আকরাম উদ্দিন
হাওর-বাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলা। হাওরকে কেন্দ্র করেই এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকা। মানুষের জীবিকার তাগিদে মাছ শিকারের পাশাপাশি রয়েছে শাপলা, শালুক, সিংড়া, ঝিনুকও সংগ্রহ করে। পানির তলদেশে মানুষের বেঁচে থাকার অনেক সম্পদে ভরপুর।
জাতীয় ফুল শাপলা, শাপলা ফুল রয়েছে সবুজ ও লাল প্রজাতির। লাল পদ্ম নামেও শাপলা ফুলের পরিচিতি রয়েছে সর্বাধিক। ফুলের গোঁড়ায় রয়েছে ফল। এই ফলের নাম ডেফ, ডেফের ভেতরে আছে বিভিন্ন রংয়ের দানা। লাল, গোলাপী, সুরমা রংয়ের। লাল ও গোলাপী রংয়ের দানা খেতে যেমন মজা, সুরমা রংয়ের দানা খেতেও তেমনই মজা। সুরমা রংয়ের দানা দিয়ে মুড়িও ভাঁজেন কেউ কেউ। গ্রাম্যভাষায় মুড়িকে বলা হয় খৈ। ডেফের দানার খৈ ভেজে আবার নাড়ু– তৈরি করেন অনেকে। তা বিক্রিও করেন বাজারে। এই শাপলার ডাটা তরকারিতে সবজি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। অনেকেই এই ডাটা বাজারে বিক্রি করে জীবন ধারণ করেন।
শালুক নামের আরেক প্রজাতি পাওয়া যায় পানির তলদেশে। সাদা রংয়ের ছোট শালুককে কুওয়াই বলেন অনেকে। শালুক ও কুওয়াই অনেকে ভাতের বিকল্প হিসাবে খান। শালুক খেলে মুখে রুচি আসে, এটি আমাশয় রোগের ও জন্ডিস রোগের মহৌষধ বলেও জানান শালুক বিক্রেতারা। শালুক গ্রাম-গঞ্জের হাট-বাজারে বিক্রি করতে দেখা যায়। এসব শালুক বিক্রি করে সংসারের খরচ যোগান হাওরপাড়ের শত শত পরিবার।
পানিতে ভেসে আছে সিংড়া। এই সিংড়া অত্যন্ত সুস্বাধু ফল। মানুষের জীবন জীবিকার অন্যতম বাহন। সিংড়াও বাজারে বিক্রি করা হয়। পানিতে আছে কেচইর নামের এক জাতীয় লতা। এই লতাকে সবজি হিসাবে ব্যবহার করেন অনেকেই। এইলতা প্রায়ই বাজারে বিক্রি হতে দেখা যায়।
পানির নিচে আছে ঝিনুক। গ্রামের মানুষ এটাকে বলেন কাপনা। এই ঝিনুক কুড়িয়ে এনে বের করেন মুক্তা। এই মুক্তা অনেকে বাজারে
বিক্রি করেন। মুক্তা নিয়ে ছায়াছবির গানও আছেÑ‘ঝাপ দিওনা জলে কন্যা, মুক্তা খোঁজে পাইবা না।’ এটাও পরিবারের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম।
এখন শীত মৌসুম শুরু হয়েছে। হাওর ও বিলের পানি কমছে, ধান লাগানোর সময় এসেছে। সেই সাথে শ্রমজীবী মানুষেরা খোঁজে নেন শাপলা, শালুক, সিংড়া ও ঝিনুক।
মাইজবাড়ি গ্রামের ক্রেতা আনোয়ার আলী বলেন, ‘আমি শালুক খেতে পছন্দ করি। ছোটবেলা আমি শাপলা, সিংড়া, শালুক তোলে খেতাম। ওই সময় কেউ এসব বিক্রি করতো না। এখন শালুকও বাজারে পাওয়া যায়। শালুক দেখলেই ছোটবেলার কথা মনে হয়। খেতেও ইচ্ছে হয়।’
শালুক বিক্রেতা বদরপুর গ্রামের ছায়ারুন নেছা বলেন, ‘আমার স্বামীর বয়স হয়েছে। তাই আমি শালুক বিক্রি করে ৬ জনের সংসার চালাই। বছরের ৬ মাস আমি শালুক বিক্রি করি। কাংলার হাওর থেকে প্রতিদিন ভোরে শালুক তুলি। পরে শহরে এনে বিক্রি করি। প্রতিদিন ৫-৬শত টাকার শালুক বিক্রি করতে পারি। এই টাকা দিয়ে আমার সংসারের খরচ চলে।’
শালুক বিক্রেতা আশিদ আলী বলেন, ‘বাওন বিল থেকে শালুক তুলে এনে বাজারে বিক্রি করি। প্রতিদিন ৩-৫ শত টাকার শালুক বিক্রি করি আমি। আমার সংসারে ৬জন আছেন। শালুক বিক্রির টাকা দিয়ে সংসারের খরচ যোগাই। শালুক খেলে মুখে রুচি আসে, ডিসেন্ট্রি ও জন্ডিস রোগের মহৌষধ শালুক। সময়ে সিংড়াও বিক্রি করি।’