মানুষের জীবন কি সত্যিই একেবারে মূল্যহীন হয়ে পড়েছে। যে পৃথিবী এতাটা উন্নতি এতোটা সমৃদ্ধ হয়েছে মানুষের সাধনায় সেই পৃথিবীতে তুচ্ছ কারণে কেন অহরহ দলে দলে মানুষ মারা হচ্ছে এই প্রশ্ন আজকের বিশ্ব সভ্যতার মূল সংকট। আশ্চর্যের বিষয় হলো কোন দৈব দুর্বিপাক কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোন মহামারী কিংবা হিং¯্র প্রাণীর আক্রমণে ঘটছে না এইসব গণমৃত্যু। মানুষ নামধারী কিছু গোষ্ঠীই নৃশংস উন্মত্ততায় নরহত্যার আনন্দে মত্ত হয়ে আছে। মানুষ মারাতেই তাদের আনন্দ, মানুষ মারাকেই তারা মনে করে আদর্শের বিজয়। ওরা ভুলে বসে আছে যেকোন আদর্শ তৈরি হয় মানুষের কল্যাণের জন্যই। এখন যদি সেই আদর্শের কারণে মানুষকেই হত্যা করে ফেলা হয় তাহলে কথিত আদর্শের মাহাত্ম্য কোন আলোয় উদ্ভাসিত হয় তা কেবল বলতে পারে ওই হত্যাকারীরাই। এত কথা মনে করার কারণ জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর গতকালের সংখ্যায় প্রকাশিত একটি পরিসংখ্যান। পত্রিকাটির ৭ম পৃষ্ঠায় ‘তিন মাসের উল্লেখযোগ্য সন্ত্রাসী হামলা’ শিরোনাম দিয়ে ২০১৬ সনের জানুয়ারি থেকে চলতি মার্চ মাস পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৯৬টি বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার উল্লেখ করে ২২ টি হামলা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত এই ২২ হামলায় নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪২ জন। এই তালিকার বাইরে অতিসম্প্রতি সংঘটিত ব্রাসেলস হত্যাকাণ্ডে নিহত ৩১ ব্যক্তির (এ যাবত প্রাপ্ত তথ্য) সংখ্যা অন্তর্ভূক্ত করলে সেটি ১ হাজার তিহাত্তরে গিয়ে দাঁড়ায়। বলা বাহুল্য ৯৬ হামলার সবগুলোর পরিসংখ্যান পাওয়া গেলে নিহতের সংখ্যা যে ঢের বেড়ে যাবে তাতে সন্দেহ নেই। এই ২২ হামলার মধ্যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন আইএস জড়িত রয়েছে ৮টিতে, অন্যগুলোতে তেহরিক ই তালেবান, আল-কায়দা, আল-শাবাব, বোকো হারাম, কুর্দিস্থান ফ্রিডম ফ্যালকন, একিউআইএম, ইউলায়েত সেইনা ইত্যাদি সংগঠনের নাম জড়িত রয়েছে। সংগঠনের নামগুলো দেখলেই বুঝা যায় এরা বিশ্বে একটি ধর্মীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। নির্বিচারে মানুষ হত্যা করাকেই তারা আদর্শ স্থাপনের একমাত্র উপায়রূপে বেছে নিয়েছে। এইসব সন্ত্রাসী আন্তর্জাতিক সংগঠনের কারণে আজ বিশ্ব নিরাপত্তা ও শান্তি চরম হুমকির মধ্যে পতিত হয়েছে। পৃথিবীর সকল মানুষ আজ সর্বক্ষণ সন্ত্রস্থ থাকেন কখন কোথায় চোরাগোপ্তা হামলায় তার প্রাণ বিপন্ন হয় এই আশঙ্কায়।
আজ আদর্শ স্থাপনের জন্য এই যে সহিংস উন্মত্ততা এর পিছনের দায় কোন অবস্থাতেই অস্বীকার করতে পারবে না পশ্চিমা ধনবাদী দেশগুলো। তারা ইসলামিক রাষ্ট্রগুলোতে প্রাকৃতিক সম্পদ হরণের জন্য যেভাবে সামরিক আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব শুরু করেছে তার বিস্ফোরণ কোন না কোনভাবে ঘটতোই। দুশ্চিন্তার কথা হলো পশ্চিমা সা¤্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে যেভাবে শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গি সহকারে প্রতিবাদী ধারা প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল সেটি না হয়ে এর প্রকাশ ঘটেছে ধর্মীয় জঙ্গীবাদী আকারে। মূলত এই জঙ্গিবাদের উত্থানের পিছনেও পশ্চিমাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল। এরা সমাজ বিপ্লবকে প্রতিহত করতেই জঙ্গিগোষ্ঠীর সৃষ্টি করেছিল। এটি অনেকটা ‘সর্প হয়ে দংশন করি ওঝা হয়ে ঝাড়ি’ এর মতো অবস্থা। আজ এই সৃষ্টি ফ্রাঙেœস্টাইনের দানব হয়ে ¯্রষ্টাকেই গিলে খাচ্ছে।
বিশ্ব শান্তির এই চরম হুমকি মোকাবিলায় রাজনৈতিক চেতনাই মোক্ষম প্রতিরোধ ব্যবস্থা হতে পারে। সারা বিশ্বে জাতিতে জাতিতে আজ সেই রাজনৈতিক চেতনায় উদ্দীপ্ত হতে হবে যে রাজনৈতিক দর্শন মানুষে মানুষে বৈষম্যের বিলোপ ঘটিয়ে সাম্য প্রতিষ্ঠা করে। সেই মাহান মতাদর্শিক চর্চার জায়গা যত বাড়বে তত কমবে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ ও জঙ্গিবাদী হামলা মোকাবিলার আশঙ্কা। সর্বত্র শুভবোধ জাগ্রত হোক।