ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) যখন বিশেষ বিশেষ শব্দের বিকল্পবানানের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধি তৈরি হয়ে গেছে তখন বানানবিধি নিয়ে বই লিখিয়েদের লিখায় শাড়ি, বাড়ি, গাড়ি, দেশি, বিদেশি ইত্যাদি সহজ শব্দের বিকল্পবানানকে মেনে নেওয়া যায় না অর্থাৎ এ শব্দগুলোকে অন্তত তাঁদের মতো ব্যাকরণে পণ্ডিতজনের পক্ষে প্রতিষ্ঠিত বিধি লঙ্ঘন করে ‘ঈ-কার’ দিয়ে লিখাটা কোনও বিচারেই ন্যায়সঙ্গত বা সমীচীন নয়, এমনকি মানানসইও না। অর্থাৎ এখন থেকে মুসলমানদেরকে ‘ঈদ’ নয় ‘ইদ’ করতে হবে এবং কেউ কাউকে আর ‘ঈদী’, ‘ঈদি’ কিংবা ‘ইদী’ পাঠাতে পারবেন না, পাঠাতে হবে ‘ইদি’। কিন্তু সাধারণ্যে প্রথিত-বিস্তৃত ‘প্রতিষ্ঠিত অশুদ্ধশব্দ’-এর প্রতি সৃষ্ট অকারণ ভাবাবেগ ও আচরণ ‘ইদি’ কিংবা ‘ইদি’র মতো অন্যান্য শব্দ প্রচলনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করবে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
নামপাটার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আগেই বলেছি, উপরে উদ্ধৃত নামফলকের নামগুলোর প্রত্যেকটিই বাংরেজি (বাংলা+ইংরেজি) অথবা বাংলিশ (বাংলা+ইংলিশ)। যেগুলোর প্রথমাংশে বাংলা ও শেষাংশে ইংরেজি আছে তাদের একটির দৃষ্টান্ত ‘নব অর্চি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি লিমিটেড’। এই একটি নামে সাতটি বাংলা শব্দের শেষে আছে একটিমাত্র ইংরেজি শব্দ ‘লিমিটেড’। বাংলাভাষায় নামফলকের নামনির্মিতির ক্ষেত্রে এই উটকো ‘লিমিটেড’কে অনায়াসে বর্জন করা সম্ভব। এই লেজটাকে কর্তন করে ‘নব অর্চি সঞ্চয় ও ঋণদান সমবায় সমিতি’ নামে পরিচয় প্রকাশে কোনও প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হবে বলে মনে হয় না, লোকসাধারণ এই নামে ‘সীমাবদ্ধ’ প্রপঞ্চটির অর্থবোধ থেকে বঞ্চিত হবে না, ‘সীমাবদ্ধ’ শব্দটির অনুপস্থিতি সত্ত্বেও। কারণ বাংলাভাষার অর্থবোধের বৈশিষ্ট্যই এমন। ইংরেজিতে নামের লেজ ‘লিমিটেড’-এর উপস্থিতি অর্থবোধে যতোটা অপরিহার্য বাংলানামে তার কোনও প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। ইংরেজি বাক্য ক্রিয়া ছাড়া সম্পন্ন হয় না, বাংলা বাক্য অনায়াশে হয়। নামের লেজ সীমাবদ্ধতার ক্ষেত্রেও তথৈবচ। এ ক্ষেত্রে ‘সীমাবদ্ধতা’র বোধ অর্জন করা বাংলায় যথাযথভাবেই সম্ভব, শব্দপুচ্ছ ‘সিমাবদ্ধ’ নামের সঙ্গে সংযুক্ত না থাকলেও। মাতৃভাষাচর্চায় ইংরেজির এই অকারণ অনুকরণ বাঙালির স্বভাবে ঔপনিবেশিকতার মুগ্ধতাবোধ থেকে উপজাত অবিমৃষ্যকারিতার নামান্তর মাত্র। আরবি শব্দ আগে বসিয়ে অথবা কোনও ব্যক্তি বিশেষের নামটি আরবি হওয়ার কারণে আর তার নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ হলে সে নামটি স্বভাবতই বাংরেজি বা বাংলিশ নামের মতো আরলিশ (আরবি+ইংলিশ) হয়ে যায়। যেমন তাহমিদ ট্রেডার্স, আল-কাওসার লাইব্রেরী, জালালাবাদ বেকারী এন্ড কনফেকশনারী, সোনিয়া ফার্ণিচার মার্ট, ফাতেমা ফার্ণিচার মার্ট। এমন খোঁজলে হয় তো দেদার নাম পাওয়া যাবে। তারপর আছে পুরো নামটাই ইংরেজি। যেমন লুকস লেডিস টেইলার্স (উপরে বাংলা ও নিচে ইংরেজি লিপিতে), সেল্ফ ডেভলাপমেন্ট ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (ইংরেজি লিপিতে), স্পা ফটো স্টুডিও (উপরে ইংরেজি ও নিচে প্রথম বন্ধনীতে বাংলা লিপিতে), ফুজি কালার (ইংরেজি লিপিতে), ফটো জোন কালার ল্যাব (নিচে ইংরেজি লিপিতে), আইডিয়াল লাইব্রেরী এন্ড স্টেশনারী, নিউ গ্লোব লাইব্রেরী, পপুলার লাইব্রেরী, জেন্টস হেয়ার স্টাইল ও টেলি জোন ইত্যাদি।
এস. ওয়াজেদ আলীকে ‘খাঁটি বাঙালি’ বলেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি এই বাঙালির বাংলাভাষা সংক্রান্ত মানসতা সম্পর্কে এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, “যখন বাঙালি পাওয়া যেতো না, ভারতীয় মুসলমান পাওয়া যেতো সেই সময়ে, ১৯৩০ সালে লিখিত ‘বাঙালি মুসলমান’ নামে একটি প্রবন্ধে তিনি বলেছেন, বাঙালিকে সর্বপ্রথমে বাঙালি হতে হবে, অর্থাৎ মাতৃভাষা চর্চা করতে হবে।”(১৪) যিনি মনেপ্রাণে অনুভব করেন বাঙালিকে বাঙালি হয়ে উঠতে হলে বাংলাভাষা চর্চা করতে হবে, তাঁকে লোকে যে-নামে (এস. ওয়াজেদ আলী) চেনে সে-নামে মোটেও তিনি বাঙালি নন। তাঁর নামের কোথাও বাংলাভাষার নামগন্ধ নেই, যেমন আমার নামেও নেই। কিন্তু তিনি চিন্তাচেতনায় ও জীবনচর্চায় আপাদমস্তক বাঙালি। তিনি যখন ‘বাঙালিকে সর্বপ্রথমে বাঙালি হতে হবে, অর্থাৎ মাতৃভাষা চর্চা করতে হবে’ প্রচার করেন তখন থেকে সময় পার হয়ে গেছে প্রায় পৌনে একশতাব্দী। এতো দিন পরেও ব্যক্তিনাম দূরে থাক এমনকি প্রতিষ্ঠানের নামকরণ নির্জলা বাংলায় করা সম্ভব হয় নি, সেখানে আরবি-ফারসির চেয়ে বেশি চলছে ইংরেজি।
ইন্দোনেশিয়া একটি মুসলিম দেশ, সেখানে সুকর্ণপুত্রী মেঘবতী একটি মুসলিম নাম, তিনি ইন্দোনেশিয়ার পেসিডেন্ট ছিলেন, তাঁর নামটি সংস্কৃতপ্রপন্নতাপন্ন, অর্থাৎ ভারতীয় মুসলিম নামায়নে অনুসৃত ধর্মদ্যোতক আরবি-আপন্নতা নেই। এই সংস্কৃতনামের কারণে কিন্তু তার মুসলিম পরিচয় বিপদাপন্ন হয় না, সর্বার্থে নির্বিঘœই থাকে। বাঙালি মুসলমান মনে করেন, তাঁর নামটি আরবিতে না হলে তার মুসলিম পরিচয় সঙ্কটাপন্ন হয়ে পড়বে, তাঁর চেতনায় এই মুসলিম পরিচয় সঙ্কটাপন্নতার ভীতি অনুপ্রবিষ্ট ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে এখানে ইসলাম প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই। আরবিভাষা ব্যতীত অন্যভাষায় নামকরণের এই অকারণ মুসলিম পরিচয় সঙ্কটাপন্নতার ভীতির একটাই অর্থ হতে পারে : বাঙালি মুসলমান নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে বাঙালি হয়েও এখনও পরিপূর্ণ বাঙালি হতে পারেনি, যদিও ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেই ১৯৭১ সালে। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতপরিসর সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বাঙালি এখনও সাংস্কৃতিক কিংবা ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতায় পর্যবসিত হয়ে আছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বিপরীতে যেমন ইরানি মুসলমানরা মুসলমান হয়েও পরিপূর্ণ ইরানি হয়ে উঠতে পেরেছে, বাঙালি সে-সাংস্কৃতিক বিকাশের উচ্চতাকে স্পর্শ করতে পারে নি। অথচ ‘বাঙালিকে সর্বপ্রথমে বাঙালি হতে হবে, অর্থাৎ মাতৃভাষা চর্চা করতে হবে।’ এই প্রস্তাবনা এস. ওয়াজেদ আলী কর্তৃক উত্থাপনের প্রায় দেড়যুগ আগে ১৯১৩ সালে বাংলাসাহিত্য যথারীতি নোবেল পুরস্কার অর্জন করে বসে আছে। আর ১৯৪৭ সালের পর এই দেশেই, যে-দেশের মানুষের মাতৃভাষা বাংলা, এই নোবেল পুরস্কার বিজয়ীকে নিধিদ্ধ ঘোষণা করেছে রাষ্ট্রশরিক পশ্চিমারা (পাকিস্তানি অবাঙালিরা), বাঙালিদের একাংশ তখন পশ্চিমাদের দালালি-গোলামিকে পবিত্র কর্তব্য বলে বিবেচনা করে নিজেদেরকে রাজাকার করে তোলেছে। এই পরম পরার্থপরতায় নিহিত আত্মবিরোধ (স্ববিরোধিতা) বাঙালি মুসলমানের একটা বড় দুর্বলতা। এই দুর্বলতার প্রকোপে ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতা বাঙালি মুসলমানের চরিত্রে প্রবল। তাই এখনও, মুক্তিযুদ্ধোত্তর ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও, সে তার বাসার সামনে দোকানটার নামকরণে বাংলাকে অন্ত্যজ করে রাখে, বাড়ির নামকরণ করতে গিয়ে ‘বাড়ি’ শব্দের আরবি ‘বায়তুল’ ব্যবহার করে অবলীলায় এবং প্রমাণ করে জাত্যাভিমান দূরে থাক স্বাজাত্যবোধ বলে তার কীছু নেই। এমনকি কোনও কোনও অমুসলিমও, যাঁর চরিত্র সাধারণত বাংলাভাষাবিদ্বেষের আপবাদে অকলঙ্কিত, তিনিও ইংরেজিপ্রীতির পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে কম পারদর্শী নন। তিনি তাঁর দোকানের নামপাটায় ‘গুড লাক স্টেশনারি অন্তর এন্ড অন্ময় ষ্টোর’ লিখে দিয়ে যথারীতি প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি অমুসলিম হলে কী হবে, বাংলাভাষাচর্চা থেকে দূরে থাকতে তিনিও ব্যতিক্রম কেউ নন। ‘গুড লাক স্টেশনারি’ উপরের সারিতে তিনি লিখেছেন ইংরেজি বর্ণে। তার পরের সারিতে বাকিটা বাংলাবর্ণে, সেখানে তাঁর প্রিয়জনের বাংলা নাম ব্যতীত অন্য শব্দগুলো ইংরেজি। তার নিচে বাংলা ‘স্বত্বাধিকারী’ শব্দটিকে মগজাভিধান থেকে ঝেটিয়ে দিয়ে লিখেছেন ইংরেজি ‘প্রপ্রাইটর’ শব্দের সংক্ষেপায়ণ ‘প্রোঃ’, যদিও এই ‘প্রোঃ’-এর পরে নামের জায়গাটি খালি পড়ে আছে।
বাংলা ‘স্বত্বাধিকারী’ শব্দটিকে উপেক্ষা করে যখন ইংরেজি ‘প্রপ্রাইটর’ শব্দটিকে সম্প্রদায় নির্বিশেষে বাংলাভাষীরা ব্যবহার করেন, তখন তাঁরা নামফলকের শব্দানুসন্ধানে শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ কিংবা নিদেনপক্ষে হাতের কাছের ‘বাংলা একাডেমী’র ব্যবহারিক বাংলা অভিধান সযতেœ পরিহার করেন এবং প্রকারান্তরে ইংরেজি ভাষাভা-ার হাতরাতে হাতরাতে ভিখারি হয়ে ওঠেন শব্দরতেœর সন্ধানে এবং প্রমাণ করেন বাংলাভাষা নামফলকের নামকরণে উপযুক্ত শব্দশূন্য একটি ভাষা, যদিও তা সর্বার্থে মিথ্যা। বাঙালির এই ভিখেরিপনার, যেটাকে বোধ করি হীনম্মন্যতা বলাই অধিক সঙ্গত হবে, প্রকৃতপ্রস্তাবে কোনও দরকার আছে বলে মনে করি না। কারণ জগৎসংসার ও বিশ্বব্রহ্মা-ের সকল মূর্তবিমূর্ত বস্তুর নাম, বাঙালির সমাজ ও চলিতকর্মের বহির্ভূত বা বিলগ্ন যৎসামান্য নাম বাদে, বাংলাভাষায় যথারীতি বিদ্যমান। যেমন ইংরেজি ‘ইন্টারনেট’ বাংলাভাষাবহির্ভূত অর্থাৎ বাঙালির সমাজ ও চলিতকর্মের বহির্ভূত একটি শব্দ। ‘প্রপ্রাইটর’ শব্দটির অর্থপ্রদ বাংলা শব্দ বাঙালির সমাজ ও চলিতকর্মের বহির্ভূত নয়, এর (‘প্রপ্রাইটর’ শব্দটির) অর্থ প্রকাশে সমর্থ ‘স্বত্ত্বাধিকারী’ শব্দটি বাংলাভাষায় বিদ্যমান, কিন্তু ‘ইন্টারনেট’ শব্দের অর্থদ্যোতনাবিশিষ্ট শব্দ বাংলাভাষায় অবিদ্যমান, তাই ইতোমধ্যে এর বঙ্গায়ন করা হয়েছে ‘আন্তর্জাল’। পরভাষার শব্দের ভাবপ্রকাশে বাংলাভাষায় অবিদ্যমান শব্দের বঙ্গায়ন একটি চলমান বৈয়াকরণিক প্রকরণ। এমনি করে বাংলা বাংলাই থেকে যাবে, কৃতঋণশব্দের ভারে ন্যূব্জ (প্রকৃতপ্রস্তাবে বাংলিশ) হয়ে পড়বে না। তদুপরি কোনও কোনও প্রাজ্ঞজনের ধারণা যে, আগমী শতকে বাংলা বিশ্বনাগরিকের ভাষা হয়ে উঠবে। যাঁরা ‘স্বত্বাধিকারী’ ব্যবহার না করে ‘প্রপ্রাইটর’ ব্যবহার করেন তাঁরা মোটেও চিন্তা করেন না যে, এই শব্দটি সাধারণ্যে, একজন কৃষক অথবা শ্রমিকের কাছে, কতোটা দুর্বোধ্য। সাধারণ্যের যাঁরা সাধারণভাবে পড়তে জানেন, তাঁরা ‘প্রোঃ’ থেকে ‘প্রপ্রাইটর’-কে উদ্ধার করতেই অপারগ, ‘প্রপ্রাইটর’-এর অর্থবোধক বাংলা প্রতিশব্দ ‘স্বত্বাধিকারী’-কে উদ্ধার করা তো তাঁদের পক্ষে দিল্লি দূরস্থ। তাঁদের মগজাভিধান, উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কোনও এক পৌরকলেজের ইংরেজিতে প-িত অধ্যাপকের মগজাভিধানের তুল্য নয়, এরকম শব্দের অর্থোদ্ধারে ইংরেজিতে ওস্তাদ অধ্যাপকের আয়ত্বাধীন জাদু তাঁদের অনায়ত্বে। তদুপরি এই ইংরেজি ‘প্রপ্রাইটর’ শব্দটি কোনও বাংলাভাষীর চেতনায় কোনও চিত্রকল্প তৈরি করে বলে মনে হয় না, বাংলা ‘স্বত্বাধিকারি’ যেমন কোনও একটা চিত্রকল্প তৈরি করে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, বাংলাভাষীদের কেউ কেউ ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার কারিন্দাগিরি থেকে অবসর নেবেন না বলে পণ করে বসে আছেন, আর বসে বসে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার আত্মঘাতী ষড়যন্ত্র সাড়ম্বরে করে চলেছেন। একবার এক পত্রিকার সম্পাদকীয় লিখতে গিয়ে সম্ভবত ‘অবিমৃষ্যকর’ শব্দটিকে ব্যবহার করে ‘অবিমৃষ্যকারিতা’র নিন্দাবাদে বিভূষিত হয়েছিলাম। ইরেজিতে উচ্চ শিক্ষিত সম্পাদক নিজে একজন অধ্যাপক। তিনি শব্দটিকে জনবোধ্যতার পরিসর থেকে ছেঁটে দিয়ে সংবাদপত্রের ভাষাপরিসরে শব্দটিকে অপাঙক্তেয় ও অবাঞ্ছিত করে তুলতে চাইলেন। নিজের নামের আগে যখন ‘অধ্যক্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করেন, তখন ‘অবিমৃষ্যকারিতা’ শব্দটির সাপেক্ষে ‘অধ্যক্ষ’ (‘অধ্যক্ষ’ শব্দের পাশাপাশি ‘অধ্যাপক’ শব্দটিও তার ব্যতিক্রম নয়) শব্দটির জনবোধ্যতার মাত্রা অর্থাৎ আমজনতার কাছে সেটা (‘অধ্যক্ষ’ শব্দটি) কতোটা সুবোধ্য, তাঁরা (আমজনতা) সেটার যথাযথ অর্থ জানেন কি না, জানলে কতোটা জানেন ঘুনাক্ষরেও একবার ভেবে দেখেন না। তেমনি আর একজন বিদ্যান, সংবাদপত্রে কাজ করেন, ‘প্রপঞ্চ’ শব্দটির গাত্রে জনবোধ্যতা নয় দুর্বোধ্যতার প্রশ্ন তোলে ব্যবহার অযোগ্যতার তকমা সেঁটে দিতে কেন জানি (বোধ করি, স্বকীয় অজ্ঞতাপ্রসূত বিচ্ছিন্নতা এবং কীছুটা হলেও পরপ্রাজ্ঞতার প্রতি অনাস্থাপ্রসূত ব্যাধিগ্রস্ততা থেকে প্রাণীত হয়ে) উসখুস করেন। ‘প্রপ্রাইটর’ শব্দটিই নয় কেবল, এমন ইংরেজি শব্দের, তা যতোই জনদুর্র্বোধ্য হোক না কেন, যত্রতত্র ব্যাপক ব্যবহারের বিরুদ্ধে কিন্তু এইসব ভষাসাংস্কৃতিক ঔপনিবেশিকতার ভৃত্য বিদ্যানের পক্ষ থেকে কোনও আপত্তি উত্থাপিত হতে দেখা যায় নি কিংবা যায় না। এই রকমের অদ্ভুতসব বিদ্যানদের নিকট যে-কোনও বাংলা অভিধানে ভুক্তি বা উপভুক্তি ভুক্ত কোনও একটি শব্দ পাত্তা পায় না, যতোটা পাত্তা পায় কোনও একটি বিভাষী শব্দ, শব্দটি যদি কৃতঋণশব্দরূপে বাংলাভাষাদেশে প্রবসিত কিংবা গৃহীত (চেয়ার, টেবিলের মতো) না হয়ে থাকে, তৎপরেও। এই বিভাষী শব্দের (এখানে ‘প্রপ্রাইটর’) জোর একটাই, সে গোলকায়নের পরিপ্রেক্ষিতে সা¤্রাজ্যবাদী মস্তানভাষা ইংরেজির পরাক্রমী সদস্য এবং ইংরেজরা একদা এই ভারতীয় উপমহাদেশে দীর্ঘ পৌনে দু’শ’ বছরের প্রত্যক্ষ উপনিবেশিক ছিল এবং এখনও পরোক্ষ উপনিবেশিক প্রকারান্তরে তারাই এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির পতাকাতলে প্রতিষ্ঠিত নয়া ঔপনিবেশিকতার তাঁবেদাররা এখনও ক্ষমতাসীন এবং অনিবার্যভাবেই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক বিধায় কমবেশি সংস্কৃতিরও নিয়ন্ত্রক। বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নিতান্ত সংখ্যালঘু মধ্যবিত্ত শিক্ষিত উন্নাসিক শ্রেণিটির মাতৃভাষার প্রতি (এখানে মাতৃভাষার একটি শব্দ ‘স্বত্ত্বাধিকারী’) এই অবিমৃষ্যকর বিমাতাসুলভ আচরণের নির্গলিতার্থ একটাই, সেটা ভাষাসাংস্কৃতিক শত্রুতার নামান্তর ভিন্ন অন্য কীছু নয়। এই অবিমৃষ্যকারিতা থেকে বিরত থাকা বাংলাভাষার পবিত্রতা রক্ষা নয় বরং অস্তিত্বরক্ষার প্রশ্নে অত্যন্ত গুরুত্ববহ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষিতদেরকে বিষয়টা অবশ্যই হৃদয়ঙ্গম করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, ভাষাহীন জাতি কোনও জাতি নয়, ভাষাহীন মানুষ পরভাষীর সহজ দাসে পরিণত হয়, এটাই তার একমাত্র নিয়তি । কোনও মানুষের ভাষা যে-মুহূর্তে অপহৃত হয়, সে-মুহূর্তে সে-মানুষ স্বাধীন মানুষের মর্যাদা হারায়, তার জীবনে স্বাধীনতা বলে কীছু থাকে না।
পাকিস্তানি আমলে আমাদের পুস্তকালয়গুলো ‘কিতাবিস্তান’ হয়ে গিয়েছিল এখন ‘লাইব্রেরি’ হয়ে উঠেছে। এই ভাষিক পরিযায়িতা বাঙালি মুসলমানের একটি ক্ষুদ্রাংশের চারিত্র্যলক্ষণ, যাঁরা শ্রেণি হিসেবে ঔপনিবেশিকতার সাংস্কৃতিক দাসত্বপঙ্কে নিমজ্জিত কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে বঙ্গদেশে কমবেশি এখনও পর্যন্ত সমাজনিয়ন্ত্রকের আসনে সমাসীন। পরদেশ-পরসংস্কৃতির দাসত্বই বঙ্গদেশে পরজীবী এই সম্প্রদায়ের হাতে ‘করে খাওয়ার’ একমাত্র হাতিয়ার। এই চারিত্র্যলক্ষণ ঔপনিবেশিকতাসঞ্জাত এক প্রকার অদ্ভুত মানসিক ব্যাধি, যার একটি উপসর্গকে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা বলা যেতে পারে। অদ্ভুত এ জন্য যে, তাঁরা অপাদমস্তক বাঙালি, বাংলাভাষা তাঁদের মাতৃভষা, কিন্তু এই মাতৃভাষাকে তাঁরা আববি হরফে লিখার স্বপ্নে বিভোর হয়ে উঠতে সহসাই পাগলপারা হয়ে পড়েন বা এই ভাষায় আরবি-ফারসি শব্দ গাদনক্রিয়ার মতো করে প্রবিষ্টকরণে ব্যতিব্যস্ত হন, আরবি-ফারসি প্রবসনে ব্যর্থ হলে অন্তরের নিভৃতে সুপ্ত বাতিক চরিতার্থ করতে ইংরেজি তো তাঁদের হাতের পাঁচ। বোধ করি একেই বলে : অঙ্গার শত ধৌতেন মলিনত্বং ন মুঞ্চতে। বাংলা মুল্লুকে লোকে মাগনা (এমনি এমনি) বলে না : ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। এই বিশেষ এক শ্রেণির বাঙালি মুসলমান যাঁরা নিজেকে মধ্যপ্রাচ্যজাতীয় বা তৎবংশোদ্ভূত ভাবেন, বাংলাভাষাকে ভাবেন বাংলাভাষাদেশে প্রতিবেশী ধর্মসম্প্রদায় হিন্দুদের ভাষা, এমনকি কেউ কেউ একটু সম্পদশালী হলে নিজেকে এই দেশের নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে আপন মানুষজনের থেকে আলাদা করে নিয়ে (প্রকৃতপ্রস্তাবে স্বজাতি থেকে স্বীয় জাতিগত পরিচয়কে ‘আলাহিদা’ করে তোলে বিচ্ছিন্নতায় আপন্ন হয়ে) ইরাক, ইরান, আবরের থেকে আগত সম্ভ্রান্ত মুসলিম বলে প্রচার করে সমাজে পৈতে পাওয়ার প্রচেষ্টায় প্রাণপাত করেন। এ এক অদ্ভুত কিন্তু ভীষণ হীনম্মন্যতার আদলে বিচ্ছিন্নতার ভয়ঙ্কর প্রতিরূপ, যাকে বলে : স্বীয় সমাজ, প্রজাতি, দেশ, ভাষা, মানুষ সর্বোপরি সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা। এমনকি এই স্বাজাতিক ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাকে অন্যভাবে বলা যায়, নিজেকে নিজের থেকে বিচ্ছিন্ন করা। এ সম্পর্কে বদরুদ্দীন উমর বলেন, “ধর্মচেতনার ফলে মুসলমানরাও এইভাবে বাঙলা ভাষাকে আরবী ফারসীর চোগা চাপকান পরাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে অনেক পরের কথা। কারণ উনিশ শতকে বাঙলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত ও অবস্থাপন্ন মুসলমানরা বাঙলাকে নিজেদের ভাষা বলে বিবেচনা করতেই প্রস্তুত ছিলেন না। তাঁরা সাধ্যমত উর্দু ফারসীতে কথা বলতেন এবং বাঙলা ভাষার চর্চা থেকে বিরত থাকতেন। এক্ষেত্রে তাদের আংশিক মোহমুক্তি ঘটতে সময় লাগলো অনেক এবং তারপর যখন তাঁরা অনেকে বাঙলা লেখাপড়ার প্রতি কিছুটা আগ্রহশীল হলেন তখন কারো কারো চেষ্টা হলো বাঙলা ভাষাকে মুসলমানী চরিত্র দান করার। হিন্দুরা যেমন সংস্কৃতের দিকে ঝুঁকেছিলেন এ সকল মুসলমানেরাও তেমনি বাঙলা চর্চাকালে ঝুঁকলেন আরবী ফারসী এবং উর্দুর দিকে। ব্যাকরণের কাঠামোকে কোনরকমে খাড়া রেখে তথাকথিত মুসলমানী অর্থাৎ আরবী ফারসী শব্দের সম্ভারে বাঙলা ভাষাকে অলঙ্কৃত করার জন্য তাঁদের চেষ্টা এবং উদ্বেগের অবধি রইলো না। তাঁদের হাতে বাঙলা ভাষা আবার বন্দী হলো আরবী ফারসীর নতুন খাঁচায়।”(১৫) তাঁরা এই স্বকপোলকল্পনায় নিমগ্নাবস্থায় কালাতিপাত করতে সবিশেষ পছন্দ করেন। ভাষাব্যবহারে তাঁদের এমন অবস্থানগত বাস্তবতাটিকে একধরনের মতিচ্ছন্নতা কিংবা বিচ্ছিন্নতা ভিন্ন অন্য কীছু বিবেচনা করার কোনও অবকাশ নেই। এই মতিচ্ছন্নতার মগ্নতা থেকে উপজাত ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার ব্যাধি এতটাই নাছুঁড়বান্দা যে, অনাবশ্যক লেজের মতো তাঁদের পিছনে লগ্ন হয়েই আছে। আর কালক্রমে এই ব্যাধির আধিতেই কেবল নয়, ক্ষেত্র বিশেষে সে ব্যাধিতে সমাজের প্রায় সকলেই জান্তে-বা-অজান্তে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। এই উৎকটাবস্থার সম্যক পরিচয় মেলে এক বিদগ্ধের লেখায়। এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, “অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যেন বাংলা ভাষায় শুদ্ধাশুদ্ধি বলে কিছু নেই। পদে পদে ভিরমি খেতে হয়। এটি গৌরবের কথা নয়। শিক্ষার্থীগণ যে সব বইয়ের দোকান থেকে বই কেনে সেই লাইব্রেরিগুলোর সাইনবোর্ডও তথৈবচ। ‘বন্ধু লাইব্রেরী এন্ড ষ্টেশনারী’ নামটিতে প্রমিত ভাষা অনুযায়ী তিন তিনটি ত্রুটি রয়েছে। নিঃসন্দেহে এগুলো অমনোযোগিতা, অসাবধানতা, অবহেলা ও অজ্ঞতার ফলে সৃষ্ট। কিন্তু এই মারাত্মক ভুলগুলোর প্রভাব সুদূর প্রসারী। অনেক শিক্ষার্থী জীবনভর এই ভুলের বোঝা বয়ে বেড়ায়।”(১৬)
তবে মনে রাখতে হবে, বাঙালি কেবল ভুলের বোঝার মন্দার পাহাড় হনুমানের মতো বয়ে বেড়ায় না, মাঝে মাঝে একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন কিংবা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সংঘটক হয়ে উঠে। ভুল বানানের বোঝাও বাঙালি একদিন ঘাড় থেকে ছুঁড়ে ফলে দেবে এবং যাঁরা এইসব ভুলচর্চার প্ররোচক তাঁদেরকে কুলাঙ্গার বলে চিহ্নিত করতে পিছ পা হবে না।
তথ্যসূত্র :
১. জ্যোতিভূষণ চাকী, বাগর্থকৌতুকী, আনন্দ, দ্বিতীয় সংস্করণ : আগস্ট ২০০৬, পৃষ্ঠা : ৩৭।
২. বাংলা স্ল্যাং, অভ্র বসু, প্যাপিরাস কলকাতা, দ্বিতীয় মুদ্রণ : আগস্ট ২০০৬, পৃষ্ঠা : যথাক্রমে ৩১৩ ও ৩০৮।
৩. ইকবাল কাগজী, কাগজীর কারচুবি. চৈতন্য প্রকাশন, একুশের বইমেলা ২০১১, পৃষ্ঠা : ৪৯।
৪. সুকুমার রায়, সুমার রায় রচনা সমগ্র, ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ১০।
৫. শ্রী প্রভাস চন্দ্র দাস ও ড. সুধাংশু ভূষণ চট্টোপাধ্যায়, বৈজ্ঞানিক প্রথায় ফলচাষ (১ম খ-), ভারতী বুক স্টল, প্রথম প্রকাশ : বইমেলা জানুয়ারি ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ৩২।
৬. উদয় নরায়ণ সিংহ, লেখা-কর্ম, বাংলাদেশের হৃদয় হতে, তৃতীয় বর্ষ প্রথম সংখ্যা : ১ ফাল্গুন ১৪১৬, পৃষ্ঠা : (১৬-১৭)।
৭. হুমায়ুন আজাদ, বাঙলা ভাষার শত্রুমিত্র, আগামী প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ : ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃষ্ঠা : ৫৬।
৬. মাহবুবুল হক, পাঠ্য বইয়ে বাংলা বানানের নিয়ম, সাহিত্য প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৪, পৃষ্ঠা : ৬২।
৯. বাংলা লেখার নিয়ম কানুন, হায়াৎ মামুদ, প্রতীক, প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি, ১৯৯২, পৃষ্ঠা : ২৩।
১০. বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান, বাংলা একাডেমী ঢাকা, ডিসেম্বর ২০০০-য়ে পরিমার্জিত সংস্করণের চতুর্দশ মুদ্রণ, ২০১১, পৃষ্ঠা : ১২২০।
১১. সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আমি কি বাঙালি? পত্র ভারতী কলকাতা, জানুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা : ৭৫।
১২. মাহবুবুল হক, পাঠ্য বইয়ে বাংলা বানানের নিয়ম, সাহিত্য প্রকাশ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪, পৃষ্ঠা : ১৩।
১৩. বাংলা কী লিখবেন কেন লিখবেন, সম্পা. নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড কলকাতা, অষ্টম মুদ্রণ, এপ্রিল ১৯৯৩, পৃষ্ঠা : ১০।
১৪. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাঙালি কাকে বলি (প্রবন্ধ : খাঁটি বাঙালি), আহমদ পাবলিশিং হাউস, দ্বিতীয় সংস্করণ : জুলাই ১৯৯১, পৃষ্ঠা : ১০৪।
১৫. বদরুদ্দীন উমর ॥ ধর্ম, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িকতা ॥ চিরায়ত প্রকাশন কলকাতা ॥ প্রথম প্রকাশ : আগস্ট ১৯৯৩ ॥ পৃষ্ঠা : ১৭৮।
১৬. কল্লোল তালুকদার, তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো, বর্ণমালা …, সাপ্তাহিক সুনামকণ্ঠ, ৯ জুলাই ২০০৩, পৃষ্ঠা : ৯।
০৫. ইংরেজিপ্রীতির প্রায়োগিকতা ও ঔপনিবেশিকতার কারিন্দাগিরি
প্রসঙ্গটা যদি বাংলাভাষীর ইংরেজিপ্রীতি ও এই ইংরেজিপ্রীতির সঙ্গে ওতপ্রোত ঔপনিবেশিকতার পরিসরে দাসত্বভাবাপন্নতা হয়, তা হলে অনিবার্যভাবেই আত্মঘাতী বাঙালির বহুবিতর্কিত ও বিখ্যাত প্রসঙ্গটি ওই দু’টি প্রসঙ্গের (বাংলাভাষীর ইংরেজিপ্রীতি ও ঔপনিবেশিকতার পরিসরে দাসত্বভাবাপন্নতা) সঙ্গে যেমন একান্ত সমীপস্থ ও লগ্ন হয়ে পড়ে বাঙালির ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার (ধষরবহধঃরড়হ) প্রপঞ্চটি, তেমনি অনিবার্যভাবেই ওতপ্রোত হয়ে উঠে রাজনীতিতে বাঙালির ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতার প্রাপঞ্চিকতাও, এড়ানো যায় না কীছুতেই। এই ‘রাজনীতিতে বাঙালির ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা’কে একজন ‘আত্মঘাতী রাজনীতি’ বলে অভিহিত করেছেন।
৩১ মার্চ ২০১১ তারিখে প্রকাশিত ‘সপ্তাহের বাংলাদেশ সাপ্তাহিক’-এর ‘স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা’ বেরিয়েছে। তাতে প্রচ্ছদ কাহিনী ‘অত্মঘাতী বাঙালি’ লিখেছেন শুভ কিবরিয়া। প্রবন্ধটিতে ভিন্ন ভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাসংঘটনের কিংবা কার্যকলাপের পরিসরে পল্লবিত বিচিত্র প্রকারের আত্মঘাতী প্রবণতার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়েছে, যে-গুলোকে অনায়াসে বাঙালির বিযুক্তিগ্রস্ততা বলেও অভিহিত করা যায়। যেমন নোবেলপ্রাপ্তির বিরোধিতা, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, স্বাধীনতার বিরোধিতা, স্বৈরতান্ত্রিকতাপ্রীতি, অগণতান্ত্রিকতা, আর্থসামাজিক-রাজনীতিক-প্রশাসনিক দুবৃত্তায়ন, বিজ্ঞানমস্কতার অভাব, মৌলবাদিতার বিস্তার, আত্মপরতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্বার্থলিপ্সা, জাতীয় স্বার্থে সংঘবদ্ধতার প্রতি অনীহা, মাৎসর্য (ঈর্ষা, হিংসা ও পরশ্রীকাতরতা), শ্রেণিস্বার্থে ধর্মের ব্যবহার, নেতিবাচকতা ইত্যাদি। কিন্তু বাঙালির সর্ববিযুক্তিগ্রস্ততা থেকে মুক্তির সর্বোত্তম পথ সমাজতন্ত্র, এই সমাজতন্ত্রের সঙ্গে বাঙালির বিচ্ছিন্নতার প্রতিমূর্তি ‘সমাজতন্ত্রবিরোধিতা’র প্রসঙ্গটি বোধ করি তিনি সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন এবং বাঙালি বুদ্ধিজীবীর এই সীমাবদ্ধতাও একধরণের বিচ্ছিন্নতা কিংবা বিযুক্তি। কিন্তু একাত্তরোত্তর বাংলাদেশে রাজাকারজীবিতার প্রতীকায়ণে উত্তরোত্তর প্রবল হয়ে উঠা বিচ্ছিন্নতার প্রপঞ্চটি তাঁর চোখ এড়ায় নি। তিনি এক জায়গায় লিখেছেন, “১৯৭১-এর বিশ্বসঘাতকরা স্বাধীন দেশে ফিরে আবার সক্রিয় হয়; স্বাধীন বাংলাদেশে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হওয়ার আগেই সপরিবারে খুন হলেন স্বয়ং জাতির জনক। দল ও দেশের আত্মঘাতী মানুষেরা অস্ত্র তুলে খুনের রঙে রাঙ্গিয়ে দিল জাতির অনাগত ভবিষ্যত। চল্লিশ বছর পিছন ফিরে তাকালে এরপর সেই খুনি ও আত্মঘাতী রাজনীতির ধারবাহিকতাই চোখে পড়বে কেবল।” (১)
ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা সংক্রান্ত আলোচনায় এইসব প্রসঙ্গ (পরভাষাপ্রীতি, ঔপনিবেশিক দাসত্ব, অগণতান্ত্রিকতা, রাজাকারজীবিতা, আত্মঘাতী রাজনীতি, আর্থসামাজিক-রাজনীতিক-প্রশাসনিক দুবৃত্তায়ন, মাৎসর্য ইত্যাদি) এ কারণেই অনিবার্যভাবে সমীপস্থ কিংবা ওতপ্রোত হয়ে উঠে যে, বাংলাভাষার সর্বাত্মক বিকাশ, বিস্তার ও প্রকর্ষতা এইসব প্রসঙ্গের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য নির্ভরতার সম্পর্কে জড়িত এবং প্রভাবিত। এখনও ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের প্রশাসনিক নির্দেশ বাস্তবে কোনও ফলপ্রসূতা অর্জন করে না, প্রাথমিকেই ইংরেজিতে হাতে খড়ি নিতে হয়, মাদ্রাসায় বাংলা প্রাধান্য পায় না, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজির মস্তানি অব্যাহত আছে এবং একদা এখানে রাজনীতিক-সমাজচিন্তক কিংবা তথাকথিত বদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছিল, বাংলা কার মাতৃভাষা (কিংবা কোন্টি বাংলাভাষী জনগোষ্ঠী)? এই প্রশ্নের উত্তরে সমুৎপন্ন বিতর্কে বাংলাভাষী বুদ্ধিজীবীরা পার করে দিয়েছেন যুগের পর যুগ। বাংলাভাষাটা বৌদ্ধদের, না হিন্দুদের, না কি মুসলমানদের ? ভাষা নিয়ে এই অকারণ বিতর্ক উজ্জীবিত করে, প্রকারান্তরে কূটতর্কে প্রপন্নতার আবহ সৃষ্টি করা হয়েছে বার বার এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলাভাষাদেশে ভাষাবিচ্ছিন্নতার এক সাংস্কৃতিক উর্বরতা তৈরি করা হয়েছে রাজনীতিক ও বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক স্বার্থোদ্ধারের অভিপ্রায়ে। প্রকৃতপ্রস্তাবে এই ভাষাবিচ্ছিন্নতা সা¤্রাজ্যবাদী রাজনীতির অনেক কূটকৌশলের একটি বিশেষ কৌশল মাত্র। সমাজবাস্তবতায় এর প্রতিফলন এতোটাই প্রকট যে, আজকালকার শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাবুর কাছে ইংরেজি হলো রঙমহলের প্রিয় নটীবিনোদিনী আর বাংলা হলো অন্দরমহলের উপেক্ষিতা বেগম, এই বাবুদের মুখের বুলির স্বরূপটি হলো ভুলভাল, যেমন তেমন করে হোক একটা, চলেবল ইংরেজি প্রক্ষেপণ কিংবা ফিরিঙ্গিমার্কা শব্দ ও বাক্যের বিগলিত অনর্গল ঝর্ণাধারার প্রতিরূপ। ইংরেজি মাধ্যমে বিদ্যার্জনের চল বেড়েছে ঘরে ঘরে। উচ্চআদালতে ও উচ্চশিক্ষার স্বর্গভূমিতে ইংরেজির মাতাল হাওয়ার ঘুর্ণি এখনও ঘুরপাক খায়।
কারও অবিদিত নয় যে, আরবি-ফারসি-উর্দুকে বাংলাভাষাদেশে রোহিঙ্গাদের মতো প্রক্ষিপ্তকরণ, বাংলাবর্ণ বদলানোর (বাংলাভাষাকে আরবি বর্ণে লেখার প্রচলন করে বাংলাবর্ণের সমুৎপাটন সম্পন্নের) প্রস্তাব করা, রবীন্দ্রনাথকে নিষিদ্ধকরণ, নজরুলকে সংশোধন করা ইত্যাদি প্রবণতার যৎকিঞ্চিৎ নিবারণ-প্রশমন ঘটেছে ১৯৭১-য়ে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ভাষাভিত্তিক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর, তৎপরেও সবটা নয়। ধর্মাবরণে মোড়ানো ভাষার আক্রমণ প্রশমিত হতে না হতেই মাইকেলি সময়ের পুরোনো সেই ইংরেজিপ্রীতির ধ্বজাধারীরা এখন উভয় বঙ্গে বাংলাভাষার উপর ইংরেজির ভয়াবহ ভার চাপিয়ে দিতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছে। বোঝার উপর শাকের আঁটি হলে কোনও কথা ছিল না। কিন্তু বিষয়টি সে রকম হালকা ও তুচ্ছ কীছু নয়। কলকাতার দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয়তে বলা হচ্ছে, “আরও দ্বিগুণ উদ্যোগে ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনের কথা স্বীকার করে নিয়েও মাতৃভাষাকে অবহেলা করার ব্যাপারটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। আমাদের দেশে যে একটাই মুশকিল। যারাই ইংরেজিতে কৃতবিদ্য হয়, তাদের প্রায় সকলেই মাতৃভাষা থেকে দূরে সরে যায়। (চলবে)