বোরো ধান কাটার মৌসুমে শ্রমিক সংকটের বিষয়টি সকলের জানা। বোরো মৌসুমে হাওরের অধিকাংশ ধান একসাথে পাকা শুরু হওয়ায় এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পাকা ধান জমিতে রেখে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত হাওরের ধান কাটা এক সাথে চলতে থাকে। এ জেলায় অন্যান্য মৌসুমের তুলনায় বোরো মৌসুমেই বেশি ধান চাষ করা হয়ে থাকে। তাই বোরো ধান কাটা মৌসুমে শ্রমিক সংকটের বিষয়টি সুবিদিত। আগে বাইরের জেলা থেকে প্রচুর শ্রমিক আসতেন। এখন যদিও কিছু আসেন তবু সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে বিশাল পরিমাণে। বহিরাগত ও স্থানীয় কিছু শ্রমিকই কৃষকদের ভরসা। সরকার কৃষি যান্ত্রিকিকরণের যে লক্ষ্য সাধনের উদ্দেশ্যে কাজ করছেন সেখানে প্রায় ৭৫% হ্রাসকৃত মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়। ধান কাটার মেশিন বা হারভেস্টর এর মধ্যে অন্যতম। সরকারি ভর্তুকি নিয়ে গ্রহণ করা হারভেস্টারগুলো কৃষি ও কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে বলে অভিযোগ আছে। এসব যন্ত্র কীভাবে ব্যবহার করা যাবে বা কৃষকরা এর মাধ্যমে উপকৃত হবেন সে সম্পর্কিত নীতিমালারও ঘাটতি রয়েছে। দেখা যায় প্রভাবশালীরা সরকারি সহায়তার এইসব যন্ত্র স্বল্পমূল্যে কিনে নিয়ে একান্তুই নিজেদের মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন। যা আদৌ হওয়ার কথা নয়। সরকারি ভর্তুকিপ্রাপ্ত উপকরণ যদি সামাজিক মালিকানা বা অধিকারের পরিবর্তে ব্যক্তি বিশেষের বাণিজ্যিক উপকরণ হয়ে উঠে তা হলে প্রচুর পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিয়ে এসব যন্ত্রপাতি সরবরাহ করার মানে কী?
শুক্রবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, হাওরাঞ্চলে ধান কাটতে হারভেস্টার মালিকরা অত্যধিক বেশি টাকা দাবি করছেন। যেখানে শ্রমিক দিয়ে এক কেয়ার ধান কাটার খরচ সর্বোচ্চ এক হাজার পাঁচশত টাকা হয় সেখানে কোথাও কোথাও হারভেস্টার মালিকরা নাকি কেয়ার প্রতি দুই বা আড়াই হাজার টাকা দাবি করছেন। একটি হারভেস্টার দিনে প্রায় ২০ থেকে ২৪ কেয়ার জমির ধান কাটতে সক্ষম। কাজের দ্রুততার কারণে কৃষকদের কাছে এ যন্ত্রটি জনপ্রিয়। কিন্তু অত্যধিক মূল্য চাওয়ার কারণে কৃষকরা বিপাকে পড়েছেন। সংবাদ ভাষ্য অনুসারে হারভেস্টার মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক জানিয়েছেন, হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটতে এক থেকে দেড় হাজার টাকার বেশি না নেয়ার জন্য তারা সকলকে সাংগঠনিকভাবে বলে দিয়েছেন। কৃষকরা জানিয়েছেন একটি হারভেস্টার দিয়ে এক কেয়ার ধান কাটতে পাঁচ থেকে ছয় শ’ টাকার বেশি খরচ হয় না। এই খরচের সাথে মুনাফা যুক্ত করে সর্বোচ্চ ৮ শ’ থেকে এক হাজার টাকার বেশি দাবি করা অযৌক্তিক। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকও হারভেস্টার মালিকদের এক কেয়ার ধান কাটতে দুই বা আড়াই হাজার টাকা দাবি করার বিষয়টিকে অবিচার হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। কৃষকরা তাই সরকারিভাবে হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। আমাদের প্রশ্ন হলো, সরকারি ভর্তুকি মূল্যে সরবরাহকৃত হারভেস্টারের খরচের বিষয়ে কেন সরকারিভাবে নীতিমালা করে দেয়া হচ্ছে না।
যন্ত্রের ব্যবহারের ফলে যেখানে খরচ কমার কথা সেখানে যদি উল্টো বেড়ে যায় তাহলে এই যান্ত্রিকিকরণ অনেকটা অর্থহীন হয়ে পড়ে। ৭৫% সরকারি ভর্তুকি নিয়ে কেনা কৃষি যন্ত্রপাতির এমন ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক ব্যবহারের বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেয়ার মতো নয়। জেলায় এ পর্যন্ত ঠিক কতগুলো হারভেস্টার বিতরণ করা হয়েছে এবং এখন এর কতগুলো সচল রয়েছে তা খতিয়ে দেখা উচিৎ। এই হারভেস্টারগুলো যাতে একেবারেই স্বল্পমূল্যে কৃষকরা ব্যবহার করতে পারেন তার তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আমরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।