কুমার সৌরভ
এবার কুষ্টিয়ার পথে
এক সপ্তাহের অবহিতকরণ কর্মশালা শেষে দ্রুত বাসায় ফিরে আসার পরিকল্পনা ছিল। বাঙালি সর্বদাই গৃহকাতরতায় ভোগে। প্রয়োজনীয় কাজ সেরে ঘরে বসে থাকাটাকেই বাঙালি সবচাইতে বড় বিনোদন মনে করে থাকে। আমি নিজেও এমন আটপৌঢ়ে স্বভাবের বাঙালিই। একটু বেশিই বোধ করি। কর্মশালা শেষ মানে আমার প্রতি সরকারি দায়িত্বও শেষ। এখন থেকে প্রতিবেলার খাবার নিজের পয়সায় উদরস্ত করতে হবে। হোটেলে খাওয়া বিশাল খরচের ব্যাপার। প্রশিক্ষণে যে টাকা পাওয়া গেছে তা থেকে যাতায়াত খরচ বাঁচিয়ে সকলেই সামান্য কিছু কেনাকাটা করতে পছন্দ করেন। এই টাকা দিয়ে বাড়তি দুই দিন বাইরে থাকার চিন্তা করার মতো স্বচ্ছলতা কোন কালেই এই অধমের ছিল না। কিন্তু বাধ সাধলেন আমার এক বন্ধু। তিনি কুষ্টিয়া শহরের অধিবাসী। দিলীপ কুমার বাগচী। সুনামগঞ্জ শহরের জামাই। তিনি প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার আগের দিন ফোন দিয়ে বললেন, কি ব্যাপার দাদা, আমাদের এত কাছে আসলেন একটিবার ফোনও দিলেন না। আমি বললাম, কাছে কোথায় দাদা। আমি তো কোটালীপাড়া এসেছি। কোথায় কোটালিপাড়া আর কোথায় কুষ্টিয়া। বাগচী নিরস্ত হলেন না। বললেন, এতদূর যখন এসেই পড়েছেন, সামনে শুক্র-শনিবারও আছে। আমাদের এখানে বেড়িয়ে যান। আমরা খুব খুশি হব। এই আন্তরিক অনুরোধকে এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য নেই আমার। মূলত আমার এই প্রিয় ভগ্নিপতির অনুরোধেই ভ্রমণ প্রলম্বিত হলো। ভাবলাম, বিনি পয়সায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা তো হয়েছে, সামনে দুই দিন বন্ধও আছে, সুতরাং কুষ্টিয়া ঘুরে যেতে অসুবিধা কোথায়। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, যা থাকে কপালে, ঘুরেই যাব কুষ্টিয়া।
কুষ্টিয়ার প্রধান আকর্ষণ শিলাইদহ রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি আর ছেউড়িয়ার লালন শাহ্’র মাজার। কুষ্টিয়া বাংলার সমৃদ্ধ শহর। পদ্মা তীরবর্তী এই শহরটি ১৮৬৯ সনে প্রতিষ্ঠিত হয় একটি পৌরসভা হিসেবে। অবশ্য তখন এই শহরটি নদীয়া জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিলো। এর আগে কলকাতা থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত রেললাইন স্থাপিত হয় ১৮৬০ সনে। কলকাতার সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন হওয়ায় এই অঞ্চলে শিল্প কল-কারখানা গড়ে উঠার বাস্তবতা তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠা পায় যজ্ঞেশ্বর ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস, রেনউইক এন্ড যজ্ঞেশ্বর কোম্পানি ও মোহিনী মিলের মতো শিল্প কারখানা। কালের বিবর্তনে এইসব প্রতিষ্ঠান এখন আর অস্তিত্বমান না থাকলেও এখনও কোনমতে টিকে আছে জগতি সুগার মিল। উল্লেখ্য এই জগতি সুগার মিলের নিকটবর্তী জগতি রেলস্টেশনটি ছিলো তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানের প্রথম রেলস্টেশন। ঐতিহাসিক এই রেলস্টেশনটিও এখন পর্যন্ত টিকে আছে। কথিত আছে, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতা থেকে রেলে করে রওয়ানা হয়ে এই জগতি স্টেশনে নামতেন। স্টেশন থেকে পালকিতে চড়ে কুষ্টিয়া শহরে অবস্থিত অবকাশকেন্দ্র টেগুর লজে গিয়ে উঠতেন। সেখানে কয়েকদিন বিশ্রাম নিয়ে বোটে করে শিলাইদহ কুটিরবাড়িতে চলে যেতেন। বৃটিশ আমলে এখানে শিল্পস্থাপনের যে ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে তার ধারাবাহিকতায় কুষ্টিয়ার বিআরবি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সুনাম অর্জনকারী একটি দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রতিনিয়ত নিজেদের পরিধি বাড়িয়ে চলেছে। বিআরবির ইলেকট্রিক ক্যাবল এখন বাংলাদেশের বাইরে বহু দেশে রপ্তানি হয়ে থাকে। ১৯৪৭ সনে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার সময় কুষ্টিয়া একটি স্বতন্ত্র জেলা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমান কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর ছিল এই জেলার মহকুমা।
কুষ্টিয়ার স্থানীয় মানুষদের উচ্চারণ রীতি খুব সুন্দর। আমরা আজ যে আধুনিক প্রমিত বাংলায় কথা বলি তার সাথে কুষ্টিয়া তথা নদীয়া অঞ্চলের অধিবাসীদের মুখের ভাষার মিল রয়েছে। এই অঞ্চলের কথ্যভাষা বাংলা চলতি ভাষার সাথে সাযূজ্যপূর্ণ এবং শ্রুতিমধুর। রবীন্দ্রনাথ সিলেটি ভাষা শুনে তাতে কমলালেবুর গন্ধ পেয়েছিলেন। তিনি কুষ্টিয়ার ভাষায় বকুল ফুলের গন্ধ পেয়ে উদ্বেলিত হয়েছিলেন কিনা সেটি জানা নেই আমাদের। তবে শিলাইদহে সারি সারি বকুল গাছ দেখে যে কারও মনে হতে পারে কবিগুরু সত্যিই এই বুলির মাঝে বোধ করি বকুলের গন্ধ আবিষ্কার করে মাতোয়ারা হয়েছিলেন। কুষ্টিয়া অঞ্চলের মানুষ সুসংস্কৃতিবান, অতিথিপরায়ণ এবং সরল প্রকৃতির। কুষ্টিয়া বাংলা শিল্প-সংস্কৃতির বহু নমস্য ব্যক্তির স্মৃতিবিজড়িত। শিলাইদহে একটি প্রদর্শনীফলক টানানো রয়েছে যেখানে কুষ্টিয়ার শুধু কুমারখালি উপজেলার সাথে সম্পর্কিত কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির নামের তালিকা লিখা আছে। ওই তালিকায় যাদের নাম তালিকাভূক্ত রয়েছে তাঁরা হলেনÑ বাউলস¤্রাট লালন শাহ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্যিক মীর মোশাররফ হোসেন, গ্রামীণ সাংবাদিকতার পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, সাহিত্যিক আকবর হোসেন, অক্ষয় কুমার মৈত্র, কৃষক প্রজাতন্ত্র আন্দোলনের নেতা মৌলভী শামছউদ্দিন আহমদ প্রমুখ (অস্পষ্ট থাকায় কয়েকজনের নামের পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়নি)।
সকাল বেলা কোটালিপাড়া ছেড়ে গোপালগঞ্জ, গোপালগঞ্জ থেকে খুলনা এবং খুলনা থেকে কুষ্টিয়া; দীর্ঘ বাসভ্রমণ শেষে কুষ্টিয়া পৌঁছতে রাত নয় টা বেজে গেল। আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিলো এই কারণে যে, কুষ্টিয়া আসবেন এমন দুইজন সহকর্মী পেয়ে যাই। তাঁদের পাওয়ায় কোটালিপাড়া-কুষ্টিয়া ভ্রমণটির একঘেয়েমী ও একাকিত্ব দূর হয়ে কিছুটা স্বস্তিদায়ক হয়েছে। এদিকে কোটালিপাড়া ছাড়ার পর থেকে কুষ্টিয়া পৌঁছানো পর্যন্ত আমার সেই ভগ্নিপতি সহকর্মী-বন্ধু দীলিপ বাগচী কতবার যে মোবাইল করে করে খবরাখবর ও রাস্তার বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছিলেন তার হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়। তিনিও তখন ফরিদপুর থেকে কুষ্টিয়া আসছিলেন। প্রথমে বললেন, তার ট্রেইন লেইট করেছে। তাই তার আগেই আমরা কুষ্টিয়া পৌঁছে যাব। তিনি আমাদের কুষ্টিয়া শহরে ঢুকার আগে চৌড়হাঁস মোড়ে নেমে যেতে বললেন। একটি ফার্মেসির ঠিকানা দিয়ে বললেন নেমেই ওখানে চলে যেতে। সেখানে তার লোক থাকবে যিনি আমাকে বাসায় নিয়ে যাবেন। এসময় তিনি তার স্ত্রী অর্থাৎ আমাদের ছোট বোনটির মোবাইল নম্বরও দিলেন যাতে আমি পথহারা হলে যোগাযোগ করতে পারি। একটুক্ষণ পরই বোন ফোন করে জিজ্ঞাসা করল- দাদা, কোথায় এসেছেন। তখন যশোর অতিক্রম করছিলাম। শুনে সে বলল, তাহলে তো আপনাদের আসতে রাত হয়ে যাবে। সেও ফার্মেসিতে উঠার কথা বলল। ভগ্নিপতি ও ছোটবোনের এত আন্তরিকতায় আমি লজ্জাই পেয়ে গেলাম। আমি শুধু বললাম, তোমরা এত চিন্তা করো না তো। ঠিকঠাক বাসায় পৌঁছে যাব দেখবে। অবশ্য এসবের কোন প্রয়োজন হলো না। কারণ দিলীপবাবুর ট্রেন লেট হয়েছে ফরিদপুরে আর আমাদের বাস লেট করছে রাস্তায় রাস্তায়। বাসের চিরাচরিত স্বভাব অনুসারে প্রতিটি স্টেশনেই ইচ্ছামত দেরি করছে। যাত্রী উঠাচ্ছে নামাচ্ছে। খুলনা থেকে উঠার সময় বাসের লোকজন বলেছিল এটি রাস্তায় দেরি করবে না। কিন্তু বাসের লোকের কথা আর ধানগাছের তক্তা যে একই রকমের জিনিস সেটি তো আমাদের কারও অজানা নয়। এরকম দেরি হতে হতে দিলীপ বাবুর ট্রেন ফরিদপুর থেকে আমাদের আগেই কুষ্টিয়া পৌঁছে গেল। তিনি কুষ্টিয়া নেমে আমাদের অবস্থান জানতে চাইলেন। বললাম। তিনি তখন বললেন, আপনারা প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছেন। আমি বরং কুষ্টিয়া শহরেই অপেক্ষা করছি। আপনারা আর চৌড়হাঁসে নামবেন না। সরাসরি বাসস্টেন্ডে এসে পড়–ন।
বাস থেকে নামতেই সেই হাসিমুখ দীলিপ বাবুর দেখা পেলাম সামনেই। প্রায় ১৫ বছর পর দেখা। পরষ্পর পরষ্পরকে জড়িয়ে ধরলাম। চেহারায় কিছুটা বয়সের ছাপ পড়লেও মুখের সারল্য আর হাসি সেই আগের মতো এখনও একই আছে। কুশলাদি বিনিময়ের পর সহযাত্রী-সহকর্মী আইয়ুব আলী ও সুভাষ দা সহ আমরা সকলে মিলেই পাশের একটি রেস্টুরেন্টে বসে চা পান করলাম। অতঃপর সহকর্মীদের বিদায় জানিয়ে একটি অটোবাইকে দীলিপ বাবুর সাথে রওয়ানা হয়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে তার বাসায় পৌঁছে গেলাম। ছোট বোন ততক্ষণে স্নান করার জন্য গরম জল করে রেখেছে। সারাদিনের বিরক্তিকর সড়ক ভ্রমণের পর সারা শরীর যেন ধূলা আর ময়লায় একসা হয়ে উঠেছে। কলতলায় গিয়ে প্রাণভরে স্নান করলাম। স্নান শেষে দুই বন্ধু মিলে খাবার খেতে বসলাম। বোন আমার কত আয়োজন করে রেখেছে। মাছের কয়েক পদ, নানা জাতের ভাজা-বড়া, নিরামিষ সবজি, মুগ ডাল। সবশেষে খেজুরগুড় আর খাঁটি দুধের তৈরি পায়েশ। তৃপ্তি সহকারে খেলাম। খাওয়ার পর জমে উঠল গল্প। বোনটি জানতে চাইছিল নতুন পাড়ার নানাজনের খবরাখবর। পাশের বাসার মুকুটের ডাক্তার হয়ে যাওয়ার খবর পেয়ে সে যে কি খুশি হয়েছে। বলল, এই মুকুটকে কত কোলে-কাঁখে নিয়েছি, সে এখন ডাক্তার হয়ে গেছে। এইভাবে সুনামগঞ্জের বহু খবর দিতে হলো তাকে। দীলিপবাবু তাগাদা দিলেন ঘুমানোর। বললেন, আমাদের সকাল সকাল রওয়ানা হতে হবে নতুবা একদিনে শিলাইদহ আর ছেউরিয়া দেখা সম্ভব হবে না। একটু না ঘুমালে উঠতে পারবেন না। তার কথা মেনে নিয়ে গল্পের আসর থামিয়ে বিদায় নিলাম। চোখে অবশ্য ঘুম এসেই গিয়েছিল। তাই বিছানায় শোওয়া মাত্র কখন যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলাম টেরই পাই নি। (চলবে)