- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বাড়ির কাছে আরশি নগর

কুমার সৌরভ
সুকান্ত কাব্যভাবনা
বিশ্ব ক্ষমতা বলয়ে সোভিয়েত  পরাশক্তির পতনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য (একাধিপত্যের বিষয়টি এখন আগের মতো নেই। এটি ব্যালেন্স হচ্ছে বলেই বোধ করি) বিশ্ব রাজনীতিতে সাময়িকভাবে হলেও একধরণের একক সাম্রাজ্যবাদী নিয়ন্ত্রণ আরোপিত হয়েছে। বৈশ্বিক ক্ষমতামঞ্চে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কোন শক্তি নেই। যে কারণে পৃথিবীর দেশে দেশে সে তার বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে নিজের ভাবাদর্শ ফেরি করে যাচ্ছে নিরোপদ্রবে। আর তার নিজস্ব এবং ভাবানুকূল প্রচারমাধ্যমের অবিরাম চিৎকার পুঁজিবাদ যে একটি মহান সমাজ ব্যবস্থা আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর সবচেয়ে মানবতাকামী দেশ তা প্রমাণে ব্যতিব্যস্ত রয়েছে। বিশ্ব রাজনীতির এ পরিবর্তনের প্রভাব আমাদের দেশেও সুস্পষ্ট। এক সময় সামন্তবাদী ধ্যান-ধারনার রাজনৈতিক দলগুলো ফ্যাসন হিসাবে সমাজতন্ত্রের কথা বলতো। সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার অপরিহার্যতা এমনই দৃঢ়মূল ছিল যে এর বিপরীত আর্দশের লোকেরাও জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য সমাজতন্ত্রের বুলি আওড়াত। আর আজ অবস্থা ভিন্ন। সমাজতন্ত্র, শ্রেণী সংগ্রাম এগুলো যেন মধ্যবিত্ত নাগরিক সম্প্রদায়ের কাছে নিষিদ্ধ শব্দাবলি। উচ্চারণ করা পাপ। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার গতি প্রকৃতি নির্মিত হয় রাজনৈতিক অনুশীলনের পথ ধরে। ফলে আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতি চর্চায়ও আজ জনবিছিন্নতা, আদর্শহীনতা প্রধানতম ধারা। এ পেক্ষাপটে আজকের সুকান্ত সাহিত্য বিষয়ক আলোচনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। মনে হচ্ছে সাময়িক ক্লান্তির পর জেগে উঠছে কর্মোদ্যোগী মানুষ। বিভ্রান্তির মেঘ কেটে আপন ঠিকানার সন্ধানে বেরিয়ে এসেছে দলে দলে।
বাংলাসাহিত্যে সুকান্ত একটি স্ফুলিঙ্গের মত। উলকাপাতের মত। এই অসীম সাহসী যুবক মাত্র ২১ বছরের জীবনকালে অতি সাধারণ মাত্র ৫/৭ বছরের সাহিত্যসাধনায় আমাদের দিয়ে গেছেন অমূল্য কিছু সম্পদ। যা পরিমাণে কম হতে পারে। কিন্তু শক্তিতে বলীয়ান। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বৃটিশ পরাধীনকালে ১৯২৬ সনের সেপ্টেম্বর মাসে এক নি¤œমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মোটামোটি বালক বয়স থেকেই সুকান্ত বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়ে পড়েন। সহজাত কুশলতায় তখন থেকেই তার সাহিত্যচর্চাও শুরু হয়। তার অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি এবং প্রখর জীবনবোধ আর দশজন        
থেকে সেই বালক বয়সেই তাকে আলাদা করে ফেলে। যার কারণে কিশোর বয়সেই  তিনি রাজনৈতিক প্লাটফরম কমিউনিস্ট পার্টির সান্নিধ্যে আসেন। কমিউনিস্ট পার্টির সাথে  যুক্ত হওয়ার ফলেই তিনি মার্ক্সিয় দর্শনে দীক্ষিত হন। মার্ক্সিয় সাহিত্যঅধ্যায়ন, সাংগঠনিক চর্চা, দেশীয় ও আর্ন্তজাতিক  পরিস্থিতি তাকে স্বচ্ছ বিপ্লবীতে পরিণত করে। শ্রেণী বিভক্ত সমাজের শ্রেণীমর্ম তিনি খুব সুন্দরভাবে আত্মস্ত করেন। অত্যন্ত সাবলীলভাবে তার কবিতায় শ্রেণীবিরোধের প্রকৃত স্বরূপ মূর্ত হয়েছে।
সুকান্ত ভট্টাচার্যের সাহিত্য সাধনা কাল মূলত ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে। এ সময় পুরো পৃথিবীর অবস্থা  ছিলো উত্তপ্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রখরতা এ সময় ভারত পর্যন্ত থাবা মেলেছে। ভারতের অভ্যন্তরে তখন স্বাধীনতার প্রত্যাশা  দিগন্ত বি¯তৃত। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাবও সমাজের বিভিন্ন স্তরে বাড়ছে। যার ফলে শিল্প কারখানায় ধর্মঘট, আন্দোলন, কৃষকদের তেভাগা আন্দোলনে রাজনীতির আকাশ গনগনে সূর্যের মতো তাতানো। স্বাধীনতার প্রশ্নে বৃটিশসাম্রাজ্যবাদ এবং তার  এ দেশীয় বশংবদদের  মধ্যে সাপলুডু খেলার তামাশায় এবং জনসাধারণকে সাম্প্রদায়িক  ভিত্তিতে বিভাজনের কূটকৌশলে রাজনীতির অন্য দিগন্ত তখন ঘন অন্ধকারাচ্ছন্ন। এ অবস্থায়  সুকান্ত ভট্টাচার্য যুগদাবি  ধারণ করেছেন তার কলমে। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের পর প্রতিবাদী সাহিত্যের ধারায় সুকান্ত সংযোজন করেন নতুন মাত্রার এক বিপ্লবী চরিত্র্যবৈশিষ্ট।
সুকান্তের কবিতায় স্বদেশের বাস্তব চেহারা আর অগ্নিসম সম্ভাবনার নিশ্চিত আকাক্সক্ষা ধ্বনিত হয়েছে। তার জন্মকাল সর্ম্পকে তিনি ছিলেন সচেতন। ‘অনুভব’ কবিতায় যার প্রকাশ পাওয়া যায়-   
‘অবাক পৃথিবী। অবাক করলে তুমি
জন্মেই দেখি ক্ষুদ্ধ স্বদেশ ভূমি।’
ক্ষুদ্ধ এবং পরাধীন স্বদেশের শৃঙ্খল মোচনে তার কলম ছিল এক অপ্রতিরোধ্য যুদ্ধাস্ত্র। স্বদেশভূমিকে মুক্ত করতে আর দেশের নিরন্ন শোষিত মানুষের অধিকার আদায়ে তার সুদৃঢ় সংকল্পের কথা বিভিন্ন কবিতায় বার বার এসেছে। যেমন ‘ছাড়পত্র’ কবিতায়-
‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গিকার।’
অথবা ‘ প্রার্থী ’ কবিতায়-
‘ হে সূর্য
তুমি আমাদের উত্তাপ দিও
শুনেছি, তুমি এক জলন্ত অগ্নিপিন্ড,
তোমার কাছে উত্তাপ পেয়ে পেয়ে
একদিন হয়তো আমরা প্রত্যেকেই এক একটা জলন্ত অগ্নিপিন্ডে
পরিণত হবো।’
অনুরূপ আকুতি অনুরণিত হয়েছে তার ‘সিঁড়ি’, ‘কলম’, ‘আগ্নেয়গিরি’ সহ সকল কবিতায়।
সুকান্তের কাব্যধারা মূলত একমুখীন। কবিতাকে তিনি মনে করতেন সমাজ পরিবর্তনের হতিয়ার। তাই তার সকল কবিতায় ঘুরে ফিরে স্বদেশ, নিপিড়িত জনতা আর মুক্তির গান বিভিন্ন ব্যঞ্জনায় প্রকাশিত হয়েছে। শৌখিনতার বশে কিংবা সাময়িক মোহে তার কবিতায় বিদ্রোহের-বিপ্লবের কথা আসেনি। বরং একজন সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মীর দায়িত্বসচেতনতার অংশ হিসাবেই এগুলি তার কবিতার উপজীব্য হয়েছে।  সামসময়িক কিংবা পূর্বেকার কোন কবির কবিতায় বিদ্রোহ বিপ্লবের এমন সর্বব্যাপী প্লাবন লক্ষ্য করা যায় না। সুকান্ত এ জন্যই অন্যদের চেয়ে পৃথক। এ কারণেই সুকান্তের কবিতা সংখ্যাগত দীনতা সত্বেও সাহিত্যাঙ্গনে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে মহিমান্বিত।
বৃটিশ পরাধীনতার বিরুদ্ধে অনেকেই বিদ্রোহ করেছেন। কেউ উগ্র জাতীয়তাবাদী পন্থায়, কেই সম্প্রদায়গত দৃষ্টিভঙ্গিতে, কেউবা আবেগতাড়িত বিপ্লবী উম্মাদনায়। কিন্তু সুকান্ত সম্পূর্ণ শ্রেণীচেতনার ভিত্তিতে সেই বিদ্রোহ  প্রকাশ করেছেন। তিনি বুঝতেন নিছক বৃটিশরা চলে গেলেই গণমানুষের মুক্তি আসবে না। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুক্তির জন্য প্রয়োজন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লব।  বৃটিশ শাসনের শেষ মুহূর্তে যখন তারা এ দেশ ছেড়ে চলে  যাওয়ার জন্য প্রস্তুত তখনই সুকান্তের কবিতায় কোনও উচ্ছ্বাস প্রকাশিত হয়নি। সুকান্ত মনে  করতেন রুশ বিপ্লবের মত বিপ্লব সংঘটনই গণমানুষের মুক্তির পথ। তাই তার বিভিন্ন কবিতায় রুশবিপ্লবগাঁথা বর্ণিত হয়েছে বারে বারে।  
‘লেলিন ভেঙ্গেছে বিশ্বে জনস্রোতে অন্যায়ের বাঁধ,
অন্যায়ের মুখোমুখি লেনিন জানায় প্রতিবাদ।
মৃত্যুর সমুদ্র শেষ। পালে লাগে উদ্দাম বাতাস
মুক্তির শ্যামল তীর চোখে পড়ে, আন্দোলিত ঘাস।
লেনিন ভূমিষ্ট রক্তে কবিতার কাছে নেই ঋণ।
বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।’
   (বাকী অংশ আগামী সংখ্যায়)

  • [১]