ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) আমরা এই শব্দটি স্থানকালপাত্র নির্বিশেষে সর্বসমক্ষে উচ্চারণ করি না, অথচ বোধ করি অবোধ ভিন্ন সকলেই প্রতিনিয়ত এই শব্দটির সঙ্গে ওতপ্রোত থাকি, কোনও না কোনওভাবে। পণ্যের বিজ্ঞাপণে নারী, নারীউত্যক্তকরণ (ইভটিজিং-এর বঙ্গান্তর), পাড়া-বেপাড়ার প্রেম ঘটিত বিভিন্ন ঘটনা, ধর্ষণ-দলধর্ষণ, বেশ্যা ইত্যাদির উপস্থিতিই তার প্রমাণ। বোধ করি ‘শব্দটি স্থানকালপাত্র নির্বিশেষে সর্বসমক্ষে উচ্চারণ করি না’র নীতিকে বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান-এ শিরোধার্য করে নেওয়ার কারণে বহুল পরিচিত ও ব্যবহৃত ‘যোনি’ শব্দটি শীর্ষশব্দরূপে ভুক্তিবিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছে, কিন্তু তৎসংশ্লিষ্ট-সংক্রান্ত শব্দাদির ‘সাধারণ অর্থ’ বয়ার্ণনার ক্ষেত্রে শব্দটি নির্দ্বিধায় ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ অর্থ বয়ার্ণনার ক্ষেত্রে শব্দটির অপরিহার্যতাকে অস্বীকার করা সম্ভব না হলেও শব্দটির শীর্ষশব্দরূপে ভুক্তির অপরিহার্যতাকে ঠিকই অস্বীকার করা হয়েছে। কিন্তু আমাদের সাহিত্য ও চিকিৎসাশাস্ত্রে, এমনকি চলিতকর্মের পরিসরে নারীপুরুষ নির্বিশেষে প্রকাশ্য না হলেও একান্ত সঙ্গোপন সংলাপে এই শব্দটি ও শব্দটির প্রমিত কিংবা লোকনিরুক্তজ বিভিন্ন প্রতিশব্দ, সংখ্যায় একেবারে কম নয় বরং অন্য অনেক শব্দের সঙ্গে প্রতিতুলনায় বেশিই হবে হয় তো, প্রবর্তিত ও প্রচলিত আছে। কোনও বিবেচনার ধার-না-ধেরে এবংবিধ নিয়ম, অর্থাৎ অভিধানে কোনও শব্দ বা শব্দবন্ধকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘অশ্লীল’ বা ‘অশিষ্ট’ ঘোষণা করার নীতি, প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে বরাবরের মতো এবং অদ্যাবধি অব্যাহত আছে, প্রশ্নহীনভাবে। প্রকারান্তরে অভিধানে শব্দের এবংবিধ যে-কোনও ভুক্তিবিচ্ছিন্নতার নিরিখে অভিধানকারদের বিবেচনাবোধের অসারতা, নীতিবিযুক্তি ও শব্দের বিরুদ্ধে অনৈতিক ষড়যন্ত্রকে স্পষ্ট ও নির্দিষ্টভাবে প্রতিপন্ন করে তাঁদের পণ্ডিতি মূর্খতাকে প্রতিভাত করেছে মাত্র। বাংলা ভাষায় বোধ করি এবংবিধ (‘যোনি’র মতো) ভুক্তিবঞ্চিত বিস্তর শব্দ পাওয়া যাবে, তবে তা কেবল তথাকতিথ ‘যৌননৈতিক টাবু’-র কারণে নয়, অন্যান্য কতিপয় কারণও এর সঙ্গে ওতপ্রোত, হয় তো। সে-বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে অনুসন্ধিৎসুজনকে সর্বাগ্রে অবশ্যই সমীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হবে। অভিধানকারদের এবংবিধ অবিমৃষ্যকারিতা প্রকৃতপ্রস্তাবে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার নামান্তর ভিন্ন অন্য কীছু নয়, এবং এর পশ্চাতে গভীরগূঢ় রাজনীতিক দুরভিসন্ধি লুকিয়ে আছে। আর যাই বলা হোক, ভাষার বিশেষ বিশেষ শব্দকে নিয়ে এবম্প্রকার বর্জনাচরণচর্চার দৃষ্টান্তকে অন্তত সত্যানুরাগসম্পন্ন বলা যায় না। এই অভিধান প্রণয়ণের পরিসরে এবম্প্রকার প্রকরণের প্রতিবন্ধকতা সর্জন করে যথানির্দিষ্ট শব্দসম্ভারকে, সংখ্যায় প্রচুর তাতে কোনও সন্দেহ নেই, অভিধানে অন্তর্ভুক্তিবর্জনের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রকরণটি প্রবর্তিত রয়েছে।
সর্বজনবিদিত সত্য এই যে, ‘যৌনতা’ কিংবা ‘যৌনাচার’ বহুল ব্যবহৃত সাধারণ দু’টি শব্দ। এই শব্দ দু’টিকে ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর শীর্ষশব্দ ‘যৌন’র উপভুক্তিতে, যতোই গরুখোঁজা করুন, পাবেন না। এরকম আরও অনেক শব্দ আছে। যে-শব্দগুলো কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী, বিভিন্ন বিষয়ে গবেষকগণ তাদের রচনায় অবলীলায় ব্যবহার করে থাকেন এবং ব্যবহার করতে করতে বহুব্যবহৃত হয়ে, যাকে বলে, একেবারেই পুরনো হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে আছে প্রতিনিয়ত সৃষ্ট নতুন নতুন শব্দ। দৃষ্টান্ত হিসেবে ‘চিত্তাভিধান’ শব্দটিই নেওয়া যাক। এটি দু’টি শব্দের সন্ধিসঞ্জাত একটি নতুন শব্দ। বাংলাভাষার ছোটবড় কিংবা নামিদামি প্রায় লিখিয়েরাই দুইটি শব্দকে এক সঙ্গে জুড়ে দিয়ে একটি শব্দসর্জনে প্রপন্ন হতে পছন্দ করেন। এখানে শব্দটি ব্যবহার হওয়ার আগেও হয় তো কেউ এই শব্দটি কোনও লেখায় ব্যবহার করে থাকতে পারেন। এমন হতেই পারে। এই শব্দটি একটি নতুন শব্দ, অন্তত এই যুক্তিতে যে, ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ (পরিমার্জিত সংস্করণ : ২০০০)-এ এই শব্দটি নেই, যেমন নেই ‘পরিমার্জিত’ শব্দটি। ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর ‘চিত্ত’ শব্দের উপভুক্তিতে ‘চিত্ত’ শব্দের সঙ্গে ‘আকর্ষক’, ‘আকর্ষণ’, ‘উদ্বেগ’, ‘উন্নতি’ এই চার শব্দের সন্ধিসঞ্জাতশব্দ যথাক্রমে ‘চিত্তাকর্যক’, ‘চিত্তাকর্ষণ’, ‘চিত্তোদ্বেগ’ ও ‘চিত্তোন্নতি’র অন্তর্র্ভুক্তি আছে। এবংবিধ প্রকরণে ‘কাম’ শব্দের উপভুক্তিতে সন্নিবেশিত হয়েছে ৩৩টি উপভুক্তি, অভিধানের ভুক্তিগুলো থেকে আরও দেদার উদাহরণ হাজির করা যেতে পারে, কেবল গণনা করে নিলেই হলো। অন্যদিকে ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’-এ এরকম (সন্ধির উত্তরপদে প্রথমবর্ণ /আ/, /উ/-এর মতো স্বরবর্ণ) ‘চিত্তাকর্যক’, ‘চিত্তাকর্ষণ’ ‘চিত্তাকাশ’, ‘চিত্তারতি’, ‘চিত্তোৎকর্ষ’, ‘চিত্তোৎকর্ষবিধায়ক’ ও ‘চিত্তোল্লাস’ ভুক্তিভুক্ত হয়েছে; কিন্তু ‘চিত্তোদ্বেগ’ ও ‘চিত্তোন্নতি’ ভুক্তিবিচ্ছিন্ন। অভিধান দু’টিতেই ‘চিত্তাভিধান’ নেই। কথা হলো, ‘চিত্তাভিধান’কে দৈবক্রমে এইমাত্রসৃষ্টশব্দ (কিংবা আনকোরা নতুন শব্দ) ধরে নিলেও ‘গীতাঞ্জলি’ কিংবা ‘বঙ্গবন্ধু’কে অভিধানে ভুক্তিবঞ্চিত রাখার ক্ষেত্রে নতুনত্বের যুক্তি আরোপ সঙ্গত নয়। বাংলাদেশের রাজনীতিক ও সাহিত্যিক ইতিহাস বলছে এই শব্দ দু’টি অনেক পুরনো। একটির জন্ম ১৯১৩-র আগে অন্যটির জন্ম ১৯৬৯-য়ে। এখানে এমন আরও উদাহরণ দেওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কেবল উল্লেখ করছি যে, ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘গীতাঞ্জলি’ শব্দদু’টি বাংলাসাহিত্যে বিভিন্ন রচনায় কতোবার ব্যবহৃত হয়েছে তার একটা, যতোটুকু সম্ভব, পরিসংখ্যান (যদিও পূর্ণ পরিসংখ্যান সম্পন্ন করা একেবারেই অসম্ভব) উপস্থিত করতে পারলে উপরোক্ত বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণিত হতো। আর সেই সঙ্গে বোধোদয় হতো যে, অভিধানকাররা প্রকৃতপ্রস্তাবে অভিধান প্রণয়নকালে একচোখা দৈত্যের মতো কতোটা অবিমৃষ্যকর আচরণে আবিষ্ট থাকেন এবং প্রকারান্তরে অভিধানে ভুক্তিবিচ্ছিন্নতার শিকার হয় হাজার হাজার প্রয়াজনীয় ও কাক্সিক্ষত শব্দ। অভিধান প্রণয়ণে আমলাতান্ত্রিক এই গমগচ্ছতার অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য, জনগণের পকেট কেটে বেতন তো তাঁরা ঠিকই আদায় করে নিয়েছেন ও নিচ্ছেন।
এখানে কেবল শীর্ষশব্দ ‘যৌন’র উপভুক্তিতে যে-সব শব্দ ভুক্তিভুক্ত হতে পারতো তার একটি সর্বার্থে অসম্পূর্ণ তালিকা সন্নিবিশিত হলো। যেমন : যৌনকর্ম, যৌনকাম, যৌনকর্মী, যৌনকামনা, যৌনদাসী, যৌনব্যাধি, যৌনরুচি, যৌনরোগ, যৌনদুর্বলতা, যৌনবাণিজ্য, যৌনবাসনা, যৌনব্যবসা, যৌনব্যাধি, যৌনসঙ্গম, যৌনাঙ্গ, যৌনাচারী, যৌনাবেগ, যৌনানন্দ, যৌনশিল্প, যৌনসংস্কৃতি ইত্যাদি। গোপনযৌনাচারী সমাজ ‘যৌনতা’ কিংবা ‘যৌনাচার’ বিষয়ক শব্দসমূহের গায়ে যে-অশ্লীলতার (সর্বার্থে অকারণ অভিযোগের) তকমা এঁটে দেওয়া হয়েছে এবং সে-তকমার অজুহাত দেখিয়ে তাদেরকে এবং এবংবিধ আরও অনেক শব্দকেÑ যেমন : গাইড়্যা, গাঁড়, চুৎমারানি, ঠাপ, বানচুৎ ইত্যাদি (আরও অগুন্তি তথাকথিত অধিক ‘অশ্লীল’ শব্দ এখানে সংকলন করা সম্ভব, কিন্তু করা হলো না)Ñ অবলীলায় অভিধানবহির্ভূত রেখে দেওয়া হয়েছে, যদিও শব্দগুলো লোকসমাজে তথাকথিত ভদ্র কিংবা অভদ্র, তথাকথিত শিক্ষিত কিংবা অশিক্ষিত উভয় সমাজে প্রতিনিয়ত ভাববিনিময়ের ক্ষেত্রে বহুব্যবহৃত ও বাস্তবে চর্চিত। নারীপুরুষ নির্বিশেষে প্রত্যেক সমাজসদস্যের প্রাতিস্বিক অভিধানে এইসব শব্দ সত্যিকার অর্থেই অভিযোজিত, তাতে কোনও সন্দেহ নেই, অভাগা শব্দগুলো কেবল অভিধানের পাতায় অপাঙ্ক্তেয় এখনও।
ধর্ম-আইন ইত্যাদি সর্বনৈতিক বিবেচনায় ঘুষ একটি গর্হিত ও জঘন্য কর্মপ্রপঞ্চ। অথচ এ দেশে প্রকাশ্যগোপনে লোকে ঘুষ খেতে পরকীয়া প্রেমের মতো দারুণ পছন্দ করে ও ভীষণ অভ্যস্ত। সকলেই জানে কোনও বিশেষ লোক ঘুষ খায়, কিন্তু তাতে ঘুষখোরের কীছু যায় আসে না, সামাজিক সম্মান পড়তিমুখো না হয়ে বরং তলে তলে উঠতিমুখো হয়। কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা মেয়ে পাত্রস্থ করার সময় প্রথমত চাকুরে পাত্রের সন্ধানে ব্যস্ত থাকেন, দ্বিতীয়ত পাত্রের উপরিরোজগার আছে কিনা জেনে নিতে কার্পণ্য করেন না এবং তৃতীয়ত উপরিরোজগারওয়ালা পাত্র পছন্দ করেন। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিস্তৃত এই ঘুষপ্রপঞ্চের মতোই লোকেরা গোপনে মুক্তযৌনতায় বিশ্বাসী এবং তারা এই প্রপঞ্চটির বিস্তৃত পরিসরে গোপনে নিজেকে সম্পৃক্ত করে রাখে, প্রচ-ভাবে। তেমনি ঘুষ ও যৌনতার প্রপঞ্চ সমাজের অভ্যন্তরে জায়মান থাকার মতোই অভিধানবহির্ভূত তথাকথিত ‘অশ্লীল’ শব্দ বস্তুতপক্ষে যাপিতজীবনে প্রতিনিয়ত লোকেরা দেদার ব্যবহারে ভীষণ অভ্যস্ত ও পারদরঙ্গম। এই গোপনমুক্তযৌনতার প্রকাশকুণ্ঠতার মানসতাই প্রকৃতপ্রস্তাবে অভিধান সংকলনে কার্যকর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে যৌনতাসংশ্লিষ্ট শব্দসমুদয়কে, কতিপয় ব্যতিক্রম ব্যতীত, অভিধানে ভুক্তিবঞ্চনা তথা ভুক্তিবিচ্ছিন্নতার শিকারে পরিণত করে। এই ‘কতিপয় ব্যতিক্রম ব্যতীত’দের অন্যতম সদস্য : গুদ, ধর্ষণ, পুটকি, বাঁড়া, যৌন, লিঙ্গ, ভগাঙ্কুর, সঙ্গম ইত্যাদি। এইসব শব্দের ক্ষেত্রে ‘প্রকাশকুণ্ঠতার’ নিয়ম প্রযাজ্য হয় নি। প্রশ্ন উঠতেই পারে কেন এবং কোন্ যুক্তিতে ? কিন্তু এমনতর প্রশ্নের উত্তরে অভিধানকারা অদ্যাবধি কোথাও কোনও যুক্তি প্রদর্শন করেছন বলে কেউ কি পরিজ্ঞাত আছেন ? যদি থাকেন তবে জানানোর সনির্বন্ধ অনুরোধ রইলো। আপাতত আমার জানা নেই।
‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ (পরিমার্জিত সংস্করণ : ২০০০)-এ নির্দিষ্ট কোনও শব্দের ব্যুৎপত্তি বর্ণনার ক্ষেত্রে যে-‘যোনি’ শব্দটির ব্যবহারোপযোগিতাকে পরিহার করা সম্ভব হয়ে উঠে নি, সেই শব্দটিকে শীর্ষশব্দরূপে স্বীকৃতি দিতে সংকলক কেন কুণ্ঠিত, বোধগম্য নয়। অনুসন্ধান করলে এমন আরও শব্দের সন্ধান মেলা একেবারে হয়তো অসম্ভব নয়। গুদ, ধর্ষণ, পুটকি, বাঁড়া, যৌন, লিঙ্গ, ভগাঙ্কুর, সঙ্গম ইত্যাদি শব্দ যদি অভিধানে শিষ্টপ্রবেশ্যশব্দের ছাড়পত্র পায়। অপরদিকে এইসব শব্দের শ্রমিক-মেহনতি-রকবাজ কিংবা গ্রামবস্তির সমাজে ব্যবহৃত সমার্থক শব্দগুলো শিষ্টশব্দরূপে অভিধানভুক্ত হওয়ার ছাড়পত্র পায় না, বরং সে-গুলো অশিষ্ট শব্দ হয়ে গিয়ে ভুক্তিবঞ্চনার শিকারে পর্যবশিত হয়। কিন্তু কেন এবং কোন যুক্তিতে ? অর্থাৎ সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠতে পারে তথাকথিত অশ্লীল তকমাধারী প্রতিশব্দ অথবা ‘যোনি’র মতো তথাকথিত অশ্লীলতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গাইড়্যা, গাড়, চুৎমারানি, ঠাপ, বানচুৎ, লাইড় ইত্যাদি শব্দ প্রবেশ্যশব্দের ছাড়পত্র না পেয়ে ভুক্তিবঞ্চিত থাকবে কোন্ যুক্তিতে ? এর উত্তর বোধ করি হতে পারে একটাই : মূল সঙ্কলকের পরে যাঁরা অভিধান সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন সেটা ছিল কেবল প্রশাসনিক এবং অভিধানের শব্দসঙ্কলনের কাজে নেমে সঙ্কলককে যে-ভাষাংশসংগ্রহের কাজে ব্যাপৃত হয়ে গলদঘর্ম হতে হয়, সে-অপরিহার্য কাজের দায়ভার প্রশাসনিক সঙ্কলকের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, অথবা অভিধান সঙ্কলন-প্রণয়ণে মেধাহীনতার প্রয়োগ নিশ্চিতকরণের অপকর্মটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করার দুরভিসন্ধি কার্যকর করতে মেধাপ্রদর্শনের নিমিত্ত্ব তিনি রাষ্ট্রনৈতিক রাজনীতির প্রমুদিত প্রতিভূ, যাঁর প্রতিভাকে অস্বীকার করার আপাতত কোনও উপায় নেই। ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ (পরিমার্জিক সংস্করণ : ২০০০) দেশর মানুষকে ব্যবহার করতেই হবে। কথায় বলে, ‘নাই মামুর চেয়ে কানা মামু ভালা’।
কিন্তু এইসব শব্দের এমন অবিমৃষ্যকর ভবিতব্য মেনে নেওয়ার কষ্টটা না-পারতেই হজম করে নিলাম, কিন্তু ‘গীতাঞ্জলি’ শব্দটির তন্বীতনুলতায় মোটেও তথাকথিত সে-অশ্লীলতার নামগন্ধ নেই। তবে শব্দটিকে কেন অভিধানের কোনও ভুক্তিইে পাওয়া যাবে না, যদি ‘কৃতাঞ্জলি’ (কৃত+অঞ্জলি), জলাঞ্জলি (জল+অঞ্জলি) ও পুষ্পাঞ্জলি (পুষ্প+অঞ্জলি) এমনকি ‘কৃতাঞ্জলিপুটে’ (কৃত+অঞ্জলি+পুট+এ) পাওয়া যায়। কিন্তু ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ নেই। ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’র বেশ পরিচিতি আছে সুধীমহলে। ‘জলাঞ্জলি’ও একেবারে কম যায় না। কিন্তু এই শব্দ ক’টির (কৃতাঞ্জলি, জলাঞ্জলি, পুষ্পাঞ্জলি ও কৃতাঞ্জলিপুটে) মতো ‘গীতাঞ্জলি’ তো কোনও অপরিচিত সাধারণ শব্দ নয়, বরং বহুব্যবহৃত ও ভুবনবিখ্যাত একটি শব্দ। পৃথিবীব্যাপী এতো বিশাল মাপের পরিচিতির পরিসর বিস্তারকারী অন্যকোনও শব্দ বাংলাশব্দভুবনে নেই। এটি ১৯১৩ সাল থেকে ভুবনবিখ্যাত একটি শব্দ হয়ে আছে। জানা কথা, রবীন্দ্রনাথের যে কাব্যগ্রন্থটি নোবেল পুরস্কারে বিভূষিত হয়েছে সেটির নাম ‘গীতাঞ্জলি’। বিশ্বব্যাপী রবীন্দ্রনাথের যত ভক্ত আছেন তাঁরা সকলেই এই ‘গীতাঞ্জলি’ শব্দটি সম্পর্কে সম্যক অবগত আছেন। তাঁদের সংখ্যা বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর সংখ্যার চেয়ে বেশি না হলেও বোধ করি একেবারে নেহাত কম নয়।
‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’টি বাংলাদেশে একটি বহুল ব্যবহৃত অভিধান। এ অভিধানটির জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী, এককথায় ইর্ষণীয় পর্যায়ের। জানা কথা অভিধানসংঙ্কলন মাত্রেই একটি অসম্পূর্ণ কাজ, সংঙ্কলন সমাপ্তির পর মুহূর্ত থেকে যে-কোনও অভিধানের অসম্পূর্ণতার মাত্রা কেবল বাড়তেই থাকে। এ প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক (২০০০) ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের ভাষ্য প্রণিধানযোগ্য। ‘পরিমার্জিত সংস্করণের প্রসঙ্গ-কথা’য় তিনি বলেছেন, ‘[…] “পরিমার্জিত সংস্করণ” বলা হলেও আসলে এটি বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধানের সংশোধিত, সংযোজিত, পরিমার্জিত, ও পুনর্বিন্যস্ত সংস্করণ। অভিধানটিকে অধিক ব্যবহারযোগ্য করে তোলাই এ সংস্করণের লক্ষ্য। কোনো অভিধান প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই তা সংস্কণযোগ্য হয়। […]’(১৯) এটা একটি সাধারণ সত্য যে, বাস্তবে নবসৃষ্ট শব্দসমূহ অভিধানের বাইরে থেকে যায়, নতুন শব্দ সংযোজন করে পুনরায় অভিধানটির নতুন সংস্করণের মুদ্রণ যদি সম্ভব না হয়। ২০১০ সালের ১৮ অক্টোবর, আমাদের সময় পত্রিকার শীর্ষশিরেনাম ছিল, “নিউজিল্যান্ডকে ধবল ধোলাই”।(২০) এই ‘ধবল ধোলাই’ শব্দবন্ধটি বাংলাভাষায় নবসৃষ্ট একটি শব্দপ্রপঞ্চ। ইংরেজি ‘হুয়াইট ওয়াস’-এর সাংবাদিককৃত বাংলায়ন। এই সর্বাঙ্গসুন্দর শব্দটিকে পরের দিনেই অভিধানে অন্তর্ভুক্তির আশা করা যায় না। কিন্তু জানা কথা, ‘গীতাঞ্জলি’ অতিসাম্প্রতিক ‘ধবল ধোলাই’-এর মতো এই একেবারে নবসৃষ্ট কোনও শব্দ নয়, এ শব্দটি ভুক্তিবঞ্চিত হওয়ার ‘অনবধানতাবশত’ ব্যতীত অন্য কোনও কারণ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো এই ‘অনবধানতাবশত’র কালব্যাপকতা একশত বছর ছাড়িয়ে যাবে কেন? এর কি কোনও যুক্তিসঙ্গত যৌক্তিকতা আছে? এর একটাই উত্তর হতে পারে। সংকলকরা পূর্বসূরি সংকলকদের অন্ধ অনুকরণ করেছেন মাত্র। পূর্বসূরিদের সংকলনবহির্ভূত শব্দাবিষ্কারে উত্তরসূরিরা শব্দানুসন্ধান কর্মে যতœবান ছিলেন না বা শব্দানুসন্ধান পরিচালনা করেননি। অথবা শব্দানুসন্ধানের অপরিহার্য পদ্ধতি ভাষাংশসংগ্রহের কর্মপদ্ধতি অবলম্বনের অনুপস্থিতি ছিল। অর্থাৎ বাংলা অভিধান প্রণয়নের প্রশাসনিকতা বা অভিধান প্রণয়নের সার্বিক কর্মপরিচালনা এখনও একধরনের আনাড়িপনায় আক্রান্ত। এই অভিযোগটি পুরোপুরি যদিও না হয়, আংশিক সত্য তো বটেই, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। বাংলা একাডেমির অভ্যন্তরে একাডেমির শুরু থেকে না হলেও, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর (১৮৮৫Ñ১৯৬৯) অনুপস্থিতির সুযোগে, আনাড়িপনা যে উপস্থিত ছিল তার প্রমাণ বিবৃত হয় ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর প্রধান সম্পাদক ড. মুহম্মদ এনামুল হকের বক্তব্যে। তিনি ১৯৭৪ সালে ‘স্বরবর্ণ অংশের ভূমিকা’ শীর্ষক অভিধানের সম্পাদকীয়তে লেখেন, “তাঁহার (ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ) অবর্তমানে পূর্ব পরিকল্পিত অভিধানটির দ্বিতীয় খ- সম্পাদনের ভার নানা আনাড়ী লোকের হাত ঘুরিয়া যেই অবস্থায় আমার কাছে আসিয়া পৌঁছিয়াছে, সেই অবস্থায় ইহার কোন বিশেষ উন্নতি-বিধান আমার পক্ষে একরূপ সাধ্যাতীত হইলেও, নানা কারণে আমাকে এ দুঃখজনক পরিস্থিতির মোকাবিলা করিতে হইতেছে।”(২১) এই বিবৃতি প্রদানের পরপরই তিনি লিখেছেন, “প্রচলিত বাংলা অভিধানগুলিতে বাংলাদেশের আধুনিক কবি-সাহিত্যিক, এমন কি, মধ্যযুগীয় কবি কর্তৃক বহু সাধারণ তৎসম, তদ্ভব, দেশী বা বিদেশী শব্দ পর্যাপ্ত পরিমাণে ধরা হয় নাই; যেমন, অচন্দ্রচেতন (বুদ্ধদেব); অফর, বাউরী (জসীম); উর (আলাওল); অব্যাজ (হায়াৎ মামুদ); উল্বণ (সুধীন দত্ত); অনিকেত (আহসান হাবিব); আলবেদা (শাহাদৎ হোসেন); আধার (বোরহানুদ্দীন) ইত্যাদির ন্যায় শব্দ প্রচলিত অভিধানে সচরাচর দেখা যায় না। বর্তমান অভিধানে সে-অভাব পূর্ণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা করিয়াছি।”(২২) কিন্তু কথা হলো : ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর প্রধান সম্পাদকের ‘সে-অভাব পূর্ণ করার যথাসাধ্য চেষ্টা’র ফাঁক গলে ‘গীতাঞ্জলি’ শব্দটি ঠিকই অভিধানবহির্ভূত থেকে গেলো এবং অতিশয় পরিতাপের বিষয় যে, ২০০০ সালের সর্বশেষ পরিমার্জিত সংস্করণেও শব্দটির স্থানসংকুলান হলো না, ‘গীতাঞ্জলি’ শব্দটির অভিধানে আসনবঞ্চনার দুর্ভাগ্য ঘুচলো না। এতে কী প্রমাণিত হয়?
গোলাম গুলমগির বলেন, ‘বন্দরের কথা জানি না তবে অন্দরের কথা একটাই, বাংলাদেশে অভিধান প্রণয়নের প্রকল্পটি আসলে মুক্তবাজার অর্থনীতির আওতায় সরকারি অর্থ হাপিস করার একটি বাণিজ্যিক প্রতারণার আধুনিক ফিকির। মনে রাখতে হবে বাংলা একাডেমিতে কোনও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতো চলিষ্ণুবিদ্যাকল্পদ্রুম নেই। বর্তমান বাংলাদেশে চলিষ্ণুবিদ্যাকল্পদ্রুমগণ বাংলা একাডেমির পৈঠা মাড়ানোর অধিকার হারিয়েছেন, সে-গল্প ইতোমধ্যে পৌরাণিকতার মর্যাদা পেয়ে গেছে, এখন কেবল অপদার্থ অভিধা প্রাপ্তির অধিকারটুকু সংরক্ষণ করেন এবং ততোধিক কীছুর জন্যে তৎপর হতে পারেন কেবল তাঁরাই, যাঁরা রামায়ণের রাবণের মতো দশমু- না হলেও অন্তত দ্বিমুণ্ডির অধিকারী।
‘গীত’ ও ‘অঞ্জলি’র গাঁটছড়া বেঁধে দিয়ে ‘গীতাঞ্জলি’র প্রকৃত স্রষ্টা কে, এ প্রশ্নের সদোত্তর ‘বিবর্তনমূলক অভিধান’ও দিতে আপতত অক্ষম। কী করে জানি না, ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’ (জুন ২০১৩) নামের গ্রন্থার্ণবেও ‘গীতাঞ্জলি’ শব্দটি ভুক্তিবহির্ভূত থেকে গেছে। যদি ধরে নেই শব্দটির স্রষ্টা রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং তাহলেও, ‘গীতাঞ্জলি’র সৃষ্টিসময় ১৯১৩-এর আগে। এদিক থেকে বিবেচনায় শব্দটির বিবর্তনমূলক অভিধানে অন্তর্ভুক্তিবঞ্চনার শিকারে পর্যবশিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অন্তর্ভুক্তিবঞ্চিত থেকে গেছে। ‘বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’-এর সম্পাদক গোলাম মুরশিদ গ্রন্থের ভূমিকার শেষাংশে বলেছেন, “এসব শব্দ ১৯৭২/৭৩ সাল পর্যন্ত। তারপরে যে-হাজার হাজার শব্দ আমাদের ভাষায় প্রবেশ করেছে, আমরা তা গ্রহণ করিনি।”(২৩) অর্থাৎ তার ভাষ্যানুসারে, ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক সৃষ্ট এবং নোবেল পুরস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি বিখ্যাত ও বাংলাভাষীদের দ্বারা বহুব্যবহৃত বাংলা শব্দের অভিধানবহির্ভূত থেকে গিয়ে এমন অবহেলার শিকারে পরিণত হওয়াটা একরকম অসম্ভব একটি ব্যাপার। ‘গীতাঞ্জলি’ যতোটা বড় মাপে বিখ্যাত, অভিধানে তারচেয়েও হাজারগুণ বেশি অবহেলিত। সুবলচন্দ্র মিত্র (সরল ছাত্রবোধ অভিধান), কাজী আব্দুল ওদুদ (ব্যবহারিক শব্দকোষ), হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় (বঙ্গীয় শব্দকোষ), শৈলেন্দ্র বিশ্বাস (সংসদ বাঙ্গালা অভিধান), মুহম্মদ এনামুল হক ও শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী (‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’), আবু ইসহাক (বাংলা একাডেমী সমকালীন বাংলা ভাষার অভিধান) কারও অভিধানে ‘গীতাঞ্জলি’ প্রবেশ্যশব্দের মর্যাদা অর্জন করতে পারেনি এবং বোধ করি অন্য কোনও অভিধানেও এমন অপ্রবেশ্য শব্দের ভাগ্যবরণই করতে হয়েছে হতভাগ্য শব্দটিকে। এমনকি অধ্যাপক পি. আচার্যের ‘শব্দসন্ধান শব্দাবিধান’-এ ‘কৃতাঞ্জলি’ আছে কিন্তু ‘গীতাঞ্জলি’র টিকিটিও নেই।(২৪) তাছাড়া, ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ শব্দটির সঙ্গেও অভিধানগুলোতে একই রকম নির্বিচার বর্জনাচরণ অব্যাহত থেকেছে। সুবলচন্দ্র মিত্রের অভিধানটি তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ নোবেল পাওয়ার এক বছর আগে অর্থাৎ ১৯১২ সালে। অর্থাৎ এমন ধারণা পোষণ করা বোধ করি অসঙ্গত হবে যে, ‘গীতাঞ্জলি’ মিত্র মহোদয়ের অনবগত শব্দ ছিল। রবীন্দ্রনাথ না পড়ে কেউ বাংলা অভিধান সংকলন করে ফেলবে, অন্তত এমন আজগুবি ব্যাপার স্বপ্নেও কল্পনা করা সম্ভব নয়। আর রবীন্দ্রনাথ পড়লে ‘গীতাঞ্জলি’ বাদ পড়ে যাবে সেটা আবার একটি আরও যৎপরনাস্তি কল্পনাতীত ব্যাপার। মনে রাখতে হবে, উর্দুভাষী আবু সয়ীদ আইয়ূব এই ‘গীতাঞ্জলি’র ইংরেজি অনুবাদ পড়ে মূলভাষা বাংলায় এই বইটিকে পড়ার জন্য বাংলাভাষা শিক্ষার সঙ্কল্প শিরোধার্য করে কলকাতায় আগমন করনে। অবাক করার বিষয় এই যে, এই আগমন একজন উর্দুভাষী মানুষের বাংলাভাষাদেশে প্রবসনে পর্যবশিত হয় এবং তাঁর আর ফিরে যাওয়া হয়নি। রবীন্দ্র্রপ্রীতি প্রেম হয়ে গিয়ে এতাটাই শক্তিধর হয়ে উঠেছিল। তিনি (আবু সয়ীদ আইয়ূব) কলকাতায় থিতু হয়ে বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্রপ্রেমী দিকপাল সাহিত্যিক হয়ে উঠেন। তদুপরি ১৯৯৫ সালে এই অভিধানটির (সুবলচন্দ্র মিত্রের সরল ছাত্রবোধ অভিধান) দশম সংস্করণের বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, “ছাত্রগণের প্রয়োজনীয় বঙ্গভাষায় প্রচলিত ও ব্যবহৃত যাবতীয় শব্দ, নূতন আগত শব্দসমূহ ও বৈদেশিক শব্দসমূহ অতি যত্ন সহকারে ইহাতে সন্নিবেশিত হইয়াছে।”(২৫) অথচ ‘অতি যত্ন সহকারে ইহাতে সন্নিবেশিত হইয়াছে’র পরও এই সবিশেষ যত্নের চালুনির ফাঁক গলে ‘গীতাঞ্জলি’ শব্দটি অভিধানের বাইরেই থেকে গেছে, গীতাঞ্জলি ‘অতি যত্ন সহকারে ইহাতে সন্নিবেশিত’ হয় নাই। সত্যি, অবাক না হয়ে কোনও উপায় থাকে না। ‘দশম সংস্করণের বিজ্ঞাপন’টি কি অভিধানটির বিক্রি বাড়িয়ে দু’পয়সা কামাই করার পুঁজিবাদী প্রতারণা বা ফন্দির নামান্তর, যাকে বলে, বিজ্ঞাপন ছিল মাত্র, আসলে কাজের কাজ কীছুই করা হয়নি। কে জান? হলেও হতে পারে। এই প্রতারণার রহস্য উন্মোচন করতে হলে তো অভিধানটির আগের একটি সংস্করণ এনে মিলিয়ে দেখার ঝকমারি সইতে হয় এবং সেটা আমার মতো অধম একজনের পক্ষে আদপেই সম্ভব নয়।
মুহম্মদ এনামুল হক ও শিবপ্রসন্ন লাহিড়ীর ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’টির দিকে অসম্পূর্ণতার অভিযোগের আঙ্গুল কেউ কেউ তোলতেই পারেন, যদিও এই একটি শব্দ বাদ পড়ার অভিযোগে এমন আঙ্গুল তোলা সমীচীন হবে না। কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে বাদপড়া শব্দ তো একটা নয় হাজার হাজার। অর্থাৎ ‘গীতাঞ্জলি’ শব্দটির মতো এন্তার শব্দ এই অভিধানটিতে নেই, অথচ যে-শব্দগুলো থাকা উচিৎ ছিল। গদ্যপদ্য ও বিশেষ করে বিভিন্ন প্রবন্ধে এমন সব শব্দের দেখা মিললেও অভিধানে যাদের দেখা মিলে না। ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’-এর পরিমার্জিত সংস্করণ ২০০০ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে। এ সংস্করণে ‘পরিমার্জিত সংস্করণের প্রসঙ্গ-কথা’ লিখেছেন, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। প্রায় আড়াই পৃষ্ঠাব্যাপী তাঁর লেখায় তিনি এমনসব পরিচিত ও বহুব্যবহৃত শব্দ ব্যবহার করেছেন যে-শব্দগুলো তাঁর প্রযত্নপরিচালনায় পরিমার্জিত ও প্রকাশিত অভিধানে সন্নিবেশিত হয়নি। অভিধানে সন্নিবেশিত তাঁর নিবন্ধ ‘পরিমার্জিত সংস্করণের প্রসঙ্গ-কথা’-য় আছে, কিন্তু অভিধানে ভুক্তিবঞ্চিত সে-সব শব্দের তাৎক্ষণিক প্রয়েজনে করা তালিকাটি হতে পারে এরকম : উপভুক্তি, উপপরিচালক, উপবিভাগ, পরিমার্জিত, পুঁথিসাহিত্য, পুনর্বিন্যস্ত, পুনর্বিন্যাস, প্রতিবন্ধকতা, প্রতিবর্ণ, প্রার্থিত, বাক্যচয়ন, বার্ধক্যজনিত, বোদ্ধামহল, ব্যাকরণনির্দেশ, শব্দনির্বাচন, শব্দসংকলন, শব্দসংক্ষেপ, শীর্ষশব্দ, সাহিত্যপাঠ ইত্যাদি।
অভিধানে ‘মহাপরিচালক’ আছেন কিন্তু ‘উপপরিচালক’ নেই (অনুসন্ধান প্রার্থনীয়), কেমন বিদঘুটে ব্যাপার নয়? মহাপরিচালকের ‘প্রসঙ্গ-কথা’র শিরোনামের প্রথম শব্দটি ‘পরিমার্জিত’। সর্বাঙ্গসুন্দর এই ‘পরিমার্জিত’ শব্দটি বাংলাভাষী সর্বজনের কাছে ভীষণ প্রিয়। এমন একটি শব্দ অভিধানে পাওয়া যাবে না ভাবা যায়? তাছাড়া, অভিধানচর্চায় অপরিহার্য ‘শীর্ষশব্দ, উপভুক্তি, প্রতিবর্ণ, শব্দসংক্ষেপ, শব্দসংকলন’ এই ক’টি শব্দ কী করে অভিধানের ভুক্তিবহির্ভূত থেকে যায়, সেটাও বোধগম্য নয়। নাকি যাঁরা বাংলা একাডেমিতে কাজ করেন তাঁরা এই শব্দকতিপয়কে তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো আলগে রাখতে বদ্ধপরিকর? এগুলোর অর্থবোধে আমজনতার কোন অধিকার স্বীকার করা তাঁদের অনভিপ্রেত? তাই তাঁরা সেগুলোকে অভিধানে ভুক্তিবঞ্চিত করে রেখেছেন? হবেও হয় তো বা। এমনিভাবে তাঁর (মহাপরিচালকের) সহযোগীদের লেখা থেকেও এমনি আরও শব্দচয়ন করা হয় তো সম্ভব, যে-শব্দগুলো তিনি ও তাঁরা অবলীলায় ব্যবহার করেন, অথচ পরিমার্জিত সংস্করণে সে-শব্দগুলো প্রকাশবঞ্চনার ভাগ্যবরণ করেই আমজনতার অবগতি থেকে বঞ্চিত হয়।
‘গীতাঞ্জলি’ প্রসঙ্গ ও শব্দের অভিধানে ভুক্তিবঞ্চনার বিতংভ্রাম্যতা সমাপ্ত করে ‘স্ট’তে প্রত্যাবর্তন করা যাক। বাংলা ‘স্ট’ দিয়ে শুরু এমন যে ইংরেজি শব্দগুলোকে ভুক্তিতে শীর্ষশব্দরূপে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তাতে স্থান পেয়েছে : স্টক, স্টার, স্টিম, স্টিমার, স্টিল, স্টুপিড, স্টুয়ার্ড, স্টেজ, স্টেট, স্টেটিসকোপ, স্টেনগান, স্টেনো, স্টেশন, স্টোভ, স্টোর, স্ট্যান্ডার্ড, স্ট্যাম্প, স্ট্রিট ও স্ট্রাইক এই ১৯টি শব্দ। এখানে উল্লেখ্য যে, ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ অনুসারে বলা যায়, ‘স্ট’ আদ্যাক্ষর দিয়ে শরু ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনও বিদেশি ভাষার শব্দ বাংলাভাষাদেশে প্রবসিত হয়নি বা হলেও অভিধানে স্থান করে নিতে পারেনি। এই অভিধানের ‘ব্যঞ্জনবর্ণ অংশের ভূমিকা’-তে সম্পাদক শিবপ্রসন্ন লাহিড়ীর ভাষ্য ‘এ অভিধানে সন্নিবিষ্ট হয়েছে’, অনুসারে যে-যে-প্রকার শব্দ বা শব্দপ্রয়োগ সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে, সে-সব শব্দ বা শব্দপ্রয়োগ সন্নিবেশনের মধ্যে কৃতঋণশব্দ ও তার প্রয়োগ সম্পর্কে সর্বশেষ ও চতুর্থ ভাষ্যে বলা হয়েছে, “৪. বাংলা সাহিত্যে ও বাংলা ভাষাভাষীদের দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত আরবী, ফার্সী, হিন্দী, ইংরেজী প্রভৃতি শব্দ।”(২৬) ‘বাংলা ভাষাভাষীদের (‘বাংলা ভাষাভাষী’ প্রয়োগটি বিতর্কিত ও অপপ্রয়োগের একটি উদাহরণ, এ ক্ষেত্রে ‘বাংলাভাষী’ শব্দটিই সঙ্গত।) দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত’ বিদেশি শব্দ (কৃতঋণশব্দ) হিসেবে ‘স্টল’ শব্দটির সন্নিবেশন অবধারিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি, কোনও না কোনওভাবে বাদ পড়ে গেছে। তাই বলে শব্দটির ব্যবহার লোকসমাজে থেমে থাকেনি বরং বৃদ্ধি পেয়েছে।
বোধ করি, ‘যৌনতা’ শব্দটির মতো অভিধানে অন্তর্ভুক্তির ভাগ্যবঞ্চিত আর একটি শব্দ ‘স্টল’ । এ দু’টি শব্দই বাংলাভাষীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দসমূহের মধ্যে বিশিষ্ট। আমাদের বাংলা একাডেমির অভিধানে ‘স্টল’ শব্দটি সন্নিবেশবঞ্চিত হয়েছে, অনুমান করি, অনবধানতাবশত এবং ‘যৌনতা’র সন্নিবেশবঞ্চনা অবশ্যম্ভাবীভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ‘যৌনতা’ শব্দটির সঙ্গে তথাকথিত অশ্লীলতার প্রচারকে প্রতিরোধ করা কিংবা প্রকৃতপ্রস্তাবে ‘যৌনতা’ প্রপঞ্চটির উপর সমাজনিয়ন্ত্রকদের স্বারোপিত অশ্লীলতার মধ্যে আকণ্ঠ নিমজ্জিত সমাজের ভণ্ডামিকে (ঠাকুর ঘরে কে রে? আমি কলা খাই না।) আসকারা দেওয়ার মানসতাকে প্রশ্রয় দিয়ে শব্দটির অভিধানে প্রবেশযোগ্যতাকে পরিহার করা হয়েছে।
ভূমিকাতে বলা হয়েছে, যখন অভিধানটি প্রণীত হয়েছে তখন পর্যন্ত (প্রথম প্রকাশ : স্বরবর্ণ অংশ- নভেম্বর, ১৯৭৪; ব্যঞ্জনবর্ণ অংশÑ জুন, ১৯৮৪) ‘বাংলা সাহিত্যে ও বাংলা ভাষাভাষী’দের দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত’ অন্যান্য (‘আরবী, ফার্সী, হিন্দী’) যে-কোনও বিভাষাসহ ইংরেজি ভাষার শব্দসমূহ এ অভিধানের শীর্ষভুক্তিতে সন্নিবেশিত হয়েছে। অভিধানে শব্দ সন্নিবেশনের যে-বিধি অনুসরণ করা হয়েছে সে-অনুসারে ‘স্টল’ শব্দটির অভিধানে অন্তর্ভুক্তির নিশ্চয়তা শতভাগ, যেহেতু শব্দটি ‘দৈনন্দিন জীবনে সচরাচর ব্যবহৃত অন্যান্য (‘আরবী, ফার্সী, হিন্দী’) যে-কোনও বিভাষাসহ ইংরেজি ভাষার শব্দসমূহ’র একটি। ‘স্টল’ শব্দটি যদিও বাস্তবে বাংলাভাষী সাধারণ মানুষের মধ্যে, শিক্ষিত-অশিক্ষিত নির্বিশেষে, চালু আছে, ‘বলা’র স্টল’ নামটিই তার প্রমাণ এবং বাংলা সাহিত্যে কোনও লেখক এ-বহুল ব্যবহৃত শব্দটিকে কোথাও কোনও লেখায় ব্যবহার করেননি, এমনটি মেনে নিতে কেন যেন মনের সম্মতি মেলে না। তা ছাড়া এই শব্দটি অনেক কাল আগেই, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষাতে ব্যবহৃত হতে হতে তার সাহেবিয়ানা হারিয়ে বাঙালিয়ানা অর্জন করে ফেলেছে, আর এখন এ শব্দটিকে ইংরেজি ভাবতে সাধারণ মানুষের বয়েই গেছে। তারা এই শব্দটিকে ইতোমধ্যেই ‘ইস্টল’ করে নিয়েছে, ইংরেজিয়ানার আর কোনও ছিটেফোঁটাও তাতে অবশিষ্ট নেই। বাংলাদেশের যে-কোনও গ্রামের বাজারে বা পথের পাশে চা-স্টলে বসে এখন চা খাওয়া যায়। বাংলাভাষীরা চা পান করে না, চা খায়, আদপে ভাষিকভাবে ভক্ষণ করে। এ তথ্য সকলেরই জানা। অর্থাৎ ‘স্টল’ শব্দটি এখন আর ‘চেয়ার, টেবিল’-এর মতোই ইংরেজি হয়েও ইংরেজি নয়, এটি একটি বাংলা শব্দ, অনেক কাল আগে এ শব্দটি বাংলাভাষীদের নিজস্ব শব্দসম্পদরূপে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে, অভিধানে তার ভুক্তি থাকুক বা না থাকুক, তাতে কীছু যায় আসে না। তাই বোধ করি নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় সেই ১৯৬৩-তে বলেছেন, “[…] ইরেজি আমাদের চেনা, টেবিল-চেয়ার-গ্লাস-কাটলেটের অনুবাদ করার প্রয়োজন পড়ে না, সে আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে।”(২৭) এমনি ‘আমাদের জীবনের সঙ্গে মিশে’ থাকা এন্তার শব্দই অভিধানে পাওয়া যায় না। তাই বলে বাঙালিরা তাঁদের নিত্যদিনের কথবার্তায় সে শব্দের ব্যবহার বাতিল করে দিয়েছেন তা তো নয়। পত্রিকা তো একুশের বইমেলায় স্টল বরাদ্দের কথা লিখে। গত কদিন আগের ১৭ জানুয়ারি, ২০১৪ তারিখে প্রকাশিত দৈনিক ভোরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠার ষষ্ঠ স্তম্ভের একটি শিরোনাম ছিল, ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা স্টল বরাদ্দ শেষ চলছে অবকাঠামো নির্মাণ’। এবং এই স্টল বরাদ্দ দিয়ে থাকেন স্বয়ং বাংলা একাডেমি। স্টল বাংলা একাডেমির সুপরিচিত এবং ভাববিনিময়ে নিত্যদিন ব্যবহৃতও। কিন্তু সেটি একাডেমির অভিধানে পৈতে পায় না, অন্ত্যজ হয়েই থেকে যায়। এই অবহেলা/উপেক্ষা আর কতো সহ্য করা যায়? বাংলাভাষাদেশে প্রবসনের বহু বছর পেরিয়ে এসে স্টল শব্দটি এখন বলতেই পারে, ‘বাংলা একাডেমির চত্বরে স্টল বসে, স্টল নিয়ে বাংলা একাডেমি চুটিয়ে ব্যবসা করে, কিন্তু বাংলা একাডেমি স্বপ্রণীত অভিধানে আমাকে অন্ত্যজ করে রেখেছে। এটা অন্যায়, গর্হিত ও আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্র। জানি না আমার মতো আরও কতো শব্দ এইভাবে অবহেলার শিকার হয়ে অভিধানের বাইরেই পড়ে থেকে জীবন অতিবাহিত করছে। এর একটি বিহিত ব্যবস্থা করা জরুরি।’
‘স্টল’ শব্দ নিয়ে লিখার সূত্রে ‘স্ট’ দিয়ে শুরু যতগুলো শব্দ অভিধানে পাওয়া যায়, তার সবগুলোই কিন্তু প্রমিত বানানরীতি লঙ্ঘন করে সাধারণ্যে সাধারণত লেখা হয় ‘ষ্ট’ দিয়ে। দেশের অন্যান্য শহরের কথা জানি না, তবে শহর সুনামগঞ্জ ইংরেজি ‘ংঃ’-র প্রতিবর্ণীকরণ বাংলা ‘ষ’ ও ‘ট’ বর্ণদ্বয়ের যুক্তরূপ ‘ষ্ট’ দিয়ে করতে অভ্যস্ত। সন্ধান করে দেখলে হাতে গোনা বা কয়েকটি মাত্র নামফলকে হয় তো ইংরেজি ‘ংঃ’-র বাংলা প্রতিবর্ণীকরণ বা লিপ্যন্তর ‘স্ট’ পাওয়া যাবে। নিতান্ত এই হাতে গোনা গুটিকয় নামফলক বাদে এখানকার নামফলকগুলো এরকম একটি ধারনাই প্রদান করবে যে-কোনও আগন্তুককে। আর তিনি যদি কবি আহসান হাবীবের মতো কেউ হন তবে তো আর কোনও কথাই নেই। কবি অরুণাভ সরকার লিখেছেন, “ভাষার ব্যাপারে খুবই খুঁতখুঁতে ছিলেন কবি আহসান হাবীব। তাঁর বাসা ছিল ঢাকার মগবাজার এলাকায়। কর্মস্থল ডিআইটি (বা রাজউক) অ্যাভিনিউতে। যাতায়াত করতেন সব বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, নেমপ্লেট ইত্যাদি দেখতে দেখতে। ভুল দেখলে খুব কষ্ট হতো তাঁর। সংশোধন করার অনুরোধ জানাতেন। সে কথায় কান দিত না কেউ।”(২৮)
আমিও প্রতিদিন দেখি এই সব লেখালেখি। আমার জানার পরিধির মধ্যে ধরা পড়া ভুলগুলো আমি মনে রাখি না, ভুলে যাই। আমার মনে হয় এই ভুলশব্দগুলোরই কোনও কোনওটা সকলের অজান্তে, বাংলা বৈয়াকরণের নাকের ডগা দিয়ে পথ অতিক্রম করে, বাংলাভাষাসভায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে অদূর ভবিষ্যতে কোনও একদিন। একটি উদাহরণ দিচ্ছি। এ শহরে একটি শিক্ষায়তনের নাম ‘সৃজন বিদ্যাপীঠ’। এই ‘সৃজন’ শব্দটির ব্যাকরণসম্মত রূপ হবে ‘সর্জন’। সুবলচন্দ্র মিত্র তাঁর ‘সরল ছাত্রবোধ অভিধান’-এ ‘সৃজন’ শব্দটির ভুক্তি বিবরণের শেষে ‘অশুদ্ধ’ লিখে রেখেছেন। কিন্তু শুদ্ধ ‘সর্জন’ তো জনতার কাছে, এমনকি যারা শুদ্ধভাবে শিশুদের শিক্ষা দেবার মহৎ দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তোলে নিয়েছেন তাঁদের কাছেও পাত্তাই পেলো না, তাঁরা তো তাঁদের বিদ্যায়তনের নাম ‘সর্জন বিদ্যাপীঠ’ রাখেননি। এমনকি কেউ কেউ বিদ্যালয়ের নাম রাখেন ‘উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়’, বুঝুন ভুলের বাহাদুরি। ভেবে দেখুন, জনতার ভোটে ভুল লোক নির্বাচিত হয়ে কি সংসদে যাচ্ছে না? (চলবে)