- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ব্লাস্টের আক্রমনে নিঃস্ব অনেক কৃষক

সোহানুর রহমান সোহান
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওরের কৃষকের সন্তান সাহাব উদ্দিন। বয়োজ্যেষ্ঠ বাবাকে ঘরে রেখে ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হওয়া নিজেদের জমির ধান দেখাতে এসেছেন তিনি। জমির সব ধান রোগে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে শুনলে কৃষক বাবা হার্ট এ্যাটাক করবেন বলে জানান তিনি। তাই এখনো বাবাকে জানতে দেন নি। ধার দেনা করে এবার বোরো মৌসুমে ১৪ কেয়ার জমিতে ২৮ জাতের ধান রোপণ করেছিলেন সাহাব উদ্দিন। ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৪ কেয়ারের সবটুকু জমির ধানই নষ্ট হয়ে গেছে। এখন কীভাবে পুরো বছরের খাদ্যের যোগান হবে এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তার।
সাহাব উদ্দিন বলেন, ধানে ফুল আসার পর দুধ হয়। দুধ থেকে ধান হয়। আমার সব ধান দুধ থাকতেই নষ্ট হয়ে গেছে। পুরো ১৪ কেয়ারের ১৪ কেয়ার জমি নষ্ট হয়ে গেছে। জমির ধান রোপন করতে প্রত্যেক কেয়ারে ৭-৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। আমাদের সারাবছরের লালিত স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে গেল। ফসলের উপর নির্ভর করে আমাদের পরিবারের জীবনযাপন। এতো বড় ক্ষতি সামলানোর মতো সামর্থ্য আমাদের নেই।
শুধু সাহাব উদ্দিন নয়। জেলার তাহিরপুর, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, শাল্লা সহ বেশ কয়েক উপজেলার হাওরে দেখা দিয়েছে ব্লাস্ট রোগের সংক্রমণ। যারা ২৮ জাতের ধান চাষ করেছেন, তাদের ধান সংক্রমিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি। ২৮ এর পাশাপাশি অন্যান্য জাতেও কিছুটা সংক্রমিত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ছত্রাক জনিত এই ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধান। আর কিছুদিন পরেই ফুল থেকে ধান হয়ে কৃষকের ঘরে উঠতো সোনালী ফসল। কিন্তু তার আগে ফুল থাকতেই নষ্ট হয়ে সাদা হয়ে গেছে কৃষকের সোনালী ধান। মানুষ দূরে থাক, গরু ছাগলকেও নষ্ট হওয়া এসব ধান খাওয়ানো যাবে না বলে জানান চাষিরা। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পুরো বছর কিভাবে চলবে সেই দুশ্চিন্তা এখন ভর করেছে তাদের।
ঢুপিকোনা গ্রামের কুমোদ বিশ্বাস বলেন, পর পর দু বছর ধানের মাইর খেলাম। একটা ধানও এবার বাঁচাতে পারলাম না। শুধু আমার নয়, সবারই কম বেশ ধান নষ্ট হয়েছে। কি রোগ আসলো বুঝতে পারতেছি না। কৃষি বিভাগ থেকেও ঠিক মতো পরামর্শ পাই না। তাদের সাথে নিজ থেকে যোগাযোগ করে শুধু ঔষধের নাম পেয়েছি। কেনা লাগছে নিজের টাকায়। তাতেও কোন কাজ হয় নি। সকল ধান মরে শেষ। বাচ্চা কাচ্চারে নিয়ে কিভাবে পুরো বছর কাটবে জানি না।
একই গ্রামের মো. জালাল উদ্দিন বলেন, বর্তমানে আমরার বাঁচা-মরা সমান, কৃষি ক্ষেত করে যদি চলতে না পারি, তাহলে চলার আর কোন পথ নাই। একটা জমি করতে অনেক খরচ। এতো টাকা খরচ করে বৈশাখে আমরা হাসিমুখে ধান ঘরে তোলার কথা ছিল।
বেতগঞ্জ গ্রামের সুবল সরকার বললেন, সবুজ ধান নষ্ট হয়ে সাদা হয়ে গেছে। ধানের বাহিরে শুধু চিটা ভেতরে কিছুই নেই। এমন অবস্থা যে মানুষ দূরে থাক গরু ছাগলও এই ধান খাবে না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সুনামগঞ্জের উপ পরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বললেন, আমাদের পরামর্শ অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় ব্রি-ধান ২৮ ও ২৯ এর তুলনায় ব্রি-ধান ৮৮-৮৯ ও ৯২ এর চাষাবাদ অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তারপরও যারা ২৮ ধান রোপন করেছে তাদের কিছু কিছু জমিতে ব্লাস্টের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। আমরা তাদের ছত্রাক নাশক প্রয়োগের পরামর্শ দিয়েছি। যারা আমাদের পরামর্শ শুনেছেন তাদের জমিতে ব্লাস্টের আক্রমণ নেই। যে সমস্ত কৃষক ভাইয়েরা আমাদের পরামর্শ গ্রহণ করেন নি তাদের জমিতে কিছু আক্রমণ রয়ে গেছে যা অতি নগন্য এবং আমাদের ফসলের জন্য তেমন আশঙ্কা নেই। ব্লাস্টের কারণে জেলায় মোট ৭ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাঙ্খিত লক্ষমাত্রা অর্জনে এটি বাধা হবে না বলেও জানান তিনি।
এদিকে পর পর দু বছর জেলার কৃষকরা একই সমস্যায় পড়ছেন উল্লেখ করে কৃষক নেতা ও জেলা সিপিবি’র সাবেক সভাপতি চিত্তরঞ্জন দাশ বলেন, কতটুকু ক্ষতি হলে সেটাকে ক্ষতি বলবে কৃষি বিভাগ। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহযোগিতা করতে সরকারের প্রতি আহবান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এটি অপূরণীয় ক্ষতি। বন্যার পানিতে গত বছর যে ক্ষতি করতে পারে নাই, ব্লাস্টে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করেছে। কৃষকের নাজেহাল অবস্থা হয়েছে। বার বার যদি ব্লাস্টের আক্রমণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে আমাদের কৃষি মন্ত্রণালয়, কৃষি অফিস কি করছে। আমি নিজেই দেখে আসছি ধর্মপাশা মধ্যনগরে ব্লাস্টের আক্রমণ। যত দিন যাবে এটার আক্রমণ বাড়বে।

  • [১]