বিশেষ প্রতিনিধি
“থাকলে শিশু বিদ্যালয়ে, হবে না বিয়ে বাল্যকালে, থাকলে শিশু লেখাপড়ায়, সফল হবে জীবন গড়ায়” এই শ্লোগানে সুনামগঞ্জের ২৯৯ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এক লাখ ১৪ হাজার ৩২৩ জন শির্ক্ষাথী সোমবার এক সাথে লাল কার্ড দেখানোর মধ্য দিয়ে বাল্য বিয়েকে ‘না’ জানাল। উদ্যোক্তরা জানিয়েছেন-কর্মসূচীটিকে গিনেজ বুকে অন্তর্ভূক্তির জন্যও চেষ্টা করা হচ্ছে। অনুষ্ঠানে সহায়তা দিয়েছে উপজেলা গর্ভন্যান্স প্রজেক্ট (ইউজেডজেপি)।
দুপুর ১২ টা ২৪ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড থেকে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ সময় কাউন্ট-ডাউন শুরু করেন। পরে ১২ টা ২৫ মিনিট থেকে সকলে যার যার অবস্থান থেকে এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে লাল কার্ড উঁচিয়ে বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে শ্লোগান ধরেন,‘বাল্য বিবাহকে- না’ যৌন হয়রানিকে- না’। এক নাগারে ৫ মিনিট শ্লোগানে শ্লোগানে বাল্য বিয়েকে ‘না’ জানানো হল। এভাবেই সুনামগঞ্জকে বাল্য বিবাহ মুক্ত করার ব্যতিক্রমী কর্মসূচী পালন করা হয়। বেলা সোয়া ১ টায় উপস্থিত সকলকে বাল্য বিবাহ্ মুক্ত করতে ভূমিকা রাখতে শপথবাক্য পাঠ করান বিভাগীয় কমিশনার জামাল উদ্দীন আহমেদ । এর পর তিনি সুনামগঞ্জ জেলাকে বাল্য বিবাহ মুক্ত ঘোষণা করেন। পরে শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তনে ‘বাল্য বিবাহ মুক্ত জেলা, সুনামগঞ্জ’ লেখা ফলক উন্মোচন করেন।
সুনামগঞ্জ জেলা শহরে এই কর্মসূচীর প্রধান ভেন্যু করা হয় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন মিলনায়তনে। এই মিলনায়তন ও চত্বরে সহ¯্রাধিক শিক্ষার্থী উপস্থিত থেকে ঐতিহাসিক কর্মসূচীতে নিজেদের যুক্ত করে। এছাড়া জেলার প্রত্যেকটি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রাঙ্গণে ৮ম থেকে ¯œাতক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এই কর্মসূচীতে অংশ নেয়।
জেলার জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, জগন্নাথপুর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, দিরাই, শাল্লা, বিশ্বম্ভরপুর এবং সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা সদরে আলাদা আলাদা ভেন্যুতে উপস্থিত থেকে কর্মসূচীতে অংশ নেন।
জেলা সদরে কর্মসূচী পালনের পর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন মিলনায়তন মঞ্চে বক্তব্য রাখেন- বিভাগীয় কমিশনার জামাল উদ্দীন আহমেদ, জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম, সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাশ, স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক বাবর আলী মিয়া, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক কামরুজ্জামান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট সাবেরা আক্তার, নারী নেত্রী শীলা রায়, ছাতক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অলিউর রহমান চৌধুরী বকুল, প্রবাসী আশরাফুজ্জামান মিনহাজ, হিন্দু বিবাহ্ নিবন্ধক সুবিমল চক্রবর্তী চন্দন, কাজী শফিকুল ইসলাম, শিক্ষার্থী ফারজানা সুজি প্রমুখ। 
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সহকারী কমিশনার মনিরুল ইসলাম এবং প্রামাণ্যচিত্র উপস্থাপন করেন আবিদ খান হৃদয়।
শহীদ আবুল হোসেন মিলনায়তন এবং এর চত্বরে উপস্থিত শিক্ষার্থী সরকারী সতীশ চন্দ্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিয়া জাহান বললো,‘আমরা এসেছি, বাল্য বিয়েকে ‘না’ বলতে। এই কর্মসূচী সকলের আবেগে নাড়া দিক, এটিই চাই আমরা’।
একই বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির শিক্ষার্থী সারবাক নাওয়ার বললো,‘এই কর্মসূচীর পর শিক্ষার্থীরা যাতে বাল্য বিয়ে প্রতিরোধে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার সাহস পায়, সেটিই চাই আমরা’।
সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী আফসানা মিমি ও হাজেরা আক্তার বললো,‘এই কর্মসূচীর উদ্দেশ্য এবং এটি কীভাবে পালিত হবে, সপ্তাহ্ খানেক আগে থেকেই আমাদের জানানো হয়েছে। এতে সচেতনতা বেড়েছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে’।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিভাগীয় কমিশনার মো. জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেছেন,‘বাল্য বিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি। সুনামগঞ্জ জেলাকে রোগমুক্ত করতে আপনাদের এই উদ্যোগ উৎসাহব্যঞ্জক। লাল কার্ড দেখানোর মাধ্যমে প্রমাণ হলো এই জেলায় আর বাল্যবিবাহকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না, যৌন নির্যাতন হবে না। এখন থেকে বলা হবে সুনামগঞ্জ আর পিছিয়ে পড়া ও পিছিয়ে থাকা জেলা নয়। সুনামগঞ্জ এখন অগ্রগামী জেলা, কুসংস্কার মুক্ত জেলা। জেলা প্রশাসক সবাইকে নিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। একটি মহৎ কাজ করেছেন। তিনি আলোকবর্তিকার সূচনা করেছেন। এখন আর কোন অপশক্তি এই আন্দোলনকে প্রতিহত করতে পারবে না। লাল কার্ড প্রদর্শনের আন্দোলনই এখন সমাজে বাল্য বিবাহ ঠেকাবে। ’
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক শেখ রফিকুল ইসলাম বলেন,‘ সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় আমরা সুনামগঞ্জে একটি ইতিহাস সৃষ্টি করলাম। আমাদের এই উদ্যোগ ইতিহাসে স্থান করে নেবে। বিষয়টি গিনেজ বুকে অন্তর্ভুক্তির জন্য চেষ্টা চলছে। গিনেজবুক কর্তৃপক্ষ আমাদের সাথে যোগাযোগ করছেন।’
তিনি আরো বলেন,‘সুনামগঞ্জ নিয়ে আমরা আর পিছিয়ে থাকতে চাই না। আমরা এখন সবার উপরে থাকতে চাই। সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি। লাল কার্ড দেখিয়ে বাল্যবিবাহকে ঝেটিয়ে বিদায় করা হয়েছে। এখন তৃণমূল পর্যায়ের মানুষ বাল্য বিয়ের কূফল জানেন। তবে বাল্যবিবাহকে প্রতিরোধ করতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।’ তিনি মেয়েদেরকে বাল্যকালে বিয়ে না করে লেখাপড়ায় শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার আহবান জানান।