- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বৃষ্টিবিঘ্নিত নবমী

নূপুরছন্দা
শুক্রবার ছিলো সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজার মহানবমী তথা পুজোর শেষ দিন। সাধারণত নবমী তিথিতেই পুজোম-পগুলোতে পূণ্যার্থী-দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। প্রতিবছরই এমন দৃশ্যের দেখা মিলে। কিন্তু এবার মহানবমীর এই তিথিতে বাধ সেধেছে প্রকৃতি। নবমীর সকাল থেকে আকাশ ভেঙ্গে অঝোর বৃষ্টি ঝরা শুরু হয়েছে। একটু খানি থেমে আবারও পূর্ণ শক্তিতে বৃষ্টির বর্ষণ। এরকমটিই ছিল শুক্রবার সারা দিন। বর্ষাকালকেও হার মানিয়েছিলো শরৎতের এই শুক্রবারটি।  দিনের বেলা প্রধানত শহরের দূরবর্তী বিভিন্ন  গ্রাম থেকে নারী পুরুষরা দল বেধে     
পুজো দেখতে আসেন। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে শুক্রবার দিনের বেলায় কোন পূজাম-পেই এমন দর্শনার্থীদের কোন সমাগম লক্ষ্য করা যায় নি। রাতে বের হন শহরের দর্শনার্থীরা। কিন্তু বৃষ্টি যেন তাদের সাথেও শত্রুতা করেছে এই দিন। দিনের টানা বৃষ্টির ফলে রাস্তা-ঘাট ও পুজোম-পের আঙ্গিনা কর্দমাক্ত হয়ে পড়ায় বাইরে বেরিয়ে পুজো দেখার উৎসাহও হারিয়ে ফেলেছেন শহরের অনেকে। তাই নবমীর রাতে পুজোম-পগুলোতে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়নি।
শুক্রবার দুপুরে এই প্রতিবেদক শহরের হাছননগর সার্বজনীন দুর্গামন্দিরে উপস্থিত হয়ে শহরের বাইরের এক দুইজন দর্শকের দেখা পান। এদেরই একজন দক্ষিণ সুনামগঞ্জের শত্রুমর্দন গ্রামের মিনু দেবনাথ। সাথে তার মেয়ে। তিনি বললেন, ‘সকাল বেলাই আসার জন্য ঠিক করেছিলাম। কিন্তু বর্ষার মতো অবিরল বর্ষণের কারণে বাড়ি থেকে বেরোতে দেরি হয়ে গেছে। শহরে এসেই এখানে এসেছি প্রথম। এখান থেকে নতুন পাড়ার পূজাগুলো দেখে সন্ধ্যার আগে আবার বাড়ি ফিরে যাব। যদি বৃষ্টি না থাকত তাহলে রাত পর্যন্ত থেকে ঘুরে ঘুরে সবগুলো পূজা দেখতাম।’ এসময়ই ম-পে ঢুকছিলেন একটি পরিবার, তারা সিএনজি থেকে নেমেছেন। কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম কোত্থেকে আসা হয়েছে। দলের সকলেই মহিলা। একজন বললেন- ‘বিশ্বম্ভরপুর থেকে’। নাম জিজ্ঞেস করতে বললেন, ‘মনিমালা’। মনিমালা বললেন, ‘আমরা আজ সকাল থেকেই বেরিয়েছি। আজ সারা দিনের জন্য সিএনজি নিয়েছি। দুপুর ১২ টা পর্যন্ত হাজং গ্রাম ও জনতাবাজারের পূজা দেখেছি। পলাশের পূজা দেখে এখন শহরে এসেছি। নবীনগর ও ষোলঘরের পুজো দেখে এখানে এসেছি। এখান থেকে নতুনপাড়ার পুজো দেখে বাড়ি ফিরব আমরা।’ সৌখিন ভক্ত বটে এই দলটি, ভাবলাম মনে মনে।
হাছননগর দুর্গামন্দির থেকে বেরিয়ে আসলাম কালিবাড়ি নাটমন্দিরের পুজোয়। সেখানে তখনও প্রসাদ বিতরণ চলছিল। অনেকেই প্রসাদ নিচ্ছিলেন। বেশির ভাগই শহর ও আশপাশের। খিচুরি দেয়া হচ্ছিল ওখানে। খিচুরি নিয়ে খাওয়া শুরু করে অনেকেই মুখ কুচকাচ্ছিলেন। ডাল সিদ্ধ হয় নাই নাকি। পূজা কমিটির লোকজন ডালের দোকানদারের উপর দোষ চাপাচ্ছিলেন। ওখানে কারও সাথে কথা না বলে চলে আসলাম বাঁধনপাড়া ম-পে। তখন সন্ধ্যা হয় হয় । ম-পের সামনেই দেখা একজন শিক্ষিকার সাথে।  দুই মেয়েকে নিয়ে পুজো দেখতে বেরিয়েছেন তিনি। বললেন, ‘আর বলবেন না ভাই। বৃষ্টি শত্রুতা শুরু করেছে। কত নতুন নতুন শাড়ি কিনেছিলাম। কিছু পড়া হয়েছে। কয়েকটি পড়া হয়নি। ভেবেছিলাম না পড়া পোশাকগুলো আজ সকাল-বিকাল-রাতে পড়ব। কিন্তু বলুন তো এমন বৃষ্টিতে নতুন পোশাক পড়ে কোন আনন্দ আছে?’  আমিও সায় দিলাম। বললাম, ঠিক বলেছেন। এই নবমীতেই যদি সুন্দর পোশাক পড়তে না পারলেন তাহলে ওগুলো কেনার স্বার্থকতা কোথায়। তিনি খুশি হলেন। তার মুচকি হাসি দেখে বুঝলাম। ম-পের ভিতরে আর ঢুকলাম না। শহরের সবগুলো মন্দিরে একবার করে ঢু মারতে হবে কিনা প্রতিবেদনটির পূর্ণতার জন্য। বিকাল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত ঘুরা হলো উত্তর নতুনপাড়া সার্বজনিন দুর্গাম-প, দক্ষিণ নতুনপাড়া সেবকসংঘ পুজাম-প, পূর্ব নতুনপাড়া সার্বজনিন পূজাম-প। কোথাও তেমন দর্শনার্থীর দেখা মেলেনি।
তবে সন্ধ্যার পর সবগুলো ম-পেই দর্শকদের ভিড় কিছুটা বাড়তে দেখা যায়। যেসব মন্দিরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা হয়েছিল সেগুলোতে অনুষ্ঠান চলাকালীন প্রচুর দর্শক সমাগম লক্ষ্য করা গেছে। দেবীর উদ্দেশে আরতি নিবেদনের সময় ছেলে-ছুকরোদের হৈ-হুল্লুর আর নাচানাচি সবগুলো পুজোম-পকেই উৎসবের রঙে রাঙ্গিয়ে দিয়েছিল। এদিন শহরের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন ম-প পরিদর্শন করে পূজারি ও ভক্তদের সাথে সম্প্রীতি বিনিময় করেছেন।  সব মিলিয়ে দিনের বৃষ্টির যে নিরানন্দ পরিবেশ ছিল রাতে তার অনেকটাই কেটে যাওয়ার লক্ষণ দেখেছিলাম। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আজ চোখের অশ্রুতে দেবী দুর্গাকে মর্ত্য থেকে বিদায় জানাবেন। শনিবার দিনটিও যদি বৃষ্টিসিক্ত থাকে তাহলেই পূর্ণতা, বৃষ্টিরও স্বার্থকতা।

  • [১]