ইকবাল কাগজী
উৎসর্জন
পাণ্ডুলিপি পড়া নাপছন্দ করেন। দেখে দিলে যদি পণ্ড -করে-ফেলে-পণ্ডিত হয়ে পড়েন। তাঁর পণ্ডিত হওয়ার বড় ভয়। তেকারণে পাণ্ডুলিপি পণ্ড-না-করার-কষ্ট কবুল করেছেন। তাঁকে ধন্যবাদ।
বিচ্ছিন্ন বিবৃতি
এক.
(ক). এই রচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পূর্বেকার প্রেক্ষিত প্রসঙ্গে
এই বইয়ের শিরোনামহীন পাণ্ডুলিপিটি প্রস্তুতের শেষ তারিখ ০৪ এপ্রিল ২০১৪। বিচ্ছিন্নভাবে লেখা প্রবন্ধ (প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রকৃষ্ট বন্ধন নয়) ক’টিকে মলাটের বন্ধনে আবদ্ধ করে ‘ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা’ নামকরণোত্তরের বেশ কয়েক বছরে পরিমার্জনের পল্লবগ্রাহিতা নির্দিষ্ট বহরবপুত্বের পাণ্ডুলিপিটিকে ক্ষণে ক্ষণে বহরব্যাপকতায় অনির্দিষ্ট করে তোলেছে এবং ক্ষেত্রবিশেষে ব্যবচ্ছেদের ছুরি সঞ্চালনে কার্পণ্য করা হয় নি। এই অপব্যবহারের কারণটি বোধ হয় বিচ্ছিন্নতা সম্পর্কিত ধারণাটি সমাজের একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে লেখকের কাছে যে-অবয়বে প্রতিভাত হয়েছিল, সে-অমসৃণ ও অপরিণত প্রাথমিক ধারণাপর্যায়টা অতিক্রম করতে না করতেই সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ধারণা ক্রমাগত ক্ষণে ক্ষণে পাল্টে যেতে যেতে কেবল জটিল হয়ে যাওয়া। ‘ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা’ প্রকাশনাটি এই জটিলতার একটি বিশ্বস্ত বয়ার্ণনা ভিন্ন অন্য কীছু নয়। ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার বয়ার্ণনা নির্মাণের এই প্রয়াস স্পষ্ট কিংবা পূর্ণ কীছু তো নয়ই, বরং সেটাকে অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ ও অমসৃণ বলাই বোধ করি সঙ্গত। সেটা এ জন্যে যে, তখনও পর্যন্ত এবং এমনকি এখন পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতা নামক প্রপঞ্চটি পূর্ণায়ববে লেখকের বোধগম্যতায় মূর্তনির্দিষ্ট হয়ে উঠে নি এবং বোধ করি হয়ে উঠবে না। বিচ্ছিন্নতাপ্রপঞ্চের সম্যক অবগতির জন্য যে-নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়ন আবশ্যক, সে-অধ্যয়নের শর্ত পুরন করা লেখকের সাধ্যায়ত্ব নয়। লেখার বিষয়বস্তুর যাবতীয় কীছু বিবৃত তারিখের (০৪ এপ্রিল ২০১৪) পূর্বেকার পরিপ্রেক্ষিতকে অতিক্রম করে নি এবং সামগ্রিক বিচারে ওতপ্রোতই রয়ে গেছে। বিষয়টা যৎকিঞ্চিৎ খোলতাই করা সঙ্গত কারণেই সমীচীন। নচেৎ লেখক নিজেকে অবিবেচকের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত উপেক্ষার শিকার করে তোলবেন, এরকম একটা উৎকণ্ঠা মনের গোচরে উঁকি মারছে।
রচনা ও প্রকাশের কালিক ব্যবধানের প্রসঙ্গটি বিবেচনায় এনে ০৪ এপ্রিল ২০১৪ তারিখের ‘এই রচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত পূর্বেকার পরিপ্রেক্ষিতটি’র একটু বিশ্লেষণ উপস্থিত করাটা বোধ করি অসঙ্গত হবে না।
এখনকার ও তখনকার পরিস্থিতির বাস্তবতার প্রভেদ আকাশ পাতাল না হলেও কোনও দিক থেকেই কিংবা কোনও বিবেচনায়ই সমান বা এক নয়। উদাহরণ স্বরূপ জেলা প্রশাসনের নামপাটার প্রসঙ্গটিকে বিবেচনা করা যায়। ২০১৪ সালে জেলা প্রশাসনের নামপাটায় ‘ডেপুটি কমিশনার’ বহালতবিয়তেই ছিল, সরকারি আদেশে তখনও রহিত করা হয় নি। যেতে আসতে পোকপতনের মতো চোখে পড়তো, ‘ডেপুটি কমিশনার’-এর নীচের পঙক্তিতে লেখা ‘জেলা প্রশাসক’। এখন একবিংশ শতাব্দীর দুই দশক পেরিয়ে যাওয়ার পর ‘ডেপুটি কমিশনার’ সমৃদ্ধ নামপাটা দেশের কোথাও পরিলক্ষিত হবার কথা নয়, জেলা প্রশাসনের নামপাটায় নামঞ্জুর ‘ডেপুটি কমিশনার’-এর যুগান্তকর ঘটনা প্রকারান্তরে বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বিলেতিয়ানা বাতিলের বাহাদুরি ঘোষণা করছে। অথচ আমার লেখায় সেটার (নামপাটায় ‘ডেপুটি কমিশনার’-এর) উল্লেখ আছে এবং এখন বাস্তবে নেই। এই সুবাদে প্রসঙ্গটির পরিমার্জন জরুরি ছিল যদিও, কিন্তু সম্ভব হয়ে উঠে নি, তাই পাঠকের পক্ষে একটু ফাঁপরে পড়ার অনবিার্য সম্ভাবনা থেকে গেছে। অথবা এমন হতে পারে যে, লেখায় বিবৃত কোনও একটি নির্দিষ্ট দোকানে ঔষধ বিক্রি হতো এখন সেখানে চা বিক্রি হয় এবং নামটি স্বাভাবিকভাবেই পাল্টে গেছে। সন্ধিৎসু পাঠক কেউ সেখানে উল্লেখিত নামের কোনও দোকান না পেয়ে লেখককে অনৃতভাষণের দোষে দোষী সাব্যস্ত করে ফেলতে পারেন এবং বোধ করি অবস্থাবিবেচনায় পাঠকের পক্ষে সেটাই হবে স্বাভাবিক ও সমীচীন। কিন্তু ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা বিষয়ক আলোচনায় উদাহরণ হিসেবে এবংবিধ নামায়নের নির্মিতির বয়ার্ণনা (বয়ান+বর্ণনা) একান্ত ওতপ্রোত ও কালনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত, কোনওভাবেই এড়ানোর কোনও অবকাশ নেই।
(খ). বিলেতিয়ানা বাতিলের বাহাদুরি এবং …
জেলা প্রশাসনের নামপাটায় নামঞ্জুর ‘ডেপুটি কমিশনার’কে একধরণের বিপ্লবই বলা যায় এবং এবম্প্রকার বিলেতিয়ানা বর্জন অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য, অপরদিকে যেখানে পৌরসভার প্রতিষ্ঠিত কোনও একটি বিনোদনস্থলের নামকরণ করা হয়েছে ‘রিভার ভিউ’, অনায়াসে যে-টির নাম হতে পারতো ‘নদীনিসর্গ’। এমন অদ্ভুত ঘটনাপ্রপঞ্চের পেক্ষিতে আপাতত যে-কারও মনে হতে পারে যে, বিলেতিয়ানার প্রতি আমলাতান্ত্রিকতার প্রীতির টান কমছে আর পৌরসভার বাড়ছে। সার্বিক বিবেচনায় হয় তো প্রতিপন্ন হবে যে, বিলেতিয়ানার বাহাদুরি যেমন ছিল তেমনই আছে। একজন হঠাৎ বড়লোক (টাকার কুমির কিংবা আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ) বনে যাওয়াজনের ঝকমকে বহুতলভবনের নামটা হয়তো দেখবেন ইংরেজিতে করা হয়েছে এবং ইংরেজিতে লেখা হয়েছে। এই সুনামগঞ্জ শহরেই এমন দেখেছি। আর এখানেই একজন কবির বাড়ির নাম ‘তরুশোভা’।
সেই ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পর থেকেই এমন ইংরেজিবাংলার, সঙ্গে আবার আরবি-ফারসিও, দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয়ে চলেছে তা কিন্তু নয়, এই দ্বন্দ্বের শুরু ১৮৩৫ সালের ০৭ মার্চ মেকলে মিনিট গ্রহণের পর থেকে। বলাবাহুল্য ১৯৪৭ পরপরই যে-কর্তব্যকর্মটি অবশ্য করণীয় ছিল সেটা ১৯৭১ পার করেও করা গেলো না, আরও চারদশকাধিক কাল নির্বিঘেœ পেরিয়ে গেলো। ১৯৪৭ থেকে আজতক কালব্যবধান একেবারে কম নয়, এর ভেতরে সাম্রাজ্যবাদী টমাস ব্যাবিংটন এডওয়ার্ড মেকলের (১৮০০-১৮৫৯) সাকরেদিপনার গুরুভার কাঁধ থেকে নামানোর এবংবিধ বিলেতিয়ানা বাতিলের একটি উদ্যোগ সত্যি এক অসাধারণ ঐতিহাসিক আমলাতান্ত্রিক কাজ, যদিও এর ভেতরে মেকলেচেলাদেরই শ্রেণিবিশেষের প্রতিনিধি একাত্তরের পরাজিত শত্রুকর্তৃক বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় সমাসীন হওয়ার ঘটনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। সুতরাং জেলা প্রশাসনের নামচাটাই থেকে বিলেতিয়ানার এই অপসারণ চাট্টিখানি কথা নয়। কারণ ব্রিটিশরা সশরীরে প্রস্থান করলেও তাদের ভাবশিষ্য মেকলেচেলারা এখনও বহালতবিয়তে এদেশের আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভেতরে কিংবা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ঘাপটি মেরে বসে থেকে বিলেতিয়ানা অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বঙ্গরাজত্ব কায়েম করে রেখেছেন, মেকলে স্বয়ং যে-বিলেতিয়ানার রূপকল্প (দুরভিসন্ধি পাঠে অনাপত্তি প্রযুক্ত) বড়লাট লর্ড বেন্টিঙ্কেয়ের দরবারে (ব্রিটিশ সংসদ পাঠে অনাপত্তিযুক্ত) প্রস্তাবাকারে (আসলে সেটা ছিল একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত পরিকল্পনা) পেশ করেছিলেন। সেদিনের (০২ ফেব্রুয়ারি ১৮৩৫) পেশ করা প্রকল্পবিবরণীতে তিনি বলেছিলেন, ‘‘I have travelled across the length and breadth of India and have not seen one person who is a beggar, who is a thief such wealth I have seen in this country, such high moral velues, people of such caliber, that I not think we would ever conquer this country, unless we break the very backbone of this nation, which is her spiritual and cultural heritage and therefore, I propose that we replace her old and ancient education system, her culture, for if the Indians think that all that is foreign and English is good and greater than her own, they will lose their selfesteem, their native culture and they will become what we want them, a truly dominated nation.’’ উদ্ধৃত এইটুকু অবিস্মরণীয় ভাষণ-বিবৃতির শেষে ‘‘Lor Macaulay’s Address of the British parliament on 2nd Feb 1835.’’ লেখা রয়েছে। এই ইংরেজি লেখাটুকু আন্তর্জালের পাতায় যে-কেউ পাঠ করতে পারেন। ভারতবর্ষের মানুষ কি এতোই বোকা এইটুকু ইংরেজির নিহিতার্থ বোঝেন না ? যারা শিক্ষত তাঁরা ঠিকই বোঝেন, কিন্তু ব্রিটিশপ্রভুর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মেরুদণ্ড তাঁদের নেই। মেকলে সেটা ভেঙে দিয়েছেন। এই একজন মিল্লাত হোসেন, ১৪ জানুয়ারি ২০২১ তারিখের ddnews24.com -এ স্বমতামত ব্যক্ত করে যে-প্রবন্ধ লিখেছেন সে-প্রবন্ধটির শিরোনাম, ‘মেকলে মিনিট : ঔপনিবেশিক উন্নাসিকতার পুনর্পাঠ’। এই প্রবন্ধের উপরাংশে শিরোনামের নিচে মেকলের একটি সুন্দর ছবির সঙ্গে ডান পাশে ছাপা হয়েছে ভারতবাসীর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার (‘we break the very backbone of this nation’) তাঁর দৃঢ় প্রত্যয় প্রকাশক ধৃষ্টতার স্মারক উক্ত লেখাটুকু। ‘মেকলে মিনিট’কে মিল্লাত হোসেন ‘এ দেশীয়দের প্রতি ঔপনিবেশিক শক্তির অবজ্ঞা আর বর্ণবাদী মনোভাবের জ্বলজ্বলে প্রকাশ’, ‘ভারতলাঞ্ছনা’ ও ‘ভারত অবমাননা’ বলে অভিহিত করে প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, “এ ধরণের উন্নাসিক ঔনিবেশিক প্রভুর দেওয়া দৃশ্যত অবমাননাকর শিক্ষাব্যবস্থার গাঁথুনি যে ২০০ বছর পরেও আমাদের অঞ্চলে আজও অটুট, তার সাফাই কি নেহায়েত উপযোগবাদের চকোলেট কোটিং দিয়েই সারা যাবে?” এবং এরপর বোধ করি আর কারও পক্ষ থেকে কোনও মন্তব্যের অবকাশ থাকে না। যদি থাকে, তো অপেক্ষায় রইলাম।
মেকলের ব্রিটিশভারতবর্ষের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ভ্রমণের নির্যাস এই ভাষণ-বিবৃতি (Lor Macaulay’s Address ), তৎকালের ভারতবর্ষের আর্থসামাজিক বিন্যাসের একটি ঐতিহাসিক বয়ার্ণনা (বয়ান+বর্ণনা), অন্তত মেকলে মহোদয়ের অবলোকনে। আপাতত তাতে কোনও সন্দেহ নেই, যাচাই-বাছাই পরের কথা। ভুলে গেলে চলবে না যে, তাঁর শিক্ষানীতির রূপকল্প পেশের কালবিবেচনায় মেকলের এই ভ্রমণ সম্পন্ন হয়েছে ১৮৩৫-এর অব্যবহিত আগে। তখন ব্রিটিশ কর্র্তক বঙ্গদখল থেকে শুরু করে পুরো ভারতবর্ষের ক্রমদখলক্রিয়া সম্পন্নের অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আরও সিকিশতাব্দী অতিক্রান্ত হয়েছে। প্রকৃতপ্রস্তাবে ব্রিটিশ কর্তৃক ভারতবর্ষের সম্পদ আত্মসাতের (লুণ্ঠন পাঠে অনাপত্তি প্রযুক্ত), প্রায় দুই দশক কম একশতাব্দী (৭৮ বছর) পেরিয়ে গেছে। মেকলের অবলোকনে ভারতবর্ষ তখনও এতোটাই সমৃদ্ধ যে, সেখানে কোনও ভিক্ষুক নেই, কোনও চোর নেই। মানুষেরা জাতিগতভাবে একদিকে উচ্চ নৈতিকতা ও ধীশক্তি, অপরদিকে আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মণ্ডিত মেরুদণ্ডের অধিকারী। মেকলের দুশ্চিন্তা এই যে, এই মেরুদণ্ডটিকে যদি না ভেঙে দেওয়া যায় ভারতকে পর্যুদস্ত করা যাবে না, অর্থাৎ ভারত থেকে ব্রিটেনে সম্পদপাচারের লুণ্ঠনপ্রবাহ সচল রাখা যাবে না। সুতরাং তিনি সে-মেরুদ-টি ভেঙে দেওয়ার ঐকান্তিক অভিপ্রায়ে নিমজ্জিত হয়ে (‘দুরভিসন্ধির কিংবা দুষ্টবুদ্ধির বশবর্তী হয়ে’ পাঠে অনাপত্তিযুক্ত) ভারতের প্রত্নত্ব, প্রাচীন শিক্ষাপদ্ধতি ও সংস্কৃতি বদলে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন (আসলে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে অপমান করেছেন), যাতে ভারতবাসী নিজেদের যে-কোনও কীছুর চেয়ে বিদেশী ও ইঙ্গলিশ যে-কোনও কীছুকে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ মনে করে, নিজের সম্পর্কে উচ্চধারণা (আত্মমর্যাদাবোধ) পোষণ করতে বিস্মৃত হয়, নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলে (অর্থাৎ আত্মসম্মানবোধ ও স্বসংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে) এবং তারা (ভারতীয়রা) হবে আমরা (ব্রিটিশরা) যেমন চাই তেমন (অর্থাৎ ‘we break the very backbone of this nation’ রূপকল্প বাস্তবায়ন প্রয়াসে নিরত ব্রিটিশ সদিচ্ছার ভৃত্য), সত্যিকার অর্থে নিয়ন্ত্রিত (প্রকারান্তরে দাস) জাতি। সুতরাং ভারতবর্ষের বাপের নাম ভুলিয়ে দেওয়ার ( ‘the Indians think that all that is foreign and English is good and greater than her own’) দূরভিসন্ধিতে প্রণীত হলো একটি শিক্ষানীতি এবং কালক্রমে বাস্তবে বিলেতিয়ানার উর্বরোদরে (ব্রিটিশভৃত্য প্রজননের খামারে) পরিণত হলো পুরো ভারতবর্ষ। ইতিহাসে এই শিক্ষানীতিটি ‘মেকলে মিনিট’ নামে অভিহিত। উপযোগবাদী সংস্কারক বড়লাট লর্ড বেন্টিঙ্কের আইন সদস্য মেকলে এই শিক্ষানীতির পরিকল্পনা ১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পেশ করেন এবং ৭ মার্চ সেটি গৃহীত হয়। অর্থাৎ ফারসির স্থলে ইংরেজি সরকারী ভাষার স্বীকৃতি পায় এবং শিক্ষার মাধ্যম মাতৃভাষা (ভারতের বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা), সংস্কৃত ও ফারসির (মেকলে ফারসিকে আরবি ঠাওরে ফারসি না লিখে আরবি লিখেছেন, এই সুবাদে তাঁর জ্ঞানের গুণকীর্তন করি।) স্থলে ইংরেজি প্রতিস্থাপিত হয়ে প্রকারান্তরে ভারত শাসনের প্রশ্নে প্রাচ্য (ভারতীয়) শিক্ষানীতিকে বাতিল করে পাশ্চাত্য (ইউরোপীয়) শিক্ষানীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাচ্যশিক্ষানীতি বাতিল করার পক্ষে তাঁর যুক্তি ছিল এরকম : প্রাচ্যসভ্যতা দুর্নীতিগ্রস্ত, অপবিত্র ও নির্বুদ্ধিতায় পূর্ণ । ‘নির্বুদ্ধিতায় পূর্ণ’ অর্থাৎ ভারতে থেলিস, হোমার, ভার্জিল, সফোক্লিস, ইরোপিডিস, সক্রেটি, অ্যারিস্টটলের মতো কৃষ্ণদৈপায়ন, বাল্মীকি, আর্যভট্ট, বৃহস্পতি, শঙ্করাচর্য, নাগার্জুন, চার্বাক, বুদ্ধ, বাৎস্যায়ন, কৌটিল্য, কালিদাস, চৈতন্য, অতীশদীপঙ্করের জন্ম হয় নি এবং এখানে একদা তক্ষশীলা, নালন্দা, উদান্তপুরী, বিক্রমশীলা, সোমপুর, জগদ্দল বলে কোনও মহাবিহার (বিশ্ববিদ্যালয়) ছিল না। তদুপুরি, তাঁর ভাষ্যানুসারে, প্রাচ্যশিক্ষা সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও পাশ্চাত্যশিক্ষার থেকে নিকৃষ্ট। ভারতবর্ষের সভ্যতা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যের নির্গলিতার্থ এমন অবিমৃষ্যকারিতায় পূর্ণ যে, যে-কোনও কা-জ্ঞানসম্পন্ন মানুষের কাছে তাঁকে প্রকারান্তরে কা-জ্ঞানহীন মূর্খ বলেই প্রতিপন্ন করে। তাঁর বিবেচনাবোধ এবম্প্রকার অদ্ভুত প্রখর যে, তিনি মনে করতেন, পাশ্চাত্যের কোনও একটি ভালো গ্রন্থাগারের একটি তাকের বইয়ে সঞ্চিত জ্ঞানসম্ভার ভারত-আরবের সমস্ত গ্রন্থাগারের বইয়ে সঞ্চিত জ্ঞানসম্ভারের সমকক্ষ ( A single shelf of an good European library was worth the whole native literature of India and Arabia.)। অথচ পাশ্চাত্য সভ্যতা মধ্যযুগে মধ্যপ্রাচ্যের বিজ্ঞান সাধনার জ্ঞানালোকে আলোকিত ও বিকশিত। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই ঐতিহাসিক সত্যকে কোনও পাশ্চাত্য জ্ঞানী অস্বীকার করেছেন বলে তো মনে পড়ে না, মেকলে সে-ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম এবং ডাঁহা মিথ্যাবাদী। একটি অদ্ভুত বিষয় এখানে উল্লেখ্য যে, ভারতের সঙ্গে আরবের কথা এসেছে কিন্তু ফারসিভাষী পারস্যের (ইরাক-ইরানের) কথা আসে নি। তিনি আরও অদ্ভুজগুবি (অদ্ভুত+আজগুবি) অনেক কীছুর সঙ্গে এও মনে করতেন যে, ইংরেজি শিক্ষা বিস্তারের কল্যাণে এক শ্রেণির ভারতীয়কে তিনি মনেমগজে ইংরেজ করে দিতে পারবেন এবং তারা তনে ভারতীয় মনে ইউরোপীয় হয়ে উঠবে। তাঁর ভাষ্যমতে ইংরেজিতে শিক্ষা অর্জন করে ‘… a class of persons India in blood and colour but English in test, opinion and entellect. ’ হয়ে উঠে ব্রিটিশের হয়ে ভারত শাসন করবে, ভারতের স্বার্থে নয় ব্রিটিশের স্বার্থে। অর্থাৎ তারা একাত্তরের যুদ্ধকালে রাজাকারদের মতো অদ্ভুত দেশপ্রেমিক হয়ে উঠবেÑ দেশের খাবে, দেশের পরবে কিন্তু দেশের স্বার্থে কুটুটি নাড়বে না, স্বজাতের সুন্দরীদেরকে পাকসেনাকে দেওয়ার মতো উত্তম উপহারের বেশি কীছু বিবেচনা করবে না এবং বুদ্ধিজীবিদের হত্যা করে দেশে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব লাভের পথপ্রতিষ্ঠন্ত পরিষ্কার করবে।
মেকলে স্পর্ধাভরে প্রাচ্যসভ্যতাকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে অভিহিত করেছেন, অথচ ভারত শাসনের প্রয়োজনে তাঁর প্রণীত শিক্ষানীতি পুরোটাই পদ্ধতিগত দুর্নীতির রাজনীতিক-প্রাতিষ্ঠানিক বিনির্মাণ। রাষ্ট্র যে-দুর্নীতিকে এখনও বহন করে চলেছে। এই শিক্ষানীতির একটি রাজনীতি ছিল, এই কথা কাউকে বলে দিতে হবে না বোধ করি, আর সে-রাজনীতিটাকে স্বয়ং মেকলে ‘we break the very backbone of this nation ’ বলে বিবৃত করেছেন। কোনও জাতির মেরুদ- উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভেঙে দেওয়ার চক্রান্ত করা হবে, আর যিনি এবম্প্রকার চক্রান্ত করবেন তাঁকে ও তাঁর প্রণীত-গৃহীত নীতিকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা যাবে না, তা কী করে হয় এবং কোন যুক্তিতে ? সার্বিক বিবেচনায় ‘মেকলে মিনিট’কে একটি ঐতিহাসিক ষড়যন্ত্র ভিন্ন অন্য কীছু ভাবা যায় না, অথবা যে-কেউ এই ‘মেকলে মিনিট’কে একটি ঐতিহাসিক দুর্নীতি বলে অভিহিত করতে পারেন, যে-দুর্নীতির যাঁতাকলে ভারতবর্ষ প্রকৃতপ্রস্তাবে আজও পিষ্ট হচ্ছে। অর্থাৎ মেকলে কর্তৃক ভারতেকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলাটাই পৃথিবীর সব চেয়ে খতরনাক ও সর্বশ্রেষ্ঠ দুর্নীতি। ব্রিটিশ কর্তৃক ভারত দখলের ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য একটাই ছিল ভারতের সম্পদ ইংলন্ডে পাচার করা, অর্থাৎ আত্মসাৎ করা, ভারতকে উপনিবেশ বানিয়ে তথাকথিত সভ্য করে তোলা নয়। বিশ্বে কোনও দেশ, রাষ্ট্র বা জাতি অন্য কোনও দেশ, রাষ্ট্র বা জাতিকে সভ্য করার অভিপ্রায়ে কখনওই দখল করে নি, দখল করেছে সম্পদ লুণ্ঠনের জন্যে। বিশ্বের ইতিহাসে এমন ভালোমানুষীর কেনও নজির নেই, কেউ দেখাতে পারবেন না। ভারত ভিন্ন ব্রিটিশের অন্য দেশদখলও এই লুণ্ঠন চরিতার্থ করার ব্যতিক্রম নয়। ভুলে গেলে চলবে না যে, ঔপনিবেশিকতা কোনও মহৎ পদ্ধতি ছিল না এবং এখনও নয়। ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন সফল করে তোলার অর্থাৎ ভারতবাসীকে ব্রিটিশের অনুকূলে সম্পদ আহরণের সহায়ক অস্ত্র করে তোলার দুরভিসন্ধিতে প্রণীত হয়েছিল ‘মেকলে মিনিট’। এককথায় এটি একটি পরিকল্পিত ও দুরভিসন্ধিমূলক শিক্ষানীতি অর্থাৎ শিক্ষাষড়যন্ত্র। এই ঔপনিবেশিক প্রয়াসের, যা অবশ্যই ছিল সর্বার্থে মানবতার প্রতি জঘন্য অপরাধ, যাঁরা সহায় হয়েছেন তাঁরাই ছিলেন মেকলেচেলা এবং এখনও তাঁদের প্রেতাত্মারা জনগণের ঘাড়ে চেপে বসে আছেন সিন্ধুবাদের ঘাড়ে চেপে বসা দুষ্ট বুড়োর মতো এবং এই ‘ঘাড়ে চেপে বসা’র সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি একটি মানবতাবিরোধী দুষ্টকর্ম, সে-টা কেনজানি তাঁরা হৃদয়ঙ্গম করতে অবলীলায় অপারগ। আজকের আমলাতন্ত্র মেকলের এই ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে নিজেকে মুক্ত করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে কেবল নয়, নিজে অবিমৃষ্যকর এক শ্রেণিস্বার্থের মলপঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে নিজের দেশের মানুষের উপর মূর্তিমান আপদ নয় বরং বিপদ হয়ে বসে আছে এবং বুকে বসে মুখে মারছে। ভারতের বিরুদ্ধে করা মেকলের এই ষড়যন্ত্র বা অপরাধটি প্রকৃতপ্রস্তাবে সকল নেতিবাচকতা অঙ্গে ধারণ করে কার্যকর ও সফলতার মুখ দেখেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মেকলের শিক্ষানীতির ‘downward filtration theory’ অর্থাৎ ‘নিম্নগামী পরিস্রবণ পদ্ধতি’ (Education was to permeate the masses from above drop by drop the Himalaya of India life useful informaion was to trickle downwards, forming in the time a broad and stately stream to irrigate the thirsty plains.) (চলবে)