তাহিরপুরের বড়গোপটিলাটি পর্যটকদের কাছে বারেকের টিলা বা বারিক্যার টিলা নামে পরিচিত। নাম পরিবর্তনের এই বিষয়টি সাংস্কৃতিক অপহরণ প্রক্রিয়ার এক নিদর্শন। যেখানে সমস্ত সরকারি কাগজপত্র ও স্থানীয় মানুষজনের কাছে এই টিলা বড়গোপটিলা নামেই পরিচিত সেখানে কীভাবে লোকমুখে এটি বারিক্যার টিলা হয়ে গেলো সে এক আশ্চর্য বিষয় বটে। তবে টিলার নাম পরিবর্তনের বিষয়টি আমাদের আজকের আলোচ্য বিষয় নয়। বরং ওই টিলায় বসবাসকারী দুই শ’ মানুষের দুর্ভোগ যন্ত্রণার মাত্র একটি দিককে তুলে ধরাই ইচ্ছা। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ ফিচারে বড়গোপটিলার অধিবাসীদের পানির সংকটের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আমরা বাইরে থেকে যারা বেড়াতে এই টিলায় যাই তখন ক্ষণিকের আনন্দে মেতে উঠি। টিলার চড়াই বেয়ে উপরে উঠে টিলার বিস্তৃত সৌন্দর্য, বনজ রূপময়তা, পিকনিক স্পট, টিলা থেকে নীচে দৃশ্যমান জাদুকাটা নদীর মোহনীয় রূপ ইত্যাদি দেখে আমরা বিমোহিত হই। ক্ষণিকের আনন্দভ্রমণ শেষে যে যার নিজস্ব জায়গায় ফিরে আসি। ক্ষণিকের দেখা এই আনন্দের পিছনে ওই টিলার বাসিন্দাদের সার্বক্ষণিক কষ্টের কথা আমরা কিছুই জানতে পারি না। জানতে চাই না। কারণ আমরা কষ্ট নয় আনন্দ করতে ওখানে যাই। তাই কষ্ট ও যন্ত্রণার সামান্য অনুভবও যাতে আমাদের কাউকে সামান্য স্পর্শ না করতে পারে সেজন্য সচেতন থাকি। টিলার প্রান্তিক বাসিন্দারা পর্যটকদের এমন আনন্দ হুল্লুড়ের মাঝখানে নিজেদের কঠিন সমস্যা মোকাবিলা করেই কোনো মতে জীবনকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে নিয়োজিত থাকেন।
বড়গোপটিলায় বসতি স্থাপিত হয় ১৯৪২ সনে। ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের বাস ছিলো তখন। এখন ৩৩ টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ১০টি বাঙালি পরিবার বসবাস করেন ওখানে। টিলায় পানির কোনো ব্যবস্থা নেই। ওখানে টিউবওয়েল স্থাপন করা হয়েছিলো একটি ২০০৮ সনে। শুরু থেকেই অকেজো টিউবওয়েলটি। টিলার পাশর্^বর্তী গারো পাহাড় কঠিন শিলাখ- দ্বারা গঠিত। ধারণা করা হয় বড়গোপটিলার নীচেও আছে পাথর। পাথুরে ভূমিতে সহজে পাইপ ঢুকানো যায় না। যে যান্ত্রিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করে পাথর কেটে পাইপ ঢুকাতে হয় সেই ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া বোধ করি অনুসরণ করা হয়নি। টিলার বাসিন্দারা পানি আনেন ৫০০ ফুট নীচের সমতল কিংবা পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে। যারা নীচ থেকে পানি সংগ্রহ করতে পারেন না তাদের প্রতি কলসি ২০ টাকা ও প্রতি ড্রাম ১ শ’ টাকায় কিনতে হয়। টিলার সকল বাসিন্দাই আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল শ্রেণির। টাকা দিয়ে পানি কেনা কিংবা সমতল থেকে পানি সংগ্রহ করে ৫০০ ফুট উঁচুতে উঠা; দুইটিই তাদের জন্য ভীষণ কষ্টকর। টিলার বাসিন্দারা এই কষ্ট সয়েই ১৯৪২ সন থেকে এখানে রয়েছেন। এই কষ্ট দূর করতে সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগও নেই। দুর্ভাগা টিলাবাসীরা।
সমস্যা যত কঠিনই হোক তার কোনো না কোনো সমাধান থাকেই। টিলাতে সাধারণ প্রক্রিয়ায় যেহেতু টিউবওয়েল বসানো যায় না সেহেতু ওখানে বিশেষ প্রক্রিয়ায় পাথুরে স্তর কেটে পাইপ বসানোর প্রযুক্তি ব্যবহার করে টিউবওয়েল স্থ্পান করতে হবে। এটি সম্ভব না হলে টিলার নীচে বসিয়ে বৈদ্যুতিক শক্তি ব্যবহার করে উপরে পানি তুলার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। এজন্য টিলায় স্থাপন করতে হবে জলাধার। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ বর্তমান বাংলাদেশে একটি টিলায় পানির ব্যবস্থা করা যায় না এমন চিন্তা একেবারেই হাস্যকর।
পানির অভাবে বড়গোপটিলাবাসী নোংরা ও দূষিত পানি ব্যবহার করে অসুস্থ হওয়ার চরম ঝুঁকিতে বসবাস করছেন। ওই টিলার প্রান্তিক মানুষের পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের জন্য আমরা তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।