শাহরিয়ার চৌধুরী বিপ্লব
বড়ই আগোছালো মন। বিধ্বস্থ। চূর্ণবিচুর্ণ হৃদয়। দুঃখ দিনের সাথী। সুখের পরিযায়ী পাখি। এ এক অদৃশ্য প্রেম। অভিমানী অভিব্যক্তি।
পরশুদিন অভিমান করে বলেছিলাম ‘এবার যদি আমার দাওয়াতে না আসেন, তাহলে আর কোনও দিন কথা বলবো না।’
আপনি কোনও দিন আমাকে না করতে পারেন নাই। সেদিনও না করতে পারেন নি। বলেছিলেন, ‘আমারে মাফ করন যায় না?’
বলেছিলাম, ‘না। ‘
ভাই। কি এমন আধ্যাত্মিক শক্তি নিয়ে বলেছিলেন যে, সত্যি সত্যিই হাসপাতালে চলে গেলেন।
এমনভাবেই গেলেন আর ফিরে এলেন না।
রাতে হাসপাতালের আইসিইউ তে ঢুকতে আমি সাহস পাইনি। ঢুকতেও চাই নি। সত্যি সত্যি যদি আপনি আইসিইউ’র রোগী হয়ে থাকেন? যদি সত্যি সত্যি আপনার এটাক হয়ে থাকে। তাহলে তো আমি অপরাধী হয়ে যাবো। নিজেকে কিভাবে ক্ষমা করবো ভাই?
আমি যখনই রাগ করতাম, অভিমান করতাম, আপনি বলতেন, ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলে দেয়।’ পরশুদিনও একই কথা বললেন।
ভাই, আপনি যেখানেই যান, যার কাছেই যান আমি তো কোনও দিন আপনার থেকে দূরে যাইনি। যতোই ভুল বুঝি না কেন? আপনাকে ছেড়ে যাইনি।
কালকেও না আমার দাওয়াতে না এলে দূরে যেতাম না। কিন্তু এভাবে চলে গেলেন কেন?
নাকি সত্যিকারের ভালোবাসা বুঝানোর দিন বুঝি গতকালই ছিলো।
আইসিইউ’র বেডে নাকে মুখে নল লাগানো দেখে বুকটা ধক করে উঠে। কত্তবড় অভিমান। দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাস বাড়ছে। হায় আল্লাহ। এইভাবে কেউ কাউকে জিতিয়ে দেয়?
আপনার সাথে আমার লাইফস্টাইলের বিশাল অমিল। অনেকটাই বিপরিতমুখী। একবার সুরঞ্জিত সেন কাকার কাছে আপনার বিরুদ্ধে বিচার দিতে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, ‘পীর ফকিরের বিরুদ্ধে কেউ কি বিচার দেয়? ওর উপর রাগ করলে তুই ধবংস হয়ে যাবি। ও শিশুর মতো সরল। ওকে বাঁচিয়ে রাখিস। সোনার ডিম পাড়বে। একদিন তোরাই ওর গার্ডিয়ান হবি। ‘
সেনকাকার অমিয় বাণী বুঝতে না পারলেও উনার কথাগুলি মেনে চলার চেষ্টা করেছি। গতরাতে আইসিইউ তে দেখার পরে নেতার সেই কথাই মনে হচ্ছিল।
কান্নার ঢেউ। ভেঙে যায় বুক। বিদীর্ণ হয় প্রান্তর।
আপনাকে বাঁচাতে পারিনি। আপনার সাথে বার বার অভিমান করেছি। আমার অভিমান থেকে নিজেকে দূরে রাখতে মনের অজান্তে মজা করেই বলেছিলেন, ‘আমি হাসপাতালে চলে যাবো। তোরা দুইটাই গিয়া আমারে দেখবি।’
আহ। ইউসুফ ভাই। কি আধ্যাত্মিক কথা। সত্যি সত্যি হাসপাতালে গেলেন। সত্যি সত্যিই দুজনেই গেলাম। কিন্তু আপনি আর দেখলেন না। কি রকম রক্তক্ষরণ।
আপনার ফকিরানা জীবন, আউল বাউল জীবনাচার, কারো ভালো না লাগুক। আমার ভালো লাগতো। আমায় সম্মোহন করতো। আমিও আপনার মতো বাউল হবার স্বপ্ন দেখতাম।
আপনার বাউলিয়ানার মধ্যে ছিল পূর্ণিমা রাতের জোসনার আলো। হাওরের বিশাল জলরাশি। সবুজ ধানক্ষেতের শিষ দেয়া গান। শিশুর মতো নিষ্পাপ একটি হাসি মুহূর্তের মধ্যেই কঠিন কঠোর মনোভাবকে আবেগের জলে সিক্ত করতো।
সরল জীবন যাপনের মধ্যে ছিল একটি নির্মল বাউল সাধকের তপস্যা।
ইউসুফ ভাই। আপনার সাথে কতবার সিলেট থেকে সাচনা বাজারে এসেছি।
আজো আসছি। এম্বুলেন্সের বেডে আপনি শুয়ে আছেন। আমি বসে আছি। কাঁদতে পারছি না। নাকের পানি চোখের পানি এক হয়ে গেছে। আপনার দম চলে গেছে দেহ থেকে। আমি জীবিত কিন্তু দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বার বার। হিচকি উঠা কান্না। কি লিখবো? চোখের জলের লিখা হয় শুধু হৃদয়ের খাতায়।
এতো আধ্যাত্মিকতা, এতো পীরাকি আপনার মধ্যে ছিলো। এতো অলৌকিক যাদুকরী ক্ষমতার সুন্দর মনের মানুষ আমার জীবনে আর কাউকে দেখবো কি না জানি না।
গত নির্বাচনে যখনই আমি ক্লান্ত হয়ে যেতাম কিংবা রাগ করে চলে যেতে চাইতাম, তখনি আপনি বলতেন, ‘এইটাই শেষবার। আমার জন্যে, জীবনে কারো কাছে আর ভোট চাইতে হবে না। ‘
রাজনৈতিক জীবনে অনেকেই শেষ বার শেষ বার বলে কিন্তু চাওয়ার আর শেষ হয় না। কিন্তু আপনি এতো নিরেট সত্যি কথা কিভাবে বলতে পারলেন?
সেদিন আরেকজন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান এর জানাযার শেষে যখন আপনার সাথে বুক মিলাতে যাই, কানে কানে বলেছিলেন, ‘এর পরের বড় জানাযাটা ‘মনডায় খয়’ আমার হইবো।
ইয়া আল্লাহ। এইভাবে কেউ নিজের মৃত্যু কথন বলে যেতে পারে?
সিলেট থেকে সাচনার পথে আছি। এ এক অন্য পথ। অচেনা এক সড়ক। সাইরেন যেন বিউগলের করুণ কান্না। সবুজ গাছগুলি মাথা নীচু করে কুর্ণিশ জানাচ্ছে বাংলার অসীম সাহসী এক মুক্তিযোদ্ধাকে। শিশিরে মাখা দুর্বাডগা শিশুদের অকৃত্রিম জলের চোখ। হাঁসগুলি সাঁতার থামিয়ে গ্রীবা উঁচু করে বলছেÑ ভালোবাসি। ভালোবাসি।
অশ্রুসজল রাস্তয় রাস্তায় শত শত নারী পুরুষের ভিড়। হাজারো ভক্তদের কান্না। যারা দেখে নাই তারা কোনও দিন বুঝবে না। আপনি কতো প্রিয়।
আধ্যাত্মিক জীবনে কিছুই পেতে চান নি। নিতে চান নি। দিয়ে গেছেন শুধু।
নিয়ে গেছেন। নিয়ে যাবেন। শুধুই ভালোবাসা।
আপনি অনেক বড় ফকির।
ভালোবাসার ফকির।