- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভরাটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও জনজীবন

সাঈদুর রহমান আসাদ
মধ্যনগর উপজেলায় সুমেশ^রী ও গোমাই নদীতে প্রতিবছর পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বালি ও পলি পড়ে জেগেছে চর। এতে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। নাব্যতা হারিয়েছে একসময়ের প্রমত্তা এই দুই নদী। পাহাড়ি ঢলে অকাল বন্যার শিকার হচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ, ভাসছে ফসলি জমি। এছাড়াও নদী শুকিয়ে যাওয়ায় জমিতে সেচ সংকটসহ কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পড়েছেন লোকসানে। এসবকে সুনামগঞ্জের লোকগান, জারি—সারিগান কমে যাওয়ারও কারণ মনে করছেন অনেকে।
নদীতে চর পড়ে নদীর মাঝ দিয়ে হয়েছে সড়ক। সেখান দিয়ে হেঁটে পারাপার হচ্ছেন মানুষ। মধ্যনগর উপজেলার গোমাই নদীর এমন করুণ অবস্থা ২৫ বছর আগে থেকেই। এ কারণে পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়েছে নদী। পাহাড়ি ঢলে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ডুবে ক্ষতির মুখে পড়েন কৃষকরা। এছাড়াও নদীতে চর পড়ায় বছরের বেশিরভাগ সময় নৌযোগাযোগ বন্ধ থাকে। তাতে লোকসানের মুখে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। এই উপজেলার সঙ্গে জেলার সরাসরি সড়ক পথ না থাকার কারণে যুগযুগ ধরেই নদী পথই ভরসা। নদী ভরাট হওয়ায় ধান চাল পরিবহনে সংকটে পড়েছেন কৃষকরা।
মধ্যনগরের কৃষক বরুণ সরকার বললেন, আমাদের সুমেশ^রী নদী বালু পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। একারণে পাহাড়ি ঢল আসলে বেড়িবাঁধ ভেঙে একমাত্র ফসল তলিয়ে যায়। সুমেশ^রী, গোমাই নদী খনন না করলে এই দুঃখ ঘুচবে না। নদী ভরাট হওয়ায় আমরা ন্যায্যমূল্যে ধান বিক্রি করতে পারছি না।
স্থানীয় কৃষক মুহিত কান্তি দে কাজল বললেন, বেড়িবাঁধ নদীর এতোই কাছে যে, প্রতিবছর প্রথম ধাক্কায় বাঁধের মাটি নদীতে চলে আসে। একারণেই নদীতে দিনদিন চর পড়ছে। নদীতে পানির ধারণ ক্ষমতা কমছে। এতে এলাকার ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মধ্যনগর বাজার ধানÑচাল আরৎদার সমিতির সভাপতি মো. জহিরুল হক বললেন, মধ্যনগর বাজার থেকে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৩৫ লাখ মণ ধান বিভিন্ন জায়গায় রপ্তানি হয়। বিভিন্ন এলাকা থেকে আমরা এই ধান সংগ্রহ করি। নদীতে পানি না থাকার কারণে কমদামে ধান বিক্রি করতে হয়। নদী খনন করার জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে দাবি জানিয়েছি। সুমেশ^রী নদীর শানবাড়ি থেকে মধ্যনগর হয়ে কলমাকান্দা পর্যন্ত খনন করা জরুরি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুমেশ^রী নদী নেত্রকোণা জেলার দুর্গাপুর থেকে উৎপত্তি। দুর্গাপুর থেকে একটি শাখা বারহাট্টা উপজেলার ঠাকুরাকোণা হয়ে আটপাড়া উপজেলার দিকে চলে গেছে। বারহাট্টা উপজেলার ঠাকুরাকোণার তাইত্তর নামক স্থান থেকে একটি শাখা কংস নামে যাত্রাবাড়ি থেকে মোহনগঞ্জ—ধর্মপাশা হয়ে সুখাইড় রাজাপুরের পাশ দিয়ে গাগলাজোড় বাজারের কাছে ধনু নদীতে সংযুক্ত হয়েছে। আরেকটি শাখা নেত্রকোণা জেলার কলমাকান্দা বাজারের পাশ দিয়ে গলহা, নিয়ামতপুর, কেশবপুর হয়ে উবধাখালী নামে গোরাডুবা হাওরের মাঝ সীমানা বরাবর প্রবাহিত হয়ে মধ্যনগর বাজারের পাশে গোমাই নদীতে সংযুক্ত হয়েছে।
গোমাই নদী বারহাট্টা উপজেলার যাত্রাবাড়ি বাজারের কাছে কংস নদীর একটি শাখা মধ্যনগরের উবধাখালীতে যুক্ত হয়েছে। উবধাখালী নদী মধ্যনগর থেকে উত্তরদিকে প্রবাহিত হয়ে কাইতকান্দার পাশে মূল সুমেশ^রী নদীতে যুক্ত হয়ে পূর্বদিকে দুগনই আবিদনগরের পাশ ঘেঁষে তেলিগাঁও সরস্বতীপুর হয়ে শানবাড়িতে উত্তরদিক থেকে আসা পাটলাই নদীর প্রবাহের সাথে যুক্ত হয়েছে। পরে এই নদী গোলকপুরের দক্ষিণে, সুনামগঞ্জ—জামালগঞ্জ আসা সুরমার প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দক্ষিণে ধনু নদীতে পড়েছে। এই ধনু নদী সুনামগঞ্জের জেলার মূল প্রবাহ মেঘনাতে মিলিত হয়েছে।
আর এই সুমেশ^রী ও গোমাই নদী নাব্যতা হারানোর কারণে শুষ্কু মৌসুমে নদীর অনেক অংশই শুকিয়ে যায়। এতে পাহাড়ি ঢলে প্লাবিত হয় নিচু অঞ্চল। গোমাই নদী যখন সচল ছিলো, তখন এরকম পরিস্থিতির তৈরি হতো না।
পাইকরহাটি ইউনিয়নের সুনই গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহজাহান খান নয়ন বললেন, এই নদী খনন হলে এলাকার মানুষের অনেক সমস্যা মিটে যাবে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় কারণে এলাকার চাষীরা জমিতে পানি দিতে অনেক কষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় বাঁধ ভেঙে জমি তলিয়েও যায়।
হাওরের কৃষি ও কৃষক রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন তালুকদার বললেন, আমাদের পূর্ব উত্তরের পাহাড়ের বৃষ্টির পানি নদী দিয়ে নিচে নামে। নদী ভরাট হওয়ার কারণে মেঘালয় থেকে নামা পানি বাঁধার সম্মুখিন হয়। যেখানে বাধার সম্মুখিন হয় পানি, সেখান থেকে ফুলতে থাকে। একারণেই হাওর ডুবে যায়।
তিনি বলেন, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা বলেছেন এই গোমাই নদী যখন সচল ছিলো, উত্তরের পানিটা আসলে কংস নদীতে সহজেই চলে যেতো। এই পানি কংস হয়ে গাগলা জুড় হয়ে নিচে নেমে যেতো। এভাবেই আমাদের হাওরগুলো নিরাপদ থাকতো।
নদীমাতৃক বাংলাদেশকে কেন্দ্র করেই লোকগান, জারি— সারির সৃষ্টি হয়েছে। ভাটির জনপদ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জে জন্ম নিয়েছেন অসংখ্য বাউল সাধক। তাঁদের সৃষ্টিতে এই নদীগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নদীর সঙ্গে ভাটি এলাকার সংস্কৃতি মিশে আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদী সংকটে থাকার কারণে লোক, জারি, সারি গান কমে এসেছে।
হাওর গবেষক সজল কান্তি সরকার বললেন, কৃষি প্রাণ বৈচিত্র্যের অন্যন্য জনপদ হাওরাঞ্চল। এখানে প্রকৃতি সম্পদে পরিপূর্ণ। এই হাওরাঞ্চলের সভ্যতা গড়ে উঠেছে নদী কেন্দ্রীক। এই নদীকে কেন্দ্র করেই হাওরের কৃষি—প্রাণ বৈচিত্র্য। এই কৃষি—প্রাণ বৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হলে নদীকে রক্ষা করতে হবে।
তিনি বলেন, এই নদীগুলো গারো ও মেঘালয় পাহাড় থেকে বয়ে একদম সাগরে মিশেছে। নদীর প্রবাহ কমছে, কারণ এর নাব্যতা দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে। এরজন্য দায়ী অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ, সড়ক পথ নির্মাণ। এগুলো খুব পরিকল্পনা করে করতে হবে। নদী না বাঁচলে হাওর বাঁচবে না। আর হাওর না বাঁচলে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, মিঠাপানি, মাছের স্বর্গ রাজ্য নষ্ট হয়ে যাবে। তাই নদী খনন জরুরি। তবে নদীকে নদী হিসেবেই খনন করতে হবে। আমরা সম্প্রতি দেখেছি নদীকে খাল হিসেবে খনন করা হচ্ছে। এটা করা যাবে না। নদীতে যে সেতু তৈরি হবে, সেগুলো নদীর নাব্যতাকে বাঁধাগ্রস্ত করছে সেগুলো খতিয়ে দেখে কাজ করতে হবে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বললেন, সুনামগঞ্জে ১৪ টি নদী পুনখনন করা হবে। সে প্রকল্পটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই নদীগুলো খনন করা হলে সুনামগঞ্জসহ আশেপাশের এলাকা আগাম বন্যা থেকে রক্ষা পাবে। তবে খুব তাড়াতাড়ি প্রস্তাবিত এই নদীগুলো খনন করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

  • [১]