- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বিকল্প কৃষি মানে ধানের বিকল্প নয়

বুধবারে জামালগঞ্জের একটি সমাবেশে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক কৃষকদের প্রতি ধানের বিকল্প হিসাবে ভুট্টা ও সূর্যমুখী চাষের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘ধান চাষ এখন অলাভজনক হওয়ায় কৃষকরা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। তাই ধানের বিকল্প হিসাবে ভুট্টা, সূর্যমুখী, টমেটো, মরিচ, বেগুন, সরিষা চাষে আগ্রহ বাড়াতে হবে’। ধান চাষের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাস্তবতা উপলব্ধি করে জেলা প্রশাসক কৃষিতে বৈচিত্র্য আনয়নের যে পরামর্শ প্রদান করেছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। বিকল্প কৃষির প্রতি চাষিদের আগ্রহ এখন বাড়ছে। শাক-সবজি ও তৈল-মশলা জাতীয় চাষাবাদের পরিমাণও বাড়ছে দেশে। তৈল ও মশলার ক্ষেত্রে আমরা এখনও অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটাতে পারছি না বলে দেশের বাইরে থেকে এসব পণ্য প্রচুর পরিমাণে আমদানি করতে হয়। তাই তৈলবীজ ও মশলা জাতীয় চাষাবাদে কৃষকদের আগ্রহ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। এই নিরিখে জেলা প্রশাসকের পরামর্শ যথোপযুক্ত। কৃষিক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনয়ন, জমির উৎপাদনশীলতা বাড়ানো ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের দেশে কাজ করার প্রচুর সুযোগ রয়েছে। আমাদের কৃষি বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণ-কর্মীদের এক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ আরও বাড়াতে হবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আমাদের আশঙ্কাটা অন্য জায়গায়। সেটি হলো ধান চাষের প্রতি কৃষকদের আগ্রহ কমে যাওয়া নিয়ে, জেলা প্রশাসক যেটি উপলব্ধি করেছেন। বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাত। ভাতের বিকল্প হিসাবে আর কোনো খাদ্য দিয়ে আমাদের উদর পূর্তি সম্ভব নয়। কিন্তু ধান চাষ সত্যিকার অর্থে এখন অলাভজনক কাজে পরিণত হয়েছে। কৃষক উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পান না। যেকোনো কৃষকই যে চাষ করে লোকসান দিবেন সেই চাষে আগ্রহ হারাবেন। ধানের প্রতিও তাই সংগত কারণেই আগ্রহ কমছে। এর পরিণতি কী হতে পারে, তা কি আমরা ভেবে দেখছি?
আসলে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নটির উত্তর খোঁজা দরকার জাতীয় স্বার্থে। কয়েকদিন আগেই পেঁয়াজের কেজি প্রতি দাম ২ শ’ টাকা বা তদুর্দ্ধ হতে দেখেছি আমরা। পেঁয়াজ খাদ্যদ্রব্যের জন্য অপরিহার্য উপাদান নয়। অভ্যন্তরীণ সরবরাহ না থাকায় পেঁয়াজের মতো একটি কম গুরুত্বপূর্ণ দ্রব্যের দাম বৃদ্ধি নিয়ে সারা দেশ তোলপাড় হয়েছে। এখন যদি কোনো কারণে বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাতের পাতে টান পড়ে তাহলে অবস্থা কী দাঁড়াবে? কারণ ভাত ছাড়া কারও একদিনও চলবে না। অতীতে চালের আক্রায় দুর্ভিক্ষাবস্থার ইতিহাস আমাদের কারও অজানা নয়। এসব দুর্ভিক্ষ অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও প্রভাবিত করেছে ব্যাপকভাবে। কৃষকের ধানের প্রতি আগ্রহ হ্রাস ঘটিয়ে কি আমরা সেই চরম আশঙ্কাজনক ভবিষ্যৎ পানেই যাত্রা শুরু করেছি? এখনই চালকে ব্র্যান্ড পণ্যে রূপান্তর ঘটানো হয়েছে। নানা নামী দামি কোম্পানি সুন্দর প্যাকেটের ভিতর বন্দী করে উচ্চমূল্যে চাল বিক্রি করছে। যদি কোনো কারণে চাল আমদানি করতে হয় তখন এই উচ্চমূল্য কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা কল্পনা করতে পারি। সেই কঠিন ও রূঢ় বাস্তবতার সম্মুখীন আমরা কখনও হই তা কাম্য নয়। এ জন্যই কৃষকদের ধান চাষের প্রতি আগ্রহ কমার প্রলয়ংকরী ভাইরাসকে রোধ করতে হবে। এটি তখনই সম্ভব যখন কৃষকদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য পাইয়ে দেয়া সম্ভব হবে তখন।
আমাদের দৃষ্টিশক্তিকে প্রসারিত করতে হবে। দূর ভবিষ্যৎ কল্পনা করার মতো সামর্থবান হতে হবে। একটি দেশের মৌলিক চরিত্রকে উপেক্ষা করে কখনও স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব নয়। আমরা নিজেদের প্রধান খাদ্য ভাতের জন্য বিদেশের উপর নির্ভরশীল হতে চাই না। সরকার ধারাবাহিকভাবে বহু কষ্ট করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছেন। এই অবস্থা ধরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে এখানে প্রচুর পরিমাণ ভর্তুকি দেয়া হলেও জাতীয় স্বার্থের লাভ ভিন্ন ক্ষতির কোনো আশঙ্কাই নেই।

  • [১]