রমেন্দ্র কুমার দে মিন্টু
ধান, মাছ, বালু-পাথর, হাওর-বাঁওর ও খাল-বিলে পরিপূর্ণ সুনামগঞ্জ জেলা। ভাটি অঞ্চলের এ জেলা আউল-বাউল কবি ও সাহিত্যিকদের পদচারণায় ধন্য। অনেক খ্যাতিমান মানুষের জন্ম হয়েছে সুনামগঞ্জ জেলায়।
ধান, হাওর-বাঁওর ও খাল-বিল হিসাবে শুধু সুনামগঞ্জ জেলাই নয়, সে হিসাবে হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনাও ভাটি অঞ্চলের অংশ। ভাটি অঞ্চলের জেলাগুলো ধান উৎপাদন করে কিন্তু ভোগ করার অধিকার তাদের নেই। ধান উৎপাদন করলেও ধানের সঠিক মূল্য পাওয়াও তাঁদের ভাগ্যে জোটে না। ধারদেনা করে প্রতি বছরই ফসল ফলায়। বছর বছর ঋণ পরিশোধ ও ধানের মূল্য অর্ধেক পাওয়ায় আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলেনা। ধান উঠার পর কিছুদিন চলার পর অভাবের সংসারে থাকা মানুষজনকে বিভিন্নভাবে আয়-রোজগারের সন্ধানে খুঁজে বেড়াতে হয়। তাও কায়িক শ্রম ছাড়া, অন্য কোনো কাজের সুযোগই নাই। কায়িক শ্রম ছাড়া কেউ কেউ বর্ষাকালে মাছ ধরতে পারে। কিন্তু বিলের মহাজনদের কঠোর শাসনে মানুষ ভাসান পানিতে মাছ ধরতে পারে না। ভাটি এলাকার কর্ম সংস্থানের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। ভাটি এলাকার মানুষ বছরের পর বছর বেশির ভাগ সময়ই অবসর জীবনযাপনে অভ্যস্ত। অবসরকালীন সময়টাকে কাজে লাগানোর জন্যে কুঠির শিল্পসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার। এতে প্রশিক্ষিত লোকজন বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে রুজি-রোজগার করতে পারত। এসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কিছু কিছু হলেও, এখনও অনেক গ্রাম বিদ্যুৎ পাওয়া থেকে বঞ্চিত।
সরকার ধান সংগ্রহ করে ফসল উঠার বহু পরে। ভাটি এলাকায় ধান চালের গোদাম খুবই সীমিত। সরকার সবার নিকট থেকে ধান নেয় না। এতে করে ব্যবসায়ীরাই লাভবান হয়। আর কৃষকরা হয় বঞ্চিত। এই বিষয়টি সরকারের জানা। কিন্তু কেন যে এ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয় না, তা বোধগম্য নয়। যদি সরকার অধিক পরিমাণে ধান ক্রয় করত বা সংগ্রহ করত তাহলে সরকারও লাভবান হত এবং কৃষকের জীবন বেঁচে যেত। এজন্য প্রয়োজন হাওরের বিভিন্ন এলাকায় খাদ্য গোদাম নির্মাণ করা।
বোরো ধান কাটা হয় চৈত্রমাসের শেষের দিকে ও বৈশাখ মাসে। গরিব ও ঋণগ্রস্ত কৃষক ফসল উঠার সাথে সাথেই বিক্রি করতে বাধ্য হয়। এখন শ্রাবণ মাস, দেশের পরিস্থিতির কারণে সম্ভবত ধানের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। যারা আগে ধান বিক্রি করেননি তারা ন্যায্য মূল্যে ধান বিক্রি করতে পেরেছেন।
হাওরের মাছচাষ বা হাওরের উন্নয়ন করার দায়িত্ব ইজারাদারদের। সরকারি কতগুলো শর্ত সাপেক্ষে জলমহাল ইজারা দেয়া হয়। কিন্তু ইজারাদাররা এসবের কোনো তোয়াক্কা না করেই মাছ ধরেন। হাওর খনন করা, মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্যে যদি হিজল-করচ গাছ লাগানো হয়, তাহলে এলাকার পরিবেশও আর্কষণীয় হতো এবং মাছের উৎপাদনও বৃদ্ধি পেত। ইজারাদারেরা সবচেয়ে বেশি যে ক্ষতি করছেন তা হল কোনাজাল দিয়ে মাছ ধরা। এর ফলে পোনা মাছটাও রক্ষা পায় না। এতে অনেক প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এ বছর বন্যায় দ্বীপের মত গ্রামগুলির যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামত করাও ভাটি এলাকার মানুষের উপর অতিরিক্ত এক বিরাট বোঝা। কারণ টেউয়ে বাড়ির ভিটা নষ্ট করে দেয়। থাকার ঘরও নষ্ট হয়ে গেছে। এর ব্যয়ভার যেন মরার উপর খাঁড়ার ঘা এর মত। সরকার যদি উদ্যোগী হয়ে গ্রামগুলিকে আফাল বা হাওরের ঢেউ থেকে রক্ষার জন্য ব্লক তৈরি করে বাড়ির পাশে বিছিয়ে দিত, তাহলে বাড়িগুলি রক্ষা পেয়ে যেত। বাড়ির সামনে পিছনে হিজল-করচ গাছ লাগানো খুবই জরুরি। গ্রামে প্রাইমারি স্কুলগুলোকেও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি। স্কুলে যাতায়াত করার কোনো সুব্যবস্থা নাই। এ বছর কোভিড-১৯ এর কারণে স্কুলগুলো বন্ধ। যদি খোলাও থাকে, প্রতি বছর এমনি সময়ে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাতায়াত বন্ধ করে দেয়। এর জন্য ভাটি এলাকার অনেক শিক্ষার্থীরা শুরুতেই ঝরে পড়ে।
সুনামগঞ্জ জেলার সড়ক যোগাযোগের উন্নয়ন এখনও প্রতিশ্রুতির মধ্যেই আছে। আগের মত নৌকায় যাতায়াতও কম। অনেক স্থানে নদী ভরাট হয়ে গেছে। প্রাথমিক বন্যা বা ফসল কাটার পূর্বে অকাল বন্যা থেকে রক্ষা পেতে হলে নদী খনন করা জরুরি। মধ্যনগর থেকে জয়শ্রী পর্যন্ত যাতে লঞ্চ চলাচল করতে পারে সে ব্যবস্থা করা হলে যাতায়াত ও পানি নিষ্কাশন উভয় ক্ষেত্রেই সুফল পাওয়া যেত। খননের নামে তেল চুরি নতুন ব্যাপার নয়। আমার মনে হয় নদীগুলি খনন করে দিলে লঞ্চ বা ট্রলারগুলি চলাচল করতে পারত এবং মানুষের যাতায়াতের সুবিধা হত।
দেশ স্বাধীন হবার পর থেকেই আমি শুনে আসছি সুনামগঞ্জ-মোহনগঞ্জ সড়কের কাজ শেষ হয়ে যাবে এবং জেলার সঙ্গে উপজেলাগুলোর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। উপজেলার মধ্যে দোয়ারাবাজার, তাহিরপুর ও জামালগঞ্জের যোগাযোগ কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু এবার বন্যার কারণে তা-ও নষ্ট হয়ে গেছে। ভাটি এলাকার জনগণের জীবনমান উন্নয়ন ও এলাকার জন্য সরকার যদি বিশেষ কোন পরিকল্পনা গ্রহণ না করে কেবল, জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালিয়ে যায়, তাহলে ঐ এলাকার চিরদিনের যে দুঃখ তা কোনদিনই ঘুচবে না। তা স্বপ্নই থেকে যাবে।

ফসলরক্ষা বাঁধের কাজ আগের চেয়ে এখন কিছুটা ভালো হয়। কিন্তু যেদি কর দরকার সেটি হলো প্রতি বছর এত টাকা খরচ না করে স্থায়ীভাবে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা। জেলার টাঙ্গুয়ার হাওর পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে অবকাঠামোর উন্নয়ন, সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করার উপর গুরুত্ব দেয়া হলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হবে। হাওরে পারিযায়ী পাখির নিরাপত্তা ও অভয়াশ্রম এবং গাছ লাগানো বিশেষ প্রয়োজন।
লেখক : সুনামগঞ্জের প্রবীণ রাজনীতিক ও সমাজকর্মী
মোবাইল: ০১৭৩১২৮৮৮৪৩