অ্যাডভোকেট এনাম আহমেদ
১৯৮০ সাল।ছোট্ট শহর সুনামগঞ্জ। লোকজনও অত্যন্ত কম। তবে শহরের সামাজিক সম্পর্ক খুবই সুদৃঢ়। মায়েরা গৃহস্থালির সারাদিনের কাজকর্ম শেষ করে ছোট ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পাড়া মহল্লায় ঘুরে বেড়ান। আমরা সবাই এভাবে ঘুরেছি। ছেলেরা একা একা মাঠে যাওয়ার বয়স হলে, সেখান থেকে পালিয়ে মাঠে চলে যায়।আমরাও চলে গেলাম। কিন্তু আবেদ তখনও মাঠে গেল না। কিছুটা বড় হয়েও তার মায়ের সঙ্গে ঘুরতে লাগলো। সে মোরগ পোষতো, বেশ কয়েক প্রজাতির মোরগ ছিল তার। বাড়িতে গাছ লাগাতো। আমরা স্কুলে দেখা হলে তাকে খেপাতাম। পুরো নাম আবেদ মাহমুদ চৌধুরী। তাদের গ্রামের বাড়ি শহরতলীর কুতুবপুরে। অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত তার বংশধররা। কুতুবপুর বড়বাড়ি সবাই এক নামে চেনে। আবেদের পিতা আছদ্দর চেীধুরী লাল মিয়া পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ফ্লাইট সার্জেন্ট ছিলেন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। পুরো এপ্রিল মাস সুনামগঞ্জ মুক্ত ছিল। এই সময়কালে তিনি এবং মতিউর রহমান চৌধুরী জুবিলী স্কুলের মাঠে মুক্তিযুদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেন। আবেদের মাতা হাবিবুন্নেসা চৌধুরী। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে আবেদ সবার ছোট। তার জন্ম মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের এক সপ্তাহ আগে তার নানাবাড়ি বিশ্বনাথে হাজারী গাঁয়ে। স্বাধীনতা পরবর্তীতে আবেদের পরিবার পুরাতন বাসস্টেন্ডে থাকতেন। ৭৭ সাল থেকে হাসননগরের পূরবী আবাসিক এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সে রাজগোবিন্দ স্কুল থেকে সরকারী জুবিলীতে ভর্তি হয় পঞ্চম শ্রেণীতে। স্কুলে একাধিকবার ক্লাস ক্যাপ্টেন ছিল। নেতৃত্ব দেয়াটা ছিল তার সহজাত। পরবর্তীতে স্কাউট নিয়ে মেতে ছিল। জাম্বুরীতে যেত। সেখানেও নেতৃত্ব দিত। অল্প বয়সেই শুরু করে সাংবাদিকতা। এ ক্ষেত্রে বড়দের সাথে তার কাজ করতে হতো। সংবাদ সংগ্রহ করতে ঘুরতো সিনিয়র সাংবাদিক অ্যাড.আইনুল ইসলাম বাবলু ভাইয়ের সাথে। আমরা মজা করে সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক শব্দ “ছাবাল মুরব্বি” হিসেবে তাকে অভিহিত করতাম। কলেজে পড়ার সময় থেকেই তার আচার- আচরণ দায়িত্বশীল ও অভিভাবকসুলভ, এমন কি আমাদের সঙ্গে কথা বলা বা কাজ করার ক্ষেত্রেও সে এমন করতো। অল্প বয়সেই বুলচান্দ স্কুল এন্ড কলেজ অব-বিজনেস ম্যানেজমেন্ট এর পরিচালনা কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়ে গেল ২০১৬-১৭ সালে। কোন প্রতিষ্ঠানের সভাপতি বলতে আমরা বুঝতাম বয়স্ক, ধুরন্ধর প্রকৃতির অর্ধ শিক্ষিত কিছু মানুষ! কিন্তু বয়স চল্লিশের কোঠায় থাকাকালিন সময়েও যে সভাপতি হওয়া যায় এবং সত্যিকার অর্থে কাজ করা যায়, তা-ই করে দেখালো আবেদ। এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে ২০২০-২১ সালের জন্য আবার সভাপতি নির্বাচিত হয়। তার সময়কালে বুলচান্দের চেহারা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। মাটি ভরাট করে স্কুলের ভেতরকার প্রয়োজনীয় পাকা সড়ক নির্মাণ, ২ টি নতুন ভবন নির্মাণ হয়। স্কুলের জন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র ক্রয়, মেয়েদের জন্য একটি পাঁচতলা ভবনের টাকা বরাদ্দ করে ফেলেছে। কিছুদিনের মধ্যেই এর কাজ শুরু হওয়ার কথা। এমন কি এই মহামারীর সময়ও চলতি মাসের শিক্ষকগণের বেতনের ব্যবস্থা সে করে গেছে। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার ক্ষেত্রে শহরের অবসরপ্রাপ্ত সনামধন্য দুজন শিক্ষক জনাব মো. মকবুল হোসেন স্যার ও জনাব্. এ.এস মাসয়ূদুল হাসান স্যারের সুপরামর্শ সে গ্রহণ করতো। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী অধ্যাপক শামীমা আখতারের কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানের সভাপতি সৎ উদ্দেশ্য থাকলে কী কী করতে পারেন, তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেলেন আবেদ। সামর্থ্যহীন শিক্ষার্থীদের নিজের টাকায় বই খাতা এমনকি পোষাকও কিনে দিতো। শিক্ষর্থীরা তাকে শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয় পেত। মধ্য শহরের এই প্রতিষ্ঠাটিকে ঘিরে তৈরি হওয়া কিছু বখাটেপনা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সে বন্ধ করে দিয়েছিল। প্রেসক্লাবের নতুন কমিটি গঠিত হলে আবেদ তাতে সিনিয়র সহ– সভাপতি নিবার্চিত হয়। আমরা তখন অনেক মজা করলাম। ডিনার খেলাম একাধিকবার। পিকনিকের আয়োজন করা হলো। এমনই এক বর্ষায় আমরা নৌকা নিয়ে ডলুরা শহীদ মিনারে গেলাম। ফুটবল, সাঁতার, গান, অভিনয়সহ অনেক মজা করলাম। সবশেষে আকর্ষণীয় পুরষ্কারসহ কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হলো। ্এতে সে বুদ্ধিদীপ্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে একাধিক পুরস্কার বাগিয়ে নিল। বাসায় গিয়ে এগুলো সৃজন বিদ্যাপীঠে পড়া তার মেয়ের হাতে তুলে দিলে মেয়েটি বাবার এমন বুদ্ধিমত্তায় সংশয় প্রকাশ করলো। আবেদ তখন মেয়েকে বলে তুমি তোমার স্যারকে ফোন করে নিশ্চিত হয়ে যাও সত্যিই আমি পুরস্কারগুলো জিতেছি কি-না। এ ঘটনাটি সে পরবর্তীতে বর্ণনা করেছিল অত্যন্ত আনন্দ নিয়ে । আরটিভির স্টাফ রিপোর্টার ও দৈনিক আজকের সুনামগঞ্জের সম্পাদক ও প্রকাশক ছিল সে। বক পয়েন্টের কাছাকাছি তার অফিস ও প্রেস। এর সামনে দিয়ে গেলে আর রক্ষা নেই, খোঁজ খবর নিতো সবার। শুধু নিজের শরীরের খোঁজ সে রাখতে পারলো না। ইদানিং শুরু করেছিল টিভিতে লাইভ রিপোর্ট। শুদ্ধ ও আঞ্চলিকতায় মেশানো অদ্ভুত এক মায়াবী কন্ঠে সে খবর শুনাতো। এ নিয়ে তাকে খেপানোর সময়ও দিল না আমাদের । আগের দিন বাস দুর্ঘটনার খবর লাইভ করলো। যেদিন সকালে মারা গেল, সেদিনও বন্যা নিয়ে তার লাইভ ছিল। কিন্তু সে খবর প্রচার করার আগে সে নিজেই খবর হয়ে গেল। তার গ্রহণযোগ্যতা কী পযার্য়ে ছিল তা বুঝা গেছে তার শেষ বিদায়ে। যেখানে করোনা মহামারী আতঙ্কে অন্যান্য জানাজায় লোকজনের উপস্থিতি অত্যন্ত কম হয় সেখানে তার শেষ বিদায়ে আরপিননগর ঈদগাহ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। শেষ বারের মতো বন্ধুর প্রিয় মুখটি দেখি। জীবিতকালের মতোই তা শান্ত, ¯িœগ্ধ। আমাদের অসম্ভব ভালোমানুষ বন্ধুটি কত শান্ত ভাবে ঘুমাচ্ছে। আমাদের প্রতি ভালবাসা সে প্রতি পদে পদে দেখিয়ে গেছে। অন্তত আমি তার কোন ভালবাসা ফেরত দিতে পারিনি। অসহায় মানুষকে সাহায্য করার চেষ্টা করেছে জীবনভর। সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজের ৭৫ বছর পূর্তি উৎসবে ৯১ ব্যাচের বন্ধুদের নিয়ে নিমেষেই অর্ধ লক্ষ টাকা অনুদান তুলে দিয়েছে একজন অপারেশন রোগীকে। যারা তাকে বড় করেছে, তাদের সে বড়ত্ব দেখায়নি। আমাদের কাঁধে তার অদৃশ্য হাতের ছোঁয়া সব সময় অনুভব করি। তার অন্তরে কোন কালিমাখা ছিল না । এ জন্য কোন কলঙ্ক তাকে স্পর্শ করতে পারে নি। সাংবাদিকতা করেছে সততার সাথে। এনিয়ে দ্বিতীয় কোন কথা শুনি নি কখনো। কথিত লাইক পাওয়ার জন্য কাজ করতো না। ছিল প্রচারবিমুখ। এক সহজিয়া ভঙ্গিতে অনায়াস বিচরণ ছিল তার। জীবনের পাঠশালায় পাঠ নিয়ে চলতে হয়েছে তাকে।তার প্রথম মেয়ে মঞ্জিলা মাহমুদ চৌধুরী ফাল্গুনি ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ে। দ্বিতীয় মেয়ে মালিহা মাহমুদ চৌধুরী সাবা’র বয়স মাত্র ৬ বছর। বাবা অন্ত প্রাণ এই দুই মেয়ে, সেও মেয়ে দুটিকে তার জীবন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল। এখন এই মেয়েদেরকে কে শান্তনা দেবে? সেটি কি ভাবে? ছ্টো মেয়েটি ইতিমধ্যে বাবার জন্য অস্থির হয়ে গেছে। মৃত্যু বুঝার বয়স তো তার হয়নি। জীবন বুঝার বয়সও না। সব সময় সে আমাদের বন্ধুদের থেকে অগ্রসর ছিল। জীবনে আমরা কোন কিছুতেই তাকে অতিক্রম করতে পারিনি। মরণেও না। আমাদের প্রজন্মের একজন হিসাবে অকাল মৃত্যুর সূচনা করে যেন সে জানিয়ে গেল, ‘আমি চির সত্য পরপারের পথ দেখিয়ে গেলাম’। চারদিকে হাহাকার, অন্ধকার। মনে হয় চিৎকার করে বলি, আবেদের সাথে আর দেখা হবে না। এটি কেমন কথা হলো, এ্টা একটা কথা হলো?