স্টাফ রিপোর্টার
তাহিরপুরে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে নেতাদের দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে ইউপি নির্বাচনে শ্রীপুর দক্ষিণ ও বালিজুরি ইউনিয়নে দলের পরাজয় হয়েছে বলে মনে করছেন পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরা। নির্বাচনের এই ফলাফল উপজেলা বিএনপির রাজনীতেতে দ্বিধা-বিভক্তি বাড়াবে বলে মনে করছেন তারা।
তবে উপজেলা বিএনপির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিনসহ সিনিয়র দায়িত্বশীলদের দাবি তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির মধ্যে কোন বিভক্তি নেই। দলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ আছে। সর্বশেষ গত ২৫ জুন উপজেলা বিএনপির ইফতার মাহফিলে সকল নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের দাবি অতীতের কোন্দল থেকে বেরিয়ে উপজেলা বিএনপিতে ঐক্যের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, নির্বাচনে নেতাদের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে সেই পরিবেশ এখন আর নেই। দলের পরাজয়ের পেছনে শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল এবং বালিজুরি ইউনিয়নে সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনিসুল হককে দায়ী করছেন নেতা-কর্মীরা। ইউনিয়ন দু’টিতে দলের নেতাকর্মীরা দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় ‘নিশ্চিত বিজয়’ থেকে দল বঞ্চিত হয়েছে বলেও মনে করছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃণমূল বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী জানান, দলীয়ভাবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে দুই ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় এবং দলের প্রার্থীর পরাজয় নতুন করে দলের বিভক্তি সৃষ্টি করতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকেই বিভক্তির সূর বাজছে। কেউ দলীয় প্রার্থী আবার কেউ বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে কাজ করছেন। প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে আগের মতই গ্রুপিং চাঙ্গা হচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানায়, শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আলী আহমদ মুরাদ। কিন্তু তার মনোনয়ন প্রাপ্তিতে নাশোখ ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল এবং তাঁর সমর্থকেরা। উপজেলা ছাত্রদল সভাপতি ও কামরুলের ঘনিষ্টজন হিসেবে পরিচিত মেহদী হাসান উজ্জ্বলের আত্মীয় বিদ্রোহী প্রার্থী শামীম আহমদের পক্ষে অবস্থান নেয়ার অভিযোগ ওঠে কামরুলের বিরুদ্ধে। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে বাদ দিয়ে কামরুল সমর্থকরা প্রকাশ্যে অবস্থান নেন বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে।
মুরাদ সমর্থকদের অভিযোগ, বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দেয়ার শর্তে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে অনুদান দেন কামরুল। তার পরও নির্বাচনে শামীম ৪৪০ভোট পান মাত্র । অভিযোগ রয়েছে, শেষ মুহূর্তে নৌকাকে সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ও তাঁর নেতাকর্মীরা বিশেষ ভুমিকা পালন করেন। ফলে নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী বিজয়ী হয় আর পরাজিত হন বিএনপি প্রার্থী আলী আহমদ মুরাদ।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল বলেন,‘ দুই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে এটা মোটেও ঠিক নয়। নির্বাচনে আমার স্পষ্ট অবস্থান ছিল দলীয় প্রার্থী ও ধানের শীষের পক্ষে। আমি চেয়েছিলাম খালেদা জিয়ার দেয়া সকল প্রার্থীই নির্বাচনে বিজয়ী হোক। বিএনপির নেতাকর্মীদের সাথে শ্রীপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের দলীয় প্রার্থীর সমন্বয়ের অভাব ছিল। বালিজুরীতে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না। তৃণমূলের বিএনপির প্রার্থী ছিল শাখায়াত হোসেন। তাকে দলীয় মনোনয়ন না দিয়ে অযোগ্য লোককে প্রার্থী করায় এই ফলাফল হয়েছে। আমি নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের পক্ষে ছিলাম। কিন্তু দলের সাধারণ নেতাকর্মীরা তাকে গ্রহণ করেনি।’
এদিকে উপজেলার বালিজুরি ইউনিয়নে বিএনপির লজ্জাজনক পরাজয়ের পেছনেও দলীয় দ্বিধাবিভক্তিকে দায়ী করছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুল হকের আস্থাভাজন ফেরদৌস আলম এই ইউনিয়নে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেন। কিন্তু বিএনপি নেতা শাখাওয়াত হোসেনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকায় ধানের শীষ নিয়েও ফেরদৌস আলম পেয়েছেন মাত্র ১৪৮ ভোট পান। শাখাওয়াত সমর্থকদের অভিযোগ, দলীয় প্রতীক নিয়ে শাখাওয়াত হোসেন নির্বাচন করলে তার জয়ী হওয়ার সুযোগ ছিল।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আনিসুল হক বলেন,‘ জাতীয় রাজনীতির পরিবেশ আমাদের অনুকূলে না থাকার পরও আমারা তাহিরপুর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪টিতে সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় বিজয় অর্জন করেছি। আগামীতে আমরা আরো ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে সকল নির্বাচনেই বিএনপির বিজয় নিশ্চিত করব।’
উপজেলা বিএনপির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন বলেন,‘ তাহিরপুর উপজেলা বিএনপির মাঝে কোন ধরনের বিভক্তি নেই। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ আছি। বালিজুরী ও দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নে বিএনপির দলীয় প্রার্থীর নয় ,ধানের শীষের পরাজয় হয়েছে। ওই দুই ইউনিয়নে দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ার পর দলের কারো সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ রাখেনি। নিজের ত্রুটি বিচ্যুতির কারণে তাদের এ ফলাফল হয়েছে।’