বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি ৩১ শয্যার স্থলে ৫০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। বৃহষ্পতিবার সংসদ সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে ৫০ শয্যায় উন্নীত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করেছেন। এটি ভাল খবর। ৩১ শয্যা থকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করণের ফলে হাসপাতালের অবকাঠামোগত সামর্থ বেড়েছে। নতুন ভবন হয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের সাথে পাল্লা দিয়ে হাসপাতালের চিকিৎসা দেয়ার সক্ষমতা সমানভাবে বেড়েছে কি? উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের যে খবর গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত হয়েছে সেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, হাসপাতালে কাগজে-পত্রে ৬ জন চিকিৎসক পদায়িত থাকলেও ২ জন সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রেষণে নিযুক্ত রয়েছেন। তিনি আরও জানিয়েছেন হাসপাতালে চিকিৎসক, সেবিকা, আয়াসহ অনেক পদ খালি। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণে এই পদগুলোর শূন্যতা পূরণ করা আবশ্যক বলে তিনি জানিয়েছেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এই মুখ্য কর্মকর্তার কথা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণের আমেজ পাওয়া যায় না। তাঁর কথার মধ্যে রয়েছে নির্মম বাস্তবতার নির্যাস যা এককথায় হতাশাজনক। বলাবাহুল্য জেলার স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর প্রকৃত অবস্থা এমনই। জেলা সদর হাসপাতালের দিকে তাকালেও একই অবস্থা প্রত্যক্ষ করা যায়। এখানেও প্রচুর পদ শূন্য। কোন সুরম্য ভবন চিকিৎসা দেয় না। চিকিৎসার জন্য দরকার মানবিক স্পর্শ। যা দিতে পারেন কেবলমাত্র একজন চিকিৎসক, সেবিকা বা অন্য স্বাস্থ্যসেবাকর্মী। তো চিকিৎসাসেবার মূল উপাদান জনবলের ব্যবস্থা না করে ভবনের পর ভবন নির্মণ করলেই যে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির অপরিহার্য চাহিদা পূরণ হওয়ার নয় তা ধীর্ঘদিন যাবত আমরা দেখে আসছি। কংক্রিট উন্নয়নের এই মনোভাব থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাথে এই অবকাঠামো যাতে সঠিকভাবে স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্যবহৃত হতে পারে সেই ব্যবস্থা করতে হবে সর্বাগ্রে। নতুবা প্রাণহীন চেতনাহীন এই ভবনগুলো তামাশার প্রতিমূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। প্রাণহীন অট্টালিকায় প্রাণ সঞ্চার যারা করতে পারেন সেই স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যবস্থা করার চিন্তা করতে হবে।
সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ কোন প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতে পারেন না। তারা মূলত ঔষধ বিপণন প্রতিষ্ঠান, হাতুড়ে চিকিৎসক, বদ্যি-কবিরাজ-ওঝা; এমন সব জায়গা থেকে তথাকথিত চিকিৎসা গ্রহণ করেন। এর ফলে তাদের রোগ আরও জটিল আকার ধারণ করে। অন্যদিকে জটিল রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চমূল্যের চিকিৎসাসেবা ক্রয় করতে যেয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। কোন পরিবারে কারও যদি ক্যানসার, হৃদযন্ত্র বা মস্তিস্কে রক্ষক্ষরণের মত জটিল রোগ হয় তবে চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে তাদের ভিটেমাটি বিক্রি করে সর্বশ^ান্ত হওয়ার ঘটনা একটু সতর্ক চোখ বুলালে আমাদের চারপাশে বহু দেখতে পাওয়া যাবে। মূলত সরকারি খাতে যথাযথ চিকিৎসাসেবা দেয়ার সামর্থের অভাবেই এরকম নৈরাজ্যকর চিকিৎসা পরিবেশ গড়ে উঠেছে দেশে। উন্নয়নশীল থেকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরের কারণে যখন আমরা আনন্দে মেতে উঠি তখন ওই পীড়াকাতর অসহায় মানুষগুলোর মুখে এই উত্তরণ কোন আনন্দ জাগাতে ব্যর্থ হয়। মূলত সরকারি স্বাস্থ্য কাঠামোর উপযুক্ত সক্ষমতা বাড়ানো ভিন্ন দেশের মানুষের চিকিৎসাসেবার মত মৌলিক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
আমাদের দেশের চিকিৎসাসংক্রান্ত সকল জায়গায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নের সাথে চিকিৎসাকর্মীদের মনোভাবের পরিবর্তন, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা থেকে বিরত রাখা, ঔষধের উর্দ্ধমূল্য নিয়ন্ত্রণ; এমনসব জরুরি বিষয়ে মনোযোগ বাড়াতে হবে। নতুবা স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামোগুলো থেকে রোগীদের সুস্থ্য হয়ে উঠার উদ্ভাসিত মুখের বদলে তাদের দীর্ঘশ্বাসের ভারী বাতাস ভেসে আসবে। এই ভবনগুলো কার্যত কিছু জায়গা ও জাতীয় সম্পদের অপচয় ভিন্ন আর কিছু রূপে বিবেচিত হবে না। চিকিৎসা পরিকাঠামোর সক্ষম মানবিক চেহারা দেখতে চায় সকলে।