- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা

ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) তবে কিছু নামে প্রথমাংশে স্থান পায় বাংলা শেষাংশে ইংরেজি।”(৭) সহজেই বোধোদয় হয়, কোনও প্রতিবন্ধকতা জাগ্রত হয় না, নামকরণ করতে গেলেই বাংলাদেশে প্রথমেই ইংরেজির প্রপন্নতা প্রাধান্য পায়। তিনি কিছু নামের উদাহরণ দিয়েছেন। আমি সেগুলো নয়, বরং সেগুলোর মতো বা সদৃশ—সমতুল সুনামগঞ্জের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান—বিপণিবিতান—স্থাপনার নাম উদ্ধৃত করছি। যেমন : মেঘলা সুজ, টগর মেডিকেল হল, মা জয়কালী চা ষ্টোর, প্রিয়া ষ্টোর, অহনা লেডিস টেইলার্স, পিয়ালী বিউটি পার্লার, নব অর্চি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড, পুষ্পিতা ভেরাইটিজ ষ্টোর, কল্পনা লেডিস কর্ণার এন্ড টেইলারিং হাউস, মা ফ্রিজ এসি সার্ভিসিং সেন্টার, শিল্পী লন্ড্রী, স্বস্তি মেডিকেল হল, সাহস ফার্মেসী, মা ইলেকট্রনিক্স, জয় হেয়ার ড্রেসার সেলুন, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস, অনুপম লাইব্রেরী, বন্ধু লাইব্রেরী, নানা ভাই টি ষ্টোর, পাঞ্জেরী লাইব্রেরী ইত্যাদি। বলাবাহুল্য বানানগুলো লিখা হয়েছে নামপাটায় যেভাবে লিখা হয়েছে সেভাবে, ব্যাকরণিয়া সেজে সম্মার্জনার কেদারিশমা (কেরদানি+ক্যারিশমা) ফলানো হয় নি।
এই সব নামের প্রথমে আছে বাংলা, শেষে আছে ইংরেজি। ‘পাঞ্জেরী’ বিশুদ্ধ বাংলাশব্দ নয়। ফারসি ‘পান্জরহ্’ শব্দটি বাংলাভাষাদেশে প্রবসিত হয়ে শেষমেশ যৎকিঞ্চিৎ বিবর্তিতরূপে হয়ে উঠেছে পাঞ্জেরী, ভাষার পরিবর্তনের নিয়মানুসারে যা নিতান্তই স্বাভাবিক। এদিক থেকে শব্দটি বাংলাভাষাজগতে বিদেশি বা কৃতঋণশব্দ, যাকে বলে প্রবসিত। বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘পাঞ্জেরী’ শব্দটির আরও একটি হ্রস্ব ই—কার (ি) সংম্বলিত বিকল্পবানান প্রদত্ত হয়েছে, সেটি ‘পাঞ্জেরি’। কৃতঋণ বা বিদেশাগত শব্দের এমন বিকল্পবানান সংক্রান্ত আধুনিক বিধি হলো, “বিদেশী ভাষার মূল শব্দের স্বরধ্বনির উচ্চারণ হ্্রস্ব কিংবা দীর্ঘ যাই হোক না কেন বাংলা বানানে কেবল হ্্রস্ব ই—বর্ণ বা হ্্রস্ব ই—কার হবে।”(৮) । এই একই নিয়মের অন্য একজনের বর্ণনা এরকম, “বিদেশি যে কোনো শব্দ যদি ই/ঈ দিয়ে শেষ হয়, তাহলে সেই শব্দের বানান নির্ভয়ে ই—কার দেওয়া যাবে।’’(৯) বাংলায় বিদেশাগত- কিন্তু প্রবসিতÑ শব্দের বানানের নিয়মানুসরে আমাদের উল্লেখিত ‘পাঞ্জেরী’ শব্দটি অশুদ্ধ, শুদ্ধটি হতে হবে ‘পাঞ্জেরি’। তেমনি অশুদ্ধ লাইব্রেরী, ফার্মেসী ও লন্ড্রী শব্দ তিনটি। বিদেশি শব্দমাত্রের বানানেই দীর্ঘস্বর বর্জনীয়, এটাই বাংলা প্রমিত বানানরীতির অকাট্য নির্দেশ। কৃতঋণশব্দের আধুনিক বাংলা ব্যাকরণসম্মত বানানবিধি এমনকি স্বয়ং ‘বাংলা একাডেমী’ প্রণীত বানানের নিয়ম অনুসারে ‘একাডেমী’ শব্দটির শুদ্ধি আবশ্যক। অতিস¤প্রতি অনুজ বিদিগ্ধ কল্লোল তালুকদারকে বলতে শুনেছি, তিনি নাকি দেখেছেন যে, এবারের বইমেলায় ‘বাংলা একাডেমী’র নামের বানানে ঈ—কার ছেঁটে ই—কার সন্নিবেশিত করা হয়েছে। কিন্তু ‘এ’—এর বদলে ‘অ্যা’ কেন করা হলো না সে জন্য তিনি ক্ষোভাক্ষেপ জানাতে কার্পণ্য করেন নি। উক্ত ‘একাডেমী’ বানানটিতে / ী/—র স্থলে /ি/ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত এবারের (২০১৪ খ্রি.) বইমেলায় কার্যকর করার বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। ‘বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’—এর ‘অ—তৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশী, বিদেশী, মিশ্র শব্দ’ শীর্ষক অনুচ্ছেদের (ক্রমÑ২.০১) শুরুতেই বলা হয়েছে, “সকল অ—তৎসম অর্থাৎ তদ্ভব, দেশী, বিদেশী, মিশ্র শব্দে কেবল ই এবং উ এদের—কার চিহ্ন ি ু ব্যবহৃত হবে। এমনকি স্ত্রীবাচক ও জাতিবাচক ইত্যাদি শব্দের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে।”(১০) আড্ডাবাজ বাতেলাপীর গোলাম গুলমগির এ সব শ্রবণ করে তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে যা ব্যক্ত করলেন, তার মর্মার্থ এই যে, আমাদের মতো আদার ব্যাপারিদের জাহাজের খবরাখবর নেওয়ার তোড়জোর আপাতত এখানেই মুলতবি রাখা কর্তব্য। বাংলা একাডেমি এতদিনে তার আমলাতান্ত্রিক আমলামির (দীর্ঘসূত্রিতার ?) জাঢ্যতা কাটিয়ে উঠতে পেরে ঈ—কারকে তিন তালাক দিয়ে ই—কারকে নিকা করতে পেরেছ, এটাই বা কম কীসে, ‘এ’—কে তালাক দিয়ে ‘অ্যা’—কে নিকা করতে তার অন্তত আরও কয়েক যুগ তো অবশ্যই দরকার পড়বে, বাংলা একাডেমি বলে কথা। তার চলনটাই আদিঅকৃত্রিম গদাইলস্করি চালের। প্রথমে পয়গাম (প্রস্তাব), পয়গামের পর পানচিনি (পরিকল্পনা), পানচিনির পর আকদ (অর্থায়ন), আকদের পর রুসমৎ (বাস্তবায়ন), রুসমতের পূর্বে যথেচ্ছা গমগচ্ছ, তবে না ফুলশয্যা, তারপর ‘হবে পোলা ডাকবে বাপ’। মনে রাখতে হবে বাংলা একাডেমিতে ‘উঠ ছুড়ি তোর বিয়ে’ বলে কোনও ব্যাপারেশন নেই। বাংলা একাডেমি করিতকর্মাদর্শে নয়, তনুমনে করিবকর্মাদর্শে বিশ্বাসী। ‘একাডেমি’—কে ‘অ্যাকাডেমি’ লিখতে হলে আরও বিয়াল্লিশ বছর লাগবে। বাঙালিকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে ‘অ্যাকাডেমি’ বানানটা সাজাপ্রাপ্ত রাজাকার—যুদ্ধাপরাধী—মানবতাবিরোধী গোলাম আজমের বিচার করার চেয়েও ভীষণ জটিল ও কষ্টসাধ্য। গোলাম আজমের বিচার করতে যে জাতির বিয়াল্লিশ বছর লেগে যায় তার তো বানানবিবর্তনের পথ মেপে মেপে ‘অ্যাকাডেমি’ বানান পর্যন্ত পৌঁছাতে চুরাশি বছর লাগার কথা। তা না হলে ‘পাঞ্জেরি’র বিকল্প ‘পাঞ্জেরী’ রেখে দেয় কোন আক্কেলে ? বাঙালি বানান শুদ্ধ করে লিখতে শিখুক বাংলা একাডেমি তা কখনও চায় না। অসলে বাংলা একাডেমি ভাষাসেবাসাংস্কৃতিক নয় ভাষামলাতান্ত্রিক। এদেশের সমাজবাস্তবতা বা আর্থসামাজিক ব্যবস্থাটাই এমন যে এখানে ‘সেবা’ শব্দটা সবসময় ‘রাজাকারজীবিতা’ শব্দের অর্থটিকে কেমন করে জানি আত্তীকৃত করে নেয়, সেবাটা আত্মসেবা হলেও কোনওমতেই স্বদেশসেবা হয়ে উঠে না বরং পরদেশসেবা হওয়ার জন্যে উন্মুখ থাকে।
গোলাম গুলমগির মনে করেন, ‘বাঙালি বানান শুদ্ধ করে লিখতে শিখুক বাংলা একাডেমি তা কখনও চায় না’। এমনটি কেবল বাংলা একাডেমি একা করে না, অন্য কেউ কেউও এমন কম্ম করতে কেন জানি একেবারে যে পিছপা নন তারও উদাহরণ আছে। যদিও এইরূপ শিয়ালপণ্ডিতিপনাকে তেমন খেয়াল করার গরজ কেউ করেন না, তবু একটু খেয়াল করলে পাঠকের কাছে ধরা পড়বে যে, আমাদের দু’জন বাংলা বানানবিশেষজ্ঞ নির্দিষ্ট একটি শব্দের বানান দু’প্রকারে লিখছেন, একজন লিখছেন ‘বিদেশি’ অন্যজন লিখছেন ‘বিদেশী’ এবং ‘ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে’ ‘বাংলা একাডেমী’ স্বপ্রণীত বানানবিধি সগৌরবে ভঙ্গ করে বানানের নিয়ম বর্ণনার বিধিবাক্যে ‘দেশি’ ও ‘বিদেশি’ না লিখে নির্দ্বিধায় লিখে দেওয়া হয়েছে ‘দেশী’ ও ‘বিদেশী’। এরকম একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দের একাধিক বানানকে আধুনিক ব্যাকরণ স্বাভাবিক ও সঙ্গত কারণেই বিধিসম্মত বা প্রমিত বলে স্বীকার করে না এবং করা সঙ্গতও নয়। একটি শব্দের বানান একরকমই হতে হবে, দু’রকম হওয়া কীছুতেই বরদাস্ত করা চলবে না। কিন্তু মুশকিল হলো প্রায় অভিধানেই একটি শব্দের একাধিক বানান প্রদত্ত হয়। উদাহারণ স্বরূপ কাজী আবদুল ওদুদ সংকলিত ব্যবহারিক শব্দকোষ অনুসারে একটি শব্দের ভুক্তি, “গাবিন, গাভিন, গাভীন, গাবীনÑ [সং গর্ভিণী] ণ. অন্তঃসত্ত্বা (পশু সম্বন্ধে বলা হয়)।” অন্যদিকে ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’—এ এই একই শব্দের ভুক্তি, “গাভিন, গাভীন [গাভিন্] বিণ গর্ভবতী, গর্ভিণী, গর্ভধারণ করেছে এমন (গাভিন গরু) (সাধারণত গরু সম্পর্কে ব্যবহৃত)। স. গর্ভিণী>প্রা. গব্ভিণ>}”। ‘গাভিন’ শব্দের বিকল্পবানান কাজী সাহেবের অভিধানে তিনটি, বাংলা একাডেমির অভিধানে দু’টি কমে হয়েছে একটি। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায় ‘ব্রাহ্মণ’ যদি ‘বামন’ হতে পারে, ‘পুরকায়স্থ’ যদি ‘পুরকাইৎ’ হতে পারে, ‘নিমন্ত্রণ’ হয়ে যায় ‘নেমতন্ন’, ‘শ্রী’ হয়ে যায় ‘ছিরি’ তবে সংস্কৃত ‘গর্ভিণী’—র প্রাকৃতরূপ গব্ভিণ (স. গর্ভিণী>প্রা. গব্ভিণ>) হতে ‘গাভিন’ না হয়ে ‘গাবিন’ হবে না কেন? মোদ্দাকথা উচ্চারণানুগত্যতাবর্জিত রক্ষণশীলতাক্রান্ত বানান সংস্কার, যে তিমিরে ছিল অদ্যাবধি সেই তিমিরেই আছে। অর্থাৎ যে কোনও শব্দের তথা বাংলাশব্দের অবিকল্পবানান নির্দিষ্টকরণ অসম্ভব পর্যায়েই থিতু হয়ে রইলো (পড়–ন থিতু করে রাখা হলো)। একটি নির্দিষ্ট শব্দের এ রকম দু’টি, তিনটি, চারটি বা ততোধিক বানান একসঙ্গে শুদ্ধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া কোনও বিচারেই সমীচীন নয়। ভাষার এই দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দেওয়াও ভাষাবিজ্ঞানের নিয়মবহির্ভূত একটি বিষয়। ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’—এ ‘দেশি’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি প্রদত্ত হয়েছে, “স. দৈশিক>প্রা. দেসিঅ>দেশি।” সংস্কৃত থেকে প্রাদেশিক হয়ে প্রমিত বাংলায় থিতু হয়েছে শব্দটি, আর তখন আমরা শব্দটিকে সংস্কৃত ‘দেশ’ শব্দের সঙ্গে হ্রস্ব ই—কার যোগে ‘দেশি’ লিপিপ্রতিমা বা বর্ণপ্রতীকে পেলাম। উক্ত অভিধানে শব্দটিকে ভুক্তিভুক্ত করা হলো শীর্ষশব্দরূপে, কিন্তু একটি বিকল্পশীর্ষশব্দসহ। সেখানে ‘দেশি’ শব্দের পরে বসিয়ে দেওয়া হলো বিকল্পশব্দের মর্যাদা সম্পন্ন ‘দেশী’ শব্দটিকেও। অর্থাৎ ‘দেশি’ শব্দটির বিকল্পবানান ‘দেশী’, উভয় বানানই নির্ভুল বিবেচ্য হবে এবং একটি সুবোধ শিশুর মনে এইরূপ বানানবৈভিন্ন্য (দ্বিবিধ কিংবা বহুবিধ বানানভেদ) দ্বিধাগ্রস্ততা তৈরি করে তার মানসিকতাকেও অসচ্ছ করে তুলবে, বানানশুদ্ধ্যাশুদ্ধি নির্বাচন করা তার পক্ষে হয়ে পড়বে ভীষণ কঠিন একটি অমীমাংসিত সমস্যা। অর্থাৎ বানানসংক্রান্ত এই সমস্যা শিশুটিকে শুদ্ধ বানানজ্ঞান থেকে বিচিছন্ন করে তোলবে। অন্যদিকে বিকল্পবানান এড়ানোর নিয়মনির্দেশ হলো বিকল্পবানানের শব্দটিকে যথাসম্ভব বর্জন অর্থাৎ ব্যবহারবহির্ভূতকরণ। এই সুবাদে এটিকে সর্বক্ষেত্রে অশুদ্ধ বিবেচনা করা উচিৎ এবং ব্যবহারবহির্ভূতকরণই সমধিক সঙ্গত, অন্তত বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রণয়নপ্রকশনার ক্ষেত্রে তো বটেই, এমনকি অন্যান্য যে—কোনও ক্ষেত্রেও। অন্যথায় বানানের সরলীকরণ বা অবৈকল্পিক বানানবিধির সম্ভবসেতু চিরদিন অনতিক্রম্যই থেকে যাবে। বানানসংস্কারের সমস্যা নিরসনে বর্তমানে অবৈকল্পিক বানানবিধির প্রতিষ্ঠা অনিবার্য ও অবিকল্প হয়ে উঠেছে। নিদেনপক্ষে তা সম্ভব করতে হলে, বিবর্তনমূলক বা অন্য কোনও বিশেষ ধরনের অভিধান ব্যতীত, সাধারণত সর্বসাধারণের ব্যবহারে লাগবে এমন কোনও ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের ক্ষেত্রে বিকল্পবানান প্রদানপদ্ধতি রহিতকরণ বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। কিন্তু বিশেষভাবে লক্ষ্য করার বিষয় যে, ‘বাংলা একাডেমী’ প্রমিত বানানবিধি রচনার ক্ষেত্রেও শব্দচয়নের সময় ‘দেশি’ শব্দের বিকল্পবানানে ‘দেশী’ শব্দটিই অগ্রাধিকার পেল এবং এমন বিকল্পবানানের অগণিত ভুক্তি বাংলা একাডেমি প্রণীত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে যৎকিঞ্চিৎ অনুসন্ধানেই যে—কারও পক্ষে আবিষ্কার করা সম্ভব। এখানে সন্দেহ নিরসনকল্পে উদাহরণ উপস্থাপনের কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না। এদিক থেকে বিবেচনা করলে, বাংলা একাডেমি প্রণীত ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে অনুসৃত বিকল্পবানানবিধির শরণাগত হয়ে কারও পক্ষে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া অসমীচীন হবে না যে, বাংলা একাডেমির বানানব্যবহারবিধি অনুসারে ‘বি’ উপসর্গ যোগে নিষ্পন্ন ‘বিদেশি’ ও ‘বিদেশী’ শব্দ দু’টির কোনওটিই ব্যাকরণবিধি লঙ্ঘন করে নি কিংবা শুদ্ধ। কারও কারও অভিমত এই যে, বিকল্পবানানবিধি ভাষার দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, “একই শব্দের দুরকম বানান রাখা যে কোনও ভাষার পক্ষেই অতি দুর্বলতা।”(১১) ‘দুর্বলতা’ বলে যতোই সমালোচনা করা হোক না কেন বিকল্পবানানবিধির এই সূত্রানুসরণ বজায় থাকলে গাবিন, গাবীন, গাভিন ও গাভীন এই চারটি বানানকেই আমজনতা সঙ্গত কারণেই শুদ্ধ বিচেনা করবেন এবং তৎক্ষণাৎ অবিকল্পবানানবিধি প্রতিষ্ঠার বারোটা বাজবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
বানানসংস্কারের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাংলা একাডেমির পশ্চাদপদতা বা রক্ষণশীলতা কিংবা ‘শেষ পর্যন্ত অজ্ঞাত পক্ষের সঙ্গে আপোষ করা’ সত্ত্বেও ইতোমধ্যেই বিকল্পবানান এড়িয়ে অবিকল্পবানান প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে বিধিপ্রণয়ন করা হয়েছে, “যেসব শব্দে হ্রস্ব ও দীর্ঘস্বরের বিকল্প বানান দেখা যায় সেগুলির বেলায় এখন কেবল হ্রস্বস্বরই (ই, উ, ই—কার, উ—কার) ব্যবহৃত হবে। এবং দীর্ঘস্বরযুক্ত বানান বিবর্জিত হবে।”(১২) শুধু অতৎসম (অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র) শব্দের ক্ষেত্রেই নয়, এমনকি অবিকৃত সংস্কৃত শব্দের ক্ষেত্রেও এমন অবিকল্পবানানবিধির মীমাংসা দেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকা ব্যবহার বিধি ‘বাংলা কী লিখবেন কেন লিখবেন’ বইয়ে লিখা হয়েছে, “তৎসম শব্দের বানানে যে সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ ও হ্রস্ব দুই স্বরই শুদ্ধ বলে গণ্য হয়, সে সব ক্ষেত্রে দীর্ঘ স্বর বর্জন করে একমাত্র হ্রস্ব স্বরই আমরা গ্রহণ করব। আর্থাৎ সে ক্ষেত্রে ‘ঈ’ স্থলে ‘ই’ এবং ‘ঈ’—কার স্থলে ‘ই’—কার, সেই সঙ্গে ‘ঊ’ স্থলে ‘উ’ এবং ‘ঊ’—কার স্থলে ‘উ—কার ব্যবহার করব আমরা।”(১৩) (চলবে)

  • [১]