বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জে ২০ দিন আগে যোগদান করা সিভিল সার্জনকে বদলি এবং নতুন আরেকজন সিভিল সার্জনের যোগদান নিয়ে বুধ ও বৃহস্পতিবার শহরের সর্বত্র ব্যাপক আলোচনা ছিল। বদলি করা সিভিল সার্জন সৎ কর্মকর্তা ছিলেন, একটি দুর্নীতিবাজ সি-িকেট তাঁকে বদলি করিয়েছে এমন দাবী করে বৃহস্পতিবার শহরে মানববন্ধনও হয়েছে। যোগদানের ২০ দিনের মাথায় বদলি হওয়া সিভিল সার্জন ডা. তউহীদ আহমেদ বৃহস্পতিবার বেলা ২ টায় দায়িত্ব হস্তান্তর করে সুনামগঞ্জ ছেড়েছেন। তাঁকে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন হিসাবে পদায়ন করা হয়েছে।
গেল মাসের ১০ জানুয়ারি সুনামগঞ্জে সিভিল সার্জন হিসাবে যোগদান করেন ডা. তউহীদ আহমেদ। যোগদানের পর বিভিন্ন সভা-সমাবেশে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের ইন্টারভিউ দিয়ে তিনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানোন্ননের জন্য ডাক্তারদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতি রোধে তাঁর জিরো টলারেন্সের কথা জানান।
এরমধ্যেই মঙ্গলবার বিকালে তাঁর বদলির আদেশ হয় মৌলভীবাজার জেলায়। বুধবার বিষয়টি শহরের লোকজনের মধ্যে জানাজানি হলে অনেকেই ক্ষুব্ধ হন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে পোস্ট দিয়ে দাবি করেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হওয়ায়, দুর্নীতিবাজ সি-িকেটই এই সিভিল সার্জনকে থাকতে দেয়নি।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মচারী জানান, বৃহস্পতিবার ডা. তউহীদ আহমেদের বদলীর আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে দুটি মানববন্ধন হওয়ায় তাঁকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন পদস্ত কর্মকর্তা মুঠোফোনে শাসিয়েছেন, ‘বলেছেন তুমিই মানববন্ধন করাচ্ছ, আজকের মধ্যে তুমি দায়িত্ব হস্তান্তর কর। পরে দুপুর ২ টায় তিনি দায়িত্ব হস্তান্তর করে সুনামগঞ্জ ছেড়ে চলে যান।’
ডা. তউহীদ আহমেদ এ প্রতিবেদককে বলেন, আমি সরকারি কর্মচারী এবং সরকারের কর্মী। আমি চাই না, আমার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিব্রতবোধ করেন। এজন্য দ্রুত দায়িত্ব দিয়েছি।
দুর্নীতিবাজ সি-িকেট কি যোগদানের ২০ দিনের মাথায় আপনার বদলী করিয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. তউহীদ বলেন, স্পর্শকাতর বিষয় এটি, মন্তব্য করতে চাই না। আমি মনে করছি, আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ মনে করেছিলেন সুনামগঞ্জে কাজ করলে ভাল হবে তাই সুনামগঞ্জে দিয়েছিলেন, এখন মনে করেছেন মৌলভীবাজারে যাওয়া প্রয়োজন তাই সেখানে পাঠাচ্ছেন।
সুনামগঞ্জ বিএমএ’র সাধারণ সম্পাদক ডা. নুরুল ইসলাম জানালেন, ডা. তউহীদকে ২০ দিনের মাথায় বদলীর কারণে আমরা হতাশ। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মানোন্নয়নে তাঁর মতো সৎ কর্মকর্তার পদায়ন জরুরি।
সুনামগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান মিসবাহ্ বললেন, মাত্র ২০দিন আগে ডা. তাওহীদ সুনামগঞ্জে যোগদান করেন। তিনি যোগদানের পর হাসপাতালে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ শুরু করেন। ঘোষণা দেন তিনি হারাম উপার্জন করবেন না। হঠাৎ করে মঙ্গলবার তাকে মৌলভীবাজারে বদলী করা হয়। তার স্থলে পদায়ন করা হয় ডা. শামসুদ্দিন নামে একজনকে। তিনি জগন্নাথপুর উপজেলায় এর আগে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে অন্য জেলায় সিভিল সার্জন পদে নিয়োগ পান তিনি। জগন্নাথপুর দীর্ঘদিন থাকায় মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী জনাব এম এ মান্নান’এর ডিও লেটার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেন তাকে সুনামগঞ্জে সিভিল সার্জন হিসেবে পদায়নের জন্য। কিন্তু মন্ত্রনালয় ডা. তউহীদকে সুনামগঞ্জে পদায়ন করেন। ডা. তউহীদ সুনামগঞ্জে পদায়নের পর কয়েকদিনের কাজে মানুষের আস্থা তৈরি করেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ে ডা. শামসউদ্দিনের পক্ষে মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী’র ডিও লেটার থাকায় আকস্মিকভাবে তাকে সুনামগঞ্জে পদায়ন এবং ডা.তউহীদকে মৌলভীবাজার বদলী করা হয়। তার বদলীর খবরে সুনামগঞ্জ থেকে অনেকে আমার সাথে যোগাযোগ করেন। স্বল্পদিনের ভেতরে তার বদলীর সংবাদ শুনে আমিও আশ্চর্য হই। সুনামগঞ্জের সাংবাদিকসহ অনেকে আমার সাথে যোগাযোগ করে ডা.তউহীদের বদলী বাতিলের উদ্যোগ নেয়ার জন্য বলেন। আমি আজকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলি। মন্ত্রী আমাকে বলেন, পরিকল্পনামন্ত্রীর ডিও লেটারকে সম্মান জানিয়ে তিনি ডা. শামসউদ্দীনকে সুনামগঞ্জে পদায়ন করেছেন। বদলী বাতিল করতে হলে মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রীর সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি জানান, মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রীর সাথে তিনি এই বিষয়ে কথা বলেছেন। সুনামগঞ্জবাসীর দাবী তাকে অবগত করেছেন। ডা. তউহীদ’এর বদলী বাতিলে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করেছেন। মাননীয় পরিকল্পনামন্ত্রী তাঁকে জানিয়েছেন, আগামী সোমবার তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলবেন।
পরিকল্পনামন্ত্রী ও সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য এমএ মান্নান বলেন, ডা. তউহীদকে পদায়নের ২ মাস আগে ডা. শামছুদ্দিনকে আমি এখানে পদায়নের জন্য ২ বার ডিও লেটার দিয়েছিলাম। ডা. তউহীদকে পদায়ন করার পর এই বিষয়ে আমি আর কিছুই কাউকে বলি নি। আমি নির্মাণাধীন বঙ্গবন্ধু মেডিকেল কলেজে পিডি পদায়নের জন্য বলেছি। সোমবার ঢাকায় ফিরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী’র সঙ্গে ডা. তউহীদ ও ডা. শামছুদ্দিনের বিষয়ে কথা বলবো আমি।