বিশেষ প্রতিনিধি
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৮ টি অপরিকল্পিত বড় সেতু হেমন্তে মানুষের উপকারে আসলেও ভরা বর্ষায় ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সেতুগুলোর কারণে নৌপথের যাত্রীদের এক কিলোমিটারের পথ ৫ থেকে ১০ কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়।
জেলার শাল্লা, দিরাই ও তাহিরপুরের দায়িত্বশীল অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গেল ১০ বছরে এক থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সেতুগুলো নির্মিত হয়েছে। হাওর এলাকা সুনামগঞ্জে পানি বাড়লেই আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র এই তিন মাস নৌ যোগাযোগে কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ কতৃর্ক কোটি কোটি ব্যয়ে নির্মিত এই সেতুগুলো।
শাল্লার দাঁড়াইন নদীর উপর মুক্তারপুরের পাশের সেতু, বাহাড়া’র পাশের সেতু, শাল্লা সদরের পাশের সেতু এবং দিরাই শাল্লার মধ্যবর্তী সীমান্তে সুরমার খালের উপর শ্যামারচর গ্রামের ভেতরের সেতু। দিরাই উপজেলার রাজানগরের পাশে মরা সুরমা নদীর উপর সেতু, ভাটিপাড়া গ্রামের পাশে পিঠাই নদীর উপর সেতু, তাহিরপুরের আনোয়ারপুরে রক্তি নদীর উপর সেতু এবং থানার সামনে বৌলাই নদীর উপর সেতু’র উচ্চতা আরও বেশি হওয়া জরুরি ছিল মনে করছেন এলাকাবাসী।
শাল্লা প্রেসক্লাবের সভাপতি পিসি দাস বললেন, হাওরাঞ্চলের জনপদ শাল্লায় এখনো মানুষের যোগাযোগের প্রধান বাহন নৌকা। একমাত্র ফসল বোরো ধান বাড়ির ঘাট থেকে ব্যাপারীর নৌকা তুলে দিতে পারলে ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায়। নদী কেন্দ্রীক যাতায়াতই ভরসা এখনো এই অঞ্চলের মানুষের। শাল্লা সদরের পাশে দাড়াইন নদীর উপরেও গিলটিয়া খালের উপরে হওয়া সেতুর উচ্চতা আরও কমপক্ষে ৪—৫ ফুট বেশি হওয়া প্রয়োজন ছিল। পানি বাড়লেই ভৈরব—আশুগঞ্জ থেকে আসা ধান ব্যাপারীর নৌকা ভেতরে ঢুকতে পারে না। ছায়ার হাওরের পশ্চিমপাড় মামুদনগর থেকে চার কিলোমিটার দূরের আঙ্গাউড়া আসতে হলে ৮ কিলোমিটার ঘুরে জয়পুর, নিয়ামতপুর, কাশিপুর হয়ে গিলটিয়া খাল দিয়ে আসতে হয়। এই ভোগান্তি হচ্ছে সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অদূরদর্শিতার কারণে।
দিরাই উপজেলার শ্যামারচরের বাসিন্দা রাজনীতিবিদ অমর চাঁন দাস বললেন, বর্ষায় হাওরাঞ্চলে বিয়ে সাদী বেশি হয়। কিছু সেতুর জন্য বিয়ের নৌকাকে অনেক ঘুরতে হয়, না হয় বরসহ বরযাত্রীকে নেমে হেঁটে যেতে হয়। শ্যামারচরের সেতু এরমধ্যে একটি। সেতুর নিচ দিয়ে জ্যৈষ্ঠ থেকে আশি^ন মাস পর্যন্ত পশ্চিম দিরাই, জামালগঞ্জ ও ধর্মপাশার নৌযাত্রীরা শাল্লায় যাতায়াত করতে পারেন না।
একই অবস্থা তাহিরপুরের আনোয়ারপুর সেতুতে। বিশাল এই সেতুর উচ্চতা কম হয়েছে দাবি করে, রাজধানী ঢাকার অভিযাত্রীক ট্যুরিজম লিমিটেড’এর নৌ পর্যটন শাখার অপারেশন্স কোর্ডিনেটর ও মহাজনের নাও’এর স্বত্বাধিকারী মাসুক উর রহমান বললেন, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরসহ হাওরাঞ্চলে নৌপর্যটন বিকাশের জন্য উদ্যোক্তারা পর্যটকদের জন্য কেবিন সুবিধাসহ ৫০ টিরও বেশি হাউজবোটের আদলে নৌকা তৈরি করছেন। এই নৌকাগুলো ভরা বর্ষায় আনোয়ারপুর সেতুর নীচ দিয়ে যাতায়াত করতে পারবে কি—না এই নিয়ে শঙ্কা আছে। সেতুটি আরও উঁচু হলে ভালো হত।
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু চৌধুরী বাবুল বললেন, আনোয়ারপুরের পাশের রক্তি নদী দিয়ে বালু, পাথর ও কয়লা বোঝাই শত শত নৌকা—বাল্কহেড প্রতিদিন চলাচল করে। এই সেতুটি দায়সারা—অপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। একই অবস্থা তাহিরপুর উপজেলা সদরের পাশের বৌলাই সেতুরও। এসব সেতু নির্মাণে বিআইডব্লিউটিএসহ সকল কর্তর্ৃপক্ষের সমন্বয় জরুরি ছিল।
সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুব আলম বললেন, আগে নির্মিত কোন কোন সেতুতে বড় নৌ যান চলাচলে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন সেতু নির্মাণের আগে অনেক চিন্তা ভাবনা করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ নৌ—পরিবহন কতৃর্পক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)সহ সকল পক্ষের মতামত নিয়ে সেতু করা হচ্ছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম বললেন, আগের সেতুগুলো নির্মাণের সময় বিআইডব্লিটিএ’র অনুমোদন নেওয়া হয় নি। তিন—চার বছর হয় কঠোরভাবে বিআইডব্লিউটিএ’র পরামর্শ মানা হচ্ছে। সেতু নির্মাণের আগে উচ্চতা নির্ধারণ করে দিচ্ছে বিআইডব্লিউটিএ, এরপর সেই অনুযায়ী কাজ করা হচ্ছে।