বিশেষ প্রতিনিধি, শাল্লার মাউতির বাঁধ থেকে
সুনামগঞ্জের সবচেয়ে বড় হাওর ছায়া হাওরে রোববার সকাল থেকে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকছে। দেখতে দেখতে ডুবে যাচ্ছে কৃষকের জমিতে থাকা পাকা ধান। একই সঙ্গে কেটে রাখা ধানের মোঠা, খড়খঁুটা সবই ডুবে যাচ্ছে। জেলা প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে হাওরের ধান কাটা ৯০ ভাগ শেষ। কৃষকেরা বলেছেন, ধান কাটা ৫০—৬০ ভাগ শেষ হলেও অনেক কাটা ধান জমিতেই রয়ে গেছে। দিরাই, শাল্লা, নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি, মদন, কিশোরগঞ্জের ইটনা ও মিঠামইন উপজেলার প্রায় চার লাখ কৃষক এই হাওরে জমি চাষাবাদ করেন।
শাল্লার মাউতির বাঁধ (৮১ নম্বর পিআইসি) ভেঙে হাওরে পানি প্রবেশ শুরু হতে থাকলে হাওরজুড়ে উৎকণ্ঠা দেখা দেয়। কৃষকরা কাটা ধান, নাকি জমির পাকা ধান, না খড় তুলে আনবেন, এ নিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন। কেউ কেউ কাটা ধানের স্তুপের পাশে বসে কাঁদতে থাকেন।
ভাঙা বাঁধের পাশে কাটা ধানের স্তুপের কাছে বসে কাঁদছিলেন কৃষাণী আভা রানী দাস। স্বামী কানন দাসের মাথায় ধানের মোঠা তুলে দিতে দিতে বললেন, ‘তারা খালি নিজের চিন্তা করে, বাঁধে লাখ লাখ টেকা রুজি কইরা সিলেট গিয়া বইয়া রইছে, অখন আমরার ধান পানিত ডুবছে। ২৫ কেয়ার ধান করছিলাম। ৫ কেয়ার কাটছিলাম, অখন নিতাম পাররাম না, নিতে নিতে ইগুন ডুবি যাইবো।
পাশেই পানির নীচের ধান কাটছিলেন আফাজ মিয়া, সিরাজ উদ্দিন, মনির মিয়াসহ ধান কাটা শ্রমিকরা।
এই শ্রমিকরা বললেন, এই বাঁধ ভাঙতে পারে না, তদারকি ও অবহেলায় বাঁধটি ভেঙে আমাদের সর্বনাশ হয়েছে।
বাঁধে দাঁড়ানো আঙ্গাউড়ার হিমেল সরকার বললেন, ভোর সাড়ে পাঁচটায় মোটর সাইকেলে যাত্রী নিয়ে খালিয়াজুড়ির কৃষ্ণপুরে যাচ্ছিলাম। বাঁধের নীচে বুরুঙ্গা দিয়ে পানি যাচ্ছে দেখে হাওরে থাকা কয়েকজন কৃষককে জানাই। কৃষকরা বাঁশ বস্তা ছাড়াই খর দিয়ে একঘণ্টা পানি ঠেকানোর চেষ্টা করেন। এরমধ্যেই বাঁধ ভেঙে যায়। পরে সকাল ৭ টায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসে কিছুই করতে পারেননি। এই বাঁধের পিআইসি সভাপতির হাওরে কোন জমি নেই দাবি করে হিমেল বললেন, তাদের তদারকির অভাবে বাঁধ ভেঙেছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলনের শাল্লার সভাপতি তরুণ কান্তি দাসও তদারকির অভাবে বাঁধ ভেঙেছে দাবি করে বললেন, হাওরে ৭০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে তবে ২০ ভাগ কাটা ধান খেতে আছে। ৪৮ ঘণ্টায় পুরো হাওর ডুবে যাবে। এই পিআইসি সভাপতি ও সম্পাদক পরষ্পর বোনের জামাই ও সমন্ধি। সভাপতি কৃপেন্দ্র দাশ ও সম্পাদক প্রদীপ দাস বাঁধে মনোযোগী ছিল না, কাজও ভালো হয় নি। তিনি বলেন, ছায়ার হাওরের ৬ উপজেলায় ১০ হাজার হেক্টরের উপরে জমি রয়েছে। এরমধ্যে ৫ হাজার হেক্টরের চেয়ে বেশি জমির ধান কাটা হয়েছে। তবে কাটা ধানেরও একটি অংশ এখনও জমিতে রয়েছে।
একই মন্তব্য করেন শাল্লা সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিশ্বজিৎ চৌধুরী নান্টু।
পিআইসি সভাপতি কৃপেন্দ্র দাশ বলেন, তিনি বাড়িতেই ছিলেন। গতকাল রাত ১১টায় ঝড়ের সময় তিনি বাঁধ থেকে ২ ঘন্টার জন্য বাড়িতে যান।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন হাওরে ৯০ ভাগ ধান কাটা হয়ে গেছে জানিয়ে বললেন, বাঁধ ঠেকানোর সর্বশেষ চেষ্টাও করা হবে।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বেলা দেড়টায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা সহ সকলকে নির্দেশ িুদয়ে বলেন, যতক্ষণ শ্বাস আছে ততক্ষণ বাঁধ রক্ষার কাজ করতে হবে। এসময় তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সকলকে বাঁধ রক্ষার কাজে লাগান।
সকালে বাঁধ ঠেকানোর চেষ্টা কেন হলো না এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু তালেব বললেন, তখন পানির চাপ বেশি থাকায় পারা যায় নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী এসএম শহীদুল ইসলাম বললেন, সকালে দায়িত্বশীলরা বাঁধ রক্ষার কাজ করতে কোন বাধা ছিল না। কেন করলেন না তারাই জবাব দিতে হবে।
সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, ছায়ার হাওরের সুনামগঞ্জ অংশে প্রায় ৪ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে। এরমধ্যে ২০০ হেক্টর জমির ধান তলিয়েছে। অন্য ধান কাটা হয়েছে।