স্টাফ রিপোর্টার
বীর মুক্তিযোদ্ধা, সুনামগঞ্জের বিশিষ্ট আইনজীবী, কলামিষ্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু স্মরণে নাগরিক শোকসভা আজ রবিবার। বিকাল ৫টায় সুনামগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমির হাছন রাজা মিলনায়তনে নাগরিক শোকসভা অনুষ্ঠিত হবে।
প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু এর নাগরিক শোক সভায় সর্বস্তরের জনগণকে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ করেছেন আয়োজক কমিটির আহবায়ক সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখত।
উল্লেখ্য, উনিশ বছর বয়সে বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু অংশ নেন মহান মুক্তিযুদ্ধে। ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি আক্রমণের পূর্বে ফ্যাক্টরির ভেতরে পাকিস্তানী সৈন্যদের অবস্থান ও গোলাবারুদ সম্পর্কে রেকি করার দায়িত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। সম্মুখ সমরে অংশ নেন ছাতক ও টেংরাটিলা যুদ্ধে।
বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু’র জন্ম ১৯৫২ সালের ২ এপ্রিল সুনামগঞ্জ শহরের ষোলঘরে। বাবা মফিজুর রহমান চৌধুরী, মা মজিদা খাতুন চৌধুরী। ৫ বোন ও ৩ ভাইয়ের মধ্যে বজলুল মজিদ চৌধুরী ছিলেন দ্বিতীয়। জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, হল্যান্ড, লুক্সেমবুর্গ, চীন, সৌদি আরব, ভারত প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেছেন। দ ১৯৯১ সালে সুনামগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০০ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০০৭-২০০৯ (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) সময়ে সুনামগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাবলিক প্রসিকিউটর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সুনামগঞ্জের প্রথম সংবাদপত্র ‘সাপ্তাহিক সুনাম’ তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ‘দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর’র উপদেষ্টা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ২০১২ সালে সুনামগঞ্জ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী বই ‘রক্তাক্ত ৭১ সুনামগঞ্জ’ প্রকাশিত হয়। ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অপর গ্রন্থ ‘পশ্চিম জার্মানির স্মৃতিকথা’। এ ছাড়া তিনি ‘একাত্তরের সুনামগঞ্জ’, ‘বরুণ রায় স্মারকগ্রন্থ’, ‘আলফাত উদ্দিন আহমদ স্মারকগ্রন্থ’ ও ‘হুসেন বখত স্মারকগ্রন্থ’ সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। স্মারকগ্রন্থগুলো তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ‘সুনামগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধ চর্চা ও গবেষণা কেন্দ্র’র উদ্যোগে প্রকাশিত হয়েছে।
১৯৯৬ সালে দোয়ারাবাজার উপজেলার নিজ গ্রাম লক্ষ্মীপুরে সাবসেক্টর কমান্ডার এ. এস. হেলাল উদ্দিন ও বজলুল মজিদ চৌধুরী দুজনের যৌথ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল-খসরু হাই স্কুল’। সুনামগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা সন্তানদের শিক্ষা সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে একইভাবে তাঁরা প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন হেলাল শিক্ষা ট্রাস্ট’। সরকারিভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানীভাতা প্রবর্তনের পূর্বে ক্যাপ্টেন হেলালের অর্থায়নে তাঁরাই সুনামগঞ্জে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা ভাতা প্রদান কার্যক্রম শুরু করেন। যখন সরকারিভাবে ভাতা দেওয়া শুরু হয় তখন এই কার্যক্রম বন্ধ করেন তাঁরা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক ও সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন বজলুল মজিদ চৌধুরী। সুনামগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দীর্ঘ ১২ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ‘আলফাত উদ্দিন রিকশা শ্রমিক ইউনিয়ন স্মৃতি ট্রাস্ট’র প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। আমৃত্যু এই দায়িত্বে ছিলেন।
এ ছাড়া রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি, জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি, ডায়াবেটিস এসোসিয়েশন, শিল্পকলা একাডেমী, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির কার্যকরী কমিটির সদস্য ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল সুনামগঞ্জ জেলা ইউনিটের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম গঠন হওয়ার পর তিনি সুনামগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সুনামগঞ্জ মুক্তি সংগ্রাম স্মৃতি ট্রাস্টের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য ছিলেন।
তাঁর উদ্যোগেই সুনামগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তাঁরা ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা (বরুণ রায়, হুসেন বখত, আলফাত উদ্দিন আহমদ, আছদ্দর চৌধুরী, রানা চৌধুরী এবং বজলুল মজিদ চৌধুরী) মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রাপ্ত ভাতার টাকা না নিয়ে এই সংগঠনের মাধ্যমে সেই টাকা নানা সামাজিক ও সেবামূলক কাজে ব্যয় করছেন। আর্থিকভাবে অসচ্চল পরিবারের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, গবির মানুষের চিকিৎসা ব্যয়, পথশিশুদের শিক্ষা উপকরণ প্রদান, সফল মানুষদের সম্মাননা প্রদানসহ নানা কাজ করছে সংগঠনটি। এই সংগঠনের মূল চালিকা শক্তি ছিলেন বজলুল মজিদ চৌধুরী।
২০১৭ সালে সুনামগঞ্জে হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতির কারণে শতভাগ ফসলহানি হওয়ায় প্রতিবাদী সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠে ‘হাওর বাঁচাও, সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলন’। তিনি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে শেষ দিন পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে গেছেন। প্রত্যুষে পায়ে হেঁটে শরীরচর্চা করার জন্য তিনিসহ আরও অনেকে গড়ে তুলেন ‘সোনালী সকাল’ নামের একটি সংগঠন।