- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বাড়ির কাছে আরশি নগর

কুমার সৌরভ
বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজারে কুমিরের সাথে
প্রশিক্ষণের কিছু মজা আছে। এক হলো বিশেষভাবে শিক্ষণের এই জায়গায় অনেক পুরানো কলিগদের সাথে দেখা হয়। দৈনন্দিন জীবন যাপনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি দিতে এমন স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ (রিফ্রেসার্স কোর্স) বলবর্ধক টনিকের মতো কাজ করে। প্রায় বুড়ো বয়সে এরকম রিফ্রেসার্স কোর্স সত্যিই আমাদের যৌবনের হারানো স্বাদ কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিয়েছে। ক্লাসে উপস্থিত থাকতে হয় সরকারি টাকা খরচকে বৈধতা দানের জন্য। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই প্রশিক্ষণ সময়ে এই ক্লাশ গ্রহণের সময়টুকুই সবচাইতে নিরানন্দের। এর বাইরে যে আড্ডা, হুল্লুর, ঘুরাঘুরি সেইটুকুতেই সকলের আগ্রহ বেশি।  প্রশিক্ষণ কোর্স এমনভাবে ডিজাইন করা হয় যাতে ওই এলাকার ঐতিহাসিক বা গুরুত্বপূর্ণ স্থান/স্থাপনা দেখার জন্য একটি দিন নির্ধারিত থাকে। শিক্ষাসফর নামের আড়ালে ওই আয়োজনকে সহিশুদ্ধ করা হয়। বাপার্ড কর্তৃপক্ষ আমাদের জন্যও এমন একটি শিক্ষাসফরের আনন্দদায়ক আয়োজন রেখেছিলেন একদিনের জন্য। বাপার্ডের এয়ারকন্ডিশন্ড বাসে চড়ে বাগেরহাট ও টুঙ্গিপাড়া ভ্রমণ, বাগেরহাটের হোটেলে সামুদ্রিক সুস্বাদু কুড়াল মাছ সহযোগে রাজকীয় ভোজন এবং দ্রষ্টব্যস্থানে ঘুরাঘুরি।  
বাগেরহাট অনেক প্রাচীন জনপদ। মোঘল আমলে এখানে নাগরিক সুযোগ সুবিধাসহ একটি নগর গড়ে উঠেছিল। উইকিপিডিয়া ঘেঁটে জানা যায়, বাগেরহাটে বসতি স্থাপন করে অনার্য শ্রেণির মানুষ। খ্রিস্টের জন্মের প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মধ্য এশিয়া হতে এ অঞ্চলে মানববসতি গড়ে উঠেছিল। বাগেরহাটের অতি প্রাচীন স্থান পানিঘাটে প্রাপ্ত কষ্টি পাথরের অষ্টাদশ ভূজা দেবীমূর্তিসহ বিভিন্ন নির্দশন থেকে এই অঞ্চলে হিন্দুসভ্যতা বিকশিত হওয়ার প্রাচীনতা সম্পর্কে প-িতগণ একমত হয়েছেন। ইসলাম ধর্মপ্রচারক খানজাহান আলী যখন খাঞ্জেলি দীঘি খনন করান তখন খননস্থলে ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধমূর্তি পাওয়া যায়। এই বৌদ্ধমূর্তি বর্তমানে ঢাকার কমলাপুর বৌদ্ধবিহারে স্থাপিত আছে। এই বৌদ্ধমূর্তি থেকে বাগেরহাটে পালআমলে বৌদ্ধসভ্যতা বিকশিত হওয়ার প্রমাণ দেয়।
প্রাচীন ইতিহাসের পাতা বন্ধ করে আসুন সুলতানি আমলে ফিরে আসি। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের শাসনামলে (১৪৪১-১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ) খানজাহান নামের একজন মুসলিম সেনানায়ক বাগেরহাট শহরের প্রতিষ্ঠা করেন। খ্রিস্টিয় পনের শতকের দিকে বাগেরহাট শহর সংলগ্ন পশ্চিম অংশে এই মুসলিম শহর গড়ে উঠে। তখন এর নাম ছিল খলিফাতাবাদ। তবে ইতিহাসের সেই খলিফাতাবাদ শহর আজ বিলুপ্ত। ১৯৮৪ সনের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বৃহত্তর যশোর জেলার একটি মহকুমা এই    
বাগেরহাট জেলায় উন্নীত হয়। বাগেরহাট শহরের প্রধান আকর্ষণ খানজাহান আলীর মাজার, বিখ্যাত ষাটগম্বুজ মসজিদ ও লোকশিল্প জাদুঘর।
বাগেরহাটের খানজাহান আলীর মাজারশরীফে আসার প্রধান কারণ হলো মোঘল স্থাপত্য রীতির আদলে গড়ে উঠা মাজার ও মসজিদ এবং মাজারের দীঘির জীবন্ত কুমির দেখা। খানজাহান আলীর জীবৎকাল ১৩৬৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৪৫৯ খ্রিস্টাব্দ। ৯০ বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। তিনি দিল্লীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং বিশ বছর বয়সে মোঘল সেনাদলের সেনাপতি পদ থেকে কর্মজীবন শুরু করেন। দিনাজপুরের রাজা গনেশকে পরাজিত করে তিনি বাংলার শাসনভার গ্রহণ করেন। পরে তিনি বাংলায় ইসলাম প্রচারের কাজে নিয়োজিত হন।
আমরা যখন মাজারে প্রবেশ করি তখন দুপুর। মাথার উপরে সূর্য। রোদের তেজ এতাটাই প্রবল যে ডিসেম্বর মাসেও আমরা প্রচ- গরম অনুভব করছিলাম। গায়ে যেসব গরম কাপড় ছিল সেগুলো এখন আমাদের কাছে যন্ত্রণা মনে হচ্ছে। কিন্তু গরম কাপড় খুলে হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর আরও বিড়ম্বনাকর তাই গরম সহ্য করে থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করলাম। প্রতিটি মাজারেরই বোধ করি এক অবস্থা। প্রধান রাস্তা থেকে মাজারের দিকে যে রাস্তাটি সেখানে বিশাল গেইট রয়েছে। গেইট দিয়ে প্রবেশ করতেই নানা কিসিমের দোকানপাট, হাঁকঢাক, ভিড়। অধিকাংশ দোকানই হস্তশিল্পের। আগরবাতি-মোমবাতির দোকানের প্রাচুর্যও বেশি। খাবারের দোকানও রয়েছে দেখলাম। যাইহোক মাজারে কোন মানত করা যেহেতু আমাদের উদ্দেশ্য নয় তাই পূন্যকাজে সহায়তাকারীদের হাকডাক উপেক্ষা করেই আমরা ছুটলাম মূল মাজার অঙ্গনের দিকে। রাস্তা দিয়ে এগুলে এক শ’ গজ দূরত্বের মধ্যেই মাজারের মূল প্রবেশতোরণ।  খিলান আকৃতির বিশাল তোরণ। লাল রঙের মোঘল স্থাপত্যরীতি অনুসারে তোরণ ও মাজার। তোরণ দিয়ে ঢুকতেই হাতের ডানে খানজাহান(রহ.) আলীর পবিত্র মাজার। মাজারের সামনে দাঁড়িয়ে নিরবে এই ধর্মপ্রচারক তথা মুসলিম শাসকের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। এরপর পুরো মাজার প্রাঙ্গণ দেখা। মাজারের দক্ষিণ দিকে খাঞ্জেলি দীঘি। প্রায় ২০০ বিঘা জমি নিয়ে এ দীঘি অবস্থিত। মাজার প্রাঙ্গণ থেকে ২৮টি পাকা ধাপ পেরিয়ে তবে দীঘির জল। শুনলাম অনেকে এই দীঘির জল পবিত্র জ্ঞান করে বিভিন্ন রোগবালাই সারাইর ইচ্ছা পোষণ করে নিয়ে যান। দীঘির মূল আকর্ষণ কুমির দেখা। আমাদের ভাগ্য ভাল একটি বিশাল কুমির তখন পাড়ে রোদ পোহাচ্ছিল। বেষ্টনি দেয়া জায়গা থেকে আমরা কুমিরটি দেখতে পেলাম। কাছে যাওয়ার অনুমতি নেই। বিপদ ঘটতে পারে। এই কুমির নিয়ে নানা উপকথা রয়েছে। জনশ্রুতি অনুযায়ী খানজাহান আলী (রহ.) এই দীঘিতে কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড় নামের দুইটি কুমির ছেড়েছিলেন। কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ই বংশ বিস্তারের মাধ্যমে শত শত বছর ধরে এই দীঘিতে বিচরণশীল রয়েছে। এটি জনশ্রুতি। জনশ্রুতির এই দুই কুমির কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়ের সর্বশেষ বংশধর মারা গেছে বলে জানলাম। এখন দীঘিতে যে কুমির রয়েছে সেগুলো কালাপাহাড় ধলাপাহাড়ের মৃত্যুর পর এনে ছাড়া হয়েছে।
আমাদের সহকর্মীদের কয়েকজন ভীষণ ধর্মভীরু। তারা বিশ্বাস করেন কোন নিয়ত করে এই কুমিরদের খাবার দিলে সেই নিয়ত পূর্ণ হয়। এরূপ ধারণা মনে আনতে দীঘির কাছে থাকা কিছু মানুষের সতর্ক প্রচারণা ভূমিকা রেখেছে। আমরা যখন বাঁশের বেড়া দেয়া স্থানে দাঁড়িয়ে অদূরের দীঘিপাড়ে ঘুমন্ত কুমিরটিকে দেখছিলাম তখন জনৈক সহকর্মী এক খাদেমকে (এরা মূলত খাদেম নয়। খাদেম ভরংধারী ঠকবাজ) তমিজের সাথে বরলেন, ভাইসাহেব আমরা কি কুমিরটিকে খাবার দিতে পারি? ছুকরা টাইপের ওই খাদিম বললেন, দিতে পারেন। কুমির হাঁস ছাড়া আর কিছু খায় না। সহকর্মী জিজ্ঞাসা করলেন, হাঁস কোথায় পাই? খাদিম বললেন, চিন্তা করবেন না। আমার পরিচিত লোক আছে সে একটি হাঁস বিক্রি করবে। বলেই কারো নাম ধরে ডাকলেন তিনি। পাশের খুপড়ি ঘর থেকে এক ব্যক্তি উদয় হলেন। তার হাতে লিকলিকে এক হাঁস। খাদিম বললেন এটি কিনতে পারেন। দাম জানতে চাইলে লোকটি দাম হাঁকল ৮০০ টাকা। শুনে আমরা সকলেই চমকে উঠলাম। আমাদের একজন বললেন, এইটুকু হাঁস শরীরে মাংস নেই একরত্তি। এর দাম এতো? হাঁসওয়ালা বলল, নিয়তের হাঁস কিনতে দামাদরী করতে নেই সাহেব। আমাদের আরেকজন বললেন, তাই বলে ৫০ টাকার হাঁসের দাম ৮০০ টাকা হাঁকবেন ভাইজান। এবার খাদেম সাহেব মুখ খুললেন। বললেন তিনি, আচ্ছা ঠিক আছে আপনারা কত দিবেন বলুন। আমাদের মানতধারী সহকর্মী তাৎক্ষণিক উত্তর দিলেন ২০০ টাকা দিয়ে দিব জনাব। খাদেম বললেন- এত কম দামে দিবে না সাহেব। ঠিক আছে আপনি ৪০০ টাকা দেন। অবশেষে ৩০০ টাকায় রফা হলো। দাম মিটিয়ে দেয়ার পর হাঁসটি মানতধারীর হাতে আসল। এবার কুমিরের কাছে যাওয়ার পালা। খাদেম আমাদেরকে নিয়ে গেলেন কুমিরের কাছে। মানতধারী কুমিরের মুখের কাছে হাঁসটি রাখলেন। তিনি ভেবেছিলেন কুমির বোধ করি হাঁসটি খাওয়া শুরু করবে। কিন্তু না সে রকম কোন লক্ষণ দেখা গেল না। খাদেম বললেন- কুমির এখন ঘুমুচ্ছে। জাগলে আমি খাইয়ে দিব আপনারা কোন চিন্তা করবেন না। অগত্যা বিশ্বাসেই ভরসা। তখন আমাদের এক আঁতেল সহকর্মী বলে বসল-ভাইসাহেব আমরা কি কুমিরকে ধরে ছবি তুলতে পারি? খাদেম বললেন, পারবেন, তবে দু’জন করে যেতে হবে। আলতোভাবে কুমিরের শরীরে আঙুল লাগিয়ে ছবি তুলবেন। কোনভাবেই তাকে রাগত করে তুলতে পারবেন না। কে যায় কুমিরকে রাগাতে। কুমির রাগলে যে হাঁস ছেড়ে আস্ত মানুষই পেটে ঢুকিয়ে নিবে তা কি আর অজানা। খাদিম সাহেব ছবি উঠানেওয়ািলাদের উপদেশ দিলেন, কুমিরকে ছুঁয়ে কিছু টাকা পয়সা যেন ভেট হিসেবে দেয়া হয়। এতে নাকি পূন্য বৃদ্ধি পাবে। যাহোক এমন করেই কুমিরের গায়ে আলতো স্পর্শ করে আমরা সবাই ছবি তুললাম। ছবি তোলার পর আমাদের সে কি উল্লাস। যেন যুদ্ধ জয় করে ফেলেছি আর কি।
ছবি তোলা শেষ। এবার ফেরার পালা। গেটের বাইরে এসে হস্তশিল্পের দোকান থেকে সকলেই কিছু না কিছু কিনলেন। স্মৃতি হিসেবে আমি একটি কাঠের কুমির ছানা কিনলাম। কুমির ছানাটি হাতে ঝুলিয়ে বীরদর্পে যেন বা জীবন্ত কুমির হাতে করেই বাসে উঠলাম। এবারের গন্তব্য ষাটগম্বুজ মসজিদ ও বাগেরহাট লোকশিল্প জাদুঘর।

  • [১]