- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বিদ্রোহী কবির জীবনে প্রেম বিরহ

এস ডি সুব্রত
বলতে গেলে প্রায় সব কবিই প্রেমের কবি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও এর ব্যতিক্রম নয়। বিদ্রোহী কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত হলেও কবির জীবনেও প্রেম এসেছে বার বার। দ্রোহের পাশাপাশি প্রেম তার গল্প গানে কবিতায় হয়ে উঠেছে প্রবল। নজরুলের অসংখ্য লেখায় বিরহ অভিমান আর অতৃপ্তির রূপ ফুটে উঠেছে অবলীলায়। তিনি মিলনের নন, বিরহের কবি। নজরুলের জীবনের প্রেম বাংলা সাহিত্যকে দিয়েছে অনন‌্য মাত্রা। তার প্রেম ছিল মোহমুগ্ধতা, যন্ত্রণা, বিরহ আর সৌন্দর্যে ভরপুর। বিদ্রোহী কবি পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন। কিন্তু তার জীবন প্রেম ভালোবাসা বেশীরভাগ রচিত হয়েছিল বাংলাদেশে। জোয়ার ভাটার মতো তার জীবনে প্রেম এসেছে প্রবল বেগে, মজেছেন তুমুল প্রেমে। নজরুল সাহিত্যে তেজোদীপ্ত চেতনার পাশাপাশি নারীর প্রেম চেতনা এক ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। নারীর সঙ্গে জড়িয়েছেন নিজের জীবন। তবে যে তিনজন নারীর সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে ছিলেন কবি তারা হলেন- নার্গিস, প্রমিলা এবং ফজিলাতুন্নেসা। এছাড়াও আরো কয়েকজন নারীর সাথে তার সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়।
সৈয়দা খানম ওরফে নার্গিস/ নার্গিস আসার খানম: বিদ্রোহী কবির জীবনে প্রথম প্রেমের পরশ নিয়ে আসেন কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর উপজেলার দৌলতপুর গ্রামের মেয়ে নার্গিস। নার্গিস এর প্রকৃত নাম সৈয়দা খানম। নার্গিস আসার খানম। নার্গিস কলকাতার পুস্তক প্রকাশক আলী আকবর খানের বিধবা বোনের মেয়ে। কলকাতায় আলী আকবর খানের সাথে পরিচয় সূত্র ধরে তার সাথে কবি ১৯২১ সালে কূমিল্লায় গেলে সেখানে নার্গিস এর সাথে পরিচয় প্রেম ও বিয়ে হয়। নজরুল কে নিয়ে আলী আকবর খান কুমিল্লায় তার বন্ধু বীরেন্দ্র কুমার সেন গুপ্তের বাড়িতে উঠেন। কয়েকদিন পর মুরাদনগরের দৌলতপুর খাঁ বাড়িতে যান কবি কে নিয়ে। সেখানে কবি কবিতা আর গানে সকলকে মুগ্ধ করেন। আকবর আলী খানের বোনের মেয়ে নার্গিস ছিল পাশের খা বাড়িতে। নার্গিস এর মা আসমাতুন্নেসা আর বাবা মরহুম মুন্সী আব্দুল খালেক। একদিন খাঁ বাড়ির দীঘির ঘাটে কবির বাঁশী শুনে মুগ্ধ হয়ে যায় নার্গিস। এরপর পরিচয় হয় , শেষে প্রেমে পড়েন। আকবর আলী খানের উদ্দেশ্য ছিল তার কোন আত্মীয়ের সাথে কবির বিয়ে দিয়ে তাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তার প্রকাশনা ব্যবসার উন্নতি করা। এক পর্যায়ে কবি নার্গিস এর প্রেমে পাগল হয়ে বিয়ের প্রস্তাব দিলে আলী আকবর খান তা লুফে নেন এবং শেষ পর্যন্ত তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু কাবিন নামা সম্পাদনের সময় কবি কে ঘরজামাই থাকতে হবে এ শর্ত দিলে কবি রাগে বিয়ের রাতেই নার্গিস কে ছেড়ে পালিয়ে চলে যান। এরপর ষোল বছর কবির সাথে নার্গিস এর কোন যোগাযোগ হয়নি। এরপর নার্গিস কবি কে একটি চিঠি লিখলে কবি সেই চিঠি র জবাব দিয়েছিলেন একটি গান দিয়ে—–
“যার হাতে দিয়ে মালা দিতে পার নাই
কেন মনে রাখ তারে , ভুলে যাও তারে, ভুলে যাও একেবারে,
আমি গান গাহি আপনার দুঃখে
তুমি কেন আসি দাঁড়াও সন্মুখে
আলেয়ার মতো ডাকিওনা আর নিশিথ অন্ধকারে।”
এরপর দুজনের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। কিন্তু কবির প্রথম প্রেম কবির মনে দাগ কেটেছিল দারুনভাবে। কবি বিষন্নতায় ডুবে যান। নার্গিস কে উদ্দেশ্য কবি বে্শ কয়টি কবিতা লিখেছিলেন। তন্মধ্যে হার মানা হার অন্যতম।
” …..আমায় বাঁধতে যারা এসেছিল গরব করে হেসে
তারা হার মেনে হায় বিদায় নিল কেঁদে
তোরা কেমন করে ছোট বুকের একটু ভালবেসে
ওই কচি বাহুর রেশমী ডোরে ফেললি আমায় বেঁধে……।”
আশালতা ওরফে প্রমিলা: কবি নজরুল আলী আকবর খানের সাথে কুমিল্লায় প্রথম যে বাসায় উঠেছিলেন সেই বাড়ির মালিক বিরজা সুন্দরী দেবী কবিকে পুত্রসম স্নেহ করতেন। কবিও তাকে মা বলো সম্বোধন করতেন। নার্গিস এর বাড়ি থেকে পালিয়ে কবি সেখানে যান। পরবর্তীতে আরো কয়েকবার সেখানে যান কবি। সেখানে বিরজা দেবীর জ্যা গিরিজা বালার কন্যা আশালতা ওরফে প্রমিলার সঙ্গে পরিচয় ও পরে প্রণয় গড়ে উঠে এবং একদিন প্রমিলা কে বিয়ে করেন। ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল কলকাতায় বিয়ের সময় ধর্ম বাঁধা হয়ে দাড়ালেও শেষ পর্যন্ত নিজ নিজ ধর্ম বজায় রেখে বিয়ে সম্পন্ন হয়। প্রমিলাও কবির সুখ-দুঃখের সাথী হয়ে যান। নজরুল তার বিভিন্ন কবিতায় প্রমিলার প্রতি প্রেমের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। বিজয়িনীর দোদুল কবিতায় প্রমিলার রপের বর্ননা দেন কবি এভাবে—
” মৃনালু হাত নয়ানু পাত
গালের টোল চিবুক দোল
সদা কাছে করায় ভুল
প্রিয়ার মোর কোথায় তুলে
–………………
কাঁকন ক্ষীন মরাল গ্রীবা।”
শয্যাশায়ী সঙ্গিনী প্রমিলাকে উদ্দেশ্য কবি লিখেছিলেন……
” অরুন তুমি তরুন তুমি, করুন তার চেয়েও
হাসির দেশে তুমি যেন বিষাদ লোকের মেয়ে।”
ফজিলাতুন্নেসা: সওগাত পত্রিকার লেখিকা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলমান স্নাতকোত্তর ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসার প্রতি কবির প্রেম ছিল কিংবদন্তী তুল্য। তবে ফজিলাতুন্নেসার প্রতি কবির প্রেম ছিল একতরফা। ফজিলাতুন্নেসা কে কবি কখনো আপন করে পাননি, তবু ভালোবেসেছেন পাগলের মতো। বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেন এর মাধ্যমে তার সাথে কবির পরিচয় হয়। কবির হাত দেখার অভ্যাস ছিল। কাজী মোতাহার হোসেন কবি কে ফজিলাতুন্নেসার বাসায় নিয়ে গেলে সেখানে কবি তার হাত দেখেন
হাত দেখতে গিয়ে চোখে চোখ পড়া ,গড়ায় প্রেমে। অব তার প্রেম মজে যান। সেখান থেকে চলে আসলেও কবির মনে থেকে যায় ফজিলাতুন্নেসা। মোতাহার হোসেন এর কাছে লেখা চিঠি ফজিলাতুন্নেসা কে দেখাবার অনুরোধ জানায়। ফজিলাতুন্নেসার কাছেও কবি চিঠি দিতেন বন্ধুর মাধ্যমে। শেষে কবির লেখা একটি চিঠির জবাব দেন ফজিলাতুন্নেসা এবং সে চিঠি তে কবি কে আর চিঠি না দেয়ার অনুরোধ জানায়। কবি কথা দিয়েছিলেন আর চিঠি লিখবেন না, কিন্তু কথা রাখতে পারেন নি। এরপরও লিখেছিলেন বন্ধুর কাছে। ফজিলাতুন্নেসার কাছ থেকে বার বার ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেও কবি তাকে চিঠি লিখেছিলেন। কাজী মোতাহার হোসেন নজরুলের লেখা চিঠি সৈয়দ আলী আশরাফ কে দিলে তিনি নজরুল জীবনে প্রেমের অধ্যায় গ্রন্থে প্রকাশ করেন এই চিঠি।
সৈয়দ আলী আশরাফ নজরুলের চিঠি পড়ে তাকে প্রেমের পূজারী বলে উল্লেখ করেছিলেন। ১৯২৮ সালে ফজিলাতুন্নেসার বিলেত গমন উপলক্ষে বিদায় সংবর্ধনায় কবি তার উদ্দেশ্যে একটি গান পরিবেশন করেন———
” জাগিলে পারুল কিগো সাত ভাই চম্পা ডাকে
উদিল চন্দ্রলেখা বাদলের মেঘের ফাঁকে
চলিলে সাগর ঘূরে অকাল মায়ার পুরে
ফুটে ফুল নিজ যেথায় জীবনের ফুল্লু শাখে।
থেকো নাকো স্বর্গ ভুলে এ পারের মর্ত্যকুলে
ভিড়ায়ো সোনার তরী আবার এ নদীর বাঁকে।

 বিলেতে ফজিলাতুন্নেসার বিয়ে হয়ে গেছে শুনে কবি গান লিখেন
 " বাদল ঝড়ে মোর নিভে গেছে বাতি
     তোমার ঘরে আজ উৎসবের রাতি।
   তোমার আছে চাঁদ আমার মেঘের রাতি
   তোমার আছে ঘর ঝড় আমার সাথী।"

ফজিলাতুন্নেসার প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কবি খোদার প্রেমে মশগুল হয়ে লেখেন ……
” পর জনমে দেখা হবে প্রিয়
ভুলিও মোরে ভুলিও
এ জনমে যাহা বলা হল না
জানাইলে প্রেম করিও ছলনা
যদি আসি ফিরে বেদনা দিও
হৃদয়ে যেথায় প্রেম না শুকায়
সেই অমরায় মোরে স্মরিও।”

এ তিন জন ছাড়াও কবি যাদের সান্নিধ্যে জড়িয়েছিলেন তারা হলেন
রানু সোম, উমা মৈত্র, জাহানারা বেগম, শিল্পী কানন বালা দেবী।
রানু সোম (প্রতিভা বসু): ঢাকার টিকাটুলি তে গান শেখাতে গিয়ে কবি রানু সোমের প্রেমে পড়েন কবি। রানু সোম পরবর্তী তে কবি বুদ্ধদেব বসুর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তখন নাম হয় প্রতিভা বসু। গুরু শিষ্যের সুন্দর সম্পর্কে র মাঝে শুরু হয় নানা কানা ঘোষা। মুসলমান কবি হিন্দু যুবতীকে গান শেখাতে গিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলে একদিন রানু সোমের বাসা থেকে রাতে ফেরার পথে একদল যুবক কবি কে আক্রমন করেছিল। রানু সোম কবিকে গুরু জ্ঞানে ভক্তি করতেন। অনেকের মতে তাদের মধ্যে কোন প্রেমের সম্পর্ক ছিল না।
উমা মৈত্র ওরফে নোটন: নার্গিস, প্রমিলা ও ফজিলাতুন্নেসার সাথে কবির জীবনে উমা মৈত্রের নামও উচ্চারিত হয়। অনেকে মনে করেন নজরুলের শিউলি মালা গল্প উমা মৈত্রের স্মৃতি নিয়ে রচিত। উমা মৈত্রকে কবি গান শেখাতেন। উমা মৈত্র তৎকালীন ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ সুরেন্দ্র নাথ মৈত্রের মেয়ে যার ডাক নাম ছিল নোটন। শিউলি মালা গল্পে কবি লিখেছেন– একজন অসীম আকাশ, অন্যজন অতল সাগর । কোন কথা নেই, কোন প্রশ্ন নেই, শুধু এ ওর চোখে ,ও এর চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে।
জাহানারা বেগম: অনেকে জাহানারা বেগমের সাথে কবির সম্পর্ক ছিল বলে মনে করেন। বর্ষাবানী নামক বার্ষিক পত্রিকার সম্পাদিকা জাহানারা বেগমের সাথে কবির প্রথম পরিচয় হয় দার্জিলিং এ ১৯৩১ সালে। জাহানারা বেগম এর কাছে সংরক্ষিত কিছু গান ও কবিতা ছিল যার মধ্যে জাহানারা বেগম কে নিয়ে লেখা কয়েকটি কবিতা ছিল। তবে কবি জাহানারা বেগম কে ভারবেসেছিলেন কিনা তাহা জানা যায়নি তেমনভাবে।
শিল্পী কানন বালা দেবী: শিল্পী কানন দেবীকেও কবি গান শেখাতেন। তাকে নিয়েও মুখরোচক কাহিনী রটেছিল। এমন কথা প্রচলিত ছিল যে — কবি কে কলকাতায় কোথাও না পাওয়া গেলেও কানন দেবীর বাড়িতে পাওয়া যাবে ‌ অবশ্যই। বাস্তব হয়তো অন্যরকম ছিল।
সত্য ও সুন্দরের কবি আজীবন প্রেমের কাঙাল ছিলেন। তাই প্রেম এসেছিল তার জীবনে বার বার। কখনো ঝড়ের মতো, কখনো নিভৃতে, কখনো মনের অজান্তে। নারী কে ভালবাসার সাথে সাথে কবি ভালবেসেছিলেন মানুষ কে মানবতা কে, সত্যকে। মানবিক প্রেমকে ভালবাসার অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন কবি। বাক শক্তি হারাবার পূর্বে বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সমিতির বিশেষ সভায় কবির মুখ থেকে নিসৃত হয়েছিল—- আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, প্রেম নিতে এসেছিলাম। সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই প্রেমহীন নিরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

  • [১]