ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর)
৫. পরকীয়া চিত্রাবলি, সানন্দা পুষ্পাঞ্জলি ২০০০, পৃষ্ঠা : (২০৫-২১১)।
৬. স্বকৃত নোমান, কথাকারের সঙ্গে : আবদুশ শাকুর, মাসিক উত্তরাধিকার, নবপর্যায়ে ৫০তম সংখ্যা, বাংলা একাডেমি ঢাকা, ভাদ্র ১৪২০, নভেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা : (১২১-১২২)।
৭. হুমায়ুন আজাদ, বাংলা ভাষার শত্রু মিত্র, অগামী প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ : ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃষ্ঠা : ২৩।
৮. স্বকৃত নোমান, কথাকারের সঙ্গে : আবদুশ শাকুর, মাসিক উত্তরাধিকার, নবপর্যায়ে ৫০তম সংখ্যা, বাংলা একাডেমি ঢাকা, ভাদ্র ১৪২০, নভেম্বর ২০১৩, পৃষ্ঠা : (১২১-১২২)।
০৬. বলা’র স্টল, গীতাঞ্জলি, বঙ্গবন্ধু এবং ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের কৃতি
সুনামগঞ্জে ‘ট্রাফিক পয়েন্ট’ সর্বজন পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত একটি নাম। নামটি যে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার ( alienation) একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, সেটা বুঝে নিতে তেমন একটা বুদ্ধি খরচের প্রয়োজন পড়ে না এবং ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার উদাহরণ এই জন্য যে, ‘ট্রাফিক’ (অর্থ : রাস্তায় লোক ও মালপত্র প্রভৃতির গমনাগমন) ও ‘পয়েণ্ট’ (অর্থ : বিন্দু, প্রাসঙ্গিক যুক্তি) এই শব্দ দু’টি সাম্রাজ্যবাদী মস্তানভাষা ইংরেজির সম্মানিত সদস্য। এদেশে এসেছে সশস্ত্র সাম্রাজ্যবাদী সৈন্যসামন্তের কাঁধে চড়ে এবং তারা দু’জনেই ইতোমধ্যে যথারীতি বাংলাভাষাদেশে প্রবসিত ও ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এ শীর্ষশব্দ হিসেবে ভুক্তিভুক্ত, অর্থাৎ বাংলাভাষায় কৃতঋণশব্দ হিসেব আত্তীকৃত। বাংলা শব্দভাণ্ডারের একটি খোপ বিদেশি শব্দের জন্য নির্ধারিত। এই শব্দ দু’টিকে সে-খোপে আমরা নিয়ে নিয়েছি। তাই বলে তাদের গতরে লেগে থাকা বৈদেশিকতার আমেজের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাকে অস্বীকার করার কোনও অবকাশ আদপেই নেই।
‘ট্রাফিক পয়েন্ট’ প্রকৃতপ্রস্তাবে যাকে বলে সুনামগঞ্জ শহরের নাভীকেন্দ্র স্বরূপ ত্রিবেণীসঙ্গমের মতো একটি তেরাস্তা অর্থাৎ ত্রিপথ। একটা পথ আর একটা পথের সঙ্গে মিলে গেলে যা হয়, জ্যামিতিক জ্ঞানের গুণে মানুষের চেতনায় তিনপথের মিলনের ধারণার উদ্ভব ঘটে, এখানেও অনায়াসে তাই হয়েছে। তা অনায়াস বলেছি বটে, কিন্তু বাস্তবে অনায়াসে কেউ এই ত্রিপথের নামকরণে কোনও বাংলা শব্দ উচ্চারণ করেন নি, অর্থাৎ ঔনিবেশিকতার একটি অনিবার্য উপসর্গ ভাষাবিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত হয়ে উঠেছে উপনিবেশিত লোকেরা এবং স্বসংস্কৃতিতে অপর সংস্কৃতির বিগলনের প্রভাবে লোকমুখে উচ্চারিত হয়েছে ইংরেজি শব্দ। এই প্রথিত ত্রিপথের ইংরেজি নামায়ন অনায়াসে প্রমাণ করে বাংলাভাষাদেশে ইংরেজির প্রতিষ্ঠিত উপনিবেশ কতোটা গভীর ও ব্যাপক। অর্থাৎ ‘ট্রাফিক পয়েন্ট’ নামটা প্রথম হয়তো কোনও ইংরেজের কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়েছিল। অথবা যদি অনুমান করি, এই বিশেষ বচনামৃত কোনও মেকলেচেলা (টমাস ব্যাবিংটন এডওয়ার্ড মেকলে’র সাকরেদ) বাঙালির, তবে তিনি যে স্বভাবে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাক্রান্ত মানুষ ছিলেন তা তো কেবল নয়, তদুপরি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমাজটাও যে ইংরেজের অধিকৃত হয়ে রাজনীতিক দাসত্বকে শিরোধার্য করে নিয়েছিল, তাতেও কোনও সন্দেহ থাকে না। সম্প্রতি বাজারে জোর গুঞ্জন আছে এই তেরাস্তাটির নাম ‘আলফাত স্কয়ার’ করা হবে, দাপ্তরিক দৌড়ঝাপ চলছে। কিন্তু ‘স্কয়ার’ কেন, ‘চত্বর’ কেন নয়? এমন একটি প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই উঠতে পারে। মনে রাখতে হবে ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এ ‘ট্রাফিক’ ও ‘পয়েন্ট’-এর মতো ‘স্কয়ার’ কিন্তু কৃতঋণশব্দ হিসেবে আত্তীকৃত নয়, এখনও (২০১৪ খ্রি.) পর্যন্ত। যেহেতু বাংলাদেশ দুই দুই বার সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিকতার খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসার সংগ্রামের ভেতর দিয়ে জন্ম নেওয়া একটি দেশ। সে-সংগ্রাম ছিল একবার ব্রিটিশ ও আর একবার পাকিস্তানি শাসনের গোলামী ছিন্ন করার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মুক্তিচেতনায় উজ্জীবিত। দ্বিতীয়বারে সুদীর্ঘ নয় মাসের ধনজনমানক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছে এই দেশকে। ত্রিশ লক্ষপ্রাণ, চার লক্ষাধিক নারীর সম্ভ্রম, জমিনের উপর বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের বিনিময়ে কিনতে হয়েছে স্বাধীনতা। যদিও স্বাধীনতা কারও পৈতৃকসম্পত্তি নয় যে, সেটাকে কারও কাছ থেকে দাম দিয়ে কিনতে হবে। পুঁজিবাদ তার অন্তর্গত বৈশিষ্ট্যানুসারে সবসময়েই কিনতে হয় নি কিংবা হয় না যে-জিনিসটা সে-টাই চড়া দামে বিক্রি করে, আর পুঁজিপুষ্ট আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদ সবসময় সে-টা কেড়ে নিয়ে সম্পদের মালিকানা অর্জন করে। বিশ্ববাসী জানে, ঔপনিবেশিক থাবার নিচে সমগ্র দেশটি সে-সময়, দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী, একটি বধ্যভূমিতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল। এমন একটি দেশে ‘স্কয়ার’ শব্দটি নিঃসন্দেহে সাম্রাজ্যবাদের ভাষাসাংস্কৃতিক একটি অবশেষ। মূলত বিষয়টা এই যে, দখলদার সৈন্যসামন্তরা চলে গেছে, তাদের ভাষার শব্দরা রয়ে গেছে, যেমন রয়ে গেছে চেয়ার, টেবিল, শার্ট, প্যান্ট, স্কুল, কলেজ ইত্যাদি। তেমনই রয়ে গেছে ‘স্কায়ার’। আর এমনভাবে থেক গেছে যে, সময়মতো চত্বরকে সরিয়ে আসন দখল করে নিয়েছে। আমরা অনেকেই বিয়ের পাত্রীকে ঘরে আনি বউ করে এবং বউভাতও করি, কিন্তু তাঁকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে গিয়ে ‘ওয়াইফ’ ফেলি। আমাদের যেমনতেমন হেনতেন শিক্ষিতের ঘরে ইংরেজি ‘ওয়াইফ’-এর বাসা বেশ শক্তপোক্ত, ‘স্কয়ার’ও তার ব্যতিক্রম নয়। ঔপনিবেশিকতার একটি নিকৃষ্ট অবশেষ এই ‘স্কয়ার’কেই আবশ্যকীয় উপকরণ করে একজন মক্তিসংগ্রামীর (তিনি একাত্তরে একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন এবং আজীবন ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে যোদ্ধৃ দিনাতিপাত করেছেন।) স্মৃতিরক্ষাকল্পে কোনও স্থানের নামকরণ মানানসই হতে পারে না। প্রশ্ন উঠতে পারে একজন মুক্তিযোদ্ধার নামে কোনও স্থানের নামকরণে পরভাষার স্পর্শ কেন কলঙ্কচিহ্নের মতো সেঁটে থাকবে? ভুলে গেলে চলবে না, ঔপনিবেশিক শাসনশোষণ স্থায়ী করার স্বার্থে ইংরেজি ভাষাকে সাম্রাজ্যবাদীরা ব্যবহার করেছে, এখনও করছে এবং শোষকশাসক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। এমন সাম্রাজ্যবাদী ভাষাকে, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যতীত, সর্বাবস্থায় বর্জন করা কর্তব্য, অন্তত যে-দেশ কোনও না কোনওকালে সাম্রাজ্যবাদের কব্জায় ছিল, পরে মুক্তি লাভ করেছে। তা ছাড়া, কথিত অশ্লীল শব্দ সকলেই জানেন কিন্তু কেউই লেখার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন না, সচেতনভাবে বর্জন করে চলেন, ইংরেজি শব্দকেও তেমনি বাক্যে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে সযত্নে বর্জন করে চললেই ল্যাটা চুকে যায়। সহজ ব্যাপার। প্রত্যেক বাঙালি জন্মসূত্রে আঞ্চলিক ভাষার অধিকারী এবং প্রমিত বাংলায় আঞ্চলিক শব্দের ব্যবহার প্রতিহতকরণে স্বভাবতই অভ্যস্ত। তাহলে বাংলাবাক্যে ইংরেজি শব্দের প্রক্ষেপণ বন্ধ না করতে পারার তো কোনও কারণ আছে বলে মনে হয় না। বিষয়বাস্তবতাটিকে (বাংলাবাক্যে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার) বোধ করি, কোনও শ্রেণি বিশেষের স্বেচ্ছাকৃত দুরভিসন্ধি ভিন্ন অন্য কীছু নয়, ভাবাই যায়, কিংবা বিষয়টাকে যে-কেউ ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাও ভাবতে পারেন।
একাধিক রাস্তার যে-কোনও সঙ্গমস্থলকে লোকে তেরাস্তা, চৌরাস্তা নামে ডাকে। সুনামগঞ্জের নাভীকেন্দ্রে অবস্থিত তেরাস্তাটির একটি নবনামকরণ করা হবে। ভালো কথা। সে-ক্ষেত্রে ‘স্কয়ার’ শব্দটিকে আমদানি করা হয়েছে। ইংরেজি ভাষায় এই ‘স্কয়ার’ শব্দটি অনেক কীছুকে বোঝায়। এখানে তা কহতব্য নয়। কেবল বলি এই শব্দটির অর্থকথার পূর্ণ বিবৃতি দিতে অভিধানের কমপক্ষে একটি পৃষ্ঠা ব্যয়িত হবেই হবে। স্থানের নামায়ণের সঙ্গে ওতপ্রোত ‘স্কয়ার’-এর অর্থ করতে হলে বলতে হয় : চতুর্ভুজাকারস্থান। অর্থের আর একটু বিস্তৃতি ঘটাতে চাইলে বলতে হয় : নগরমধ্যস্থ উন্মুক্ত স্থান, সামরিক স্থাপনাস্থ অনুরূপ উন্মুক্ত স্থান ইত্যাদি।
সে যা-ই হোক। কিন্তু প্রশ্ন হলো নামকরণে ইংরেজি শব্দের ব্যবহার কেন, কেন নয় বাংলা শব্দ? যে-ভাববৈচিত্র্যকে প্রকাশের অভিপ্রায়ে বিভাষার ‘স্কয়ার’ শব্দটিকে প্রয়োগ করা হয়েছে সে-ভাববৈচিত্র্য প্রকাশে পরিপূর্ণভাবে পারদরঙ্গম (পারদর্শী+পরঙ্গম) শব্দের বাংলায় কি কোনও অভাব আছে ? প্রকৃতপ্রস্তাবে বিষয়টা এমন নয়। বাংলাভাষা নামকরণে যথেষ্ট পারদরঙ্গম শব্দে ভীষণ সমৃদ্ধ একটি ভাষা। বাংলায় কোনও একটি বিশেষ স্থানের জুতসই বা সর্বাঙ্গসুন্দর নাম রাখা যাবে না, এমন হতেই পারে না। যিনি ভাবেন বাংলা ভাষা নামকরণের জন্য জুতসই শব্দে সমৃদ্ধ নয়, আমি বলতে বাধ্য তিনি মনেপ্রাণে বাঙালি নন, অথবা তিনি বাঙালি হলে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাগ্রস্ত কিংবা সাম্রাজ্যবাদের সাংস্কৃতিক দাস, অথবা তিনি কোনও কারণে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিতান্ত অনভিজ্ঞ। এ দেশে হাজারলক্ষ গ্রাম, বিল, বাঁওড়, ঝিল, নদী, নালা, বন, জঙ্গল, অজৈবজৈব পদার্থের নাম রাখা হয়েছে আদি অকৃত্রিম বাংলায়। বাংলাভাষা তো এতোটা গরিব নয়? তাহলে আমাদের নিত্য দিনের উচ্চারণের জগতে কোন্ স্বার্থে নামকরণের ক্ষেত্রে সাম্র্রাজ্যবাদী ইংরেজিকে নেমতন্ন করা? সুনামগঞ্জের একটি তেরাস্তার নামায়নের সঙ্গে তো কোনও আন্তর্জাতিক বিষয়আসয় সম্পর্কিত নয়। সুরমা নদীর তীরে একটি বিনোদনবিহারস্থানের নাম কেন হবে ‘রিভার ভিউ’? ওখানে কোনও ইংরেজ গিয়ে তো বসবেন না, নিত্যদিন। আর আমাদের নগরনায়কের পৌরপ্রতিষ্ঠানটির আসনগুলোও তো ইংরেজরা এসে দখল করে বসে নেই, সেখানে তো সব বাঙালিরাই সমাসীন আছেন। আর এই পৌরসভার সকল নাগরিকই তো বাঙালি। এখানে তো ইংরেজিভাষী কেউ বাস করেন বলে জানা নেই। নাকি কেউ আছে, যে ইংরেজি ভাষায় কথা বলে? ইংরেজি ভাষায় মার কাছে ভাত চায়, ‘ভালানি’ অথবা ‘ভালা আছইন্নি’ না বলে ‘হা ডু ডু’ (হাউ ডু ইউ ডু) বলে। নিশ্চিত এমন কেউ নেই। ইংরেজি বা অন্যকোনও ভাষাশিক্ষার সার্বজনীন তাৎপর্য হলো বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞানকে আয়ত্ব করে নিজেকে ও নিজের দেশকে সমৃদ্ধ করা, আলোকিত করা, বিশ্বপরিসরে নিজেকে শ্রেষ্ঠ আসনে অধিষ্ঠিত করা। এর আরও একটি গভীর তাৎপর্য আছে, আর সেটি হলো : স্বভাষীসমাজে ভাবপ্রকাশে পারক্যভাষাকে (অস্বভাষা) ব্যবহার করে নিজেকে হীনম্মন্য প্রতিপন্ন না করা। এই হীনম্মন্যতার একটাই অর্থ স্বভাষা ও স্বসংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্নতা, যাকে বলা যায় পরাজিতের সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণ। অথচ আমরা বাঙালিরা ইতিহাসের প্রতিটি পর্বে সংগ্রামে নিবিষ্ট ও শেষ পর্যন্ত কোনও না কোনওভাবে বিজয়ী এক জাতি। তাই অনিবার্যভাবেই বাঙালির ভাবপ্রকাশের ভাষা বাংলাভাষাও একটি বিজয়ী ভাষা। যদিও এই জাতির একটি ক্ষুদ্রাংশ স্বীয় সত্তার ভেতরে অধিষ্ঠিত অশুভর দ্বারা আবিষ্ট হয়ে রাজাকারজীবিতার প্রতি অদ্ভুত এক মোহমুগ্ধতায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর ব্যাপী শরণাগত ও অভ্যস্ত থেকে গেছেন। অর্থাৎ, বলতে চাই, কতিপয় মিরজাফর কিংবা গো. আজম, যাঁরা আবহমান কাল থেকে জাতীয় বিজয়বিরোধী কিংবা ফার্সি-ইংরেজি-উর্দুর তল্পিবাহক ছিলেন আছেন এবং থাকবেন। এখানে ‘তেমাথা’, ‘তেরাস্তা’ কিংবা ‘ত্রিপথ’কে পরাস্ত করে কী করে ‘স্কয়ার’ শব্দটি স্থান করে নেয়, সেটা কোনও বোধাতীত রহস্য নয়। জানি এর পেছনে রয়েছেন, দেশের সিংহভাগ সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন মুষ্ঠিমেয় তথাকথিত শিক্ষিত ইংরেজের দালাল (প্রকৃতপ্রস্তাবে মেকলেচেলা) বাংরেজ বাঙালি। একটি স্থানের নাম রাখতে বাংলাভাষায় শব্দের অভাব পড়বে, এমন তো হবার কথা নয়। যে-ভাষায় সঞ্জয় লাউড় রচনা করেছেন মহাভারত, লালন-হাসন-রাধারমণ সেই কবে গান করে গেছেন, যে-ভাষায় মধুসূদন লিখেছেন মহাকাব্য, যে-ভাষা একশত বছর আগে নোবেল ছিনিয়ে এনেছে, যে-ভাষায় ভাই গিরীশচন্দ্র সেন অনুবাদ করেছেন কোরআন, যে-ভাষায় রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত-জীবনানন্দ-সুকুমার-সমর-সুভাষ-শামসুর-বিনয়-সুনীল-শক্তি-শঙ্খ লিখেছেন অজ¯্র কবিতা ও গান, যে-ভাষায় বঙ্কিম-শরৎচন্দ্র-মানিক-তারা-বিভূতি-সমরেশ-ওয়ালিউল্লাহ-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-শহীদুল জহির-মহাশ্বেতা-দেবেশ লিখেছেন উপন্যাস, মধু-গিরিশ-মুনির-শম্ভু-সেলিম আল দীন লিখেছেন নাটক এবং রাজশেখর-মুজতবা-শাকুর লিখেছেন অনবদ্য নকাল্পনিক গদ্য, যে-ভাষায় বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-য়ে ৭ মার্চে মহাকাব্যিক ভাষণ দিয়েছেন, যে-ভাষায় বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়েছে, সে-ভাষায় সত্যজিত চলচ্চিত্র বানিয়ে ছিনিয়ে এনেছেন ওস্কার, সে-ভাষায় একটি স্থান বিশেষের নাম রাখতে জুতসই শব্দ খুঁজে পাওয়া যাবে না, এটা কী করে হয়? এটা তখনই হতে পারে যখন এমন কেউ নামকরণের দায়িত্বে থাকেন, যিনি একজন ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাগ্রস্ত হীনম্মন্য মানসতার বাঙালি। তিনি অন্য রকম এক মানুষ। যিনি নিজের অস্মিতাকে হারিয়ে ফেলেছেন, যিনি বাঙালিত্বকে বিকিয়ে দিয়েছেন হাতের ময়লা ক’টা কড়ির দামে, যিনি স্বসংস্কৃতিকে কখনই অপর সংস্কৃতি থেকে উত্তম ভাবে না, যিনি নিজেকে ছোট ভাবতে ও ছোট করতেই জন্মাবধি অভ্যস্ত। আসলে তিনি বাঙালি নন, যেমন তাঁরা বাঙালি হয়েও বাঙালি নন, যাঁরা একদা বাংলাভাষাকে আরবি-ফারসি-উর্দুর মিশেলে একটি খিচুড়িভাষা বানাতে চেয়েছিলেন।
চাঁদনিচক, চকবাজার, টুকের বাজার, টুকের ঘাট, চৌরাস্তা, তিরপিনি, পারঘাটা, ফুলটঙ্গি যদি হতে পারে স্থানের নাম তবে ‘আলফাত চত্বর’ কিংবা ‘আলফাত’-এর সঙ্গে অলিন্দ, আঙ্গিনা, প্রাঙ্গণ জুড়ে দিয়ে কোনও নাম নয় কেন? অথবা নিদেনপক্ষে আলফাত তেরাস্তা? এমনকি তেরাস্তা নাপছন্দ হলে ‘ত্রিপথ’ও হতে পারে। তাতে না পোষালে ‘ত্রিমার্গ’ এক পায়ে খাড়া। বাধা কোথায়? বোধ করি তার উত্তর একটাই : আলফাত উদ্দিন মুক্তার দেশটাকে স্বাধীন করে দিয়ে যেতে পেরেছেন কিন্তু আমাদের মধ্যে কারও কারও মনটাকে নয়। দুঃখের বিষয় তাঁরা (‘আমাদের মধ্যে কেউ কেউ কেউকেটা’রা) এখনও সমাজনিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় আসীন আছেন। যাঁদের মন এখনও সেই মেকলেচেলাগিরি তথা ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার শিকলেই বাঁধা পড়ে আছে। এই শ্রেণির লোকেরা হলেন মেকলের তত্ত্বপ্রযুক্তিসৃষ্ট সেইসব ভারতীয়, যেইসব ভারতীয়কে মনেমগজে ইংরেজ করে তৈরি করা হয়েছিল, ভারতকে শাসনশোষণ করার কাজে লাগাতে এবং সেটা সর্বার্থে ছিল একটা সাম্রাজ্যবাদী দুরভিসন্ধি। সেদিন সাম্রাজ্যবাদী দুরভিসন্ধিকে শিরোধার্য করে যাঁরা ইংরেজের ক্রিড়নক হয়েছিলেন তাঁরাই ছিলেন ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার দেশি দাস, দোসর ও দালাল কিংবা কারিন্দা। ইংরেজরা এখন শাসন ক্ষমতায় নেই, কিন্তু তাদের তৈরি দালালদাসদের বংশধররা আছেন আর তাঁদের সাথে আছে প্রভুর ভাষা ইংরেজি। দেশের ঠাকুরকে ফেলে সব সময়ই তাঁরা বিদেশের কুকুরকে ধরে চুমু খায়, কয়েস যেমন লাইলির কুকুরকে ধরে চুমু খেয়েছিল, লাইলকে ভালোবাসার প্রমাণস্বরূপ। ঔপনিবেশিকদেরে ফেলে যাওয়া উচ্ছিষ্ট শব্দেকে আওড়ানোর কসরত তাঁদের এখনও বড়বেশি পছন্দ। এইভাবে প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন এখন তাঁদের আরাধ্য কাজ। মনের এই মানসিক বন্দিত্বকে বরণ করে নিয়ে একশ্রেণির বাঙালি একধরনের ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতায় প্রপন্ন হয়ে আছেন, ইংরেজির প্রতি- এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে আরবি, ফারসির প্রতিওÑ নিদারুণ মগ্নচৈতন্যে অভ্যস্ত অকারণ মুগ্ধতা তাঁদের কাটছে না। তাঁরা ‘পৌরবিপণি’র সঙ্গে ‘মার্কেট’ জুড়ে দিয়ে হাস্যকর ‘পৌরবিপণি মার্কেট’ সর্জন করে নিজেকে বাংরেজ বানাতে না পারলে পরিতৃপ্ত হতে পারেন না। কী অদ্ভুত? মূর্খতারও একটা সীমা থাকা চাই। প্রকৃতপ্রস্তাবে এইরকম অদ্ভুত ‘বাংরেজ’ বাঙালিরাই ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার আধিব্যাধিতে ভীষণভাবে আক্রান্ত।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়কে মনে পড়ছে। তিনি তাঁর এক লেখায় ‘জুভেনাইল ডিলিংকোয়েন্সি’র, জুতসই ‘বাংলা অনুবাদ’ না পেয়ে, ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং এতে করে নিজের মধ্যে একধরনের ‘দাস-মনোভাব’ আবিষ্কার করে ক্ষমাপ্রার্থী হয়েছিলেন পাঠকের কাছে। তিনি লিখেছিলেন, “জুভেনাইল ডিলিংকোয়েন্সি-এর বাংলা অনুবাদ কী হবে? তারুণ্যসুলভ অপরাধ? নাকি আর একটু সহজ ভাষায় বলা যাবে, ‘বালকোচিত বাঁদরামো’? একটা লাগসই পরিভাষা নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু হাতের কাছে ঠিক এই মুহূর্তে সেটা খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু জুভেনাইল ডিলিংকোয়েন্সি শব্দ দু’টোই যখন চালু তখন ওদেরই আপাতত ব্যবহার করা যাক। আশা করি, আমার এই দাস-মনোভাবের জন্য আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন।”(১) শ্রী গঙ্গোপাধ্যায় যখন ‘জুভেনাইল ডিলিংকোয়েন্সি’র ‘লাগসই’ অনুবাদ পাচ্ছিলেন না, তখন সময়টা ছিল ১৯৬৭। বিখ্যাত দেশ পত্রিকায় তাঁর লেখাটা মুদ্রিত হয়েছিল ৩০ সেপ্টেম্বরে। আর এখন ২০১৪-তে এসে আমরা সুনামগঞ্জের বাঙালিরা ‘স্কয়ার’ শব্দের ‘লাগসই’ বাংলা অনুবাদ খুঁজে না পেয়ে ‘স্কয়ার’ শব্দটিকেই ব্যবহারে বাধ্য হচ্ছি। অথচ ‘স্কয়ার’-এর অর্থব্যঞ্জনাসম্পন্ন কোনও বাংলাশব্দ নেই বা সর্জন করা যাবে না এমন ভাষাসাংস্কৃতিক দুর্বলতা বাংলাভাষার নেই বা কখনও ছিল না। ‘স্কয়ার’ শব্দের ‘লাগসই’ (কিংবা জুতসই) অনুবাদের একটি উদাহারণ দিচ্ছি। কাওসার আহমেদ চৌধুরী লিখেছেন, “ভ্যাালেন্টাইন স্কয়ারে পৌঁছে কা. আ. চৌ. দেখলেন, সেখানে এই দিবসের নায়কনায়িকা দূরে থাক, একটা কাকেরও দেখা নেই। তখন তিনি ঘড়ি দেখলেন এবং অত্যন্ত বিরক্ত চিত্তে বারসাতেক চত্বরের চারপাশে পায়চারি করে নিলেন।”(২) কাওসার আহমেদ চৌধুরী ইংরেজি ‘স্কয়ার’এর জুতসই বাংলা ‘চত্বর’ ঠিকই পেয়েছেন। প্রকৃতপ্রস্তাবে এই উদাহরণ থেকে বোধোদয় হয়, ‘স্কয়ার’ কোনও অবিকল্প শব্দ নয়, এই শব্দটির অর্থদ্যোতনাসম্পন্ন শব্দ বাংলাভাষাদেশে নেই, এই কথা হলফ করে কেউ বলতে পারবেন না। তারপরও যদি কেউ ‘চত্বর’কে ফেলে ‘স্কয়ার’কে ধরেন, সেটা হবে স্বদেশি ঠাকুর ফেলে বিদেশি কুকুর আলিঙ্গন করার নামান্তর। ‘স্কয়ার’ শব্দের প্রতি তাঁর এই অকারণ পক্ষপাত অবশ্যই তাঁকে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাব্যাধিগ্রস্ত বলে প্রতিপন্ন করবে।
এই ব্যাধিগ্রস্ততার চিরতরে অবসান চাই। সে-চেষ্টা দিকে দিকে চলছে এবং অভূতপূর্ব সফলতা অর্জিত হচ্ছে। ক্রিকেট খেলার একটি পরিভাষা ‘টুয়েন্টি-টুয়েন্টি’র অর্ধসংক্ষেপায়ণ সে-সফলতার একটি উত্তম উদাহরণ। ‘টি-টুয়েন্টি’কে করা হয়েছে ‘কু-কুড়ি’। মন্দ কি? অনুবাদকর্মে সাংবাদিকরা এখানে সচেষ্ট হয়েছেন। এমনকি ‘বি-বিশ’ও করা যায় অনায়াসে। যার যে-টা পছন্দ ব্যবহার করতে বাধা নেই। প্রচলিত হয়ে গেলেই হলো। কিন্তু আসল কথা হলো, এমনসব ক্ষেত্রে ইংরেজি ব্যবহার না করে বাংলা ব্যবহারের প্রচেষ্টা থাকা চাই, মনের মধ্যে থাকা চাই প্রবল স্বাজাত্যবোধ ও সে-স্বাজাত্যবোধ থেকে জন্ম নেওয়া সেই শক্তি যে-শক্তির জোরে ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার আচ্ছন্নতাকে কাটিয়ে এই একটুখানি স্বদেশি হয়ে উঠা যায়। কথাটা সকল বঙ্গভাষীর জন্যেই বিশেষভাবে প্রযোজ্য। একটু সতর্ক থাকলেই হলো। সমস্যাটি সমাধানের জন্য ‘নো প্রব্লেম’ না বলে কেবল ‘সমস্যা নেই’ বলতে হবে আর কি। আর যাঁরা লেখালেখি করেন তাঁদের না হয় একটু বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। এর বেশি কীছু তো নয়? এবং এ-প্রচেষ্টায় আন্তরিকতার অভাব না হলে বাংলাভাষা ভাবপ্রকাশে বিশ্বেসেরা ভাষা তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আসলে এখানে ‘স্কয়ার’ শব্দটিকে ব্যবহারে কেউ বাধ্য হচ্ছে না, বলা ভালো অর্ন্তগত প্রাতিস্বিক দুর্বলতাকে প্রশ্রয় দিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। বাঙালির ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার ব্যাধিগ্রস্ততা থেকে সমুৎপন্ন হীনম্মন্যতা এখানে প্রকটিত হয়েছে মাত্র।
ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা একশ্রেণির বাঙালিকে পরভাষার প্রতি যতোটা উৎসুক ও দায়গ্রস্ত করে তোলে মাতৃভাষার প্রতি ততোটাই করে নিরুৎসুক ও উদাসীন। এরা কবি টি. এস. এলিয়েট (১৮৮৮-১৯৬৫) কথিত ‘ফাঁপা মানুষ’, বিচ্ছিন্নতার আগুনে যন্ত্রণাদগ্ধ পোড়ামাটির বন্ধ্যাত্বগ্রস্ত প্রতিরূপ। মানুষের মধ্যে যে-স্বাভাবিক সর্জনক্রিয়া বিরাজমান, পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের জটিলতার কারণে সৃষ্ট নিঃসঙ্গতা এই শ্রেণির মানুষকে সে-সর্জনক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে অনুর্বর মানুষ করে তোলেছে ক্রমাগত। সর্জনক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন অনুর্বর এইসব মানুষের সামাজিক যৌথতা অনায়াসে চিহ্নিত হতে পারে ‘ফাঁপা মানুষ’-এ ভরা এমন একটি নিয়ন্ত্রিত ভুবনায়ন হিসেবে, যা আবার ইতোমধ্যে পরিণত হয়েছে বিশ্বব্যাপী এক অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায়। প্রকৃতপ্রস্তাবে বিশ্বজুড়ে সর্জনশীল মানবিকতা থেকে এক শ্রেণির মানুষ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে অন্য মানুষ থেকে, অর্থাৎ সার্বিক অর্থে সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে, এমনকি নিজের থেকেও। যে বিচ্ছিন্নতার মানে ক্ষমতা, সার্থকতা, আদর্শ, অবাসন ও অস্মিতা থেকে ব্যক্তির বিচ্ছিন্নতা। মুক্তবাজার অর্থনীতির জাদু মুনাফার পাহাড় গড়তে গিয়ে মানুষকে বানাচ্ছে নির্বোধ প্রাণি। পুঁজিবাদী মানুষ উত্তরোত্তর হয়ে উঠছে আরও বেশি বেশি মুনাফাখোর, মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষ, অন্তর্গতভাবে পরানের গভীর থেকে গভীরে ভীষণ ভীষণ অসামাজিক এবং এই পুঁজিবাদী মানুষকে যে-মাপ কাঠিতেই যে-ভাবেই মাপা হোক না কেন তাকে ভোগবাদী ব্যতীত অন্য কীছু বলে কীছুতেই চিহ্নিত করা যায় না। আবার সে যতোটা ভোগবাদী তার চেয়ে বেশি অমানবিক। মানবিকতার মুখে শিশ্ন উচিয়ে পেচ্ছাব করতে সে বড় বেশি পারঙ্গম। সে বোমা বোঝে কিন্তু মানুষ বোঝে না। পৌরাণিক কথাকৌতুকীর গোপাল ভাঁড় পায়খানা করে আরাম পায়, আর পরমাণুবিভাজন প্রযুক্তির অধিকারী পুঁজিবাদী (পুঁজিবাদীকে আধুনিক বলা বোধ করি সঙ্গত নয়) মানুষ এটম ফাটিয়ে।
আরাম নিয়ে দু’টি গল্প আছে। দু’টিই ভীষণ প্রথিত। একটি গল্প গোপাল ভাঁড়ের। গোপালের গল্পটি ত্যাগ (বর্জনও বলতে পারেন) সংক্রান্ত। শিরোনাম দেওয়া যায় : গোপাল ভাঁড়ের বর্জ্যত্যাগে (পায়খানা করে) আরাম। বলা বাহুল্য, পায়খানা করার মধ্যে একটি বর্জন বা ত্যাগের ব্যাপর আছে। অন্যটি যাকে বলে কোনও একটি পদার্থকে ফাটিয়ে দেওয়ার। রাজনীতির ময়দানে বোতল, ডিব্যা, পটকা, ককটেল, পেট্রল বোমা ইত্যাদি ফাটানোর মতো। আমাদের দেশে সে-ফাটানোর চর্চা আকসার হয়ে থাকে। রাজনীতিবিদেরা এতে করে বড়বেশি আরাম উপভোগ করেন। এখানে বলার গল্পটি যেনতেন ফাটানো নয়, একেবারে এটম ফাটানোর গল্প। বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড টেলার রীতিমতো রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন, তার নাকি দারুণ লেগেছিল। গোপাল ভাঁড়ের পায়খানায় আরাম গল্পটা বোধ করি কোনও বাঙালিরই অজানা নয়।
একদিন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের এক ছেলে জন্ম নিল। গোপাল ভাঁড়কে রাজা বললেন, ‘গোপাল, আমার ছেলে হয়েছে। তোর কেমন লাগছে।’
‘মহারাজ, পায়খানা করলে যেমন আরাম পাই।’
রাজা অগ্নিশর্মা। একেবারে তেলেবেগুনে। রাজদরবার থেকেই বের করে নয়, বরং তাড়িয়ে দিলেন গোপালকে।
তারপর?
বেশ পরে কোনও এক দিন। রাজা বজরাবিহারে বেরিয়েছেন। আর তখনই রাজার পেট খারাপ হলো। রাজা বড় বাইরে যেতে চাইলেন। গোপাল দেখলে উচিৎ জবাবের জুতসই সুযোগ যায়। সে কৌশলে রাজাকে বাইরে যেতে দেরি করিয়ে দিলে। বজরা তীরে ভিড়ানোর নানান কিসিমের অজুহাত হাজির করলে। ঘাটমন্দ, স্থানমন্দ। শতসঙ্কুলতা। পঙ্ক, কণ্ঠক, ব্যাঘ্র, সর্প আরও কত কী। তরণী থেকে তীরে অবতরণ করলেই বিপদ। এদিকে রাজার পেটের গতিক খারাপ। পরিচ্ছদ নষ্ট হয় হয় অবস্থা।
‘গোপাল, আর যে পারি না।’
শেষে এক সময় রাজার বেগতিক অবস্থায় বজরা তীরে ভিড়ল। রাজা তড়িঘড়ি অবতরণ করলেন। বড় বাইরে করে ফিরলেন। গোপাল, এত্তো দিনে মওকা বুঝে, রাজাকে মুলায়েম সুরে প্রশ্ন করে, ‘মহারাজ, এখন কেমন লাগছে?’
‘আর বলিস না। পায়খানা করার মতো আরাম এসংসারে আর কীছুতে নেই।’
‘মহারাজ, সেদিন আপনার ছেলে হলো। আপনি বললেন : গোপাল, তোর কেমন লাগছে? আমি বললাম : পায়খানা করলে যেমন আরাম পাই। আপনি রেগেমেগে একেবারে কাই।’
তারবাদে কথা একটাই। ত্যাগের বহুত মরতবা, মহিমা। বিশেষ করে দেহস্থিত বর্জ্য ত্যাগের। রাজা কবুল করলেন, পায়খানা করার চেয়ে আরামের আর কীছু নেই পৃথিবীতে। রাজার ছেলেকে গোপাল সত্যি খুব ভালোবাসে। তাই না এমন কথা বলেছিল, ‘পায়খানা করলে যেমন আরাম পাই ।’
কথাকৌতুকীর গোপাল কিংবা কৃষ্ণচন্দ্র স্বভাবে পুঁজিবাদী মানুষের মতো নয়, বোধ করি সামন্তবাদী এই প্রভুভৃত্য স্বকালে সবচেয়ে আধুনিক। কিন্তু তাদের অস্ত্রভা-ারে এটমের মতো ভয়ঙ্কর মারণায়ুধ ছিল না যে, সেটা কারও মাথায় মেরে আরাম পাওয়ার বাসনা তাঁদের হবে। এই রাজাপ্রজা উভয়েরই পায়খানা করে আরাম। কী সহজ স্বাভাবিক।
এদিকে পুঁজিবাদী মানুষের স্বভাব এমন, অ্যাটম ফাটিয়ে লক্ষ মানুষ মারতে পারার সক্ষমতা অর্জন করা তার কাছে সবচেয়ে আরামপ্রদ ও প্রিয় প্রসঙ্গ। মানবিক স্বভাবের সঙ্গে এই অস্বাভাবিক নিষ্ঠুরতার রসায়ন মানুষকে স্বাভাবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে, এই বিচ্ছিন্নতা ভয়ঙ্করতার দিক থেকে বিশ্বে অতুলনীয় এবং রাষ্ট্র থেকে রাষ্ট্রের রাজনীতিক কর্মসূচিতে প্রলম্বিত। এই ধারণা বিশ্বজুড়ে বর্তমানে সুপ্রতিষ্ঠিত যে, প্রযুক্তি মানুষের জন্য ভয়ঙ্কর, সমগ্র মানবজাতির জন্য বিপজ্জক, প্রযুক্তিভিত্তিক বৈশ্বিক রাজনীতি পারমাণবিক অস্ত্রপ্রতিযোগিতার পাটাতনে দাঁড়িয়ে মানুষের অমানুষত্ব পৃথিবীর প্রভু হয়ে উঠেছে, মানবিকতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাজনীতিক সংস্কৃতি দানবিকতায় পর্যবশিত হয়েছে। একজন লিখেছেন “আশ্চর্য এই, এমন উজ্জ্বলতম আবিষ্কারকে হাতের মুঠোয় পেয়ে কিছু যুদ্ধপাগল অহঙ্কারী মানুষ এমন একটি ঘৃণ্য ঘটনায় এটিকে ব্যবহার করে বসল, অনেক বিজ্ঞ মানুষের বিচারে যার আদৌ কোনও প্রয়োজন ছিল না। ফলে এই উজ্জ্বলতম আবিষ্কারটি আজও কালিমালিপ্ত হয়ে আছে। রাজনীতি আর বিজ্ঞানের বিরোধ এখানেই। বিজ্ঞানকে হাতে পেয়ে রাজনীতিকরা যে ধিক্কৃত অপকর্মগুলি করে বসেন, তার দায় চেপে বসে বিজ্ঞানের ঘাড়ে। এমন কী সমস্ত মানুষই দায়ী হয়ে পড়ে তার জন্য। দূর ভবিষ্যতের মানুষ হয়তো বিংশ শতাব্দীর মানুষকে সে-ভাবেই বিচার করে বসবে। তারা খুঁজে পাবে না, যুদ্ধশেষে এই পরমাণুশক্তিকে শুধুমাত্র কল্যাণের পথে পরিচালিত না করে কেন বহু দেশ ক্রমাণ¦য়ে আরও বড় আরও বিশাল যুদ্ধাস্ত্র তৈরির নেশায় পড়ে গিয়েছিল। সেই প্রতিযোগিতা পরমাণু বোমাকে এমন স্তরে নিয়ে গিয়েছিল যে ১৬ জুলাই ১৯৪৫-এর সেই ‘ত্রিমূর্তি’ আজ নিতান্তই তুচ্ছ।”(৩) বর্তমান বিশ্বে বিরাজমান এই ভয়ঙ্কর সমরসংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায়, যে-কারও মনে হতে পারে যে, মানবপ্রজাতি তার বংশাণুতে (জিন) স্বপ্রজাতিবিদ্বেষের বা নামান্তরে স্বপ্রজাতিহননের বাতিক বংশপরম্পরায় বহন করে চলেছে। মানুষ ভরা হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আমেরিকা সানন্দে অ্যাটম ফাটিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে পাগল হয়ে উঠে বৈশ্বিক স্নায়ুযুদ্ধকে অনন্তকালের জন্য প্রলম্বিত করে। এর চেয়ে ভয়ঙ্কর জীবনবিযুক্তি আর কী হতে পারে? মনে প্রশ্ন জাগে, এই বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে যুক্ত অসভ্যতা সভ্যতার চেয়ে কতগুণ বিশাল? এবং প্রশ্ন থেকেই যায়। তারপরও কেউ কেউ ‘নাইন ইলেভেন’-এর আগে ভাবতে শুরু করেছিলেন ‘শয়তান মারা গেছে’।(৪) এই শয়তান মারা যাওয়ার কল্পনাটা বোধ করি মানহাটান প্রজেক্টের শয়তানকে ভুলিয়ে দেওয়ার একটি দুরভিসন্ধি, আর একটি নতুন বিচ্ছিন্নতার প্রতিরূপ। যে-ভয়ঙ্কর শয়তানের ভংঙ্করত্বের বর্ণনা করতে গিয়ে একজন লিখেছেন, “নিপুণ কলমে রোডস্ রচনা করেছেন এক কাহিনী। দেখিয়েছেন, নিজেদের চৌহদ্দি ভুলে গেলে কেমন বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন বিজ্ঞানী কিংবা রাষ্ট্রনায়কেরা। কেমন করে শুরু হতে পারে রুদ্ধশ্বাস দৌড়। চরম বিনাশের লক্ষ্যে। সভ্যতার ইতিহাসে সব চেয়ে ভয়ঙ্কর সেই উদ্যোগের ধারাবিবরণী এমন পরিশ্রম করে লেখেনি আর কেউ।”(৫) ‘বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন বিজ্ঞানী কিংবা রাষ্ট্রনায়কেরা’, কিন্তু কতোটুকু? তাঁদের সেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠার নমুনা বিশ্ববাসী টের পায় ৬ আগস্ট হিরোসিমা ও ৯ আগস্ট নাগসাকিতে অ্যাটমবোমা বিস্ফোরণের ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করে।
১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাইর ভোর। ত্রিমূর্তির (ট্রিনিটির) একটির, যাকে বলে অ্যাটম বোমার, পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ। নিউ মেক্সিকোর অ্যালোমোগর্ডোর মরুভূমিতে। বিজ্ঞানী এডওয়ার্ড টেলার বলেছেন, “নিয়মকে পাত্তা না-দিয়ে আমি সোজাসুজি তাকিয়ে ছিলাম বিস্ফোরণের দিকে। দানবের চোখে চোখ রেখেছিলাম। দারুণ লেগেছিল আমার।”(৬) রাজবিদূষক গোপালের সঙ্গে পুঁজিদাস বিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার ও এডওয়ার্ড টেলারের তফাৎ এখানেই। বিজ্ঞানী উভয়েই অ্যাটম বোমা নির্মাতাদের অন্যতম। ভয়ঙ্কর অ্যাটম বোমার বিধ্বংসী ক্ষমতা চাক্ষুষ করেছেন। এবং আরামলোভী অতৃপ্ত টেলার তারপরও এটমের চেয়ে হাজার হাজার গুণ বিধ্বংসী হাইড্রোজেন বোমা বানিয়েছেন। যা দিয়ে গোটা পৃথিবী ধ্বংস করা যাবে। এখন পৃথিবীতে বিভিন্ন রাষ্ট্রের অস্ত্রাগারে মজুদ পারমাণবিক বোমা দিয়ে হয়তো এই পৃথিবীকে কয়েক শ’ বার কি, হয়তোবা কয়েক হাজার বার, ধ্বংস করা যাবে। বিজ্ঞানের এইভাবে ব্যবহার, মানুষের মেধার এত বড় অপচয়, বোধ করি মানব ইতিহাসে আর ঘটবে না। না ঘটাই মঙ্গল। অবশ্য ‘বিজ্ঞানের এইভাবে ব্যবহার’ না বলে অপব্যবহার বলাই বেশি সঙ্গত, কেন না মানুষের পক্ষে তা কোনও আনন্দ বহন করে না। সবচেয়ে বড় কথা অপব্যবহারেরও একটা সীমা থাকে। অ্যাটমবোমার ব্যবহার সকল সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
মানুষের প্রতি মানুষের বিকৃত আচরণের যৎপরোনাস্তি খতরনাকত্বের পরিচয় প্রকাশক ঘটনা ঘটতেই পারে এবং ঘটছে অহরহ, পৃথিবীর সর্বত্র। মনে করুন একটি লোক পোশাক-আশাকে পরিপাটি দস্তুরমতো উন্নতরুচির ভদ্রলোক, সিগারেট ফুঁকছে, আর একটি পাগলপ্রকৃতির লোক পাশেই মাটির নোংরাতে পড়ে থাকা সিগারেটের ফেলে দেওয়া অবশিষ্টাংশ কুড়াচ্ছে, মনের আনন্দে। ভদ্রলোক পাগলকে কাছে ডেকে নিয়ে গিয়ে নিজের মুখের সিগারেটের শেষাংশ মাটিতে ফেলে দিয়ে পাগলকে কুড়াতে দিল। পাগল সিগারেটের অবশিষ্টাংশ কুড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াতেই তার গালে একটি বিরাশি সিক্কার চড় কষে দিয়ে ভদ্রলোকটি অপার আনন্দে খিকখিক করে হেসে উঠলো। অথবা এমন হতে পারে, একবার পত্রিকায় একটি সংবাদ পাঠ করেছিলাম, একটি চাস্টলের চা পরিবেশক ছেলেটি একজনকে চা পরিবেশন করে পেটে চাকুর পাড় খেয়েছে। আপরাধ চায়ের পিরিচটি শুকনো ছিল না, কাপ থেকে উপচে পড়ে যাওয়া চায়ে ভিজে ছিল, এটা সদাশয় খদ্দের মহোদয়ের উষ্মার উদ্রেক করেছে। চাকুর পাড় খাওয়ার একটি কারণ আছে, যদিও সেটা পাড় খাওয়ার কারণের প্রেক্ষিতকে যৌক্তিক সঙ্গতি প্রদান করে না। এই চড় দেওয়া ও খাওয়ার কোনও কারণ নেই, যেমন হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে অ্যাটমবোমা ফাটানোরও কোনও কারণ ছিল না। কারও হামবড়াই ফলানোর প্রয়োজন দু’টি শহর ধ্বংস করে দেওয়ার কারণ হতে পারে না। এমনকি কারণ হিসেবে সেখানে ষড়রিপুর সর্বশেষ রিপু মাৎসর্য (ঈর্ষা, হিংসা, পরশ্রীকাতরতা) পর্যন্ত কার্যকর নয়। ভদ্রলোকের এই আনন্দ উপভোগের আরামটুকু মানবিকতার মুখে শিশ্নোচিয়ে মুত্রত্যাগের শয়তানী, অপরদিকে মানহাটান প্রজেক্টের রাজনীতি প্রকারান্তরে ওই শয়তানির চেয়ে লক্ষগুণে বাড়া, এবং বিশ্বমানবিকতার মুখে শিশ্নোচিয়ে মুত্রত্যাগের ভয়ঙ্কর আরাম। টেলার পৃথিবীর সকল মানুষকে ‘সিগারেটের অবশিষ্টাংশ কুড়ানো পাগলপ্রকৃতির লোকটি’র চেয়ে বেশি মর্যাদা দিতে রাজি নন। মানুষের মর্যাদা তাঁর কাছে এর বেশি কীছু নয়। একেই বলে বিজ্ঞানীর বিচ্ছিন্নতা। এই ভয়ঙ্কর শয়তানির কোনও তুলনা হয় না, সভ্যতার ইতিহাসে আর কোনও দিন হবে না, এই কামনা করি। নোবেল বিজয়ী ইশাডর র্যাবাই টেলারকে ‘সমস্ত উত্তম বস্তুর শত্রু’ বলে বর্ণনা করে বলেছেন, ‘আমার বিশ্বাস, টেলারের অনুপস্থিতিতে পৃথিবী হতো আরও সুন্দর’।(৭) আমি তাঁর সঙ্গে যুক্ত করতে চাই, ‘হতো নির্মল আনন্দময়, পায়খানা করার পর যেমন আনন্দ পায় গোপাল ভাঁড়।’
বিজ্ঞানীর আরামের গল্প আপাতত এইটুকুই। এবং এই অমানবিক আরামটুকুই আজতক বিশ্বে সংঘটিত সকল বিচ্ছিন্নতার মধ্যে ভয়ঙ্কর দানবিক বিচ্ছিন্নতা। কারণ এই বিচ্ছিন্নতা যৎপরোনাস্তি হননপ্রবণ ও খতরনাক অশুভ। এমন ভয়ঙ্কর ও অশুভ বিচ্ছিন্নতা পৃথিবীতে আর যেনো না ঘটে, আর যেনো কারও মনে এমন ভয়ঙ্কর আরাম লাভের স্বপ্ন জেগে না উঠে।
পরমাণুর বিভাজন (ইউরোনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম পরমাণুর খ-ন) ও সংযোজনের (হাইড্রোজেন পরমাণুর জুড় লাগিয়ে হিলিয়াম তৈরি) প্রক্রিয়া সংঘটিত করে, সোজা কথায়, পারমাণবিক বিচ্ছেদ-মিলনের কিংবা যুক্তি-বিযুক্তির প্রাযুক্তিক ব্যাপারস্যাপার ঘটিয়ে লঙ্কাকা- বাঁধাবার যিনি হোতা, এই কাজে তিনি (বিজ্ঞানী টেলার) দারুণ আরাম পান। এটি কোনও বিদূষকের আরাম নয়, বিজ্ঞানীর আরাম। বিদূষক গোপালের আভাসিত আরাম মানবিক, কিন্তু বিজ্ঞানী টেলারের আভাসিত আরাম অমানবিক। টেলারের আরামের অমানবিকতার একমাত্র তুলনা প্রলয়। রাজার ভাঁড় রাজাকে বুঝিয়ে দিতে চায় মানুষের রেচনক্রিয়ার মধ্যেও আরাম আছে, আর সে আরাম প্রকৃতপক্ষেই প্রাকৃতিক, অকৃত্রিম জৈবিক ও জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। সে আরামে যে আনন্দ মিলে, রাজার ছেলে হলে যে আনন্দ পাই, সে আনন্দের সঙ্গে ওই বর্জ্যত্যাগের আরামের আনন্দটা তুলনীয়। সত্যি আরামে আরামে কত আকাশপাতাল ফাঁরাফাৎ (ফাঁরাক+তফাৎ)। গোপাল মানুষ হিসেবে যতোটা মানুষ হাইমার কিংবা টেলার ততোটা মানুষ নামের অবান্তর। এই বিজ্ঞানীরা কেউই আসলে মানুষ ছিলেন না বরং ছিলেন পুঁজির কেনা গোলাম। এদিক থেকে বিবেচনায়, পরমাণু বোমার ¯্রষ্টা হাইমার-টেলার কিংবা মানহাটান প্রজেক্টে কাজ করা তাঁদের সহকর্মীরা কেউই নন, পরমাণু বোমার প্রকৃত স্রষ্টা পুঁজি। তখন পুঁজিই ছিল পৃথিবীর প্রভু এবং এখনও আছে। পুঁজি সেদিন বিজ্ঞানীদের ঘাড় ধরে কাজ করিয়ে নিয়েছে মাত্র। আসলে বিজ্ঞানীরা সেদিন বিজ্ঞানকে পুঁজির পদতলে বিসর্জন দিয়ে মানবসভ্যতার জন্য বিজ্ঞানকে অভিশাপে পরিণত করেছিলেন, এর বেশি কীছু সেদিন তাঁরা করতে পারেন নি। চূড়ান্ত বিচারে রাগী গোপাল কৌতুকী প্রতিশোধের আশ্রয়ে শেষ পর্যন্ত অনুরাগী ও মানবিক, অপরদিকে মানহাটান প্রজেক্টের বিজ্ঞানীরা সকলেই মানবতার শত্রু, নিদারুণ নির্মম এবং ভয়ঙ্কর শয়তানের প্রতিরূপ, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মানহাটানের মহাকর্মযজ্ঞ মানবেতিহাসের সবচেয়ে খতরনাক কর্মযজ্ঞ। এটি মানবসভ্যতার শ্রেষ্ঠ নোংরামি কিংবা শয়তানী। সেখানে একটাই কাজ হয়েছিল, যাকে বলে, মানবের দানবায়ন। যাকে বর্ণনা করা যায় : মানুষ থেকে মানুষের চরম বিচ্ছিন্নতাকে নিশ্চিত করা, সভ্যতার সঙ্গে অসভ্যতাকে সম্পৃক্ত করা, মানুষকে অমানুষে পরিণত করা, এইসব মিলে বিশ্বব্যাপী জিঘাংসার জঘন্য বীজ রোপণের একটি কর্মযজ্ঞের বাস্তবায়ন। আর এইসব অপকর্ম অতিক্রম করে গুরুত্বপূর্ণ কীছু তো সবসময়েই থাকে, এমনকি সেটা হতে পারে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ কী সৃষ্টি করলো তা বড় কথা নয়, বড় কথা হলো মানুষের সৃষ্টি মানব সভ্যতার কোন্ কল্যাণের কাজে লাগলো। এই হিসেবেই পৃথিবীতে মানুষের প্রতিভার কিংবা মেধার বিচার। মানুষকে তার সৃষ্টিকর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন করলে সে আর মানুষ থাকে না। কোনও না কোনওভাবে মানুষকে ¯্রষ্টা হতেই হয়। ¯্রষ্টা না হয়ে মানুষ বাঁচে না। আসলে নিজের সৃষ্টিকে ভোগ করেই মানুষের বাঁচা। মানুষ একাধারে ¯্রষ্টা ও ভোগী। ¯্রষ্টা ও ভোগীর সম্পৃক্ত দ্রবণ অস্মিতা প্রকৃতপ্রস্তাবে এই সৃষ্টির জন্য মঙ্গল। কিন্তু একটি দুঃসংবাদ এই যে, পুঁজির প্রভুত্ব বর্তমান পৃথিবীতে স্রষ্টা থেকে ভোগীকে আক্ষরিক অর্থেই পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। এই দুই শ্রেণিতে (স্রষ্টা ও ভোগী) মানুষ ভাগ হয়ে গেছে। ¯্রষ্টা মানুষ কাজের মধ্যে নিজেকে মগ্ন রাখে। সে নিজের মেধা খাটিয়ে মানব জাতির জন্য সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ কীছু উদ্ভাবন করে। এই ‘কীছু’ সৃষ্টির ক্ষমতা যার নেই সে মানুষ পরাশ্রয়ী প্রাণীর বেশি কীছু নয়, সে পুঁজির মালিক হতে বেশি পছন্দ করে এবং পুঁজির পুঁজ খেয়ে খেয়ে (প্রকৃতপ্রস্তাবে ভোগী হতে হতে) মানুষ হতে পশুতে পরিণত হয়। মানহাটান প্রজেক্ট পুঁজির পুঁজখোরদের আখড়ার বেশি কীছু ছিল না। যে-কোনও বিচারে যে-কোনও যুক্তিতে অ্যাটম ও হাইড্রোজেন বোমার নির্মাণযজ্ঞ মানবজাতির জন্য সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ কীছু উদ্ভাবন নয়, ইতিহাসের সত্য এটাই। এই বোমা পৃথিবীর অপচয় ও অকল্যাণ ছাড়া, মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করা ও ভয় প্রদর্শন করা ছাড়া, পৃথিবীর হৃদপি- হতে রক্তক্ষরণ করা ও অন্তরে হাহাকার উৎপন্ন করা ছাড়া কোনও কল্যাণে আসে নি আর অসবেও না। অ্যাটম হিরোসিমা ও নাগাসাকি ধ্বংসের পর ঠাণ্ডাযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে মাত্র। মানুষ বাঁচানোর পথ থেকে বিচ্ছন্ন করে মারণাস্ত্র তৈরির প্রতিযোগিতার নাটের গুরু বানিয়ে দিয়েছে রাজনীতিকে। বলাই যায়, কোনও এক পাগলের পাল্লায় পড়ে পৃথিবী যে-কোনও দিন ধ্বংস হয়ে যাবার আপতিকতার মুখোমুখি হয়ে বসে আছে।
জীবন চালানোর জন্য জগত সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞানার্জন চাই মানুষের। পুঁঁজিবাদ বিশ্বজুড়ে জ্ঞান বিস্তারের যে-ব্যবস্থাই গড়ে তোলছে অনিবার্যভাবে সেটা হচ্ছে প্রকারান্তরে এমন একটি কারখানা যেখানে মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে যে-ভাবে কোনও একটি পণ্য তৈরি করা হয় তেমনি তৈরি করা হয় পুঁজিবাদী মানুষ, যে মানুষের সর্বশেষ গন্তব্য যুদ্ধ, মানুষ হয়ে মানুষের রক্ত ঝরানো, প্রকরান্তরে পান করা। চূড়ান্ত অর্থে পুঁজিবাদ প্রতিনিয়ত একটি খুনী পৃথিবী তৈরি করে চলেছে, এডওয়ার্ড টেলাররা সেখানে ‘প্রতিভা’ প্রদর্শনের নামে প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রতিভার অপচয় করার প্রতিযোগিতায় মত্ত। পুঁজি সত্যিকার অর্থেই পৃথিবীকে একটি উৎকৃষ্ট বধ্যভূমিতে পরিণত করেছে। পৃথিবীকে স্বর্গ থেকে নরক করে তোলা এই ভয়ঙ্কর বিচ্ছন্নতা থেকে ভবিষ্যতের সভ্যতাকে অবশ্যই মুক্তি পেতে হবে। এই মুক্তির কোনও বিকল্প নেই।
প্রসঙ্গ কেবল গড়ায়। ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার প্রপন্নতায় ‘ফাঁপা মানুষ’ সৃষ্টির কথকতা থেকে রাজার ভাঁড় গোপালের আরাম, গোপালের আরাম থেকে পুঁজির দাস বৈজ্ঞানিক টেলারের আরাম, টেলারের আরাম থেকে অ্যাটম, অ্যাটম ফাটানো থেকে ঠা-াযুদ্ধ, ঠা-াযুদ্ধ থেকে পুঁজি। প্রসঙ্গান্তরের এই পথপরিক্রমাটি আসলে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে প্রাযুক্তিক বিচ্ছিন্নতার চূড়ান্ত, অর্থাৎ অ্যাটমবোমার উদ্ভাবন ও তার অনিবার্য পরিণতিকে নির্দেশ করে। কিন্তু শুরুর প্রসঙ্গটি ছিল, মাতৃভাষার প্রতি নিরুৎসুক উদাসীনতা। এই উদাসীনতা ভয়ঙ্কর মূর্খতায় গড়াতে পারে এবং গড়ালেও একধরণের নির্বোধ শ্রেণির বাঙালির কোনও আপত্তি নেই। মগ্নচৈতন্যের গভীরে বাঙালির এই অভ্যস্ততা একধরণের হীনম্মন্যতায় পর্যবশিত হয়ে পড়েছে, এর থেকে তার মুক্তি চাই।
এই হীনম্মন্যতার ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত পরিলক্ষিত হয়, সুনামগঞ্জ মহিলা কলেজের নামফলকে সুনামগঞ্জ শব্দটির ‘ঞ্জ’ যুক্তাক্ষরটি যখন ‘ন্জ’ হয়ে পড়ে। বানান সরলীকরণ কিংবা যুক্তাক্ষর ভেঙে লেখার কোনও নবযৌক্তিক সূত্রও এখানে কার্যকর নয়, এখানে কার্যকর হয়েছে কারও না কারও প্রবল অবিমৃষ্যকর মূর্খতা। যুক্তাক্ষর ভেঙে বিসদৃশ হলেও করা যেতো ‘ঞ্জ’, কিন্তু তাও করা হয় নি। বাংলাভাষায় শব্দকে উচ্চারণানুগ করার এমন কোনও ব্যাকরণসম্মত বিধি এখনও প্রবর্তিত হয়নি যাতে ‘ঞ্জ’কে ভেঙে ‘ন্জ’ লেখা যাবে। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে পড়ুয়া ইন্দিরা গান্ধিকে ‘প্রিয়দর্শিনী’ বলতেন, এই ‘ন্জ’ ‘ঞ্জ’-এর তুলনায় তেমনি খুব একটা সুদর্শিনীও নয়। ‘ঞ্জ’-এর স্থলে ‘ন্জ’ প্রয়োগ সর্বার্থে একটি অশুদ্ধ প্রয়োগ এবং বাংলাভাষাকে বিকৃত করার একটি জঘন্য ষড়যন্ত্র ও প্রবণতা। বছরের পর বছর ‘ফাঁপা মানুষ’-এর কৃতি এই ভাষাবিচ্ছিন্নতার নিদর্শন বয়ে চলে একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভাবা যায় না। সংশ্লিষ্ট কলেজের এতো এতো শিক্ষিত মানুষজনের কারও কি চোখে পড়ে না প্রবেশপথের এই ফাঁপা পাণ্ডিত্যের মামদোবাজি ? একেই বলে অবাক বাংলাদেশ, মামদোবাজ চড়ে বসেছে কলেজের মাথায়। কেবল এই কলেজ নয়, আসলে বাংলাদেশে মামদো দখল করে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানের আসনগুলো। তাই আজকাল প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা হয়ে উঠেছে প্রিয় বিপ্লবী প্রবণতা।
সুনামগঞ্জে ‘ট্রাফিক পয়েন্ট’-এ যেমন আছে ‘দেশবন্ধু মিষ্টান্ন ভাণ্ডার’ (১৯৪৭ সালের স্বাধীনোত্তর কালে, কিংবা বলা যায়, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে, কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠিত), তেমনি আছে তার প্রায় সমসাময়িক অনুজ ‘দাস ব্রাদার্স’। এদিক থেকে বিবেচনায় দ’ুটিই এ শহরের পুরনো ও প্রখ্যাত দোকান। প্রথমটির নাম আদি অকৃত্রিম বাংলা। যে-নামটিতে, ব্রিটিশ আমলের পর পরই প্রতিষ্ঠিত হলেও, ঔপনিবেশিকতার অনিবার্য প্রতিক্রিয়া ভাষাবিচ্ছিন্নতার কোনওরূপ চিহ্ন বিধৃত নেই। ভাষৌপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত শহুরে ও গ্রামুরে লোকেরা কেউ কেউ, ১৯৪৭-য়ে ব্রিটিশ শাসন অবসানের সাতষট্টি বছর পর এখনও যেটিকে, বাংরেজি করে “বালা’র স্টল” বলেই ডাকেন ও চেনেন। যেহেতু এই মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের মালিকের নাম বলরাম দে, তাই লোকের কাছে এটি বলরামের স্টল অর্থে বলা’র স্টল। একটু খেয়াল করে দেখুন, মালিক তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটির নাম ঠিকই রেখেছিলেন বাংলায়, কিন্তু ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নাক্রান্ত বৃহত্তর সমাজের লোক, যাঁরা ইতোমধ্যে উপনিবেশিত হয়ে পড়েছেন এবং সে-ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে স্বভাষায় প্রক্ষেপণ করে চলেছেন পরভাষার শব্দ, সেটির একটি উপনাম দিয়ে দিয়েছেন। আর সে-নামটির সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছেন একটি ইংরেজি শব্দ।
‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ (পরিমার্জিত সংস্করণ : ২০০০)-এ ইংরেজি স্টল ( Stall ) শব্দটিকে কৃতঋণশব্দ রূপে গ্রহণ করা হয় নি বা বলা ভালো অনবধানতাবশত ভুক্তিবঞ্চিত হয়েছে। তেমনি ভুক্তিবঞ্চিত হয়েছে অনেক বাংলাশব্দ। সে-সব বাদপড়াদের কয়েকটি যেমন : অনাবাসী, অনাশ্রয়ী, অবমানব, অবাসী, আলোকায়ন, উপজিত, উপজেলা, উৎকলন, ক্যারিশমা, গীতাঞ্জলি, গোলকায়ন, জননিরাপত্তা, জনরায়, নামায়ন, নিজস্বী, নৈকতলিক, নৌভ্রমণ, পথকলি, পথশিশু, প্রধানমন্ত্রী, প্রাক্কলন, প্রাক্কলিত, বঙ্গবন্ধু, প্রবৃদ্ধি, বন্দুকধারী, বন্দুকবাজ, বন্দুকযুদ্ধ, বন্ধুতা, বিচারবহির্ভূত, বিমানশিশু, বেদিশা, বেপাড়া, ভুবনায়ন, ভেতরায়ন, ভুবনীকরণ, ভ্যান্ত্রাবাজ, মনমানি, মহাজোট, যুগলবন্দি, যুদ্ধশিশু, সমুৎপন্ন, সমীকৃত ইত্যাদি। এরা সংখ্যায় অগুন্তি। এখানে অগুন্তির গাণিতিক বিস্তৃতি কতো কারও জানা নেই। এই অগুন্তি, ‘হাজার হাজার’ হতে পারে কিংবা তারও বেশি, যে-কেউ এমন কল্পনা করে নিতেই পারেন। তাৎক্ষণিক এ শব্দগুলো মনে এলো বা লিখতে লিখতে মনে পড়ে গেলো, তাই তোলে দিলাম। একবার ভেবে দেখুন, এই শব্দগুলোর সঙ্গে অভিধানভুক্তিবঞ্চনার দুর্ভাগ্য বরণ করে নিতে হয়েছে গানান্তপ্রাণ বাঙালির কাছে ভীষণ প্রিয় ‘গীতাঞ্জলি’ কেবল নয়, এমনকি ভাষাভিত্তিক বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের জন্মইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোত ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটিকেও। বাংলাদেশে বাংলা একাডেমির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় কোনও অভিধানের পরিমার্জিত পরিবর্ধিত নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হবে কিন্তু সেটাতে ‘যদ্ধুশিশু’ শব্দটি থাকবে না, ভাবা যায় না। এটা তো বলতে গেলে হিরোশিমা-নাগাশাকিতে অ্যাটম বিস্ফোরণের ঘটনাকে বাদ দিয়ে জাপানের ইতিহাস লিখার মতো অবিমৃষ্যকর, এর চেয়ে ইতিহাস না লেখাই অধিক শ্রেয়। এদিক থেকে বিবেচনায় ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯৯২) ও পরিমার্জিত সংস্করণ (২০০০) দু’টিই প্রকৃতপ্রস্তাবে একপ্রকার পুনর্মুদ্রণেরই নামান্তর, বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে যতোই সংস্করণের বিজ্ঞাপন প্রচার করা হোক না কেন। যদি অভিধান সংস্করণে নতুন শব্দভুক্তির প্রসঙ্গটি নিয়মবহির্ভূত কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে বাংলা একাডেমির ‘অভিধান সংস্করণে নির্ভুল ভূমিকা’ পালন প্রশংসার দাবি রাখে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বোধ করি এই ‘নিয়মবহির্ভূত কর্তব্য’ কর্মের প্রপন্নতা ফারসি থেকে প্রবসিত ‘রাজাকার’ শব্দটিকে উল্টো অর্থান্তর সহকারে সঙ্গতভাবেই শীর্ষশব্দরূপে অন্তর্ভুক্ত করতে সফল হলেও, বিপরীতে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটিকে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং এই ব্যর্থতা আমাদের মুক্তিসংগ্রামের সঙ্গে ওতপ্রোত একটি শব্দকে স্বাধীনোত্তরকালে ‘সংশোধিত, সংযোজিত, পরিমার্জিত ও পুনর্বিন্যস্ত’ অভিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে পারার গৌরব থেকে বিচ্ছিন্নতার নামান্তর এবং বোধ করি একধরণের রাজনীতিক শত্রুতাও। আর এই অভিমতানুসারে বলা যায়, আসলে অভিধান প্রণয়নও রাজনীতি বিচ্ছিন্ন বিষয় নয় বরং অনিবার্যভাবে রাজনীতির স্পর্শধন্য একটি ব্যাপার।
ভুলে গেলে চলবে না, যে-কোনও বাঙালির জন্য এক্ষেত্রে ভুলে থাকাটা হবে একটি ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাসঞ্জাত অপরাধ। (চলবে)