ইকবাল কাগজী
এক ॥
গত শুক্রবার, ১৩ অক্টোবর ২০১৭ সিলেট গিয়েছিলাম। মদনমোহন কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ’র আমন্ত্রণে। যৎপরনাস্তি জরাজীর্ণ লক্করঝক্কর ‘বিরতীহীন’-যোগে সিলেট যাত্রায় সঙ্গে ছিলেন অনুজ মোহাম্মদ সুবাস উদ্দীন। খসরু ভাইয়েরও ( অ্যাড. বজলুল মজিদ চেীধুরী) যাওয়ার কথা ছিল, তিনিও আমন্ত্রিত ছিলেন, কিন্তু কোনও এক বেমক্কা হামলেপড়া সামাজিকতার কারণে তিনি যেতে পারেননি। মদনমোহন কলেজের শিক্ষক মিলনায়তনে যখন পৌঁছলাম তার আগেই নির্ধারিত অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। তাৎক্ষণিক নাম নিবন্ধন সমাপনান্তে তাপানুকূল মিলনায়তনে প্রবিষ্ট হলাম। আমাকে দেখে দারুণ উচ্ছসিত আবিদ ফয়সলের, ভাবটা এতক্ষণ আমার অপেক্ষায়ই ছিলেন এবং সেটি আদপেই অকৃত্রিম ছিল, পাশে অসনগ্রহণ করলাম। তখন কথা বলছিলেন ড. ফাত্তাহ। ইতিউতি দৃষ্টিক্ষেপ করে পাওয়া গেলো আদি অকৃত্রিম সুফি সুফিয়ান, ছোটকাগজ ‘ভাষ্কর’ সম্পাদক সুহৃদ পুলিন রায়, কবিবন্ধু গবেষক ড. মোস্তাক আহমদ দীন ও সুহৃদ গল্পকার নাসের শহীদকে। একসময় পরিচিত হলাম শহিদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতিকে নিয়ে একটি বইয়ের লেখক সুদর্শন অপূর্ব শর্মার সঙ্গে।
আয়োজকরা অনুষ্ঠানটিকে ‘লেখক আড্ডা’ (জনান্তিকে বলি, ‘আড্ডা’ বানানটা লক্ষণীয়, সহজেই হৃদয়ঙ্গম হয় যে, এঁরা আড্ডা’ বানানের বিরোধী।) বলে অভিহিত করেছেন। এই আড্ডার মধ্যমণি ড. আবুল ফতেহ ফাত্তাহ’র পেছনে টাঙ্গানোÑ নাকি সাঁটা, সে যা-ই হোকÑ প্রাচীরপত্রের শীর্ষদেশে লেখা আছে, ‘অঞ্চলসাধনা, বৈশ্বিক চেতনা, মানবমুক্তি’ এই তিনটি শব্দ (আপাতত ‘বৈশ্বিক চেতনা’-কে শব্দবন্ধ না বলে শব্দই বলছি)। এই তিনটি শব্দ যে বিশেষ অর্থবহ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। অবশ্য সন্দেহভঞ্জন হয়েছিল অনুষ্ঠানের শেষ দিকে ড. জফির সেতুর নাতিদীর্ঘ কিন্তু ভাবব্যঞ্জনায় ব্যাপক, সারগর্ভ ও প্রাঞ্জল ভাষণের কল্যাণে, স্পষ্ট হয়েছিল এই শব্দত্রয়ের এখানে ব্যবহারের তাৎপর্য। ড. ফাত্তাহ যদিও ইতঃপূর্বে সঞ্চলনার অবসরে, অনেকটা স্বাগত ভাষণের মতো করেÑ এই যাকে বলে কয়েক বাক্যে, একেবারেই সংক্ষিপ্তাকারেÑ এই তিনটি শব্দের ভাবার্থ বিবৃত করেছিলেন, বোধ করি সমবেতজনের ঔৎসুক্যকের তাপের তীব্রতাকে প্রশমিত করার সহৃদয় সদিচ্ছায় উজ্জীবিত হয়ে । যেগুলোর সম্যক আলোচনায় প্রবৃত্ত হয়ে যে-কেউ একজন ইচ্ছে করলে মহাভারত (যে-কারও অভিপ্রেত পাঠ হতে পারে, ‘বিশালবপুত্বের অধিকারী অভিসন্দর্ভ’) রচনা করে ফেলতে পারেন, বর্তমান ভুবনায়নবন্দি বিশ্বের আর্থসামজিক বাস্তবতায় এমনই বিশাল ব্যঞ্জনার অধিকারী এরা, এই শব্দত্রয়। যদিও এখানে এ নিয়ে আলোচনার অবকাশ আপাতত নেই।
প্রথম পংক্তিতে বিন্যস্ত বিশেষ অর্থবহ এই শব্দত্রয় সম্বলিত অনেকটা সাংগঠনিক ভাবাদর্শ প্রতিফলিত করার পর নীচে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ পংক্তিতে লেখা হয়েছে, “সিলেটমনীষা : জীবনীসিরিজ প্রকল্পের উদ্যোগে ‘শতমনীষার জীবনকথা : সিলেট’ শীর্ষক কর্মকৌশল নিরূপণ ও লেখক আড্ডা”। তৎপরে বিন্যস্ত হয়েছে ‘প্রধান অতিথির নামসহ তারিখ, স্থান, সময় ও সর্বশেষ পংক্তি বড় হরফে, ‘মদনমোহন কলেজ সাহিত্য পরিষদ’।
ড. ফাত্তাহ উপস্থাপন করলেন কর্মকৌশলের যাবতীয় যা-কীছু, ইতোমধ্যে যার মুদ্রিত কপি সমবেত প্রত্যেকের সমীপে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। আলোচনা শুরু হলো অনেকটাই মতবিনিময় সভার আদলে। মাউথপিস ঘুরছিল হাতে হাতে। বাংলাদেশের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যানুসারে মাঝেমধ্যে বেরসিক বিদ্যুতের প্রস্থান-প্রবেশ রসভঙ্গ করছিল। ‘শতমনীষার জীবনকথা : সিলেট’ প্রণয়ণের কর্মকৌশল নিয়ে, কথা প্রসঙ্গে একজন, ‘শতমনীষার’ তালিকায় কোনও মুক্তিযুদ্ধবিরোধীকে অন্তর্ভূক্ত না করার প্রস্তাব রাখলেন, তৎক্ষণাৎ সেটি গৃহীত হলো।
ড. ফাত্তাহ’ আলোচনার একপর্যায়ে বললেন, তিনি ব্রিটিশামলে মাদ্রাসার ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়–য়া তাঁর বাবার একটি ইংরেজি পাঠ্যপুস্তকÑ সম্ভবত প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪২ সালে, সেদিক থেকে বিবেচনায় বইটি পুরনো একটি বই তো বটেইÑ প্রকাশ করতে যাচ্ছেন। তৎসঙ্গে অবগত করেছেন, তৎকালে মাদ্রাসায় ধর্মীয়শিক্ষাসহ আরবি, ফারসির সঙ্গে ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ও নির্দ্বিধায় পড়ানো হতো, এখন তেমন করে পাড়ানো হয় না। সামগ্রিক বিবেচনায় তাঁর মনে হয়, অন্তত মাদ্রসাকেন্দ্রিক শিক্ষাক্ষেত্রে আগেকার দিনের চেয়ে এখন আমরা পিছিয়ে আছি, হয়ে পড়েছি অনেকটাই ঐকান্তিক প্রতিক্রিয়াশীল। এই বোধ তাঁকে ব্যথিত করে। তিনি মনে করেন, জাতীয়মুক্তির পথে আলোকায়িত জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব করতে হলে এই পশ্চাদপদতার অন্ধকার গহ্বর থেকে থেকে বেরিয়ে আসা দরকার, এর কোনও বিকল্প নেই। আর আমি তাঁর বক্তব্য শুনতে শুনতে ২০১৭ সালে উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির সযতœ প্রয়াসে সজ্জিত তাপানুকূল একটি মিলনায়তনে বসে একধরনের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার উর্বর ক্ষেত্রে জঙ্গিবাদের চাষবাসের মচ্ছব দিব্যদৃষ্টিতে প্রত্যক্ষ করছিলাম দেশের আনাচে-কানাচে, মাঠে-ময়দানে ও প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে। আর মনে পড়ছিল সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অমর্ত্য সেনের একটি বিদগ্ধ মন্তব্য, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিক্ষুব্ধ স্থানগুলিতে মৌলবাদী শিক্ষাস্থলগুলি অসহিষ্ণুতা ও
হিংসারÑ এবং প্রায়সই সন্ত্রাসেরÑ লালনক্ষেত্রের অংশ হয়ে উঠেছে।’ (পরিচিতি ও হিংসা, অনুবাদ : ভাস্বতী চক্রবর্তী, আনন্দপাবলিশার্স, তৃতীয় মুদ্রণ : জানুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা : ১২১Ñ১২২)। বক্তব্য শুনতে শুনতে কেন যেনও মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশ তার ব্যতিক্রম নয়, এই দেশ কোনও না কোনওভাবে সন্ত্রাস কবলিত হয়ে পড়েছে।
দুই ॥
পরিশেষে বক্তব্য রাখেন ড. জফির সেতু। তাঁর বক্তব্যটি এখানে যথাযথ বিবৃত করা এই অধমের পক্ষে আদৌ সম্ভব নয়। তবে নির্দ্বিধায় বলি, তাঁর উপস্থাপিত বিষয়টি গুরুত্ব ও ব্যাপকতার নিরিখে স্বাভাবিকভাবেই যতোটা বাকবিস্তৃতি দাবী করে, সে দাবী পূর্ণ করার অবকাশ তাঁর ছিল না, তিনি যে-‘লেখক আড্ডা’য় বক্তব্য রাখছিলেন সেখানে। তাছাড়া সময়স্বল্পতারও একটা বিষয় ছিল। সুতরাং সঙ্গত কারণেই তাঁর বক্তব্য ছিল যৎপরনাস্তি সংক্ষিপ্ত কিন্তু মনোমুগ্ধকর। মনোমুগ্ধকর বলার পর যা না বললেই নয় তা হলো, ড. সেতুর বক্তব্যটি ছিল প্রচ- তাৎপর্যপূর্ণ ও বৃহত্তর সিলেটের ভবিষ্যৎ আলোকায়নের ইঙ্গিতবাহী কিন্তু বর্তমান বিশৃঙ্খল মানবিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে অতীব জরুরি একটি অভিসন্দর্ভমতো ভাষ্য। আবারও বলি, তাঁর পুরো বক্তব্য এখন আর আমার পক্ষে উদ্ধৃত করা সম্ভব নয়। তবে তাঁর একটি ক্ষুদ্র বক্তব্য নিজের মতো করে লিখে রেখেছিলাম একটি কাগজের চিরকুটে। অনেকটা বক্তব্যের নিহিতার্থের মতো করে, ‘শাবিপ্রবি-তে একটি বিশেষ বিষয় পাঠ্য করার প্রসঙ্গটি সিলেটের পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে অসঙ্গত।’ অর্থাৎ খাপ খায় না। স্পষ্ট মনে আছে, তিনি তাঁর এই বক্তব্যের সপক্ষে উদাহরণ স্বরূপ উপস্থাপন করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাওরসংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে সমুদ্র বিষয়ক বিদ্যাকে পাঠক্রমের অন্তর্ভূক্তকরণের প্রসঙ্গটি। যে-প্রসঙ্গটির ওপর যে-কেউ একটু কটাক্ষ আরোপিত করে বলে ফেলতে পারেন : সমুদ্রবিদ্যাকে পাঠ্য করে নিয়ে প্রকৃতপ্রস্তাবে হাওরের মানুষকে নিজের যাপিতজীবনের মানবিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি গূঢ়গভীর ও সুদূরপ্রসারী একটি প্রতারণা কিংবা ষড়যন্ত্রকে বাস্তবায়িত করা হয়েছে এবং এর একটাই সারার্থ হতে পারে, যাকে বলা যায়, হাওরের মানুষের প্রাকৃতিক বাস্তবতা ও সে-বাস্তবতার জমিনে গড়ে ওঠা হাওরের আর্থসামাজিক বিন্যাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, ঐতিহ্য-সংস্কার তথা সংস্কৃতি থেকে হাওরের মানুষকে বিচ্ছিন্ন করার একটি দুরভিসন্ধি। বিষয়টি কাকতালীয় কিনা জানি না, তবে মনে হচ্ছে, ঔপনিবেশিক আফ্রিকার অবস্থার সঙ্গে সর্বাশে না হলেও কীছুটা তো অবশ্যই, অন্তত ভাবভঙ্গি-ধরনধারনটা মিলে যাচ্ছে। মিলিয়ে দেখার জন্য পর্যবেক্ষণটা তুলে দিচ্ছি, “ঔপনিবেশিক অবস্থা, নির্মমভাবে, আফ্রিকার মানুষকে তার পরিবেশ থেকে উপড়ে এনেছে, তার মনুষ্যত্ব হরণ করে তাকে পণ্য বানিয়েছে, কেড়ে নিয়েছে তার ভাষা ও সংস্কৃতি, তাকে করে তুলেছে তার নিজের বাসভূমেই কোনও সামাজিক রাজনৈতিক অধিকারহীন মানুষÑ ‘অপমানুষ’, নিজের সম্বন্ধে বিকৃত হীনতার বোধ জাগিয়ে তুলছে তার মধ্যে।” (মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, বাস্তবতার কুহক আর কুহকের বাস্তবতা, দেশ, ২২ জানুয়ারি ২০০০, ৬৭ বর্ষ ৬ সংখ্যা, পৃষ্ঠা : ৩০, স্তম্ভ : ২)। জানি এখানে ব্রিটিশসহ পাকিস্তানি সরাসরি ঔপনিবেশিকতার বিলুপ ঘটেছে কিন্তু নয়া ঔপনিবেশিকতার জোয়ালের গুরুভার নামেনি ঘাড় থেকে, সেটাও একেবারে মিথ্যা নয়। তারপর, এই রকম যে-কোনও প্রয়াসের, এখানে হাওরবিদ্যাকে পাঠ্য না করে সমুদ্রবিদ্যাকে পাঠ্য করার, নির্গলিতার্থ হতে পারে, নয়া ঔপনিবেশিকতা থেকে আমাদের উত্তরণ ঘটেনি এখনও। এই অবস্থাটিকে বিশ্লেষণ করে আফ্রিকান লেখক নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গুর বলেছেন, ‘মানুষের সংস্কৃতির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেওয়া মানে অন্যদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিরূপণের হাতিয়ারকেই কব্জা করে ফেলা।’ (ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড, অনুবাদ : দুলাল আল মনসুর ॥ চিহ্ন, বর্ষ ১৮ সংখ্যা ৪, নভেম্বর ২০০৯, পৃষ্ঠা : ৮৫)। এই বাক্যটি পাঠের পর সহজেই বোধোদয় হয়, এইভাবে সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণের দুরভিসন্ধির প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবায়ন ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির মতো করে দেশীয় প্রেক্ষিতে বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের অভিপ্রায়ে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির একটি রূপভেদ ভিন্ন অন্য কীছু নয়, যে-বিচ্ছিন্নতার ভেতরে আত্মগোপন করে আছে কোনও বিশেষ জনসমাজের বা জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা হরণের গোপন অভিপ্রায়। যে-অভিপ্রায় প্রকারান্তরে হাওরের জনসমাজকে হাওরসংস্কৃতির বাস্তবতা থেকে উচ্ছেদ করে সমুদ্রসংস্কৃতির অবাস্তবতায় শরণার্থী করে তোলে। শাবিপ্রবিতে সমুদ্রবিদ্যাকে পাঠ্য করে প্রকারান্তরে বৃহত্তর সিলেটের মানুষকে তার বসত ও হাওররের প্রাকৃতিক শিক্ষাঙ্গণ তথা প্রকৃতি ও মানুষের মিথষ্ক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করার কর্মকৌশল বাস্তবায়িত হয়েছে। বরং বলা ভালো, সকল প্রপঞ্চকে উল্টে দেওয়া হয়েছে। যেখানে পড়ানো উচিৎ হাওর বিষয়ে কোনও কীছু সেখানে আপত্তি উঠা সত্ত্বেও পড়ানো হচ্ছে সমুদ্রসংক্রান্ত বিষয়। অস্বভাবিকটাকে স্বাভাবিক আর স্বাভাবিকটাকে করে তোলা হয়েছে অস্বাভাবিক। অন্যরকম বিবেচনায় বিষয়টি একধরণের বিতাড়নের। রোহিঙ্গাদের রাখাইন থেকে বিতাড়ন করা হয়েছে সশরীরে আর বৃহত্তর সিলেটিদের বাধ্য করা হয়েছে মানসিকভাবে বিতাড়নে। রোহিঙ্গা বিতাড়ন ও বৃহত্তর সিলেটীদের বিতাড়ন এই দুই ঘটনার আদর্শ-উদ্দেশ্যের অভিমুখ একটাই, কোনও না কোনওভাবে কোনও না কোনও জনগোষ্ঠীর জীবনধারণের সকল প্রকার অধিকার হরণ করা কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা। রোহিঙ্গাদের অধিকার সম্পূর্ণভাবে হরণ করে বসতি থেকে সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা হয়েছে এবং প্রকারান্তরে বৃহত্তর সিলেটের মানুষের অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ করার পুঁজিবাদী প্রতারণার লাগাম পরানো হয়েছে তাদেরকে সমুদ্রবিদ্যা অধিগত করতে বাধ্য কারার কর্মকৌশল শিক্ষাঙ্গণে বাস্তবায়িত করে। যে-কর্মকৌশলকে বলা যায়, অধ্যয়নের নামে কোনও এক জনগোষ্ঠীকে অন্যরকম সংস্কৃতিতে উদ্বাস্তু হতে বাধ্য করা।
বর্তমান বৃহত্তর সিলেটের সামগ্রিক আর্থসামাজিক বিন্যাসের অবকাঠামোর উপর গড়ে উঠা সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বা মানবিক পরিবেশের পেক্ষিত বিবেচনায় ড. সেতুর বক্তব্যকে (শাবিপ্রবি-তে একটি বিশেষ বিষয় পাঠ্য করার প্রসঙ্গটি সিলেটের পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে অসঙ্গত।) উপেক্ষা করার অর্থ হতে পারে একটাই, আর সেটাকে বলা যায় অগ্রগতির রাজপথ ছেড়ে দিয়ে ডান কিংবা বাম দিকের খানাখন্দের জলকাদায় নেমে পড়ে পথ চলার ভাগ্যবরণ করা। মনে রাখতে হবে মদনমোহন কলেজের বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠার কথা ছিল, তা হয়নি। সিলেটে অতিশয় বিলম্বে শিক্ষাবোর্ডর প্রতিষ্ঠা হয়েছে কিংবা ভাটি বাংলার জেলা-উপজেলাগুলোকে ‘আবোড়া’ সড়কের দ্বারা এখনও জুড়ে দেওয়া হয়নি অথবা টাঙ্গুয়া তথা হাওরগুলোকে বা পণাতীর্থকে পর্যটনবাণিজ্যের কেন্দ্র করে তোলা যায়নি অথবা ভাটিবাংলাকে মাছ ও ধানের বিশ্বশ্রেষ্ট ভা-ার হতে পারর মতো করে হাওর উন্নয়নের বিজ্ঞানসম্মত প্রকল্প হাতে নেওয়া যায়নি। ইতিহাসের বিশাল কালপর্যায় জুড়ে বৃহত্তর সিলেটকে আর্থসামাজিক উন্নয়নের পথচলার রাজপথ থেকে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছে বারবার, এর অসামান্য উন্নয়নের সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা হয়েছে সচেতনভাবে। এইসব করেছে কখনও ঔপনিবেশিক শাসকশক্তি কিংবা কখনও দেশীয় শাসক পুঁজিবাদী শোষক শ্রেণি । ড. সেতুর বক্তেব্যে ঘুরে ফিরে এইসব প্রসঙ্গের কোনও কোনওটি, কেমন জানি কী করে, উঠে এসেছে। তিনি সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিককাল থেকে শুরু করে বর্তমান কাল পর্যন্ত বৃহত্তর সিলেটের সামগ্রিক আর্থসামাজিক ব্যবস্থার একটি অতিসংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন হাজির করেন এবং বলতে প্রয়াস পেয়েছেন যে, এই হাতের কাছে পাওয়া তথ্যপ্রযুক্তির যুগেও বৃহত্তর সিলেট উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে দেশের অন্যন্য অঞ্চল থেকে বরাবরের মতো পিছিয়ে আছে। পাকিস্তান আমলে যে বিশ্ববিদ্যালয়টি সিলেটে স্থাপিত হওয়ার কথা কোনও এক ব্যক্তি বিশেষের ‘এক দিনের’ সরকারি কারসাজিতে সেটি স্থাপিত হয়েছে চট্টগামে। সিলেটে ভাটি অঞ্চলের সামগ্রিক আর্থসামাজিক বিন্যাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ছিল কিন্তু সেটা করা হয়নি। হাওরাঞ্চলের জীবনযাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ও এ অঞ্চলের মানুষের বাঁচামরা যে হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে ওতপ্রোত, সেই জলজ সংস্কৃতির সর্গভূমি ভাটির জনমানুষের জীবনোপজীব্য করে এখানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হাওরবিদ্যাকে পাঠক্রমের অন্তর্ভুক্ত করে একটি আলাদা পাঠক্রম প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এই প্রস্তাবের মধ্যে সমাজ উন্নয়নের সঙ্গে প্রকৃতি ও মানুষের মিথষ্ক্রিয়ায় গঠিত একধরণের সমাজবাস্তবতার সম্পৃক্ততাকে স্বীকার করা হয়েছে। প্রকৃতপ্রস্তাবে যে-সমাজবাস্তবতার জমিন না পেলে মানবসভ্যতার কোনও বিকাশ বা কোনও ধরনের উন্নয়নই সম্ভব নয়। এই সমাজবাস্তবতা প্রসঙ্গে কার্ল মার্কেস ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলসের একটি মন্তব্য প্রণিধান যোগ্য, তাঁরা বলেছেন, ‘মানুষের উপলব্ধি ও সচেতনতার ফসল প্রথম বিজড়িত হয়ে থাকে মানুষের বস্তুগত ক্রিয়াকর্ম ও বস্তুগত মিথষ্ক্রিয়ার ভাষার সঙ্গে। মানুষের উপলব্ধি, চিন্তা এবং মানসিক মিথস্ক্রিয়া এই পর্যায়ে তাদের বস্তুগত আচরণের প্রত্যক্ষ উৎসারণ হিসেবে হাজির হয়ে থাকে। মানুষের রাজনীতি, আইন, ধর্ম, নৈতিকতা ও অধিবিদ্যার ভাষায় প্রকাশিত মানসিক ফসলের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। প্রকৃত মানুষ, সক্রিয় মানুষ যেমন তাদের সুনির্দিষ্ট উৎপাদনী শক্তির এবং এসব শক্তির সঙ্গে সাড়া দিতে পারে এমন মিথষ্ক্রিয়ার সর্বশেষ পর্যায়ের সুনির্দিষ্ট বিকাশের শর্তাধীন বলেই নিজের ধারণা এবং আদর্শের উৎপাদক।’ (চিহ্ন, পৃষ্ঠা : ৯৯Ñ১০০)। ‘মানুষের বস্তুগত ক্রিয়াকর্ম ও বস্তুগত মিথষ্ক্রিয়া ’-কে ব্যাহত করে কিংবা ‘বস্তুগত আচরণের প্রত্যক্ষ উৎসারণ’ থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে মানুষকে হয় তো নিয়ন্ত্রণ করা যায় কিন্তু মানুষের কোনও প্রকৃত উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। বৃহত্তর সিলেটের ক্ষেত্রে নিহিতার্থে হাওরসংস্কৃতির জগৎকে উপজীব্য করে বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করে প্রাকৃতিক নিয়মকে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এমনকি হাওরসংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে সামুদ্রিকবিদ্যাকে প্রতিষ্ঠা করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ হয়ে উঠেছে কট্টর আচরণবাদী। যে আচরণবাদ মানুষের মনের গহনের প্রবৃত্তির স্বতঃক্রিয়াশীলতাকে উপেক্ষা করে এবং মানুষকে যন্ত্রের চেয়ে বেশি কীছু ভাবে না। পাঠক্রম হিসেবে হাওরবিদ্যার স্থলে সমুদ্রবিদ্যাকে চালু করে প্রকারান্তরে জলজ সংস্কৃতির প্রতিবেশে লালিত মানুষজননের ‘প্রবৃত্তির স্বতঃক্রিয়াশীলতা’কে সচেতনভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। কিংবা অন্যভাবে বলা যায়, মানুষকে নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে এবং এই করে প্রকারান্তরে মানুষকে যন্ত্রের উর্ধ্বে মানবিক মর্যাদা থেকে বিচ্যুত করা হয়েছে। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত ঘটনা এই দাঁড়ালো যে, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায়, বলা উচিৎ নয়া ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার অধীনে, যে-ভাবে মানুষকে যন্ত্রের থেকে অধিক কীছু ভাবা হয় না এবং মানুষকে যন্ত্রের মতোই নিয়ন্ত্রণ করা হয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে, তেমনি বৃহত্তর সিলেটের মানুষকেও নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
সমুদ্রসম্পর্কিত বিষয় পাঠ্য করে এইভাবে অপর সংস্কৃতির সঙ্গে লগ্ন করে দিয়ে হাওরের জীবনবাস্তবতা থেকে হাওরসংস্কৃতির সর্গভূমি বৃহত্তর সিলেটের সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করা তথা বৃহত্তর সিলেটীদের জীবনধারণের নিয়ন্ত্রণভার সমুদ্রবিদ্যার হাতে তোলে দেওয়ার অপকর্মটি যেহেতু দেশের শিক্ষাকর্তৃপক্ষ কর্তৃক সিলেটের মানুষজনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যন করে বাস্তবায়িত হয়েছে সে জন্য এইরূপ একটি বিচ্ছিন্নতার সৃজনকর্মকে একান্ত যুক্তিসঙ্গতভাবেই শিক্ষাকর্তৃপক্ষীয় ঔপনিবেশিকতা বলে অভিহিত করা যায় (এর অন্য কোনও মানানসই নামও হতে পারে)। আসলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্র বিষয়ক পাঠক্রম সংযোজিত করে বৃহত্তর সিলেটকে ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার মতোই এক প্রকার বিচ্ছিন্নতার শিকারে পরিণত করা হয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেইে। আবারও বলি, শাবিপ্রবিতে সামুদ্রিক বিষয় পাঠ্য করে বৃহত্তর সিলেটীদের একপ্রকার মানসিক বিতাড়ন সম্ভব করে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একাংশে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের জন্য যেমন গড়ে তোলা হয়েছে আশ্রয় শিবির তেমনি বৃহত্তর সিলেটীদের জন্য সামুদ্রিকবিদ্যা পাঠক্রমটি একটি শরণার্থী শিবির ভিন্ন অন্য কীছু নয়।
বাস্তবে এখন বাংলাদেশ অপর কোনও দেশের উপনিবেশ নয়, কিন্তু এ কথা সত্যি যে, নয়া উপনিবেশিকতার জাল এখনও বাংলাদেশ ছিন্ন করতে পারেনি। সে নয়া উপনিবেশিকতার ভুবনায়নের আওতায় পরিচালিত বিভিন্ন কর্মকৌশল বাস্তবায়নের একটি হলো বৃহত্তর সিলেটের ক্ষেত্রে প্রয়োগায়িত বিচ্ছিন্নতার বাস্তবায়ন, যেটিকে ড. সেতু তাঁর ইঙ্গিতময় ভাষ্যে কিঞ্চিৎ বিশ্লেষণ করেছেন মাত্র, যে-বিচ্ছিন্নতা পুঁজিবাদী সেই প্রতারণাকে বাস্তবায়িত করেছে যেখানে রাষ্ট্রের ভেতরেই রাষ্ট্রের একটি অংশকে (এখানে বৃহত্তর সিলেট) একধরণের বিচ্ছিন্নতার শিকারে পরিণত করা হয়েছে। বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কে নগুগি ওয়া থিয়াঙ্গু বলেছেন, ‘উপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার রয়েছে দুই ধরণের চেহারা; মানুষকে তার পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার সরাসরি (কিংবা অগোচরের) প্রক্রিয়া; আরেকটা হলো মানুষের পারিপার্শ্বিক জগতের সবচেয়ে বেশি বাহ্যিক চেহারার সঙ্গে পরিচয় ঘটানোর চেহারা।’ (চিহ্ন, পৃষ্ঠা : ৯৬)। অন্যত্র তিনি বলেছেন, ‘… আফ্রিকার শিশুর চারপাশের প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং সামাজিক পরিবেশির সঙ্গে তার বোধ-বিবেকের বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়ে গেল। এই বিচ্ছিন্নতাকে আমরা বলতে পারি ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতা ।’(চিহ্ন, পৃষ্ঠা : ৮৬)। প্রকারান্তরে এই বিচ্ছিন্নতারই একটি রকমফের ঘটেছে বৃহত্তর সিলেটের ক্ষেত্রে, যে-বিচ্ছিন্নতা সংঘটনের ব্যাপ্তি ব্রিটিশ-পাকিস্তান-বাংলাদেশের শাসনামল জুড়ে, তাকে যে-নামেই ডাকা হোক বা যে-ভাবেই বিশ্লেষণ করা হোক না কেন, তাতে কীছু যায় অসে না। মনে রাখতে হবে বৃহত্তর সিলেটের ক্ষেত্রে এইরূপ আরও কোন বিচ্ছিন্নতা কার্যকর কি না খোঁজে দেখা দরকার। এইসব বিচ্ছিন্নতার অন্ধকারবৃত্তে বন্দি বৃহত্তর সিলেটের মুক্তি চাই। বৃহত্তর সিলেটকে বেরিয়ে আসতেই হবে, বৃহত্তর সিলেটের সার্বিক উন্নয়নের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এর কোনও বিকল্প নেই।