- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি/ অভিভাবকদের উদ্বেগ দূর করতে হবে রাজনীতিবিদদেরই

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ছাত্র রাজনীতি শুরু নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকদের তরফ থেকে গভীর উদ্বেগের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। শনিবারের দৈনিক সমকালে প্রকাশিত ‘ছাত্র রাজনীতি ভীতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’ শিরোনামের প্রধান সংবাদ থেকে জানা যায় অভিভাবকদের পক্ষ থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি শুরু না করার জন্য অন্তত ১০ হাজার ই-মেইল উপাচার্যদের কাছে জমা পড়েছে। গত ৩ সেপ্টেম্বর সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সম্মেলন হওয়ার পর থেকে এই উদ্বেগ ব্যাপকভাবে বেড়েছে । শুধু অভিভাবকরাই নন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই চান না তাদের ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি শুরু হোক। বর্তমানে দেশে প্রায় ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। মূলত এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীকে সচেতনভাবে রাজনীতির বাইরে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। ছাত্ররাজনীতির প্রতি এই ব্যাপক নেতিবাচক মনোভাবের কারণ কী? সমাজবিজ্ঞান মতে আমাদের জীবনাচরণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীক কোনো কাজই তো রাজনীতির বাইরে নয়। আমরা যে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে বাস করি তা রাজনীতি কর্তৃক নির্ধারিত। শিক্ষিত জনগোষ্ঠী যখন রাজনীতিবিমুখ হয়ে যান তখন পুরো কাঠামোটির দুর্বলতার বিষয়টি সকলের সামনে চলে আসে। সুস্থ রাজনীতির অভাব অসুস্থ চর্চার দিকে ঠেলে দেয়, বেশ কিছু তরুণ মেধাবী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর জঙ্গিবাদে জড়িত হয়ে পড়ার তথ্য এর প্রমাণ।
বর্তমান সময়ে ছাত্র রাজনীতির নামে বিশেষত সরকারি দলের ছাত্র অঙ্গ সংগঠনের রাজনীতি বহির্ভূত বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অধিকতর অংশগ্রহণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকিছুকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের রাখার মতো বাস্তবতা আমাদের চোখের সামনে। মূলত এখন বামপন্থী ছোট সাংগঠনিক শক্তির কয়েকটি ছাত্র সংগঠন ব্যতীত মূল ধারার ছাত্র সংগঠনগুলো আর রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে নেই। ফলে ছাত্র রাজনীতির প্রধান ধারাটি দেখে দেখে সকলের মধ্যে ছাত্র রাজনীতি সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক ধারনা তৈরি হয়েছে। এই প্রবণতা একটি দেশের জন্য ভীষণ রকমের ক্ষতিকারক। ছাত্র রাজনীতির উজ্জ্বল অধ্যায় আমরা ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে দেখেছি। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগ্রামের দীর্ঘপথ পেরিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন স্বৈরাচারী সরকারের গণবিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে ছাত্র সমাজের গৌরবজনক সংগ্রামী ভূমিকা জাতীয় ইতিহাসের অংশ। এত গৌরবের ছাত্র রাজনীতিকে আজ দুর্বৃত্তায়ন আর বাণিজ্যিকিকরণের অন্ধকূপে নিক্ষেপ করার যে বাস্তবতা তা অস্বীকার করার উপায় নেই। আর এ কারণেই ছাত্র রাজনীতির প্রতি এই বিতৃষ্ণা। অভিভাবকরা সন্তানদের উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান। সেখানে সন্ত্রাসী কর্মকা-, টেন্ডারবাজি বা বেলেল্লাপনা করে নষ্ট হতে নয়। অভিভাবকদের এই উদ্বেগ দেশের মূল রাজনৈতিক ধারাকে বিবেচনায় নিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিজেদের ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকা- দেখতে চাইবেন না প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভয়ে। সুস্থ ধারার ছাত্র রাজনীতি চালু থাকলে আজ শিক্ষা ক্ষেত্রে যে চরম নৈরাজ্যকর অবস্থা তার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিবাদ জারি থাকতো। ছাত্র রাজনীতির সেই সুস্থ ধারা না থাকার কারণে এর সুযোগ নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রতিবাদহীন ক্যাম্পাসে নিশ্চিন্তে শিক্ষা-বাণিজ্য করার ইচ্ছা পোষন করছেন।
সুস্থ ধারার ছাত্র রাজনীতি ছাড়া যেমন জাতীয় ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি তৈরি হতে পারে না তেমনি অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর একটি বড় শক্তিও নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। সুতরাং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সুস্থ ধারার ছাত্র রাজনীতি করার মৌলিক অধিকারের বিরোধিতা করার যে ভীতি আজ অভিভাবকদের মধ্যে শুরু হয়েছে, মূল ধারার রাজনৈতিক ব্যক্তিদের তা দূর করার দায়িত্ব নিতে হবে। ছাত্র রাজনীতিতে বিরাজমান মন্দ প্রপঞ্চগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে এবং রাজনৈতিক ও আদর্শিক অঙ্গীকারের প্রতি দায়বদ্ধ থাকলে, আমরা মনে করি ছাত্র রাজনীতির অতীত গৌরবধারা পুনরায় ফিরে আসবে। আর তখন রাজনীতি ভয়ে কাতর অভিভাবকদের মন থেকেও বাঘের ভয় দূর হবে।

  • [১]