- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বাড়ির কাছে আরশি নগর

কুমার সৌরভ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
ষাটগম্বুজ মসজিদ
ষাটগম্বুজ মসজিদের আসলে গম্বুজ কয়টি? সাধারণ জ্ঞানের এক কমন প্রশ্ন। কিন্তু এর সঠিক উত্তর আমি জানতাম না। ভাবতাম নামের মাঝেই তো উত্তর লুকিয়ে আছে। নাম যখন ষাটগম্বুজ তখন এর গম্বুজের সংখ্যা তো ৬০টিই হবে। কিন্তু না ভুল ভাঙ্গল এই মসজিদ প্রাঙ্গণে আসার পর। সহযাত্রী এক কলিগ প্রশ্নটি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন। আমি যথারীতি কোন কিছু না ভেবেই উত্তর দিলাম ৬০টি। জেনারেল নলেজের জেনারেল উত্তর। কলিগ বললেন, এই তো ধরা খাইলেন। এরকম উত্তর দিলে তো পরীক্ষায় পাস করতে পারবেন না। আসলে এই মসজিদের সর্বমোট গম্বুজ সংখ্যা ৮১ টি। তবে ৮১ সংখ্যাটি মসজিদের চারটি মিনারকে গোণায় ধরে,  প্রকৃত গম্বুজ সংখ্যা ৭৭ টি। মসজিদের চার কোণায় রয়েছে চারটি মিনার। যা ইসলামের বিজয়প্রতীক। চৌচালা গম্বুজ রয়েছে ৭টি। প্রকৃত গম্বুজ ৭০ টি। সবমিলিয়ে ৮১টি। মনে প্রশ্ন আসল, তাহলে মসজিদটির নাম ষাট গম্বুজ মসজিদ রাখা হল কেন? খুঁজতে খুঁজতে এর একটি উত্তর পাওয়া গেল। একটি মতে দেখা যায়, মসজিদটি ষাটটি পাথরের স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে, ফারসি ভাষায় এগুলোকে বলা হয় খামবাজ। আর এ খামবাজ শব্দটি বিবর্তিত বা রূপান্তরিত হয়ে নাম ধারণ করেছে গম্বুজ। অর্থাৎ ৬০টি খাম্বার উপর দাঁড়িয়ে থাকা মসজিদটির নাম ষাট গম্বুজ মসজিদ। আরেকটি মতে এই মসজিদে কোন ছাদ নেই। ছাদ নেই বলতে আমরা সাধারণত প্রচলিত অর্থে সমান্তরাল ধরনের যে ছাদ দেখি তা এখানে অনুপস্থিত। অর্ধ ডিম্বাকার ও আয়তাকার গম্বুজগুলোই এর ছাদ। গম্বুজ ছাড়া আলাদা কোন ছাদ নেই বলে একে ‘ছাদ গম্বুজ’ মসজিদ বলা হত। একসময় ছাদ গম্বুজ রূপান্তরিত হয়ে ষাট গম্বুজ হয়েছে।  ষাটগম্বুজ মসজিদ দেখতে এসে এমন ধরা খেয়ে চুপসে গেলাম সত্যি কিন্তু সেটি মসজিদের সৌন্দর্য দর্শন ও ঐতিহাসিক-প্রতœতাত্ত্বিক গুরুত্ব অনুধাবনে কোন ভূমিকা রাখতে পারল না। শীতের দুপুরের অপ্রত্যাশিত কড়া রোদ্দুরে মসজিদের ¯িœগ্ধ ও শীতল পরিবেশে আমাদের মনপ্রাণ জুরিয়ে গেল সত্যিকার অর্থেই। মসজিদকে ঘিরে এত এত তাল ও খেজুর  গাছ যে, পুরো মসজিদ আঙ্গিনা এক ছায়া সুনিবিড় শান্ত  নীড় হিসেবে আমাদের কাজে প্রতিভাত হচ্ছিল।   
ষাটগম্বুজ মসজিদ বাংলাদেশের অন্যতম প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন। ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃত ও প্রণীত বাংলাদেশের বিশ্বঐতিহ্যবাহী তিনটি স্থানের তালিকায় এই মসজিদটি অন্তর্ভূক্ত।  অন্য দুইটি স্থান হলো পাহাড়পুরের বৌদ্ধ বিহার ও সুন্দরবন। ইসলাম ধর্মপ্রচারক খানজাহান আলী (রহ.) এই মসজিদ নির্মাণ করেন ।  
শতাব্দীতে এই  মসজিদটি নির্মিত হয়েছে বলে মোটামোটি নিশ্চিত হওয়া যায়। এ মসজিদটি বহু বছর ধরে ও বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদে ব্যবহৃত পাথরগুলো আনা হয়েছিল রাজমহল থেকে। খানজাহান আলী (রহ.) চিশতিয়া তরিকা অনুযায়ী চলতেন বলে কোথাও নিজের অবদানের কথা লিখে রাখা হতো না অথবা কোন শিলালিপিও রাখা হতো না। ফলে ষাটগম্বুজ মসজিদ সহ তাঁর দ্বারা যশোর, খুলনা ও বাগেরহাটে নির্মিত প্রায় ৩৬০ টি মসজিদের কোথাও অনুরূপ কোন শিলালিপি পাওয়া যায় না।   
বিশাল এ মসজিদে আলো বাতাসের কোন অভাব হয় না।  মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে ৬টি করে ছোট ও একটি বড় খিলান। পূর্বপাশে একটি বড় ও তার দু’পাশে ৫টি করে ছোট খিলান। দৈর্ঘে ১৬৮ ফুট ও প্রস্থে ১০৮ ফুটের এ মসজিদের দেয়ালগুলো আট ফুট করে চওরা। এখানে সাত সারির ২১টি কাতারে একসঙ্গে প্রায় তিন হাজার মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। নারীদের জন্য রয়েছে আলাদা সংরক্ষিত স্থান। মূলত চুন সুরকি, কালো পাথর ও ছোট ইটের তৈরি এ মসজিদটির মেহরাব ১০টি। এর মধ্যে মূল মেহরাবটি পাথরের। বাকী ৯ টিতে টেরাকোটার কাজ লক্ষ করা যায়, যা মধ্য যুগের পাল রাজাদের মধ্যে ছিল। ইন্টেরিয়রে বৌদ্ধ স্থাপত্য শিল্পের ছোঁয়া রয়েছে। মেহরাবের নকশায় দেখা যায় গোলাপ, পদ্মপাঁপড়ির টেরাকোটা নকশা। আর চৌচালা ভল্ট রীতি বাংলার চৌচালা কুঁড়েঘরের।
আমাদের সাথের মুসলমান বন্ধুরা ভিতরে নামাজ পড়তে গেলেন কারণ তখনও জুম্মার নামাজের সময় চলে যায় নি। আর আমরা যারা অমুসলিম তারা মসজিদ আঙ্গিনায় ঘুরে ঘুরে এর অপরূপ নির্মাণ শৈলী, সৌন্দর্য ও শান্ত¯িœগ্ধ পরিবেশের অনাবিল শান্তি উপভোগ করছিলাম। হাতে সময় বেশি নেই। কারণ এর পর ষাট গম্বুজ পার্শ্ববর্তী বাগেরহাট মিউজিয়াম দেখে দুপুরের খাবার গ্রহণ এবং এর পর টুঙ্গিপাড়া অভিমুখে যাত্রা করতে হবে। ঘুরতে ঘুরতে ভাবতে থাকি এই জনপদে মসজিদকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে কত অমর স্থাপত্যকর্ম যার কোন কোনটি শিল্পগুণে অনন্য। মনে পড়ে সুনামগঞ্জের পাগলা মসজিদটির কথা। সুনামগঞ্জ অঞ্চলের সবচাইতে সুন্দর মসজিদ বলা হয় এটিকে। জানা যায় কলকাতা থেকে মিস্ত্রি এনে দশ লাখ টাকা ব্যয় করে পাগলার ইয়াসিন মীর্জা দশ বছর সময় ব্যয় করে এই অপূর্ব কারুকাজের মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। সাংবাদিক হাসান শাহরিয়ারের একটি লেখা থেকে জানা যায় সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘর মসজিদটি নাকি মোঘল আমলে নির্মিত হয়েছিল। কয়েক বছর আগে ষোলঘরের প্রাচীন মসজিদটি ভেঙ্গে নতুন মসজিদ নির্মাণ কালে পুরাতন মসজিদের কয়েকটি ইটের নমুনা প্রতœতত্ত্ব বিভাগে পাঠালে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানানো হয় এই স্থাপনা চার শ’ বছর আগের। হাসান শাহরিয়ারের তথ্যমতে, ১৩৮৪ সনে হযরত শাহজালালের সিলেট আগমনের পর তার সঙ্গী হযরত শাহকামাল কুহাফাহ এর দ্বিতীয় ছেলে শাহ মোয়াজ্জেম উদ্দিন কোরেশি জগন্নাথপুরের শাহপাড়া থেকে লাউড় রাজ্য শাসন করতেন। তখন তিনি সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরের নিকটবর্তী নিজগাঁও নামক স্থানে একটি দ্বিতীয় প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তুলেন। তিনি বা তার বংশধরদের কেউ ষোলঘরের প্রাচীন মসজিদটি নির্মাণ করে থাকতে পারেন বলে অনুমান করা হয়ে থাকে। দেশের এইসব প্রাচীন মসজিদকে নিয়ে গবেষণা করলে বহু ঐতিহাসিক তথ্য জানা সম্ভব হবে। ষোলঘর এলাকার সেই মসজিদটি যদি প্রকৃত অর্থেই মোঘল আমলে নির্মাণের তথ্য প্রমাণিত হয় তাহলে অন্তত এটুকু ধারণা লাভ করা যাবে যে শহরের নিকটবর্তী ওই স্থানে সেই সুপ্রাচীন কালেও জনবসতি ছিল। তথ্যটি প্রমাণিত হওয়া আরও দরকার এ কারণে যে, কোন একটি অনুমানের উপর নির্ভর করে বিশ্লেষণ করলে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছার অবকাশ থেকে যায়। এই গবেষণার মাধ্যমে শহর সুনামগঞ্জের পত্তন সম্পর্কেও ঐতিহাসিক ধারণা লাভ সম্ভব। সুতরাং ষোলঘর মসজিদের যে ইটগুলো  প্রতœতত্ত্ব বিভাগে পাঠানো হয়েছিল সেগুলির পরীক্ষণ ফলাফল সংগ্রহ করে এবং ইতিহাসের অন্যান্য উপাদান ও রেকর্ডপত্র যাচাই বাছাই করে কেউ যদি গবেষণা করেন তাহলে এই অঞ্চলের সঠিক ইতিহাস জানা সম্ভব হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ইতিহাস চর্চার অন্যতম উপকরণ হতে পারে বলে আমাদের মনে হয়। কারণ সুপ্রাচীনকাল থেকেই সকল ধর্মাবলম্বীরা নিজেদের সামর্থ অনুসারে কিংবা সামর্থের বাইরে গিয়েও নানা প্রতিষ্ঠানাদি নির্মাণ করে পূন্য লাভের চেষ্টায় নিবেদিত ছিলেন। এসব স্থাপনা সমকালীন ইতিহাসের ধারক।
নামাজ শেষ হতেই আমরা ষাটগম্বুজ মসজিদ প্রাঙ্গণ ছেড়ে লাগুয়া বাগেরহাট জাদুঘরে ঢুকলাম প্রাচীন এই জনপদের কিছু নিদর্শন দেখতে। সেই প্রসঙ্গ পরবর্তী কিস্তিতে। (চলবে)

  • [১]