ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) আর যা’-ও বাংলা বলি তা’-ও আবার বাংরেজি (বাংলা+ইংরেজি) কিংবা বান্দি (বাংলা+হিন্দি) ভাষার চেয়ে উৎকৃষ্ট কীছু হয় না। এতে অন্যদের যা হয় হোক, বাংলার তো নিশ্চয়ই বারোটা বাজছে। ক্রমান্বয়ে বাংলাকে আরও পরজীবী, পরগাছা করে তোলা হচ্ছে। অনেকেই জায়মান এই বিশেষ ভাষিক প্রবণতাকে বলছেন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। সেটা হতেও পারে বৈকি। কিন্তু উলটোপিঠে এও তো ঠিক, আমরাই এই আগ্রাসনের মহাসুযোগ করে দিচ্ছি। অর্থাৎ শত্রুপক্ষ পরিকল্পিত লক্ষ্য অর্জনে সফল আর আমরা নিজেরা নিতান্ত আত্মরক্ষা করতেই ব্যর্থ। আমাদের নির্ধারন করতে হবে নিজেদের বাঁচানোর কৌশল। অন্যকে স্বাগত জানাতে হলেও নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রাখার কলাকৌশল আমাদেরই উদ্ভাবন করতে হবে। বলছিলাম বাংলা ভাষার কথা। ইংরেজি, হিন্দি, বাংরেজি, বান্দি এগুলোর পাশাপাশি আমাদের নিজস্ব প্রভাবশালী আঞ্চলিক ভাষার গ্যাঁড়াকলে পড়ে শুদ্ধ, প্রমিত ও আদর্শ বাংলার ‘আহা বেচারা’ অবস্থা। এ হেন অবস্থায় আদর্শ ও প্রমিত বাংলার ‘ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি’ এই ত্রাহি অবস্থা।”(১৭) একজন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যে-ভাবে চেনা, একজন ভাষাদরদি আলম আমার কাছে অবশ্য সে-ভাবে চেনা নন, তাঁর বাংলাভাষাপ্রীতিকে সাধুবাদ জানাই। আর সেই সাথে তাঁকে একটা কথা বলি, বাংলাভাষাকে এই আশাবাদটুকু মনের ভেতরে থাকবেই, যতক্ষণ শ্বাস ততোক্ষণ মারতে হলে প্রথমে বাঙালি জাতটাকে মারতে হবে। আর এর বিপরীতে আশ।
আমাদের এক কবি রামনিধি গুপ্ত ওরফে নিধুবাবু (১৭৪১-১৮৩৯) বলেছিলেন, “নানা দেশে/ নানা ভাষা/ বিনা স্বদেশী ভাষা/ মিটে কি আশা?” আমাদের কেউ কেউ সে কথা বেমালুম ভুলে গেছি, না কি নিধুবাবু যে অর্থে মনেপ্রাণে বাঙালি ছিলেন সে অর্থে আমরা আর বাঙালি নেই ? বাংলাভাষার বর্তমান সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় এই প্রশ্নটা নিতান্ত অস্বাভাবিক বা অযৌক্তিক নয়। বাংলাভাষীদের জন্যে এর চেয়ে অধিক হীনম্মন্যতা ও আত্মপরিচয় বিলোপ্তির দিকে অভিযাত্রার এমন আহাম্মকি আর কী হতে পারে ? কিংবদন্তি আছে, একদা বৃক্ষের যে শাখায় সয়ং উপবেশন করেছিলেন সেই শাখার গোড়া কর্তনে উদ্যত হয়েছিলেন পরমপণ্ডিত-কোবিদ হয়ে উঠার আগে মুর্খ-মূঢ় কবি কালিদাস। বাঙালি মুসলমানের ভাষা-উপনিহিতকরণ প্রবণতার সঙ্গে পরভাষাপ্রীতির পরাকাষ্ঠার আগ্রাসন কি তাৎপর্য বিবেচনায় কালিদাসের সেই উজবুকি কাণ্ডের মতো নয় ? কারও আত্মরক্ষাকবচ, যা অন্যের হাতে ন্যস্ত বা উপনিহিত হলে মারণাস্ত্র হয়ে উঠবে, তা হস্তান্তর করা কি আত্মহত্যারূপ দুর্বুদ্ধি নয় ? যে দুর্বুদ্ধিকে নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কীছুই বলার কোনও অবকাশ নেই। ইরাক-ইরানিরা মুসলিম হয়েও নিজস্ব জাত্যাভিমান পরিহার করে বিস্মৃত হয় না যে তারা ইরাক-ইরানি। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে বহিরাগত বা উপনীত সংস্কৃতির আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত বাংলাদেশ, বাংলাভাষা ও বাঙালির ক্রান্তিকাল এখনও চলছে। তাই ইদানিং তিরস্কারসহ নির্দেশনা ধ্বনিত হচ্ছে কারও কারও লেখায়, “আমরা আমাদের আত্মপরিচয় ভুলতে বসেছি, আমাদের আত্মমর্যাদা সম্পর্কে আমরা নিজেরাই আজ উদাসীন, আমাদের নেই কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। এর সাথে যোগ হয়েছে দখলদার পুঁজিবাদ, বিশ্ববাজার দোকানদারি, আগ্রাসী বিশ্বায়ন। তাই আমাদের টিকে থাকতে হলে আত্মসচেতন ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হতে হবে। […] আর জাতির অস্তিত্ব হল তার সংস্কৃতি। সংস্কৃতিহীন জাতি বিকৃত ও মৃত। এই সংস্কৃতির প্রাণ হল ভাষা। আমাদের ভাষা, প্রিয় বাংলাভাষা লালন-পালন, পৃষ্ঠপোষকতা, চর্চা-পরিচর্যা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদেরই সর্বোচ্চভাবে আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং তা অবশ্যই সর্বজনগ্রাহ্য, শুদ্ধ ও আদর্শ পোশাকেই।”(১৮) ইতিহাসের শত অঘটনের ফাঁকতালে বাঙালি মুসলমানদের বিশেষ একটি অংশ বা শ্রেণি, যারা মধ্যপ্রাচ্য-সংস্কৃতিমনস্কতার দাসানুদাস, তারা কিন্তু মুসলিম-সংস্কৃতির ধারক হয়ে গিয়ে নিজের বাঙালিত্বকে ভুলে যেতে ভালবাসেন, যা বাঙালির জাতিগত চারিত্র্যলক্ষণের বিপরীত। তাঁদের মগজে এই তথ্যপ্রক্ষেপ করা জরুরি যে, প্রাকশতযুগকাল থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত বিশ্বসভায় বাঙালি বলে বিখ্যাত জনগোষ্ঠী একক এবং এক অনন্য একাত্মবোধে অস্থিত্বশীল ছিল এবং এখনও আছে, যারা সেই চর্যাপদের যুগে ছিল সহজিয়া বৈষ্ণব বাঙালি। ইতিহাস-বিশ্লেষক এক অধ্যাপক বলেন, “[…] ‘বাংলা’ নামের স্থান এবং ‘বাংলা’ ভাষার- উভয়েরই রয়েছে এক ধরনের চিরন্তন স্বাভাবিকতা; মনে হয় যেন ইতিহাস, রাজনীতি এবং ধর্মের বাইরে এই ভূখ-, তার জনগোষ্ঠী এবং সংস্কৃতি সব সময়ই সংযুক্ত অখ- রূপ নিয়ে চিরকাল এখানেই ছিল। বাংলাদেশের অভ্যুদয় অর্থাৎ বাঙালিদের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে দেখা হয় যুগপৎ এক অনন্য একাত্মবোধের কারণ ও পরিণতি হিসেবে, যা রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রথাগত কাঠামোর বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিবরণীতে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়কালকে একধরনের পথচ্যুতি হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দেখা যায়- যেন বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্তরণের বিশাল উপাখ্যানে এটি ছিল একটি মুহূর্তিক বিচ্ছেদ।”(১৯) অর্থাৎ বাঙালি কখনও বাঙালি ছড়া অন্য কীছু হয়ে যায় নি কোনও দিন, সর্বকালে সর্বাবস্থায় সর্বখোলসের ভেতরে বাঙালি আদি অকৃত্রিম বাঙালিই রয়ে গেছে এবং চিরদিন থাকবে। শ্লীপদে বিস্ফোটকের মতো বাঙালির জাতিগত বৈশিষ্ট্যের একটি, গুটিকয়েক বিশ্বাসঘাতক রাজাকারজীবী দুষ্টচক্র, বাঙালির জাতিসত্তার স্বরূপ বদলে দেবার ক্ষমতা রাখে না। বিশেষ করে মনে রাখা সমীচীন যে, ১৯৭১-য়ে কতিপয় রাজাকার ছাড়া বাকি সাড়ে সাত কোটি বাঙালি আদি অকৃত্রিম বাঙালি হিসেবেই বিশ্বসভায় নিজেদের পরিচয় তোলে ধরতে কোনওরূপ কার্পণ্য করে নি। তারা প্রমাণ করেছিল তারাই শিল্পী সুলতানের আঁকা স্ফীত, পুষ্ট ও বলিষ্ট পেশির কৃষক তথা বাঙালি, বাস্তবে শরীর তাদের যতই হোক না কেন অস্থিচর্মসার।
বাঙালি মুসলমানের ঘাড়েচড়া এই ভাষাবিদ্বেষী-পরসংস্কৃতিপ্রেমী অযৌক্তিক-উজবুকি ভূতকে, এই সর্বাস্তৃত সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাকে, বিতাড়ন করবে কে ? মনে পড়লো সেই গানের কথা, যে গানে ভ- ধর্মজীবীর প্রতি মধ্যযুগের কবি আব্দুল হাকিমের মতোই কবি হাসন রাজার ক্ষেভ প্রকাশ পেয়েছে। হাসন রাজার গানে এক শ্রেণির তথাকথিত মোল্লার প্রসঙ্গ আছে, যাঁদেরকে তিনি মনেপ্রাণে ঘৃণা করতেন। কবির বিবেচনায় এঁরা প্রকৃত ইসলামি জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন না, যাঁদেরকে তিনি ভ- ধার্মিক বলে ভাবতেন। তাঁর গানে এইরূপ মুসলমান ভেকধারী ধর্মজীবী বা ধর্মব্যবসায়ীদের তিনি কঠোর সমালোচনা করেছেন।
আমাদের দেশের সর্বস্তরের ধর্মপ্রাণ আলেমগণ অবশ্যই হাসন রাজা কথিত বিশেষ শ্রেণির তথাকথিত মোল্লাগণের মধ্যে পড়েন না। আমি সে গানের উদ্ধৃতি দেবার আগে সকল আলেম-অলামাগণের কাছে সবিনয়ে ক্ষমা ভিক্ষা করি। যেহেতু উদ্ধৃত পংক্তিতে ‘মোল্লা’ শব্দটি আছে। বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান অনুসারে এই শব্দটির অর্থ : ১. পরিপূর্ণ জ্ঞানবিশিষ্ট মহাপণ্ডিত ব্যক্তি, ২. আরবি, ফারসি, উর্দু ও ইসলামি শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তি। এমন মহৎ অর্থবোধক একটি শব্দের অভিধাধারী কাউকে অবমাননা করা তো দূরে থাক, যৎসামান্য কৌতুক করেও কোনও উক্তি করা কোনও যুক্তিতেই সঙ্গত মনে করি না। তাই আবারও ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
গানের বিখ্যাত সেই উক্তিতে ‘মেল্লা’ শব্দটি এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যে, সেটির শাব্দিক অর্থকে অতিক্রম করে আলঙ্কারিক বা সংশ্লিষ্ট গানে একটি বিশিষ্টার্থ সর্জিত হয়েছে, যার অন্য একটি বাঁকা অর্থ দাঁড়িয়ে যায় শ্রোতা বা পাঠকের কাছে। পাঠক-শ্রোতার পক্ষে স্বাভাবিকভাবেই সেটির একটি নির্দিষ্ট বিশেষ কদর্থ না করে কোনও উপায় থাকে না। যেমন আরবি ‘রেদাকার’ কিংবা ফারসি ‘রাজাকার’ শব্দটির শাব্দিক অর্থ স্বেচ্ছাসেবক, কিন্তু আমাদের বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে শব্দটিকে একটি বিশেষ আলঙ্কারিক, বলা উচিৎ বাংলাদেশের লোকসমাজে ব্যবহৃত অর্থে অর্থাৎ লোকনিরুক্তজ অর্থে গ্রহণ করা হয়েছে। সে আলঙ্কারিক অর্থটিকে অর্থ না বলে সংজ্ঞার্থ বলাই সঙ্গত। আর সেটা এরকম, “১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা স্বেচ্ছাসেবক নামে পাকিস্তান দখলদার বাহিনীকে সহায়তা করে এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা ও ক্ষতিসাধন করে।” এই ক্ষতি ছিল ত্রৈমাত্রিক : প্রাণ, মান ও মালের ক্ষতি। আরবি ‘রেদাকার’ কিংবা ফারসি ‘রাজাকার’ থেকে উদ্ভূত বাংলা ‘রাজাকার’ শব্দটি বাংলা ভাষায় একটি বিশিষ্ট বাগ্ধারায় পর্যবশিত হয়েছে এবং তার নতুন অর্থ দাঁড়িয়ে গেছে ‘বিশ্বাসঘাতক দেশদ্রোহী কুলাঙ্গার’ কিংবা জঘন্য ব্যক্তি। শব্দটির অন্তর্নিহিত মূল অর্থদ্যোতনায় ‘সেবা’ কর্মের সার্বজনিকতা ছিল, যে-কোনও ক্ষেত্রে সেটার প্রয়োগাধিকার ছিল। কিন্তু বাংলায় প্রবসিত হয়ে শব্দটির ভেতরে ‘সেবা’ অর্থদ্যোতনার একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রয়োগ নিশ্চিত হয়ে পড়েছে, সেই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রটি হলো অন্যদেশ (স্বদেশ নয়)। এমন করে পাকেচক্রে এক ভাষার শব্দ অন্য ভাষায় সম্পূর্ণ অন্য অর্থ ধারণ করে প্রবসিত হয় কিংবা হতেই পারে। এটাও ভাষার একটা বিশ্বজনীন স্বীকৃত নিয়ম।
ফারসি ‘কারচোব’ থেকে এসেছে বাংলা ‘কারচুবি’, কারচুবি থেকে ‘কারচুপি’। কারচুবি (< ফা. কারচোব) শব্দের মূল অর্থ : বস্ত্রাদিতে নকশার কাজ। আমাদের নকশিকাঁথা সেলাইয়ের মতো শৈল্পিক সুষমাম-িত কাজ। কিন্তু বাংলা ভাষায় ‘কারচুপি’ শব্দটির অর্থ দাঁড়িয়ে গেছে কদর্থে চালাকি, কৌশল ইত্যাদি। যে কার্যপ্রকরণে অন্যজনের প্রতারিত হওয়ার সম্যক সম্ভাবনার অর্থাভাস ফল্গুধারার মতো দ্যোতিত। হাল আমলের বাংলাদেশে যে-কোনও নির্বাচনে বিজেতা বিজয়ীকে কারচুপি করার অভিযোগে অভিযুক্ত করেন, এটি গণমাধ্যম ও সাধারণ্যে একটি বহুল আলোচিত প্রসঙ্গ। সত্রাজিৎ গোস্বামীকৃত ‘বাংলা অকথ্যভাষা ও শব্দকোষ’ অভিধানে শব্দটির ভুক্তি এ রকম : “কারচুপি [< ফা. কারচোবি] প্রতারণামূলক কৌশল, মূল অর্থ ছিল কাপড়ে সুক্ষ্ম কারুকার্য, (সাধারণ)।”(২০) বাংলাভাষী মানুষের কাছে যেমন রাজাকারের ভাষাগত মূল অর্থ একটি কদর্থে পাল্টে গেছে তেমনি হাসন রাজার গানে ‘মুল্লা’ [বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে (পরিমার্জিত সংস্করণ : ২০০০) ‘মোল্লা’ প্রতিবর্ণায়নে বা বানানে প্রাপ্ত ।] শব্দটির অর্থ পাল্টে যায় পাঠক-শ্রোতার কাছে, গানটি শোনা বা পাঠ করার সময়। গানটির প্রথম পংক্তি দু’টি হলো, “মুল্লার বাড়ি যাইও না রে পুত/ মুল্লার সঙ্গ করলে পরে হইবে অজমভুত ॥”(২১) । ‘মুল্লার সঙ্গ করলে পরে হইবে অজমভুত’ এর ‘হইবে’ শব্দটিকে কেমন যেনো একটু কৃত্রিম কৃত্রিম ঠেকে সুনামগঞ্জের লোকনিরুক্তানুরে ‘হইবায়’ হওয়ার কথা। এদিক থেকে বিবেচনায় হাসন রাজার গানে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দগুলো কারও কারও অনধিকার অসভ্য পরিশীলনের শিকার হয়ে বিচ্ছিন্নতার আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না।
মানুষের বাচ্চাকে ‘অজমভুত’ (অদ্ভুত) বানানোর ভূতের অভাব যেমন হাসন রাজার কালে বা আরজ আলী মাতুব্বরের কালে ছিল না তেমনি আজও নেই। মুসলমানদের সংখ্যাল্প বিশেষ একটি শ্রেণি সমাজে মোল্লাতন্ত্র কায়েম করতে প্রতিনিয়ত তৎপর ছিল এখনও আছে। সমাজনিয়ন্ত্রণে এ শ্রেণিটির বিশেষ ধর্মীয়দৃষ্টিভঙ্গির প্রপন্নতা কিংবা ধর্মবাণিজ্যিক অবিমৃষ্যকারিতা আরোপের নিদর্শন মেলে ওয়াহিদুল হক-এর এক লেখায়। তিনি বলেন, “বাঙালি নিম্নবর্গীয় মুসলমান, সম্ভবত নিরান্নব্বই শতক তারাই, নানাতর অনুশাসন পায় ধর্মব্যবসায়ী মোল্লা মৌলানার কাছ থেকে। পায় কর্তব্য কর্মের ফর্দ এবং তাকে হেলা করলে দোযখের নিদারুণ শাস্তির নিশ্চয়তা। ধর্মজীবনই চাষীতাঁতীর একমাত্র মানস জীবন। এবং সেই মানস জীবন কেবলি নানা গালগল্প আর ভীতি প্রদর্শনে পূূর্ণ হলে মানুষের চলবে কেন ? মানুষ দরগায় যেতে আরম্ভ করে, সুফিরা (স্বঘোষিত) তাদের বলে আল্লাহ প্রেমময়। বাউলের আখড়ায় যায় মুসলমান, যে-বাউল গুরুর কথা বলে কিন্তু মোল্লার কথা বলে না। এ যেন লিবারেশন ইসলাম। আসলে এ হচ্ছে বাঙালির ইসলাম। নদীবিধৌত মৎস্যভুক মানুষের ইসলাম। বৌদ্ধ এবং হিন্দুর ইসলাম।”(২২) ওয়াহিদুল হক কথিত ‘ধর্মব্যবসায়ী মোল্লা মৌলানা’দের সম্পর্কে গোলাম মুরশিদ বলেছেন, “বাংলার প্রতি সবচেয়ে বিরোধিতা ছিলো মোল্লা-মৌলবিদের। তাঁরা বাংলাকে হিন্দুর ভাষা অথবা ‘কুফুরি জবান’ অর্থাৎ কাফেরের ভাষা বলে ফতোয়া দিয়েছিলেন। নিজেদের আরবি-ফারসি-উর্দুর জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তাঁরা যাতে ব্যবসা এবং প্রতিপত্তি স্থায়ী করতে পারেন, তাদের বিরোধিতার সেটা একটা কারণ।”(২৩)
আরজ আলী মাতুব্বর তাঁর মাকে খুব ভালোবাসতেন। মায়ের মৃত্যু হলে তাঁর একটি ছবি তোলে রাখার ব্যবস্থা করেন তিনি, শহর থেকে ছবি তোলার লোক আনিয়ে। এই ছবি তোলার অপরাধে গ্রামের মোল্লা-মুরুব্বিরা ছবি তোলা ইসলামি শরিয়া মোতাবেক হারাম, এই ফতোয়া জারি করে তাঁর মায়ের জানাজা পড়তে অস্বীকৃতি জানায় এবং তারা জানাজা না পড়ে একজন মৃত মুসলিম রমণীর উপর তাদের কর্তৃত্বের দাবনিক প্রচ-তা আরোপ করে তাঁকে মৃত্যুর পরেও হেয়করণ, দলিতকরণ, নিয়ন্ত্রণকরণ ও নির্জিতকরণের ক্ষমতা আরোপ করে। মধ্যপ্রাচ্য সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদীরা এইসব অগুন্তি ‘করণ’-কারচুপির ফাঁদে আটকে প্রকৃতপ্রস্তাবে জীবিতদের উপর সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিক্রম প্রতিষ্ঠায় তৎপরতা অব্যাহত রাখে এবং প্রতিপন্ন করে যে, তাদের প্রতিষ্ঠিত বিধান মতে যে-অপরাধ (এখানে ছবি তোলা) আরজ আলীর জননী করেন নি, মৃত মানুষ কোনও অপরাধ করতে পারে না, সে-অপরাধের শাস্তি হিসেবে ধর্মমতে প্রাপ্য তাঁর জানাজা দেওয়ার অধিকার থেকে তাঁকে বঞ্চিত করার ক্ষমতা তাঁরা সংরক্ষণ করে, যা ধর্মানুমোদিত নয়। এইভাবে মধ্যপ্রাচ্য আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক শক্তি স্থানীয়দের উপর নিজেদের শাসন-শোষণ সুদৃঢ়করণে সহায়ক অন্যরকম এক ধর্মের গোড়াপত্তন করে, যে-ধর্মের মূলে আছে অপরকে (ড়ঃযবৎ) স্বীয় কর্তৃত্বের শিকলে বেঁধে রাখার দুরভিসন্ধি এবং যে-মৃতের ছবি তোলা হবে তার জানাজা পড়া হারাম। যুগে যুগে তারা সাধারণ মানুষকে শোষণ-নিষ্পেষণ করে জাগতিক স্বার্থোদ্ধারের লোভে এইভাবে ইসলামকে হাতিয়ার করে নিয়েছে। তারা ইসলামের প্রচারে অত্মোৎসর্গী হয়েছে ইসলামের স্বার্থে নয় নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তারের তাগিদে, রুটি ও রুজির লোভে।
কিন্তু আজ যখন বড় বড় আলিম-ওলামারা টিভিক্যামেরায় বন্দি হন, তখন অন্তত প্রমাণ হয় যে, সেদিন আরজ আলী মাতুব্বরের মৃত মায়ের উপর ধর্মকে নিপীড়নযন্ত্র করে তোলেছিল সেই তথাকথিত ‘মোল্লা’ (ইসলামী আলেম-উলামাদের কাছে আবারও ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।) নামের ভূত, সমাজটাকে অজম্ভূত করে তোলাই যার একমাত্র কাজ।
পবিত্র ইসলামের- মানুষের কল্যাণের জন্য আবির্ভূত ইসলামের- এই অপবিত্র ও মানবনির্যাতনাত্মক ব্যবহার মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত আশরাফ সংস্কৃতির সঙ্গে ভারতবর্ষের মাটিতে গাদনক্রিয়ার মতো সবলে প্রোথিত হয়েছিল। মনে রাখতে হবে, শ্রেণিস্বার্থে নিয়ন্ত্রিত ধর্মের এই অপবিত্র ও মানবনির্যাতনাত্মক ব্যবহার ঔপনিবেশিক জ্ঞানতত্তেরই অনুশীলন। অথবা অন্যভাবে বললে বলতে হয় : এও একধরণের প্রাচ্যবাদ, যেটাকে এডওয়ার্ড সাইদ ওরিয়েন্টালিজম বলে বর্ণনা করেছেন। বলা বাহুল্য, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ভারতবর্ষে প্রবসিত এই আশরাফসংস্কৃতি বাঙালি মুসলমান সমাজে মাতৃভাষা উপনিহিতিকরণরূপ আধি-ব্যাধিরও আদি অকৃত্রিম উৎসের অন্যতম।
তথ্যসূত্র :
১. আজিজুল রাসেল ॥ এইমে সেজেয়ার, উপনিবেশবাদ ও উপনিবেশবাদবিরোধি লড়াই ॥ নির্বাচিত চারবাক, সম্পাদনা : রিসি দলাই ॥ চারবাক, আজিজ সুপার মার্কেট, শাহবাগ (ঢাকা) ॥ ফেব্রুয়ারি, একুশের বইমেলা : ২০১১, পৃষ্ঠা : ৭৬
২. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৮১
৩. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৮১
৪. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৮১
৫. প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা : ৮১
৬. এদুয়ার্দো গালেয়ানো, লাতিন আমেরিকার রক্তাক্ত ইতিহাস, অনুবাদ : অশেষ রায়, র্যাডিক্যাল (কলকাতা), জানুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা : ২৯।
৭. কাজী নজরুল ইসলাম, সঞ্চিতা, মাওলা ব্রাদার্স (ঢাকা), ষষ্ঠ মুদ্রণ : জানুয়ারি ২০১৩, পৃষ্ঠা : ১৭৪।
৮. জয়ন্তানুজ বন্দ্যোপাধ্যায়, ধর্ম ও প্রগতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড (কলকাতা), তৃতীয় মুদ্রণ : ডিসেম্বর ২০১৪, পৃষ্ঠা : ৩৫।
৯. সুকুমার রায়, সুমার রায় রচনা সমগ্র, ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ৭৯)।
১০. ইকবাল কাগজী, কাগজীর কারচুবি, চৈতন্য (সিলেট), অমর একুশের বইমেলা ২০১১, পৃষ্ঠা : ২৫।
১১. মোসাদ্দেক আহমেদ, অন্তর্জলীসূত্র, কালি ও কলম, দশম বর্ষ একাদশ সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা : ২৭, স্তম্ভ : ২।
১২. কার্ল মার্কস-ফ্রেডারিক এঙ্গেলস, রচনা সংকলন, প্রথম খ-, দ্বিতীয় অংশ (‘অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে’ গ্রন্থের ভূমিকা), প্রগতি প্রকাশন (মস্কো), ১৯৭১, পৃষ্ঠা : ২৫।
১৩. হাসন রাজা, হাসন রাজার গান, সম্পাদনা : আবুল আহসান চৌধুরী, বর্ণায়ন, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা : ৯১ (হাছন উদাস)।
১৪. আবুল বাশার, সাক্ষাৎকার : আবুল বাশার, সাক্ষাৎকার গ্রহণ : তাপস দত্ত, ধানসিড়ি, বর্ষ : ১৮ সংখ্যা : ৪, নভেম্বর ২০০৯, পৃষ্ঠা : (১৫৯Ñ১৬০)।
১৫. স্বপন আদনান, দুর্নীতির সংস্কৃতি এবং পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি, নতুন দিগন্ত, একাদশ বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যা, জানুয়ারিÑমার্চ ২০১৩, পৃষ্ঠা : ১১।
১৬. অ্যালেন বাদিয়্যু, আশুভ বিষয়ে, ভাষান্তর : লায়লা ফেরদৌস, নাগরী, একুশে বইমেলা ২০১৪, পৃষ্ঠা : ১৮।
১৭. শরীফ মুহম্মদ ফয়েজুল আলম, ভাষার আর্তনাদ ও আমাদের দায়, আবাহন, সম্পাদক : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ১ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা, জুলাইÑসেপ্টেম্বর ২০০৫, পৃষ্ঠা : ২১৩।
১৮. শরীফ মুহম্মদ ফয়েজুল আলম, ভাষার আর্তনাদ ও আমাদের দায়, আবাহন, সম্পাদক : আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ১ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা, জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০০৫, পৃষ্ঠা : ২১৫।
১৯. আহমেদ কামাল, দেশ ভিভাগের অভিজ্ঞতা ও জাতীয় ইতিহাস রচনার সমস্যা, প্রতিচিন্তা, জুলাই সেপ্টেম্বর, পৃষ্ঠা : ১০৯।
২০. সত্রাজিৎ গোস্বামী, বাংলা অকথ্যভাষা ও শব্দকোষ, একবিংশ, দ্বিতীয় পকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারী ২০০১, পৃষ্ঠা : ১৫৭।
২১. হাসন রাজা, হাসন রাজা সংগীতসমগ্র, সম্পাদনা : সামারীন দেওয়ান, মওলা ব্রাদার্স, ফেব্রুয়ারি ২০১৪, পৃষ্ঠা : ৩০৭।
২২. ওয়াহিদুল হক, সংখ্যাগুরু নির্যাতন বাংলাদেশ, যুগান্তর ঈদ সংখ্যা ২০০৫, পৃষ্ঠা : ২৬, স্তম্ভ : ১।
২৩. গোলাম মুরশিদ, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, অবসর, পুনর্মুদ্রণ : জুন ২০০৮, পৃষ্ঠা : (১৮০-১৮১)।
০৩. নামফলকের নাম : বাংলা, বাংরেজি ইত্যাদি শব্দের বানান
শহর সুনামগঞ্জে এসে যখন চিরথিতু হই, তখন রাস্তার দু’পাশে ছিল না এত যত্রতত্র বহুতল দালানকোঠা, বহুবিধভঙ্গিবিন্যাসে লেখা রংবেরংয়ের এতো নামফলক কিংবা রাস্তার মোড়ে মোড়ে এতো বিজ্ঞাপনপাটার বাহারি প্রদর্শনী। নিত্যদিন নিলয়Ñ১২৪/১ থেকে যে পথ মাড়িয়ে পৌরবিপণিতে যাই, নতুনপাড়ার ভিতর দিয়ে সে পথ চলে গেছে জামাইপাড়া হয়ে কালীবাড়ি, তারপর টাফিক পয়েন্ট। ট্রাফিকপয়েন্টটি একটি তেরাস্তা, তিন পথের ত্রিবেণীসঙ্গম। এই ত্রিবেণীর একটি এ শহরের বিখ্যাত শিক্ষক রাখাল বসুর (শ্রীধূর্জটিকুমার বসু) বাসার সম্মুখস্থ বিপণির সামনা থেকে পূর্বদিকে সরলরেখার মতো প্রলম্বিত। চলে গেছে কাজির পয়েণ্টে বাঁক নিয়ে উত্তরে ষোলঘর পর্যন্ত। এই রাস্তাটি ধরে পূর্বদিকে যেতে প্রথমেই রাস্তার উত্তর পাশে, যে-জায়গাটাকে গতশতকের একাত্তরের আগেপরে বলা হতো পুরাতন কলেজ প্রাঙ্গণ কিংবা আলী আহমদ হল প্রাঙ্গণ, সে-স্থলে গড়ে ওঠা বেশকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা। তারপর ব্রিটিশ আমলের একটি সরকারি বাড়ি পেরিয়ে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার আর থানার সমনে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাঠাগার এই দু’টির মাঝখানের জায়গাটায়, যেখানে পুরাতন হাসপাতালের দক্ষিণে কচুরিপানাভর্তি একটি বড় পুকুর ছিল, সেই পুকুর বালুভরাট করে তাতে গড়ে উঠেছে পৌরবিপণি। প্রতিদিন এই পৌরবিপণিতে যাই। যেতে যেতে পথের দু’পাশে নতুনপাড়ার প্রায় বাসার না হলেও বেশ কীছু বাসার সামনাজুড়েই দেখি দোকানঘর উঠছে। চাস্টল-মুদির দোকান থেকে শুরু করে হরেক রকমের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে লোকজন। দিনে দিনে নতুন নতুন বারোয়ারি দোকান বেঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। বিবিধ পণ্যবিপননের কেন্দ্র হয়ে উঠছে পাড়া অর্থাৎ পাড়া আর আদি অকৃত্রিম পাড়া থাকছে না, বাজার হয়ে উঠছে কালে কালে।
পথ চলতে চলতে মনে পড়ে অতীতে কোনও এক সময় এমন জমাট আর জনজটে সরগরম ছিল না এই পাড়া, এমন কি পুরো সুনামগঞ্জ শহরটাই ছিল জোটবদ্ধ বাড়ির সমারোহে গিঞ্জি-নয়-বসতির গ্রামগন্ধী শান্তির স্নিগ্ধতায় ছাওয়া শান্তনীড়, পুকুর-পাগাড় আর গাছ-গাছালি-নদী-খালের নিবিড় নিসর্গঘেরা এক নিরিবিলি সবুজ জনপদ। একদা কেমন নিসর্গ-শ্যামলিম-সুন্দর ছিল এই সুনামগঞ্জ তার একটি ঐতিহাসিক বর্ণনা পাওয়া যায় দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফের আত্মস্মৃতিনির্ভর লেখায়। একবার ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু এসেছিলেন সুনামগঞ্জে। কবি রাজনীতিক শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু ইংরেজিতে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। সে ভাষণের প্রারম্ভটাই ছিল সুনামগজ্ঞের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অবিস্মরণীয় নান্দীপাঠ। ভাষণটির তাৎক্ষণিক বাংলায়নে নিরত ছিলেন শ্রীক্ষিরোদচন্দ্র দেব (এই শ্রীদেব সম্পর্কে দু’কলম লিখতে পারলে ভালো হতো, আফসোস তাঁর সম্পর্কে কীছুই জানি না।)। সেই বঙ্গায়িত অপরূপ বাণীবন্দনার বর্ণনা করেছেন দেওয়ান আজরফ। তিনি লিখেছেন, “তাঁর তরজমা খানিকটা এরূপ ছিল : এই যে সুনামগঞ্জ যেখানে আকাশ পাহাড়গুলোকে চুম্বন করে এবং পাহাড়গুলোও তার প্রতিদান দেয়- যেখানে কোনো এক পাহাড়ের পাদদেশে তারই শাড়ির আঁচলের মতো সুন্দরী সুরমা প্রবাহিত হচ্ছে এবং তারই তীরে অবস্থিত ঝোপে বসে বুলবুল তার সুরের ঝংকার তুলছে- এরূপ স্থানে যে কোনো মানুষের পক্ষেই কবি না হয়ে উপায় নেই।”(১) সরোজিনি কীর্কিত প্রিয়দর্শিনী প্রকৃতিকন্যা এই সেই সুনামগঞ্জ এখন যেখানে বহুজাতিক বাণিজ্যের পণ্যতান্ত্রিকতার নিয়ননিয়ন্ত্রিত রমরমা বিভব রাতবিরেতে নাকের ডগায় (চলবে)