- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বিশ্বায়নের প্রভাব বনাম প্রাকৃতিক বৈরিতা

বিশ্বায়নের এই যুগে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে সংঘটিত সামান্য কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়াও উপেক্ষা করার উপায় নেই অন্য জনপদের। এখন বিশ্বকে গ্লোবাল ভিলেজ বলা হয়। অর্থাৎ পুরো পৃথিবী মিলিয়ে একটি গ্রাম। যোগাযোগ, বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ইত্যাদি এখন বিশ্ববাসীকে অনেক কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। দেশে দেশে, মানুষে মানুষে এখন অনেক বেশি পারস্পরিক আদান-প্রদান। প্রতিদিনই আমরা অন্য দেশের লোকদের সাথে মিলিত হই, অন্য দেশও আমাদের সাথে মিলিত হয়। এই সুনিবিড় সম্পর্কের কারণে বৈশ্বিক ক্রিয়া-কর্মের প্রতিক্রিয়া অতীতের যেকোনো সময়ের চাইতে এখন অনেক বেশি। এ যেমন সম্ভাবনার জায়গা তেমনি এ বিপদের স্থানও বটে। সম্প্রতি চীন দেশের একটি প্রদেশে করোনা ভাইরাস নামের প্রাণঘাতী এক ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটেছে। এই ভাইরাসের আক্রমণে চীনের সরকারি ভাষ্য মতে মৃতের সংখ্যা হাজার ছুঁই ছুঁই করছে। চীন একটি নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র। সরকারি ভাষ্যের বিপরীতে তথ্য পাওয়ার তেমন কোনো পথ নেই। তাই চীনের সরকারি তথ্য বাস্তব সত্যের ঠিক কতটা প্রতিফলন ঘটাচ্ছে তা যাচাই করার আর কোনো রাস্তা নেই। তবে সরকারি ভাষ্য থেকেও করোনা ভাইরাসের বিপদের মাত্রা বুঝতে অসুবিধা হয় না। এই ভাইরাস পুরো বিশ্বকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। পৃথিবীর দেশে দেশে এই ভাইরাস মোকাবিলায় যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সুদূর চীনে যে ভাইরাসের সংক্রমণ তা কেন সারা পৃথিবীকে আতঙ্কিত করে তুলেছে? এর কারণ আগের কথাই। অর্থাৎ আন্ত: দেশীয় সম্পর্কের নিবিড়তা এখন অনেক বেশি। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে সারা বিশ্বেই চীনাদের উপস্থিতি প্রচুর। আবার চীনেও প্রায় সব দেশের মানুষেরই যাতায়াত রয়েছে। এই যাওয়া-আসার মধ্য দিয়েই ভাইরাসটির বহির্গমন ঘটার আশংকা সবচাইতে বেশি। তাই এ বিষয়ে বৈশ্বিক সতর্কতাও সমান জরুরি।
শুধু ভাইরাস আতংক নয়, চীনের এই বিপদ তছনছ করে দিতে চাইছে বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও। আমাদের ছোট্ট দেশটিও এই প্রবল বিপদের মধ্যখানেই রয়েছে। ইতোমধ্যে কাঁকড়া ও চিংড়ি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমদানি আদেশ বাতিল করে দিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ। ফলে এই খাতের ব্যবসায় ধস নেমেছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের বড় অংশ আসে চীন থেকে। চীনের সকল কল-কারখানা এখন বন্ধ। তাই রপ্তানিও বন্ধ। তৈরি পোশাক খাত অল্প কিছুদিনের মধ্যেই কাঁচামাল সংকটে পতিত হবে। চীন থেকে আমদানি হয় আরও বহু পণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল। এসব পণ্য আসা বন্ধ হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে কিছু পণ্যের দাম বেড়ে গিয়েছে। চীনের ভাইরাস পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না ঘটলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাত বিশাল বিপর্যয়ে পড়বে। এই অবস্থা পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেরই। সুতরাং চীনে যে ভাইরাস আক্রমণ করেছে তাকে উপেক্ষা কোনো সুযোগ নেই বিশ্ববাসীর। পৃথিবী এখন অনেক বেশি পরস্পর সংলগ্ন ও নির্ভরশীল। এই নির্ভরতার জায়গা প্রকৃতির অভিশাপ থেকে যে মুক্ত নয় করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব তার প্রমাণ।
প্রায়শই এখন অজানা ও নতুন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটতে শুরু করেছে। সার্স থেকে ডেঙু হয়ে করোনা; সবকিছুই আধুনিক যন্ত্রসভ্যতা নির্ভর পৃথিবীকে রক্তচক্ষু দেখাচ্ছে। কেন এই প্রাকৃতিক বৈরিতা, এর পিছনে কোন্ বৈজ্ঞানিক সত্য লুক্কায়িত এবং এসবের পিছনে তথাকথিত উন্নত বিশ্বের অতিরিক্ত পরিবেশ ধ্বংসকারী কর্মকা-ের ভূমিকা কতটুকু; তা জানার পরিস্থিতি নেই। তবে কোনো কিছুই কার্যকারণ ছাড়া ঘটে না। এইসব ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পিছনেও রয়েছে বহু কারণের সমষ্টি। মুনাফামুখী বিশ্ব ব্যবস্থা আমাদের জানার পথটিকেও আজ রুদ্ধ করে রেখেছে।

  • [১]