- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বিপাকে খামার মালিকরা

স্টাফ রিপোর্টার
‘আমার নিজের জমি জমা নাই। গো-খাদ্যের চাষের জন্য ৭০ হাজার টাকায় চার বিঘা জমি লিজ নিয়েছিলাম। এবছর অকাল বন্যার কারণে দেশি ঘাস ফলাইতাম পারছি না। এরপরেই গো-খাদ্যের দামও হঠাৎ করে বেড়ে গেছে। খাদ্যের দাম বাড়ায় ঠিকমতো গরুর খাবার দিতে পারি না। আগে ভূষির বস্তা কিনেছি ১৪০০ টাকায়, এখন কিনতে হচ্ছে ২২০০ টাকায়। আগে মিক্সারের বস্তা কিনেছি ৯০০ টাকায়, এখন ১১ থেকে ১২শ’ টাকায় কিনতে হচ্ছে। খড়ের দামও বেড়েছে। এদিকে পরিমিত খাবার দিতে না পারায় দুধ উৎপাদনও কমেছে। আগে দৈনিক একটা গাভী ৮ থেকে ৯ কেজি দুধ দিত। এখন ৫-৬ কেজি দুধ পাওয়া যায়।’
কথাগুলো বলছিলেন ধর্মপাশা উপজেলার দশ দেওরি গ্রামের মানিক ডেইরি ফার্মের উদ্যোক্তা মানিক মিয়া। তিনি বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকেই একটি, দুটি করে দেশী গরু কিনে বিভিন্নজনের কাছে বাগি দিতাম। সেসময় আমরা দুই ভাই মোটরসাইকেল ভাড়ায় চালিয়ে সংসার চালাই। টাকা জমিয়ে দুইটা বিদেশি গাভী কিনি। দুধ বিক্রি করেও আয় হতো। এনজিও থেকে ৩ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে খামারটা বড় করেছি। শ্রম ঘামে ধীরে ধীরে আমার খামারে গরুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬টিতে। ২০২১ সালে খামারী হিসেবে নিবন্ধন করি। এক বছর ভালোই চলছিল। বর্তমানে আমার খামারে ৮টা গাভী গর্ভবতী। খুব চিন্তায় আছি। বিক্রি করলেও লসে বিক্রি করা লাগব। ব্যাংকে ঋণের জন্য গেছি। কিন্তু জমির দলিল ছাড়া ব্যাংক ঋণ দেয় না। সামনের দিনগুলো কেমনে চলতাম, চিন্তায় আছি। সরকারি সহায়তা পেলে অথবা ব্যাংক থাকি ঋণ পেলে খামারটা টিকে যেতো।
জেলা প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ জেলায় তিন হাজার ৩১৬টি খামার রয়েছে। এরমধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় ৩৯৪, ছাতকে ৩৯৬, দোয়ারাবাজারে ৩০৫, জগন্নাথপুরে ২২৯, জামালগঞ্জে ১৭৯, বিশ্বম্ভপুরে ২২৭, দিরাইয়ে ৪০৭, শাল্লায় ২৫২, তাহিরপুরে ৩১৫, ধর্মপাশায় ২৬২ এবং শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ৩৫০ টি খামার রয়েছে। খামারগুলোতে ৫৭ হাজার ৩৬৭টি গবাদীপশু রয়েছে। এরমধ্যে ৩০ হাজার ৪৫৯টি ষাঁড়, ৭ হাজার ৭৯১টি বলদ, ৮ হাজার ১৫৬টি গাভী, ১ হাজার ২৯৪টি মহিষ, ৫ হাজার ৩৩৬টি ছাগল, ৪ হাজার ৩৩১টি ভেড়া।
জানা যায়, হাওর ও সীমান্তবর্তী উপজেলার নিম্নাঞ্চলে গত এপ্রিলের শেষ দিকে এক দফা এবং মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে দ্বিতীয় দফায় আকস্মিক বন্যা হয়। বেশ কয়েকটি উপজেলা বন্যার শিকার হয়। কৃষি দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের বন্যায় প্রায় শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়। অকালবন্যায় বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা ধানের সঙ্গে গো-খাদ্য হিসেবে খড়ও হারিয়েছিলেন। এবার অনেকের খড় পচে গেছে, অনেকের খড় ডুবে নষ্ট হয়েছে। এতে গো-খাদ্যের সংকট মারাত্মক হয়ে উঠেছে। দাম বেড়ে যাওয়ায় ডেইরি ফার্মের মালিকরাও বিপাকে রয়েছেন। সংকট মোকাবেলায় খামারীরা সরকারি আর্থিক সহযোগিতার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে মানিক মিয়ার মতো সুনামগঞ্জ পৌর শহরের হাসননগরের মা ডেইরি ফার্মের উদ্যোক্তা বশির মিয়াও ২৮ টি গরুর খামার নিয়ে বিপদে আছেন। ইতোমধ্যে তিনি ১০টি গরু বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন।
বশির মিয়া জানান, গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, দেশি ঘাস পানিতে তলিয়ে যাওয়া এবং এছাড়াও বন্যায় খড়ের সংকট দেখা দিয়েছে। এইজন্য তিনি গরুর খাদ্যের পরিমান কমিয়ে দিয়েছেন।

অনেক খামার মালিক বিক্রি করে দিচ্ছেন গরু


শহরের নবীনগর এলাকার এ আর ডেইরি ফার্মের উদ্যোক্তা মমিনুল হক জানান, গো-খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে। দেশি ঘাস ফলন কম হয়েছে ও খড়ের সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আমাদের খামারিদের সমস্যা হচ্ছে।
মোহাম্মদপুর এলাকার ডেইরি ফার্মের মালিক রফিকুল ইসলাম জানান, গো খাদ্যের সংকটের কারণে গরুর সংখ্যা ১৮ টি থেকে কমিয়ে ৮ টিতে নিয়ে এসেছি। এ বছর লাভ তো হবেইনা, টিকে থাকাই মুশকিল হবে।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ডেইরি ফার্মের মালিক ও জেলা ডেইরি ফার্মারস এসোসিয়েশনের সভাপতি নুরুল আলম সাগর বললেন, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতি বৃষ্টিতে সৃষ্ট বন্যায় সুনামগঞ্জে বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় আমরা (ডেইরি ফার্মের মালিকরা) বিপাকে পড়েছি। একদিকে গো-খাদ্যের প্রত্যেকটি আইটেমের দাম বেড়েছে, অপরদিকে দেশী ঘাস ও খড়ের সংকটে পড়েছি। এ বছর সুনামগঞ্জের ডেইরি ফার্মের প্রত্যেককে সরকারি সহায়তা দেওয়া দরকার। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ দেখবেন এবং বিবেচনা করবেন আশা করছি।
তাহিরপুর উপজেলা ডেইরি ফার্মারস এসোসিয়েশনের সভাপতি ও জুবায়ের এন্ড ডেইরি ফার্মের উদ্যোক্তা এনামুল হক বললেন, বিশটি গরু ছিল খামারে, এখন আছে ১৭টি গরু। গো-খাদ্যের দাম বৃদ্ধিতে সমস্যায় আছি, ঠিকমতো গাভীর খাদ্য দিতে পারছি না। দেশী ঘাস, খড়ের সংকটে পড়েছি আমরা। আগাম বন্যার ফলে এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের সরকারি সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন। নইলে খামারিদের টিকে থাকা মুশকিল হবে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসার ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের বক্তব্য জানার জন্য তাঁর মুঠোফোনে কয়েকদফায় ফোন দিলেও তিনি রিসিভ না করায় এই বিষয়ে তার কোন বক্তব্য সংযুক্ত করা যায় নি।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, বন্যায় প্রাণি সম্পদের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে। এই বিষয়ে কোন সহায়তা বা প্রণোদনা আসলে ক্ষতিগ্রস্তদের দেওয়া হবে।

  • [১]