ্রনাথ অর্থাৎ রবীন্দ্র চরিত্রের নানা বিষয়াদি নিয়ে সাজানো হয়েছে এই জাদুঘর। নিচতলা ও দোতলার উন্মুক্ত ব্যালকনিগুলি রানীগঞ্জ টালি দিয়ে তৈরি ঢালু ছাদ দ্বারা আংশিক আচ্ছাদিত। নিচতলার উপরের মধ্যবর্তী অংশে রয়েছে ত্রিকোণ প্রান্তবিশিষ্ট একটি ঢালু ছাদ। দোতলার ওপরের পিরামিড আকৃতির ছাদ ভবনটিকে আরও বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে।
নিচতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত প্রতিটি কক্ষে সাজিয়ে রাখা জিনিসগুলো গভীর আগ্রহ নিয়ে দেখা শুরু করলাম আমরা। আমি প্রতিটি নিদর্শন দেখছি আর ছবি তোলছি। প্রদর্শনীর গায়ে সাঁটানো সংক্ষিপ্ত পরিচিতিও পড়ার চেষ্টা করেছি। বোধ করি এসব নিয়ে ভবিষ্যতে কিছু লিখার চেষ্টা করব এমন একটি দূরচিন্তাও মনের মধ্যে কাজ করছিল, যে কারণে কিছু তথ্য সংগ্রহের ইচ্ছা ভেতরে থেকে এমনিতেই চাগিয়ে উঠে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রয়াস বাধাগ্রস্ত হয়েছে পিছনের দর্শনার্থীদের কারণে। বিশেষ করে তরুণ দর্শনার্থীরা সেলফি তোলতে
এতোটাই তৎপর যে কারণে আমাদের মতো মধ্যবয়স্কদের রীতিমত ছিটকে পড়ার অবস্থা তৈরি হয়। মনে মনে এই তরুণদের ধন্যবাদ জানাই। কারণ ওরা সেলফি তুলছে এক শ্রেষ্ঠ বাঙালির কীর্তিকে সামনে রেখে। এর মধ্য দিয়ে এরা নিশ্চয়ই বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি কিছুটা হলেও আকৃষ্ট হবে। এই তরুণরা কেন, পুরো কুঠিবাড়িতে লোকজনের ভিড় দেখে মনে হয়েছে, কে বলেছে মুক্তচিন্তার জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। এই যে মানুষের ভিড় এরা কূপমন্ডুক হলে এখানে নিশ্চয়ই আসতেন না। এরা শুধু রবির কিরণ শরীরে ছুঁয়াতেই আসেন না বরং এই কিরণ সাথে করে নিয়ে যান বিলিয়ে দেয়ার জন্য। ‘মেলাবে-মিলিবে’ রবীন্দ্র দর্শনের এক অন্যতম অনুষঙ্গ। এটি ভারতীয় সংস্কৃতিরও মূল সুর। তিনি যেমন কবিতায় বলেছিলেন, ‘কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে কত মানুষের ধারা/দুর্বার স্রোত এল কোথা হতে সমুদ্রে হল হারা/হেথায় আর্য, হেথায় অনার্য, হেথায় দ্রাবিড়-চীন-/শক-হুন-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন’। তিনি বাঙালি মানসে বিশ্বজনীন এই যে সর্বজনীন সমন্বয়ের রূপ দেখেছিলেন সেটি ছিল সবকিছুকে গ্রহণ করে হৃদ্ধ হওয়ার এক দুর্মর আকাক্সক্ষা। আমরা আজ সেই জায়গা থেকে সরে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হতে হতে শেষ বিন্দুতে এসে ব্যক্তিকে একাকিত্বের ঘেরাটোপে বন্দী করে ফেলেছি। ওই ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে অগণিত তারকারাজিকে ধারণ করে মাথার উপর দাঁড়িয়ে থাকা আকাশের সান্নিধ্য পেতে রবীন্দ্রনাথ হতে পারেন অনুসরণীয় ব্যক্তি।
নীচ তলার প্রবেশ মুখেই বিশাল একটি বোর্ডে রবীন্দ্রনাথের সংক্ষিপ্ত জীবনপুঞ্জ লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এখানে কবির নিজের সৃষ্টি করা বেশ কিছু শিল্পকর্ম সুন্দরভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। মূলত প্রতিটি কক্ষেই এমন শিল্পকর্ম দেখতে পাই। যার মধ্যে ভাল লাগা কয়েকটি চিত্রকর্ম হলো ‘প্রতিকৃতি’, ‘চরিত্র চিত্রণ’, ‘সাতটি মানুষ’, ‘জানালায় দুটি মুখ’, ‘উপবিষ্ট পুরুষ’ ইত্যাদি। একটি কক্ষে রবীন্দ্রনাথের কুমিল্লা অভয়াশ্রম ভ্রমণের সময়ে তোলা একটি বড় ফটোগ্রাফ দেখতে পাই। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী পুত্র ও আত্মীয়-স্বজনদের ফটোও রয়েছে অনেকগুলো। শাহজাদপুর কাচারী বাড়ি, খুলনার ফুলতলার কবির শ্বশুরবাড়ি, পতিসরের কুঠিবাড়ির ছবি সংরক্ষিত আছে জাদুঘরে। একটি কক্ষে রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত খাট যত্নে সংরক্ষিত আছে। সনাতনী ধাচের সাধারণ কিন্তু অভিজাত খাট এটি, দেখলে বুঝা যায়। রবীন্দ্রনাথ যে স্পিডবোট ব্যবহার করতেন, চপলা নামকরণ করেছিলেন কবি একে, সেটিও সংরক্ষিত আছে কুঠিবাড়িতে। রয়েছে কবির ব্যবহৃত ডিম্বাকৃতির একটি টেবিল, কাঠের দেরাজ, হাত পালকি, চার বেহারা পালকি, দুই বেহারা পালকি, লোহার সিন্দুক, আটকোণা বিশিষ্ট টেবিল, কাঠের আলমিরা ইত্যাদি । রবি ঠাকুরের একটি তরবারি ও খাপ দেয়ালে ঝোলানো দেখা গেল। এই তলোয়ারটি নাকি সম্প্রতি চুরি হয়েছিল। জাদুঘর কর্তৃপক্ষের তৎপরতায় অবশ্য তলোয়ারটি শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করা গেছে। কবি যে কৃষির উন্নয়নে নিরলস পরিশ্রম করেছেন তার বেশ কয়েকটি নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত আছে। যেগুলোর মধ্যে মাটি মসৃন করার যন্ত্র, ঘাস কাটার যন্ত্র অন্যতম। তিনি নিজে কৃষি উন্নয়নের চিন্তা করেই থেমে থাকেন নি উপরন্তু বাস্তবে প্রয়োগও করেছেন এই চিন্তা। এ ছাড়া বিষয়টির স্থায়িত্বশীল ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিজ পুত্র রথীন্দ্রনাথকে আমেরিকায় পাঠিয়ে কৃষিতে স্নাতক ডিগ্রি করান। তৃতীয় তলার অর্ধেক খোলা। এখানে বসে পদ্মা নদী ও শিলাইদহের প্রাকৃতিক শোভা ভাল করে উপভোগ করা যায়। কবিগুরু এখানে বসেই প্রকৃতির সাথে একাত্ম হতেন। কথা বলতেন ভরা জ্যেৎস্নার সাথে, নিকষ অমাবস্যার সাথেও এখানে বসেই তিনি মৌন নিবিষ্টতায় অন্তরঙ্গ হয়ে উঠতেন। এই ছাদের নিস্তব্ধতায় কবি বলে উঠতেন, ‘দোহাই পৃথিবী তোদের/একটুকু চুপ কর/ভালবাসিবার তরে আমারে দে/ একটুকু অবসর’। আমরা ছাদে উঠতে এক পসলা বাতাস গা ছুঁয়ে গেল। বাতাসের সাথে জানি কিছু শব্দও আমাদের কানে প্রবেশ করে। কে জানি বলে উঠল ‘সেই পুরাতন চোখে/মাঝে মাঝে চেয়ো সখী/উজ্জ্বলিয়া স্মৃতির মন্দির/ এই পুরাতন প্রাণে মাঝে মাঝে এসো সখি/ শূন্য আছে প্রাণের কুঠির’।
কুঠিবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার সময় হলো। তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে চরাচরে। গোধূলির আবির রাঙা আকাশ আজ কেন জানি একটু বেশিই লাল। কুয়াশায় ঢাকা পড়েনি এই নম্র লজ্জাতুর আকাশরানীটি আজ। যাওয়ার কথা মনে করে বিষাদে মন ভরে উঠে। কেবলই তখন মনে অনুরণন, ‘তোমার টানে আমার ছন্দ পাখা মেলে বলে-/ তোমায় ভুলিবার নয়,/ তুমিতো করেছো, জয় বিশ্বময়।/ তোমার সুরে কেটেছে, য়ের ভয়/ মিলন বন্ধনে সমাজে, কুসংস্কারের হয়েছে লয়।/ তুমি বাংলার আকাশে ধ্রুবতারা, দেদীপ্য উজ্জ্বলময়,/ স্নিগ্ধমায়ার বেঁধেছো মানুষেরে, প্রকৃতিকে আপনালয়।’
কুঠিবাড়ি থেকে ফেরার পথে কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় অবস্থিত কবিগুরুর স্মৃতিধন্য টেগর লজের সামনে থামলুম। একসময় বেদখল হয়ে যাওয়া এই বাড়িটি পরবর্তীতে উদ্ধার করে সংরক্ষণ করা হয়। কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া এসে কবি এই বাড়িতে বিশ্রাম করতেন। জগতি স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে পালকিতে চড়ে কবি আসতেন এই বাড়িতে। কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে চলে যেতেন শিলাইদহ। লাল দ্বিতল এই ভবনটি বৃটিশ স্থাপত্যরীতি অনুসারে নির্মিত। বর্তমানে এটি কুষ্টিয়া পৌরসভা কর্তৃক দেখভাল করা হচ্ছে। সময়াভাবে আমরা টেগর লজের ভিতরে ঢুকতে পারি নি।
টেগর লজের নিকটেই আরেক মহাপ্রাণ বাঙালি লালন সাঁইজির মাজার। দুই কীর্তিমান বাঙালির স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে কুষ্টিয়া হয়ে উঠেছে বাংলা শিল্প-সংস্কৃতির এক পীঠস্থান। লালনের একেবারে কাছাকাছি থেকে রবীন্দ্রনাথ এই বাউলের দ্বারা বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ও লালন সাঁই যে মানবতাবাদী পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছিলেন যে বিভেদমুক্ত সমাজ দেখার অভিপ্রায় নিয়ে সারা জীবন সাধনা করে গেছেন, আজ আমরা সেই জায়গা থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছি। আজ সারা পৃথিবীতে অশান্তির যে আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে, মানুষের পরিচয় যেভাবে নানা পরিচয়ে ক্ষুদ্র গন্ডিবদ্ধ হয়ে পড়েছে, সেখান থেকে উদ্ধারের জন্য আমাদের বার বার রবীন্দ্রনাথের কাছে লালন সাঁইর কাছে ফিরে যেতে হবে। টেগর লজ থেকে ফিরার পথে আমি আনোয়ার ভাই ও দিলীপ বাগচী এই কথাগুলোই আলাপ করছিলাম। এবারের গন্তব্য, ওই যে বললামÑ আরেক মহাপ্রাণ লালন ফকিরের আখড়া; সেখানে। রবীন্দ্রনাথকে বুঝতে গেলে লালনকে তো বুঝতেই হবে। (চলবে)