- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা

ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর)‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি বাংলাদেশ নামক একটি দেশের জন্মজীবনের সঙ্গে এতোটাই ওতপ্রোত ও অবিচ্ছেদ্য যে, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবকে হত্যা করে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটির বাংলাভাষাদেশের মাটিতে কবর রচনা করতে চেয়েছিল এ দেশেরই একটি উপশ্রেণির কতিপয় প্রতিনিধি। অথবা কোনও একজন যদি বলেই ফেলেন, ‘১৯৭১-এর বিশ্বাসঘাতক […] দল ও দেশের আত্মঘাতী মানুষেরা’, তা হলে কি তিনি খুব বেশি একটা সত্যভ্রষ্ট দোষৈকদর্শী বলে বিবেচিত হবেন ? বলা বাহুল্য তাঁরা দেশের মিত্র অবশ্যই ছিল না। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি দখল করে, রাষ্ট্রটির খোলনলচে বদলে, বঙ্গবন্ধুপ্রণীত সংবিধানের যথেচ্ছ ব্যবচ্ছেদ করে, স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিক সুবিধা নিশ্চিত ও পুনর্বাসন সম্পন্ন করে, অপকৌশলের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন ও দক্ষতার সঙ্গে পাকিস্তানিকরণের কারচুপি করে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটির সঙ্গে শত্রুতা করেছিল। কিন্তু শেষরক্ষা হয় নি। টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবের শরীরের কবর রচিত হলেও শেখ মুজিবের আদর্শিক নাম ‘বঙ্গবন্ধু’ বাংলাদেশের মানুষের চিত্তাভিধানে চিরভাস্বর থেকে গেছে। ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটির সঙ্গে বাঙালিজাতি অকৃত্রিম ভাষাসাংস্কৃতিক সংশ্লিষ্টতা বজায় রেখে চলেছে দীর্ঘকাল ধরে। এ সংশ্লিষ্টতা এখন ঘনিষ্টতায় পর্যবশিত হয়ে বাঙলি জাতিসত্ত্বার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠেছে। আর বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। বিচ্ছিন্ন করতে গেলে নিছক অঙ্গহানি ঘটবে না, অস্তিত্বের সঙ্কট দেখা দেবে। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তৎকালের পাকিস্তানি জান্তা দুর্বার আন্দোলনের মুখে বাধ্য হয়ে তথাকথিত ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ প্রত্যাহার করে এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে এক বিশাল গণসংবর্ধনা সভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এই হিসেবে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ৪৫ বছর এবার (২০১৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) পূর্ণ হলো, অর্থাৎ বাঙালির ভাষাসাংস্কৃতিক ব্রহ্মাণ্ডের আকাশে ৪৫ বছর ধরে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি ধ্রুবতারার মতো প্রোজ্জ্বল হয়ে বিরাজমান। বাঙালির গল্প, কবিতা, গান, উপন্যাস, নাটক, চলচ্চিত্র, ভাষণবক্তৃতা, আলোচনা, সমালোচনা, সংবাদ, সম্পাদকীয়, উপসম্পাদকীয় কিংবা নিত্যদিনের সংলাপে বঙ্গবন্ধু ছিলেন, আছেন ও থাকবেন। বাঙালির ভাষাসাংস্কৃতিক ভুবনে বঙ্গবন্ধু একটি চিরভাস্বর নামশব্দ, বাঙালির সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, এই শব্দটিকে বর্জন করে বাঙালির ইতিহাস কেউ রচনা করতে পারবে না। বিস্ময়ে অভিভূত ও বিমূঢ় হয়ে যেতে হয় যে, বাঙালির যাপিত জীবনের সাংস্কৃতিক ভুবনে অপরিহার্য ও অনিবার্য একটি শব্দ কী করে ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এ ভুক্তিবঞ্চিত থেকে যায়, এতোটা দীর্ঘ সময় জুড়ে ? অভিধানটির ব্যবঞ্জবর্ণ অংশের প্রথম প্রকাশ ১৯৬৪ সালে। এর মধ্যে এই অভিধানটির অনেকটি পুনর্মুদ্রণের সঙ্গে দুইটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে, একবার ১৯৯২ ও অন্যবার ২০০০ সালে। কোনও বারেই ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটিকে অভিধানে ভুক্তিভুক্ত করতে অবকাশ মেলেনি কারও। যথাযথ অনুসন্ধানে হয় তো জানা যাবে যে, নিয়োজিত সংকলকরা উদাসীন থেকে মুফতে ফাও মারার অনুশীলনে কেরদারিসমা দেখিয়েছেন কেবল এবং প্রকারান্তরে এই জনপ্রিয় অভিধানটিতে সুপ্ত ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাকে আরও প্রগাঢ় ও গভীর করে তোলেছেন। অথবা তারা রাজনীতিকভাবেই বঙ্গবন্ধু শব্দটিকে অভিধানভুক্তিবঞ্চিত করতে অনুপ্রাণিত ছিলেন শতভাগ, যাকে বলে জ্ঞাতসারে। ক্ষমতায় রাজাকার অধিষ্ঠিত ও অধ্যূষিত বাংলাদেশে এমন ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যায় না। ৭৫-য়ের রাজনীতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষিতে আমাদের সুনামগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা শহিদদের নামে নামকরণকৃত প্রতিষ্ঠানের নাম প্রত্যাহার করে পূর্বনামে ফিরিয়ে নেওয়ার উদাহরণ আছে। এইরূপ নামপ্রত্যাহারে সক্রিয়তাসম্ভব মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতিক পরিস্থিতিতে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটিকে অভিধানভুক্তিবঞ্চিত করার সক্রিয় রাজনীতিকতা কার্যকর ছিল এমন অনুমান বা ভাবনা পোষণ যে-কেউ করতেই পারেন এবং সেটা একবারে অসঙ্গত ও অকারণ কীছু হবে বলে মনে হয় না। এতে করে আর যা-ই হোক অন্তত এই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায় যে, স্বাধীনোত্তর কালে জাতীয়মুক্তির সড়কে বাংলাদেশ পা দিয়ে ফেলতে পারে এমন সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করার লক্ষ্যে রাজনীতিক ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল এবং কার্যত দেশের প্রগতিমুখিনতাকে প্রতিক্রিয়াশীলতামুখি করে তোলার সর্বাত্মক সে-কর্মপ্রয়াস ব্যর্থ হয় নি। তারা ঠিকই স্বঘোষিত অকমিউনিস্ট কিন্তু সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী মুজিবকে হত্যা করতে কসুর করে নি। মুজিব তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন, “আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না। পুঁজিপতিরা নিজেদের স্বার্থে বিশ্বযুদ্ধ লাগাতে বদ্ধপরিকর।” (৮)
অনুপুঙ্খ অনুসন্ধানে হয় তো জানা যাবে, কোন্ কোন্ শব্দ ইতোমধ্যে সংকলকরা ভুক্তিভুক্ত করেছেন সেগুলোতে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার প্রপন্নতা কতোটা প্রশ্রয় পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, বাঙালিরা কি একাডেমির পরিচালক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদেরকে বঙ্গবন্ধু শব্দটিকে অভিধানে ভুক্তিবিযুক্ত করার জন্যে পরিপোষণ করে থাকে? বাঙালি শত প্রতিকূলতার মোকাবিলা করে, হাজার প্রতিবন্ধকতাকে প্রতিহত করে ৪৫ বছর ধরে একটি শব্দকে তার ভাষাসাংস্কৃতিক ভুবনে সযত্নে লালন করতে পারে অথচ এতো বছর পরে বাংলা একাডেমি সে শব্দটিকে তার একটি অভিধানে এক চিলতে ঠাঁই করে দিতে পারে না, ভাবলেই মনে হয়, ডাল মে কুচ কালা হ্যায়। এমন হলে, যে-কারও চেতনায় বিশেষ একটি শব্দের প্রতি এইরূপ উপেক্ষার প্রসঙ্গটি মূর্তনির্দিষ্ট উপায়ে সাধিত একটি ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা রূপে প্রতিপন্ন হতেই পারে, যেখানে বিজয়ের তিন বছর আট মাস পেরুতে না পেরুতেই স্বাধীনতাবিরোধীরা রাষ্ট্রের স্থপতিকে সপরিবারে খুন করে এবং তৎপরে রাষ্ট্রীয় আনুকূল্যের স্নিগ্ধছায়াতলে বহলাতবিয়তে যাপন করে জীবন, একটা নির্দিষ্ট কালপর্যায় পর্যন্ত।
দৈবাৎ মনে যখন পড়লো, তো একটি প্রসঙ্গ এখানে বিবৃত করেই ফেলি। দ্বিধা করে কোনও লাভ নেই। বক্কেশ্বর হয়ে বলতে-বকতেই তো বসেছি। অন্য কারও জানি না, অন্তত আমার কাছে যুগপৎ সবচেয়ে মজার, বিস্ময়কর ও অবিমৃষ্যকর মনে হয়েছে যে, এই ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’টিতে প্রধানমন্ত্রী, প্রবৃদ্ধি, প্রাক্কলন, প্রাক্কলিক, প্রাক্কলিত, বিশ্বায়ন, বিচারবহির্ভূত ইত্যাদি নিত্যব্যবহার্য ও অপরিহার্য শব্দের অনুপস্থিতি এই অভিধানটির উৎকট অসম্পূর্ণতার বিজ্ঞাপন প্রতিনিয়ত প্রচার করছে। অনুসন্ধানে এই অভিধানে ভুক্তিবঞ্চিত, অথচ বাস্তবে নিত্যদিন ব্যবহারে হয় তো জীর্ণ হয়ে পড়া, আরও অনেক শব্দ বা শব্দবন্ধ পাওয়া যাবে। এমনকি বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে ওতপ্রোত ‘গীতাঞ্জলি’ শব্দটির অনুপস্থিতি একেবারেই মাত্রাছাড়া অনভিপ্রেত একটি বিষয়। মাত্রাছাড়া এজন্য যে, ১৯১৩ সালের পর থেকে, বলতে চাই, বাংলা সাহিত্যের ‘গীতাঞ্জলি’ নামক একটি কাব্যগ্রন্থ নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে, এই শব্দটি অভিধানে প্রবেশ্যশব্দের যোগ্যতা অর্জন করেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনও পর্যন্ত, পুরো একশত বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও, কেন জানি না অভিধান সংকলকদের অবহেলার বিপর্যয় (ইচ্ছে হলে পাঠ করতে পারেন : বিশেষ শব্দের প্রতি আরোপিত হয়ে যায় এমন অন্ধত্বের ব্যাধি) ‘গীতাঞ্জলি’র পিছু ছাড়ছে না। নাকি, বাংলাভাষার অভিধানকাররা রাতকানার মতো গীতাঞ্জলিকানা ? তারা গীতাঞ্জলি শব্দটাকে দেখতে পান না। মনে হয় তাই। এছাড়া তো অন্য কোনও কারণ আপাতত আবিষ্কার করা সম্ভব হয়ে উঠছে না।
জানা কথা, যাঁরাই বাধ্য হয়ে অভিধান ব্যবহার করেন, তাঁরা ভালো করেই জানেন, শব্দসঙ্কলকেরা যৎকিঞ্চিৎ শব্দের বিরুদ্ধে অশ্লীলতা কিংবা অশিষ্টতার অভিযোগ আরোপ করে সে-গুলোকে অভিধানবহির্ভূতকরণ কর্মে নিযুক্তনিমগ্ন থাকেন। বিশেষ বিশেষ শব্দের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি প্রযুক্ত হয়, যাবতীয় ভাষাবিধি অমান্য করে এবং আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে, শব্দসঙ্কলকের প্রাতিস্বিক অবিমৃষ্যকারিতাই উপর্যুক্ত প্রক্রিয়াটির প্রধান নিয়ামক। এই প্রাতিস্বিকতার বিস্তর ব্যখ্যাবিশ্লেষণ সম্ভব, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় বিদগ্ধ যে-কারও দৃষ্টিতে ভাষিক-ব্যবহারিক শব্দকে এবংম্প্রকার ভুক্তিবিযুক্তকরণের প্রকরণটি সমাজভাষার শ্রেণিবিভাজনের সামাজিক-রাজনীতিক বাস্তবতাকে প্রতিভাত করে এবং শ্রেণিবিভক্ত সমাজের দ্বান্দ্বিকতার প্রতীক বলে প্রতিপন্ন হয়। অর্থাৎ চূড়ান্তবিচারে পুরো বিষয়টি অনুসন্ধিৎসু সংশ্লিষ্ট সমীক্ষকদের কাছে প্রতিক্রিয়াশীলতাগ্রস্ত অভিধানকারদের রক্ষণশীলতা ও এই রক্ষণশীলতার অন্তর্নিহিত শ্রেণিবৈরিতাসঞ্জাত ঘৃণা-উন্নাসিকতার নির্লজ্জ প্রতিফলন কিংবা প্রকাশ বলে বিবেচিত হতেই পারে এবং এমন হওয়াই স্বাভাবিক ও যুক্তিসম্মত। মার্কসবাদী দার্শনিক-রাজনীতিক লেনিন ও স্তালিনের ভাষাসংক্রান্ত ভাষ্যে সমাজভাষার শ্রেণিবিভাজনের কঠোর সমালোচনা বিধৃত হয়েছে। লেনিন ও স্তালিনকে উদ্ধৃত করে একজন বলেছেন,
“কিন্তু বর্তমান সমাজভাষাবিজ্ঞানীদের কাছে ভাষার এই শ্রেণীবিভাজন বা বর্ণেতর ভাষার প্রতি উন্নাসিকতা স্বীকৃত নয়। ভাষার সংজ্ঞায় লেনিন বলেছিলেন- Language is the most important means of human intercourse.
“অর্থাৎ ভাষা মানুষের মনোভাব আদান-প্রদানের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই বিচারে, মনোভাব-জ্ঞাপনের শক্তি শিষ্ট-শিক্ষিতজনের আদর্শ ভাষার যেমন আছে, মজুরদের ভাষা বা রকের আড্ডার ভাষারও তার থেকে কোনো অংশে কম নেই। এই সত্যের নিরিখেই ষ্টালিন সিদ্ধান্তে এসেছিলেন, ভাষার শ্রেণিবিভাজন সঙ্গত নয়- Hence the functional role of language, as a means of intercourse between people,  consist not in serving one class to the detriment of other classes, but in equally serving the entire society, as the classes of society
“অর্থাৎ একটি ভাষাগোষ্ঠী তার ভাষাভাণ্ডার বা শব্দভাণ্ডারকেই নানাভাবে, নানা উপলক্ষ্যে, সমাজ অন্তর্গত নানা স্তরে প্রয়োজনমতো ভাব-বিনিময়ের ( human  intercourse) কাজে লাগায়। এদিক থেকে কোনো ভাষাই ‘ইতর’ কিংবা Antilanguage হতে পারে না।” (৯) সুতরাং অভিধানকারদের পক্ষ থেকে বিশেষ কোনও ভাষাগোষ্ঠীর ভাষার বিশেষ বিশেষ শব্দ-শব্দবন্ধকে ভাষাভাণ্ডার অথবা প্রত্যক্ষভাবে অভিধান থেকে উৎখাত কিংবা উচ্ছেদকরণের প্রক্রিয়াটি সমাজপরিসরে চলিতকর্মের (প্রকৃতি ও সমাজকে বদলের কাজের) পরিসরে জায়মান ভাববিনিময়ের (human  intercourse) ঐতিহাসিক প্রকরণটিকে বাধাগ্রস্ত, দুর্বল ও পঙ্গু করে তোলে। ভাষাকে দুর্বল ও পঙ্গু করার অধিকার কারও থাকতে পারে না। হাইড্রোঅক্সাইডকে ( H2O) অপ, অম্বু, ইরা, ইলা, উদক, জল, জীবন, তোয়, নীর, পয়, পাথঃ, পানি, পুষ্কর, প্রাণদ, বারি, বারুণ, সলিল, সরঃ, শীতোত্তম ইত্যকার আরও যে-কোনও নামে অভিহিত করার অধিকার থেকে কাউকে বিচ্ছিন্ন বা বিরতকরণের কোনও অধিকার কারও নেই, তিনি স্বয়ং শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, শ্রীহরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা মুহাম্মদ শহীদুল্লাহই হোন, অথবা যদি তাঁরা হোন ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান পরিমার্জিত সংস্করণ (ডিসেম্বর ২০০০)’-এর প্রধান সম্পাদক, সম্পাদক, সহযোগী সম্পাদক যথাক্রমে ডক্টর মুহম্মদ এনামুল হক, শিবপ্রসন্ন লাহিড়িী ও স্বরোচিষ সরকার। জনান্তিকে বলি, এই ‘পরিমার্জিত সংস্করণ’-এ শীর্ষশব্দরূপে ‘পরিমার্জিত’ শব্দটি অনুপলভ্য বটে।
চলিতকর্মের পরিসরে কোনও বিশেষ ভাষায় ভাববিনিময়কারী কোনও জনগোষ্ঠীর কণ্ঠনিসৃত শব্দপ্রতীকের বর্ণপ্রতীকায়নের লিপিবদ্ধ সংগ্রহই হলো অভিধান। যে-কোনও ভাষার অভিধান সঙ্কলন করে উঠা কষ্টসাধ্য তো বটেই তদুপরি পরিপূর্ণভাবে সঙ্কলন করা কোনওভাবেই কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। অভিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে এই সত্য সর্বজনবিদিত ও বিশ্বজুড়া স্বীকৃত। অভিধান কখনও পূর্ণ হয় না, অপূর্ণতা অভিধানের একটি অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য। এই সীমাবদ্ধতা নিয়েই অভিধান অনন্য ও মহিমান্বিত হয়ে উঠে। অর্থাৎ সর্বাবস্থায় ও সর্বপরিপ্রেক্ষিতেই অভিধান সঙ্কলনের ক্ষেত্রে ব্যবহারিক শব্দের অংশবিশেষ বিভিন্ন কারণে অভিধানে ভুক্তিবঞ্চিত থেকেই যায়। এই বিভিন্ন কারণগুলোর ফিরিস্তি এখানে উপস্থিত করার কোনও অবকাশ নেই। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মনিষ্ঠতার মতো নির্ধারিত এই সুনির্দিষ্ট ও অবশ্যম্ভাবী কারণগুলোর ব্যতিক্রম দুর্লক্ষ্য নয়, অন্তত একটি বিশেষ ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়, যখন অভিধানকাররা স্বপ্রণোদিত হয়ে বিশেষ বিশেষ শব্দসমূহকে অভিধানের ভুক্তিবঞ্চিত করেন অর্থাৎ অন্তর্ভুক্ত করেন না শব্দগুলোর বিরুদ্ধে অশিষ্টতা ও অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে এবং প্রকারান্তরে তাঁরা ভাষার মনোভাব-আদানপ্রদানের অর্থাৎ human intercourse -এর সর্বজনীনতার নীতির উপর ভাষিক অথবা ভাষাগোষ্ঠীর শ্রেণিবিভাজননির্ভর ভাষার শ্রেণিবিভাজনের নীতিকে আরোপ করেন এবং এই করে প্রকৃতপ্রস্তাবে ভাষাকে প্রমিত ও অপ্রমিত, মার্জিত ও অমার্জিত, আদর্শ ও অনাদর্শ, সংস্কৃত ও অসংস্কৃত, শিষ্ট ও অশিষ্ট, শ্লীল ও অশ্লীল, ভদ্র ও অভদ্র, কথ্য ও অকথ্য, শহুরে ও গ্রামুরে ইত্যাদি অভিধায় বিভক্ত করেন। এবম্প্রকার বিভাজনের রূপগুলো প্রকৃতপ্রস্তাবে সমাজের অধিপতি (শাসক ও শোষক) ও অধস্তন (শাসিত ও শোষিত) এই একরূপ শ্রেণিবিভাজনেরই ভিন্ন ভিন্ন অভিব্যক্তি মাত্র। ভাষার এই শ্রেণিভিভাজন অখ- ভাষাগোষ্ঠীকে দ্বিখণ্ডিত করে, ভাষাগোষ্ঠীর অভ্যন্তরে শ্রেণিবৈরিতা সর্জন করে। শব্দবর্জনের এবম্প্রকার প্রকরণ জায়মান রাখা হয় মার্জিত ও অমার্জিত ভাষাভেদের অন্তঃসারশূন্য তত্ত্ব প্রয়োগ করে। কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে ভাষার কোনও মার্জিত ও অমার্জিত প্রকারভেদ হতে পারে না বা নেই, অন্তত ভণ্ডাদিমির ইলিচ লেনিন প্রদত্ত সংজ্ঞা (‘Language is the most important means of human intercourse.’) অনুসারে। সুতরাং ভাষাভাণ্ডারের বিশেষ শব্দ বা শব্দবন্ধকে ‘অকথ্য, অপ, অশিষ্ট, অশ্লীল, গ্রাম্য, ইতর, সম্ভ্রমহীন, রুচিবিগর্হিত, অনাদর্শিক ইত্যাদি বলে অভিহিত করার কোনও অবকাশ নেই। অভিধান প্রণয়নের সুবিধাকে ব্যবহার করে এই অসঙ্গত অবকাশ তৈরি করেন অভিজাত শ্রেণির জ্ঞানপাপীগণ, যাঁরা নিজেদেরকে অভিধান প্রণয়ণের ভূমিকায় অবতীর্ণ করেন। অনভিজাতদের (আতরাফ অর্থাৎ নিম্নশ্রেণি) প্রতি অভিজাতদের (আশরাফ অর্থাৎ উচ্চশ্রেণি) বিদ্বেষসঞ্জাত এই অভিঘাত (অভিধান সঙ্কলনের ক্ষেত্রে অবলম্বিত শব্দবর্জনের প্রকরণ) চূড়ান্ত বিচারে জায়মান আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় উপজিত শ্রেণিদ্বন্দ্বেরই বহিঃপ্রকশ অর্থাৎ অভিধান প্রণয়নের পরিসরে যে-শব্দবর্জনপ্রকরণ বাস্তবায়িত হয় তা অভিধানকারদের শ্রেণিগত বিদ্বেষ-হিংস্রতারকে নির্লজ্জভাবে প্রকটিত করে এবং পাশাপাশি প্রতিপন্ন করে তাঁরা সকলেই একধরণের বিচিত্র ভাষাবৈযুক্তিক হীনম্মন্যতায় আক্রান্ত, উন্নাসিকতাগ্রস্ত। এই হীনম্মন্যতা-উন্নাসিকতার নির্গলিতার্থ একটাই, শব্দ বা শব্দবন্ধকে ‘অশ্লীল’ বা ‘অশিষ্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকারান্তরে এইসব শব্দ বা শব্দবন্ধ ব্যবহারকারীদেরকেই ‘অশ্লীল’ বা ‘অশিষ্ট’ অভিধায় ভূষিত করা, অর্থাৎ চুড়ান্ত পর্যায়ে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করা, অসম্মান করা ও শোষকশ্রেণি থেকে শোষিতশ্রেণিকে আলাদা করে চিহ্নিত করা। এটি একটি নিতান্ত অবিমৃষ্যকর ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার দৃষ্টান্ত, কিন্তু চারিত্র্যলক্ষণে আপাদমস্তক রাজনীতিক। এই রাজনীতি প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতায় পরিপূর্ণ ও বিভাজনের অবকাশ তৈরি করে আত্মসাাৎ জায়মান রাখার দুরভিসন্ধিতে প্রখর।
সমাজশাসন-শোষণের দুরভিসন্ধিতে প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্র হচ্ছে এবং বোধ করি হবে, যদি না সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা থেকে সম্পদের সামাজিক মালিকানার অর্থনীতি প্রবর্তিত করা যায়, অর্থাৎ সর্বাস্তৃত আত্মসাতের অর্থনীতি চলতেই থাকবে, পুঁজির দুর্বার দৌরাত্ম্যে বিভাজনের রাজনীতির অবসান হবে না, এই অবসরে রঁতিয়েরা শাসন করবে পৃথিবী, খুনের বন্যা বইয়ে দেবে দেশে দেশে এবং এদিকে জীবনের চালিকাশক্তি অর্থনীতির ভিতের উপর গড়ে ওঠা সাংস্কৃতিক জগতও সেই শেণিবিভাজনের রাজনীতি থেকে বিযুক্ত থাকবে না, এইটাই স্বাভাবিক। শ্রেণিবৈরিতার বৈশ্বিক পরিসরে মানুষ শেষপর্যন্ত পরস্পরের প্রতি দিদ্বেষী অমানবিক হয়ে তো উঠবেই। এই মজ্জাগত শ্রেণিবৈরিতার ছাপপ্রভাব শ্বিজুড়া ভিন্ন ভিন্ন ভাষার সাহিত্য-সংস্কৃতির পরতে পরতে পরিলক্ষিত হয়, অভিধানও স্বাভাবিকভাবেই তার ব্যতিক্রম নয়। এই ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতে অভিধানকারেরা অভিধানে বিভাজনের রাজনীতিতে নিমগ্ন থাকবেন, ভাষাগোষ্ঠীকে এক করে ‘একার্ণব’রূপে তাঁরা কখনওই প্রত্যক্ষ করবেন না, সমাজের বৃহৎ শ্রমজীবী অংশকে অমার্জিত, অশিষ্ট, অশ্লীল, অভদ্র, ইতর বলে প্রতিপন্ন করতে মুখিয়ে থাকবেন। অমানবিকতা কিংবা দানবিকতার কূপমণ্ডুকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তাঁদেরকে নৈঃশ্রেণিক সামাজিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির একার্ণবতত্ত্বে বিশ্বসী ও বিশ্বস্ত হয়ে উঠতে হবে, অন্যথায় নয়। সুতরাং জায়মান সামাজিক অবস্থাবিশেষের পরিপ্রেক্ষিতে চূড়ান্ত বিচারে সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা সঞ্জাত আভিজাত্যের দানবিকতা অভিধান প্রণয়নের মহৎকর্মটিকে শ্রেণিবিদ্বষের বিষে বিষিয়ে দেবে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বর্তমান পরিস্থিতিতে আক্রমণ অবশ্যম্ভাবী, অভিধান তার ব্যতিক্রম হতে পারে না, এমন ভাবনায় যে-কেউ ভাবিত হতেই পারেন। অভিধান প্রণয়নের পরিসরে শ্রেণিবৈরিতাসঞ্জাত প্রতিপক্ষের প্রতি এবম্প্রকার আক্রমণ একটি সাংস্কৃতিক ষড়যন্ত্র, যে ষড়যন্ত্রটি ‘বর্তমান সমাজভাষাবিজ্ঞানীদের কাছে ভাষার […] শ্রেণিবিভাজন বা বর্ণেতর ভাষার প্রতি উন্নাসিকতা স্বীকৃত নয়’ (১০) এই বৈজ্ঞানিক প্রত্যয়প্রতিপাদ্যের বিরোধী এবং সার্বিক বিবেচনায় অবশ্যই অনভিপ্রেত। অভিধানকে শ্রেণিনিরপেক্ষ করে তোলার অভিপ্রায়ে এই প্রবণতার (শব্দ বা শব্দবন্ধকে শ্লীল, অশ্লীল, শিষ্ট, অশিষ্ট বলে চিহ্নিতকরণের) অবসান চাই। যদিও তার আগে সমাজটিকে একার্ণবে পর্যবসিত করতে হবে।
অভিধানকারদের এই মনোভাব অবশ্যই সামন্তবাদী-পুঁজিতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াশীলতাসঞ্জাত তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মানুষ হয়ে অপর মানুষকে ঘৃণা করার এবম্প্রকার নিন্দনীয় কার্যকলাপ অব্যাহত রেখে তাঁরা নিজেদের মানবিকতাকে বিসর্জন দেন এবং নিজেরো মানুষ নামের অবান্তর হয়ে উঠেন, নিজের অজান্তে হয়ে উঠেন জ্ঞানপাপী। এই পাপকর্মের পৌরোহিত্য থেকে তাঁদের মুক্তি চাই, মুক্তি চাই এবম্প্রকার অমানবিক ভাষাসাংস্কৃতিক বিযুক্তি থেকে, তাতে অন্তত বাঙালি জাতিসত্তার একপক্ষ আরেকপক্ষের প্রতি অনায়াসে সাম্যসহমর্মিতার অনুভাবে পরস্পরের দিকে সৌহার্দের দৃষ্টি মেলে তাকাতে পারার সুযোগ অর্জন করবে এবং অমঙ্গলের অবকাশ হবে সঙ্কীর্ণ। তাতে মন্দ কী ?
এবম্প্রকারে ভাষাসাংস্কৃতিক বিযুক্তি প্রদর্শনের কোনও আবশ্যকতা ছিল না বা এর পশ্চাতে তেমন কোনও যৌক্তিকতাও নেই এমন ভাবনা যে-কেউ ভাবতেই পারেন। তাতে ভাষাসাংস্কৃতিক বিযুক্তি রহিত হয়ে যায় না, অবস্থার কোনও তারতম্য ঘটে না, বাস্তবতা যেমন থাকার তেমনই জায়মান থাকে। অর্থাৎ সাহিত্যের আড্ডায় বসে ‘বাল ছিঁড়ে আঁটা বান্ধা’ উচ্চারণ করলে পুঁজির দুর্বার দৌরাত্ম্যে বিভাজনের রাজনীতির তল্পিবাহকদের তথাকথিত অশ্লীলতার অভিযোগে অভিযুক্ত হতেই হয়। যেহেতু সাহিত্যাসরে এই ‘বিশেষ ভাষা’ নিষিদ্ধ এবং ‘বাল’ অভিধানে ‘অশিষ্ট’ বলে উল্লেখিত। যারা নিষেধ করেন তারা এই বিশেষ ভাষাকে ‘ইতরভাষা’ বলেন, অথচ বাস্তব জীবনে তাঁরা এই ইতরভাষায় প্রকাশিত ভাববস্তুর লটবহরের ব্যবহারিক সমুদ্রে আপদমস্তক নিমজ্জিত থাকেন এবং তথাকথিত সুসংস্কৃত ভাষায় কিংবা ঔপনিবেশিক ভাষা ইংরেজিতে সেইসব ভাববস্তুর অর্থদ্যোতনাসম্পন্ন শব্দ ব্যবহারে কুণ্ঠিত হন না বা নির্দ্বিধায় ব্যবহার করেন, তখন তাঁরা অশিষ্ট ও অশ্লীল হয়ে যান না কিংবা অশিষ্টতা ও অশ্লীলতার কলঙ্ক তাঁদের অঙ্গ-অন্তরকে স্পর্শ করে না। এবংবিধ চর্চায় নিরত হয়ে তাঁরা অপরপক্ষের (যেমন সত্রাজিৎ গোস্বামীর অভিমতানুসারে মজুর বা রকবাজ) প্রতি প্রতিনিয়ত যে ভাষাসাংস্কৃতিক অভিঘাত আরোপ করে থাকেন এই আরোপণক্রিয়াটি যে প্রকারান্তরে সাংস্কৃতিক প্রতারণার নামান্তর হয়ে উঠে তা তাঁরা হৃদয়ঙ্গম করতে পারেন না। সাহিত্যাসরের শিষ্টজনের মতোই বাংলাভাষার অভিধানকারও তার ব্যতিক্রম নন। সঙ্কলিত অভিধানগুলোতে কোনও কোনও শ্রেণি-পেশা-সম্প্রদায়-জনস্তর বিশেষের ভাষাকে যৎকিঞ্চিৎ ব্যতিক্রম ব্যতীত কার্যত ‘ইতরভাষা’ কিংবা ‘অহঃরষধহমঁধমব’ রূপেই গণ্য করা হয়েছে। একজন সে-সত্যের উপলব্ধিসঞ্জাত প্রতিফলন ঘটিয়ে লিখেছেন, “[…] বিশেষত যৌন শব্দ বা যৌনাঙ্গ বিষয়ক শব্দের ক্ষেত্রে বাংলা অভিধানের রক্ষণশীলতা সর্বাধিক চোখে পড়ে। বাংলা যৌনক্রিয়া বা জননেন্দ্রিয় বিষয়ক যে-সমস্ত শব্দ বহুল প্রচলিত সেই সমস্ত শব্দকেও আশ্চর্যভাবে এড়িয়ে গেছেন অভিধানকর্তারা। যৌনতাই যে বাঙালি সমাজের প্রধান টাবু, সেটা স্পষ্ট হয় অভিধানকর্তাদের মনোভাব থেকে।”(১১) এই টাবু ক্ষেত্রবিশেষে সামাজিক অমঙ্গল, অনিষ্টতা কিংবা অপকৃষ্টাতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রসঙ্গটি একটু সহজবোধ্য করার প্রয়াসে এখানে টাবুর যৎকিঞ্চিৎ পরিজ্ঞান বিধৃতকরণার্থে সিগমু- ফয়েডের একটি উদ্ধৃতি উৎকলিত করছি। তিনি একজনকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, “ভু- বলেছেন, ‘যেসব প্রথা কোনো ধর্মমতের চিন্তার সঙ্গে বা তৎসংক্রান্ত ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে যুক্ত কোনো বস্তু সম্বন্ধে ভীতি উৎপাদন করে’ তা সবই টাবু পদবাচ্য। আর এক জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘প্রত্যেক আচার-বিরুদ্ধ প্রথা বা আদব-কায়দা এবং বিশেষ কোনো জিনিস স্পর্শ করতে নিষেধ বা নিজের জন্য গ্রহণে নিষেধ বা কোনো নিষিদ্ধ শব্দ ব্যবহারে আপত্তি, টাবু বলতে সাধারণভাবে এ সমস্তকেই আমরা বুঝিÑ।’ তা যদি হয়, তা হলে কোনো জাতি বা সংস্কৃতির কোনো স্তরই এর অনিষ্টকারিতার হাত থেকে রেহাই পায় নি।” (১২) অভ্র বসুর অভিমতানুসারে অভিধান সঙ্কলনের পরিসর-পরিপ্রেক্ষিতে ‘বাংলা যৌনক্রিয়া বা জননেন্দ্রিয় বিষয়ক’ (যৌনতা বিষয়ক) শব্দ বা শব্দবন্ধসমূহ ‘যৌনতাই […] বাঙালি সমাজের প্রধান টাবু’ (বাঙালির যৌননৈতিক টাবু)-এর শিকার হয়ে পড়ে। টাবু-সংশ্লিষ্ট-সমীক্ষণ-লব্ধ উক্ত সত্যতা সসম্মানে স্বীকার করে নিয়েই বলতে হয়, অভিধানে কীছু কীছু ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম একেবারে দুর্লক্ষ্য নয়, যেখানে বাঙালির যৌনতা বিষয়ক টাবু কার্যকর নয়। যেমন গাঁড়, গুদ/ভোদা, পোঁদ, বাঁড়া, বাল, বাঞ্চত ইত্যাদি ‘যৌনক্রিয়া বা জননেন্দ্রিয় বিষয়ক’ শব্দ অভিধানে লভ্য বটে, অর্থাৎ অভিধানকাররা এই শব্দসমূহকে অভিধানে ভুক্তিবিচ্ছিন্ন করেন না, কিন্তু এ গুলোর ‘পদ পরিচয়’-এর পূর্বে কিংবা শুরুতে প্রথমবন্ধনীর ভেতরে ‘অশ্লীল’, ‘অশিষ্ট’, কিংবা ‘অশি.’ (অশিষ্ট), এবংবিধ ‘পদ পরিচয়’ পরিবেশনে নির্দ্বিধ হতে কার্পণ্য করেন না। অর্থাৎ শব্দগুলোকে তথাকথিত ‘মার্জিত ভাষার’ (১৩) বহির্ভূত, ‘সম্ভ্রমবোধ’(১৪) উদ্রেকে অপারগ ও ‘বর্ণেতর’ (নিম্নশ্রেণির) (১৫) পরিচয়ে চিহ্নিত করেন। এর ফলে জ্ঞানপাপী সুলভ পাণ্ডিত্য প্রকাশের সুবাদে অভিধানকারদের শ্রেণিচরিত্র প্রকটিত হয়, তাঁদের ইতিহাসধিক্কৃত যুগপৎ সামন্তবাদী ও পুঁজিতান্ত্রিক রক্ষণশীল রাজনীতির প্রতিক্রিয়াশীল নোংরা নাক মুখোশের ফাঁক গলে আত্মপ্রকাশ করে নাক গলানোর কর্মসংস্কৃতির বিস্তার ঘটায়, প্রকারান্তরে বর্বরতা-ভণ্ডামির পরাকাষ্ঠা প্রতিপন্ন হতে আর সময়ের অপচয় ঘটে না এবং বোধোদয় ঘটে যে, অভিধান রাজনীতি নিরপেক্ষ নয়। অপরপক্ষে উপর্যুক্ত শব্দসমূহের (১. গাঁড়, ২. গুদ/ভোদা, ৩. পোঁদ, ৪.বাঁড়া, ৫. বাল, ৬. বাঞ্চত) সমার্থক প্রতিশব্দ বা শব্দবন্ধের (যথাক্রমে ১. যোনি, পায়ু; ২. গুহ্যদেশ, মলদ্বার, পায়ু, স্ত্রীচিহ্ন, যোনি, স্ত্রীযৌনাঙ্গ; ৩. মলদ্বার, গুহ্যদেশ, পাছা, নিতম্ব, শ্রোণি; ৪. পুরুষাঙ্গ, শিশ্ন; ৫. উপস্থচুল, উপস্থকেশ, উপস্থকুন্তল; ৬. ভগ্নিধর্ষক) ‘পদ পরিচয়’ প্রদানের ক্ষেত্রে ‘অশ্লীল’ বা ‘অশিষ্ট’ পরিচয় পরিবেশনে সচেতনবিযুক্তি বা বিরত থাকার তপস্যায় নিরন্তর নিমগ্ন আছেন অভিধানকারেরা। এর চেয়ে চমৎকার প্রতারণা আর কী হতে পারে? অর্থাৎ কোনও কোনও শব্দ-শব্দবন্ধের সঙ্গে ‘অশ্লীল’ বা ‘অশিষ্ট’ পরিজ্ঞান উল্লেখের নিয়ম প্রয়োজ্য নয়, কোনও কোনও শব্দ-শব্দবন্ধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই নিয়মানুসারে গাঁড়াদিগণের (গাঁড়, গুদ/ভোদা, পোঁদ, বাঁড়া, বাল) ক্ষেত্রে ‘অশ্লীল’ বা ‘অশিষ্ট’ ‘পদ পরিচয়’ পরিবেশনের নীতি প্রযোজ্য হয়েছে। এবম্প্রকার ‘জোলাকে ফুলা দিয়ে বুঝানো’র অপকম্মটি করার কালে তাঁরা (অভিধানকারেরা) বিশেষভাবে অযৌক্তিক হয়ে উঠতে ভালোবাসেন অথবা যৌক্তিকতার মু-পাত করতে কসুর করেন না কিংবা সংশ্লিষ্ট বিষয়টিকেই সম্পূর্ণ এড়িয়ে যেতে পছন্দ করেন। এই যুক্তি-নীতিবিচ্ছিন্নতার পশ্চাতে তাঁদের শ্রেণিগত বিদ্বেষবহির্ভূত অন্য কোনও যৌক্তিক কারণ অভিব্যক্ত নয়। এইসব গাঁড়াদিগণ জীবপ্রত্যঙ্গ বিশেষের (প্রকৃতপ্রস্তাবে নরপ্রত্যঙ্গের) পরিচয়জ্ঞাপক শব্দ-শব্দবন্ধ যদি তথাকথিত ‘অশ্লীল বা ‘অশিষ্ট’ হয় (অভিধানকারদের অভিমতানুসারে) তবে সেই অভিন্ন জীবপ্রত্যঙ্গ, যে-গুলো তথাকথিত শ্লীল ও শিষ্ট বলে স্বীকৃত (অভিধানকারদের অভিমতানুসারে), গুহ্যাদেশাদিগণও (পায়ু, গুহ্যদেশ; যোনী, ভগ; স্ত্রীযৌনাঙ্গ; মলদ্বার, পাছা, নিতম্ব; পুরুষাঙ্গ, শিশ্ন; উপস্থকুন্তল) অবশ্যই ‘অশ্লীল বা ‘অশিষ্ট’। কারণ ভাববিনিময়ের ক্ষেত্রে শাব্দিক অর্থদ্যোতকতার তো কোনও ফাঁরাফাৎ (ফাঁরাক+তফাৎ) ঘটে না। যেমন মুসলমানরা ‘পানি’ ও হিন্দুরা ‘জল’ বললে ‘হাউড্রোজেনের দুই বাবাজি (পরমাণু) অক্সিজেনের এক’ (১৬) মিলে যা (হাইড্রোঅক্সাইড বা ঐ২ঙ) হয় তার বস্তুগত মহাজাগতিক অস্তিত্বের কোনও পরিবর্তন সাধিত হয় না, তার মৌলিকত্বের কোনও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে না, যেমন ছিল তেমনই থাকে। একবার ‘গাঁড়’ বললে আর একবার ‘নিতম্ব’ বললে এই দুই শব্দের (গাঁড় ও নিতম্ব) অর্থদ্যোকতার মর্মনির্যাস বা অভিব্যক্তি পৃথক হয়ে যায় না, তারা ব্যবহারকারীর বাকযন্ত্রের তাড়নাসঞ্জাত পৃথকত্বের কারণে শ্রোতার কর্ণে শ্রবণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ভাষিক-শাব্দিক স্পন্দনভিন্নতা প্রাপ্ত হয় বটে, কিন্তু এই ভিন্নতা বাঙালি শ্রোতাসন্নিধানে নির্দিষ্ট বস্তুপরিচয়টিকে বদলে দেয় না, অনিবার্যভাবে একই বস্তুগত মহাজাগতিক অস্থিত্বকে নির্দেশ করে। মূর্তবিমূর্ত একই পাদার্থ বা বস্তুর পরিচয়জ্ঞাপক ভাষিক শব্দ-শব্দবন্ধের ভিন্নতা থাকতেই পারে। ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় (যেমন বাংলা বা ইংরেজি) তো এই ভিন্নতা আছেই এবং বোধ করি থাকবেও, এমনকি যে-কোনও একটি নির্দিষ্ট ভাষার শব্দভা-ার থেকে একটি নির্দিষ্ট বস্তুর পরিচয়জ্ঞাপক শতাধিক শব্দ-শব্দবন্ধ ভাষীরা ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হতে পারেন, অর্থাৎ ভাষীরা পরস্পরের সন্নিকটে একটি নির্দিষ্ট বস্তুর পরিজ্ঞান বিবৃত করতে শতাধিক শব্দ-শব্দবন্ধের ব্যবহার করে থাকেন, এমন বাস্তবতা কারও কল্পনাপ্রসূত কীছু নয়। প্রত্যেক ভাষায় ভিন্ন ভিন্ন প্রতিশব্দের সহায়তায় একই বস্তু বা ভাবকে পরিচিত করার এবংবিধ নিয়ম প্রচলিত ছিল এবং আছে। কারণ মানুষ ভাবপ্রকাশের ক্ষেত্রে ভাষিকবৈচিত্র্য প্রয়াসী। সূর্য একটি মহাজাগতিক বস্তু এবং সৌরজগতে সূর্য একটাই। বাংলাভাষায় শতাধিক (কমপক্ষে ১১২টি)(১৭) শব্দ-শব্দবন্ধে এই এক সূর্যের পরিচয় নির্দেশ করা হয়। এবম্প্রকারে ‘নারী’, ‘স্তন’, ‘নদী’ কিংবা ‘সমুদ্র’ শব্দের প্রতিশব্দ যথাক্রমে কমপক্ষে ২৮, ১৫, ৩১ ও ৬৪টি। (১৮) এরকম হাজারটা উদাহরণ উপস্থিত করা সম্ভব। পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায়ও একই বস্তুভাবকে (মূর্তবিমূর্ত বস্তুকে) ভিন্ন ভিন্ন শব্দ-শব্দবন্ধযোগে প্রকাশের এবম্প্রকার নিয়মপ্রকরণের ব্যবহারিক বাস্তবতা পরিলক্ষিত হয়।
ভাবপ্রকাশে ব্যক্তির এই সর্বজনীন স্বাধীনতাকে ব্যাহত করার কোনও অধিকার কারও নেই। এই স্বাধীনতা ব্যাহত হলে সাহিত্যের সমৃদ্ধি আঁতুর ঘরেই আটকে গিয়ে ফতুর হয়ে বসে থাকার সমূহসম্ভানা উদ্রিক্ত হয়। যে-কোনও একটি ভাষার সাহিত্যের রথীমহারথীদের প্রত্যেকের সাহিত্যসৃষ্টির ভাষা আলাদা আলাদা, কারও সাথে কারও মিল নেই, মিলটা কেবল তাঁরা একটি নির্দিষ্ট ভাষায় সাহিত্যসৃষ্টির কাজটি সম্পন্ন করেন। বাংলাসাহিত্যেও তার কোনও ব্যতিক্রম ঘটে না। সাহিত্যের এই বৈশিষ্ট্যই সাহিত্যের প্রকর্ষতার চাবিকাঠি। মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, কমলকুমার মজুমদার, সৈয়দ মুজতবা আলী, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ, সমরেশ বসু, শওকত আলী, অমিয়ভূষণ মজুমদার, মহাশ্বেতা দেবী, হাসান আজিজুল হক, সমরেশ বসু, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির প্রমুুখ সাহিত্যরথীরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের থেকে কমবেশি অলাদা তাঁদের ভাষাভঙ্গির ভিন্নতার কারণেও। ভাবপ্রকাশের এই বিশেষ স্বাতন্ত্র্য মান্যতা না পেলে বিশেষ বিশেষ ভাষাভঙ্গিসমৃদ্ধ কমবেশি আলাদা আলাদ ভাষার সাহিত্যসম্ভারে বাংলা সাহিত্য কেবল নয়, বরং বিশ্বের কোনও ভাষাই সমৃদ্ধ হতে পারতো না। সুতরাং ভাষাব্যবহারের ক্ষেত্রে রক্ষণশীলতার চর্চা পশ্চাদপদতারই নামান্তর। এই প্রবণতা অবশ্যই পরিহারযোগ্য।
বস্তুর (মূর্তবিমূর্ত) পরিচয়জ্ঞাপক শব্দ-শব্দবন্ধের ভিন্নতার কারণে বস্তুটির কোনও পরিবর্তন হয় না, সুতরাং সেটিতে শ্লীল, অশ্লীল, শিষ্ট, অশিষ্ট ইত্যাদি কোনও গুণাগুণ বিকাশের কোনও অবকাশ তৈরি হয় না। অর্থাৎ এইসব গুণাগুণের কোনও অস্তিত্ব নেই, বাস্তবে গুণাগুণগুলো ভাষীদের মানসতায় কোনও না কোনও প্রকারের বিকারসঞ্জাত বিকৃতির প্রতিরূপ এবং সে-গুলোর বাস্তবতা কেবল কল্পনায়ই বাস্তব। অভিধানকারের বিবেচনায় যখন গাঁড়াদিগণ ‘অশ্লীল’ বা ‘অশিষ্ট’ হয় এবং বিপরীতে গুহ্যদেশাদিগণ ‘অশ্লীল’ বা ‘অশিষ্ট’ হয় না, অর্থাৎ অভিধানে নির্দিষ্ট ভুক্তির ‘পদ পরিচয়’-এর ক্ষেত্রে ‘অশ্লীল’ বা ‘অশিষ্ট’ লিখে দেওয়া হয় কিংবা লিখে দেওয়া হয় না, তখন অভিধানকারের এবম্প্রকার প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকা- প্রকৃতপ্রস্তাবে মানসতার বিকারসঞ্জাত বিকৃতির সুনির্দিষ্ট প্রপঞ্চকে প্রকটিত কিংবা প্রতিভাত করে। এই বিকৃতির নির্গলিতার্থটা তাঁদের (অভিধানকারদের) অন্তর্নিহিত কিংবা মানসতায় স্থিত শ্রেণিস্বার্থের উৎকট উগ্রতার প্রকাশ ভিন্ন অন্যকীছু নয় বলেই বিদগ্ধজনের অভিমত। এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, সমাজভাষাবিজ্ঞানে ভাষার কোনও ভেদাভেদ (উচ্চ-নিচ, মার্জিত-অমার্জিত, শিষ্ট-অশিষ্ট কিংবা শ্লীল-অশ্লীল) স্বীকৃত নয়। এই যুক্তি যে-কোনও ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য। কারণ কমলকুমার মজুমদার, শওকত আলী বা সমরেশ বসুকে কেউ যথাক্রমে ‘সুহাসিনীর পমেটম’, ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ বা ‘বিবর’ ও ‘প্রজাপতি’ লিখতে বারণ করতে পারেন না কিংবা বারণ করার অধিকার রাখেন না, হোক সেটা যতই অপ্রচলিত ও দুর্বাধ্য (কমলকুমার মজুমদার), দাঁতভাঙা তাৎসমিক (শওকত আলী) বা রকবাজ (সমরেশ বসু) ভাষা। এই ভাষাবৈভিন্ন্যতার যত ইচ্ছে সমালোচনা করার অধিকার স্বীকৃত হলেও বারণ করার অধিকার স্বীকৃত নয়।
প্রকৃতপ্রস্তাবে ভাষার শব্দকে অশিষ্ট কিংবা অশ্লীল এবং শিষ্ট কিংবা শ্লীল এবম্প্রকার প্রকরণে দ্বিধা বিভক্ত করার মধ্যে শ্রেণিরাজনীতির নির্ঘাত উপস্থিতি নির্দেশ করে। শ্রেণিস্বার্থের দাসানুদাস অভিধানকাররা সে-রাজনীতিটিই করেছেন, তাঁরা অভিধানের শব্দগুলোর দু’টি প্রকার ভেদ করেছেন, একটি অভিজাত শ্রেণির ভাষা (শিষ্ট ও শ্লীল) ও অন্যটা অনভিজাত শ্রেণির ভাষা (অশিষ্ট ও অশ্লীল)। সমগ্র ভাষাগোষ্ঠীকে এবম্প্রকার প্রকরণে বিভক্ত করার অধিকার কারও থাকতে পারে না। এতে করে ভাষাকে অসঙ্গতভাবে শ্রেণিরাজনীতি ও শ্রেণিশোষণের হাতিয়ার করে তোলা হয়। এবংবিধ নীতির নির্গলিতার্থ একটাই, লোকে যাকে বলে, ‘গুয়ে বলে গোবরদাদা তোর গায়ে বড় গন্ধ’। এই নীতি স্বাভিজাত্য প্রকাশের অবিমৃষ্যকারিতার বিষে পরিপুষ্ট ও দূষিত। যেমন ধর্ম হিসেবে ইসলামে উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ নেই। কিন্তু একদা মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত মুসলমানরা নিজেদেরকে আশরাফ (অভিজাত বা উচ্চশ্রেণি) এবং ভারতীয় মুসলমানদেরকে আতরাফ (অনভিজাত বা নিম্নশ্রেণি) বলে চিহ্নিত করে, প্রকৃতপ্রস্তাবে নিজেরা একধরণের ধর্মবিচ্ছিন্নতা বা ধর্মবিযুক্তির শিকারে পর্যবশিত হয়েছেন এবং ধর্মের রাজনীতিক ব্যবহারকে নিশ্চিত করে ধর্মকে শ্রেণিশোষণের হাতিয়ারে পরিণত করছেন।
ভাষা ও ব্যাকরণের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বিবেচনায় এই সত্য উন্মোচিত হয় যে, বাংলা অভিধানকাররা অভিধানে একটি অবিমৃষ্যকর প্রকরণ চালু রেখেছেন, ভুক্তিভুক্ত শব্দের ‘পদ পরিচয়’ বিবৃতকরণের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট শব্দকে (এখানে ‘নির্দিষ্ট শব্দ’ মানে যে-শব্দগুলো অভিধানকারদের বিবেবচনায় তথাকথিত ‘প্রমিতশব্দ’ নয়) অশিষ্ট, অশ্লীল ও অমার্জিত চিহ্নিত করা। বিষয়টির যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা ইতিপূর্বে পরিবেশিত হয়েছে। তারপরও অভিধানে শব্দভুক্তির রীতিপ্রকরণ সহযোগে দু’একটি বাড়তি উদাহরণ সংশ্লিষ্ট করে বিষয়টিকে আরও খোলাসা করে তোলার প্রয়োজন অনুভব করছি।
অভিধানে ‘লিঙ্গ’ শব্দের ভুক্তিতে ‘পদ পরিচয়’-এর ক্ষেত্রে ‘অশ্লীল’ পরিজ্ঞানের বিবৃতি অনুল্লেখিত, অথচ ‘লিঙ্গ’ শব্দের সমার্থক ‘বাঁড়া’ শব্দের ভুক্তিতে ‘পদ পরিচয়’-এর ক্ষেত্রে ‘অশ্লীল’ পরিজ্ঞানের বিবৃতি উল্লেখিত হয়েছে। ‘বাঁড়া’র ‘সাধারণ অর্থ’ করা হয়েছে ‘বি (অশ্লীল) পুরুষাঙ্গ, শিশ্ন’ এবং ‘লিঙ্গ’র ‘সাধারণ অর্থ’-এর ৫টি অর্থান্তরের প্রথটিতেই ‘লিঙ্গ’র অর্থ করা হয়েছে, ‘পুরুষের জননেন্দ্রিয়, শিশ্ন’ এবং এক্ষেত্রে পদপরিচয়ের অগ্রে প্রথমবন্ধনীবদ্ধ ‘অশ্লীল’ উল্লেখ করা হয় নি। এটি একধরণের রক্ষণশীলতার লক্ষণও বটে এবং বোধ করি এর একটি লক্ষণরেখো বিদ্যমান, যে-রেখাটা সামন্তবাদী রক্ষণশীলতার প্রতিভূ অভিধানকারেরা নিজেরা নির্মাণ (‘অঙ্কন’ পাঠ অনাপত্তিযুক্ত) করেছেন এবং তা তাঁরা অদ্যাবধি অতিক্রম করতে নারাজ। এবম্প্রকার রক্ষণশীলতার মুণ্ডুপাত করা অবশ্য বিধেয়, তাতে কোনও অন্যথা করা উচিৎ নয় এবং এর প্রতিবিধিৎসার্থে দিকেদিকে অসংখ্য রাবণের আবির্ভাব আবশ্যক। মনে রাখা দরকার যে, কোনও শব্দ ‘প্রমিত’ মর্যাদার না হলে তা অশিষ্ট কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে অশ্লীল হয়ে যায় না। শব্দের প্রমিত হওয়ার নিয়মে এবংবিধ কোনও নীতি অনুমোদন যোগ্য নয়। কোনও শব্দ বা শব্দবন্ধকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘অশ্লীল’ বা ‘অশিষ্ট’ ঘোষণা করার নীতিগত এই অবিমৃষ্যকারিতাকে রক্ষা করে চলার যে-কোনও প্রচেষ্টা নিরপেক্ষাতার নীতিকে সমর্থন করে না। আবারও বলছি, এই নীতি কার্যত শ্রেণিস্বার্থরক্ষার নীতিনির্ভর রাজনীতির প্রয়োগ ভিন্ন অন্য কীছু নয় এবং এই শ্রেণিসাপেক্ষ নীতির নিরিখে প্রণীত অভিধানগুলোকে অচিরেই সংশোধন করে শ্রেণিনিরপেক্ষতার নীতিতে ফিরিয়ে নেওয়া উচিত।
অনেক শব্দের মতো আর একটি বিশেষ মানবপ্রত্যঙ্গের ক্ষেত্রে অভিধানকারদের অবিমৃষ্যকারিতা পরিলক্ষিত হয়। ‘লিঙ্গ’ কিংবা ‘বাঁড়া’ যাই বলি না কেন, এই বিশেষ প্রত্যঙ্গটির প্রমিত প্রকাশগুলোকে যথাযথ মর্যাদা (অভিধানে ‘শীর্ষশব্দ’-এর মর্যাদা প্রাপ্তি) দেওয়া হচ্ছে, বিপরীতে লোকনিরুক্তিজ প্রকাশগুলোকে মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে না, অভিধানের বাইরে রাখা হচ্ছে, কিংবা অভিধানে ভুক্তিভুক্ত করতে হলে ‘অশিষ্ট’ ও ‘অশ্লীল’ ইত্যাদি ‘পদ পরিচয়’ যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। ‘লিঙ্গ’-এর মতোই ‘নিতম্ব’ মানব শরীরের একটি বিশেষ প্রত্যঙ্গের নাম। আমজনতা কিংবা মুটেমজুর-রকবাজ সাধারণ লোকেরা এটিকে লোকনিরুক্তিজ ‘লাইড়’, ‘পুঁটকি, গাঁড়, গাঁড়ি ইত্যাদি বলেই চেনে। কিন্তু সংস্কৃতাগত ‘নিতম্ব, শ্রোণি, স্থিক, ঘটিক, আরোহ, জঘন, কটিপ্রোথ’ বলে চেনে না। বিশেষ একটি প্রত্যঙ্গকে ‘নিতম্ব, শ্রোণি, স্থিক, ঘটিক, আরোহ, জঘন, কটিপ্রোথ’ ইত্যাদি বললে ‘শিষ্টতা’ কিংবা ‘শ্লীলতা’ প্রকাশের পরাকাষ্ঠার প্রকাশ ঘটে, অপরদিকে এই একই বিশেষ প্রত্যঙ্গকে কেউ ‘লাইড়, ‘পুঁটকি, গাঁড়, গাঁড়ি’ বললে তা ‘অশিষ্টতা’ বা ‘অশ্লীলতা’ প্রকাশক অপকর্ম হয়ে উঠে কোন্ যুক্তির জোরে সেটা কোনও সাধারণ বুদ্ধিতে বোধগম্যতার মাত্রা অর্জন করে না কোনওভাবেই। এবংবিধ অযৌক্তকতাকে মেনে নেওয়া যায় না। সর্বক্ষেত্রে যৌক্তিকতার পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনকারী জ্ঞানপাপীগণ নির্ধারিত এই ক্ষেত্রে এমন অযৌক্তিকতার চর্চা নির্দ্বিধায় করেন এবং যথারীতি সে-অযৌক্তিকতার সঙ্গে শ্রেণিস্বার্থ সংশ্লিষ্ট থাকে। এবম্প্রকার বুদ্ধিবিবেচনার নিহিতার্থ একটাই, আমজনতার সঙ্গে সচেতন প্রতারণা।
এবার যৌননৈতিকতানুসারে অশ্লীলতার বোধসঞ্জাত টাবুর প্রেক্ষিতে বিবেচ্য শব্দটি ‘যোনি’। শব্দটিতে এবং শব্দটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কর্মকা- ও রীতিনীতি-রেওয়াজ সব কিছুই আমাদের সামাজিক যৌননৈতিকতানুসারে অশ্লীলতার টাবু আরোপিত ও ওতপ্রোত। (চলবে)

  • [১]