গবেষণা নির্ভর সমাজ তৈরি করার তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি। সোমবার রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব) এর ষষ্ঠ সমাবর্তন উৎসবে সভাপতির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘উন্নত জীবনযাপনের জন্য গবেষণার বিকল্প নেই। আমাদের মনে রাখতে হবে অনুকরণ নয়, উদ্ভাবনই আমাদের শক্তি। উদ্ভাবনের জন্য শিশুকাল থেকেই নিজেদের গবেষণার উপর জোর দিতে হবে।’ শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্য থেকে জাতি ও রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়নে গবেষণার গুরুত্বের জায়গাটি বেশ ভালভাবে ফুটে উঠেছে। আমরা এখন মধ্যম আয়ের জাতিতে পরিণত হয়েছি। লক্ষ্য হলো-২০৪১ সনের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়া। আমরা যে পথে অর্থনৈতিক উন্নয়ন এখন করছি সেই পথে কি উন্নত রাষ্ট্রে উত্তরণ ঘটানো সম্ভব? পৃথিবীর যেসব দেশ এখন উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃত সেইসব দেশের অগ্রগতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, তারা নতুন উদ্ভাবনের মধ্য দিয়েই সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছেছে। আমাদের দেশটি শিল্পায়নের দিকে তেমন সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। শিল্প বলতে আমরা যন্ত্রপাতিসহ সমস্ত উপাদান বাইরে থেকে আমদানি করে শুধু সেলাই করার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিকে বুঝাই। এর বাইরে চিকিৎসাবিজ্ঞানে উন্নত দেশগুলো জীবনরক্ষাকারী যেসব ঔষধ আবিস্কার করে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে তার মুক্ত পেটেন্টের সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠা ঔষধ শিল্প নিয়েও গর্ব করি। এরকম অমৌলিক শিল্পকাঠামোকে কখনই শিল্প বলে চালিয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। আমাদের দেশে ভারীশিল্প নেই। নেই উৎপাদনযন্ত্র উৎপাদনের শিল্প। হালকা যানবাহন কিংবা ইলেকট্রনিক্স মেশিনও উৎপাদন করি না আমরা। সংযোজন করে করে আমরা উৎপাদনের সুখ খুঁজি। উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে হলে এমন অলীক তৃপ্তিবিলাসের জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং অবশ্যই মৌলিক শিল্প স্থাপনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। মৌলিক শিল্প গড়ার জন্য চাই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ। যে সমাজ গড়ার জন্য শিক্ষামন্ত্রী গবেষণার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
বিশ^বিদ্যালয় হলো নতুন জ্ঞান তৈরির জায়গা। শিক্ষার্থীদের অনার্স, মাস্টার্স ডিগ্রি দেয়ার চাইতেও বিশ^বিদ্যালয়ের বড় কাজ হলো গবেষণার মাধ্যমে নতুন জ্ঞান তৈরি করা, নতুন আবিষ্কার ও উদ্ভাবন ঘটানো। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠন তথা গবেষণাকে তেমন করে গুরুত্ব দিতে পারেনি। এখন দেশে অনেক বিশ^বিদ্যালয় হচ্ছে। সরকার প্রতি জেলায় একটি করে বিশ^বিদ্যালয় স্থাপন করবেন। বিশ^বিদ্যালয়কে আমরা মনে করি বড় ক্যাম্পাস, অনেকগুলো বড় বড় অট্টালিকা আর বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ানো। আদতে এরকম মনে করার কারণে এখন আমাদের কোনো বিশ^বিদ্যাøলয়েই আর গবেষণা হয় না। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য জার্নালে আমাদের গবেষকদের কোনো লেখা প্রকাশ হয় না। মূলত আমরা জ্ঞান ও উদ্ভাবনের জায়গায় এত বেশি পরনির্ভরশীল হয়ে গেছি যে আমাদের মাথা এখন আর নতুন কিছু আবিস্কারের জন্য তেমন করে কাজ করে না। এই নিস্পন্দ অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষামন্ত্রীর কথার মূল সুর এইটাই। তবে এরকম ভাল কথা শুধু বললেই চলবে না। ওই লক্ষে পরিকল্পনা তৈরি করে কাজ শুরু করে দিতে হবে। শিক্ষামন্ত্রী দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ব্যক্তি। তাঁকে কথার সাথে কাজ করে দেখাতে হবে। এজন্য বিশ^বিদ্যালয় ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোতে যাতে নিয়মিত গবেষণা হয় সেজন্য উপযুক্ত কর্মপরিকল্পনা ও অর্থবরাদ্দ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের বুঝাতে হবে তারা একটি প্রতিষ্ঠানের টাকা পয়সা নিয়ে মাথা ঘামানোর লোক নন। তাঁরা আরও বড় কাজ করার জন্য। এই বড় কাজের জন্য ছোট ছোট প্রশাসনিক ও আর্থিক বিষয় থেকে মুখ ঘুরিয়ে জ্ঞানের অসীম রাজ্যে ডুব দিতে হবে। সেই অজানা রাজ্য থেকে নতুন নতুন মনিমুক্তো আহরণ করে এই দেশ ও জাতিকে উপহার দিতে হবে। তবেই না আমরা বিশ^মঞ্চে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে পারব।