স্টাফ রিপোর্টার
ভাটি অঞ্চলের হাওর-বাঁওড় চষে বেড়ানোর জন্য খ্যাতি ছিল তাঁর। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে অস্ত্র হাতে লড়ে সুনামগঞ্জের দিরাই-শাল্লা-তাহিরপুর-জগন্নাথপুর-নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ির হাওড় অঞ্চল তথা ভাটি অঞ্চলকে স্বাধীন করতে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। তিনি বীর মুক্তিযোদ্ধা-সাংবাদিক সালেহ চৌধুরী। দিরাই উপজেলার গচিয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ নভেম্বর। একাধারে ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা, বরেণ্য সাংবাদিক, বিশিষ্ট কলাম লেখক, চিত্রশিল্পী, সংগঠক, সমাজসেবক ও পরোপকারী। বলতে গেলে গোটা জীবনই সাংবাদিকতা আর শিল্পসাহিত্যের ভুবনে ডুবে ছিলেন তিনি।
অসামান্য বুদ্ধিদীপ্ত, সৃজনশীল ও সাহসী মানুষ ছিলেন সালেহ চৌধুরী। একসময় কবিতা লিখতেন। শিশুদের জন্য ছড়া লিখেছেন। ছবি আঁকতেন। লিখেছেন মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ। পত্রপত্রিকার জন্য কার্টুন আঁকতেন। সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিয়েছেন এমন সাংবাদিকের সংখ্যা হাতে গোনা। সালেহ চৌধুরী তাদের একজন, যিনি কলম ছেড়ে অস্ত্র ধরেন।
নিজ গ্রামের পাশাপাশি মৌলভীবাজার, সিলেট এবং লাহোরে তিনি পড়াশোনা করেন। বিএ পাস করার পর চিত্রকলার দিকে আকৃষ্ট হন। পশ্চিম পাকিস্তানে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন সালেহ চৌধুরী। লাহোরের পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি এমএ পাস করে ঢাকা ফিরে আসেন।
তিনি কাজ করেছেন দৈনিক বাংলা, সান্ধ্য দৈনিক আওয়াজ, দৈনিক পাকিস্তান সহ বিভিন্ন পত্রিকায়। এছাড়াও বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম লিখতেন। সাপ্তাহিক ‘ইশারা’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। দায়িত্ব পালন করেছেন কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের সভাপতি ও দাবা ফেডারেশেনের সাবেক কর্মকর্তা হিসেবেও।
কবি শামসুর রাহমানের ঘনিষ্ঠজন ছিলেন সালেহ চৌধুরী। জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল। হুমায়ূন আহমেদ শ্রদ্ধার সঙ্গে তাকে ‘নানাজী’ বলে সম্বোধন করতেন। দাবার সঙ্গে তাঁর আজীবন সখ্য। খেলতেন না কেবল, দাবারু বানাতেনও। গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোর্শেদের খ্যাতি অর্জনের পশ্চাতে ছিলেন সালেহ চৌধুরী। তিনি তার সম্পর্কে একটি বইও লিখেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদের সামনে যে ভাস্কর্যটি রয়েছে, তা দৃঢ় প্রত্যয়, অঙ্গীকার ও প্রতিরোধেরই প্রতীক। সালেহ চৌধুরী এর নামকরণ করেছিলেন ‘অপরাজেয় বাংলা’। এর স্থপতি ছিলেন বৃহত্তর সিলেটের আরেক কৃতী সন্তান সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ।
একাত্তরের রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা সালেহ চৌধুরী শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটিতে সক্রিয় ছিলেন। যুদ্ধাপরাধীদের প্রতীকী বিচারে ১৯৯২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে গণআদালত বসেছিল, তার অন্যতম সাক্ষী ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায়ও তিনি সাক্ষ্য দেন।
২০১৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে ৮১ বছর বয়সে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নেন তিনি। ৩ সেপ্টেম্বর রবিবার বিকেলে দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের গচিয়া গ্রামে তাঁর নিজের ইচ্ছায় পারিবারিক গোরস্তানে মা-বাবার কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে সালেহ চৌধুরীকে। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী শাহেরা চৌধুরী, তিন ছেলেসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে যান। ২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগার মিলনায়তনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সুনামগঞ্জ জেলা ইউনিট কমান্ডের আয়োজনে নাগরিক শোকসভায় বক্তারা বলেন, সালেহ চৌধুরী একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক, চিত্রশিল্পী, ভাস্কর, সাংবাদিক, কলাম লেখক ছিলেন। এক ব্যক্তির চরিত্রে এত গুণের সমাহার সচরাচর দেখা যায় না। সালেহ চৌধুরীর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি ভালো মনের মানুষ ছিলেন। অহংকার ছিল না, আত্মপ্রচারও তিনি করতেন না। আমাদের জেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সহ জেলার অনেকগুলো শহীদ মিনারের আর্কিটেক্ট ছিলেন তিনি।