- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা

ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) এভাবে যে-কোনও সাধারণ বাঙালির বাকযন্ত্রের স্বাভাবিক কেরদারিসমা (কেরদানি+ক্যারিসমা) প্রদর্শনের বদৌলতে ইংরেজি ‘স্টার’ হয়ে যায় ‘ইস্টার’। স্টার সিগারেট কিনতে গিয়ে কেউ ‘স্টার’ বলে না, বলে ‘ইস্টার’। এমনকি ঘরের বউ যাকে বলি ‘স্ত্রী’ সেও হয়ে পড়ে ‘ইস্ত্রী’ কিংবা ‘ইস্তিরি’।
সব লৈখিক ভাষারই একটা কড়াকড়ি নিয়ম-শৃঙ্খলা থাকে, তা লেখকেরা মেনে চলেন। এটাই নিয়ম। যে-নিয়মে ব্যাকরণের লাগাম লাগানো থাকে। কিন্তু গ্রামের একজন লোক বা এই অনতিতরুণটি কোনও শিক্ষিত লোক-লেখক নয়। ভাববিনিময়ের সময় সে ভাষার প্রমিতবিধি মেনে চলে না, মেনে চলার তার কোনও গরজ-তাগিদও নেই। তার বা তার মতো আমআদমির ঠোঁটে তাই প্রমিত শব্দগুলো পাল্টে যায়। এই পাল্টে যাওয়া রীতিই কথ্যভাষা। সুনামগঞ্জ শহরের আশেপাশে তার অজ¯্র উদাহরণ বিদ্যমান। শহরের ভেতরে ‘লক্ষণশ্রী’ ও শহরের অনতিদূরে ‘অমৃতশ্রী’ গ্রামদু’টি লোকমুখে যথাক্রমে ‘লখন্ছিরি’ ও ‘আমিত্তিরি’ হয়ে পড়ে। তার নাম আসহাব উদ্দিন, আমাদের গ্রামের লোকের মুখে সে ‘আছাব্যা’। লোকায়ত ব্যাকরণ কিংবা লোকনিরুক্তি এরকমই। এই লোকনিরুক্তির ইংরেজি নাম ফোক এটিমোলোজি কিংবা পপ্যুলার এটিমোলজি। হুমায়ুন আজাদ বলেন, “অনেক সময় বিদেশি শব্দকে, বা দুরূহ, দুরুচ্চার্য দেশি শব্দকে সহজ ও পরিচিত রূপ দেয়া হয়। এতে তার তাৎপর্য বোঝা যায়, কিন্তু নতুন তাৎপর্য মূল তাৎপর্যের থেকে অনেক পৃথক হয়ে উঠে। এই প্রক্রিয়ার নাম লোকনিরুক্তি।”(১) সাহিত্য রচনার সময় এই সব কথ্যরূপের অনেক শব্দ প্রমিত শব্দের সঙ্গে লেখকের লেখায় অনায়াসে স্থান করে নেয়। সুভাষ ভট্টাচার্য বলেন, “বাংলায় বহু শব্দের পৃথক কথ্য রূপ আছে। বিশেষ্য, বিশেষণ, ক্রিয়া প্রভৃতি নানান পদেই সেইসব পার্থক্য দেখা যায়। তৎসম শব্দের কথ্য রূপ যেমন আছে, তেমনি আছে অসংস্কৃত দেশী, বিদেশী, শব্দের কথ্য রূপ। কোনও কোনও কথ্য শব্দ যে লৈখিক সাহিত্যেও ব্যবহৃত হয়ে চলেছে তাও লক্ষণীয়।’’(২) এইভাবে শব্দের উচ্চারণ বদলে যাওয়ার নিয়মকে ব্যাকরণে ধ্বনিপরিবর্তন বলে।
বিভিন্ন প্রকার ধ্বনিপরিবর্তনের মধ্যে একটির নাম আদিস্বরাগম। আমরা যখন বাঙলা ‘স্ত্রী’ শব্দটিকে ‘ইস্ত্রী’ বা ইংরেজি ‘স্টোর’ শব্দটিকে ‘ইস্টোর’ উচ্চারণ করি তখন ব্যাকরণের পরিভাষায় আদিস্বরাগম সংঘটিত হয়। হুমায়ুন আজাদ বলেন, “শব্দের শুরুতে যুক্ত ব্যঞ্জন থাকলে, তার আগে অনেক সময় একটি স্বরধ্বনি যোগ করা হয়। একে বলা হয় আদিস্বরাগম। আদিস্বরাগম, অধিকাংশ ক্ষেত্রে, ঘটে থাকে যদি যুক্ত ব্যঞ্জনের প্রথমটি হয়, /স/। আদিস্বরাগম ফরাশি ও স্পেনীয় ভাষায় বিশেষভাবে দেখা যায়। বাঙলায়ও দৈনন্দিন উচ্চারণেÑ সংস্কৃত ও বিদেশি শব্দে (বিশেষ করে ইংরেজি)- আদিস্বরাগমের উদাহরণ অনেক।”(৩) বিশেষ বিশেষ শব্দ উচ্চারণ করার সময় মানুষ মাঝে মাঝে উচ্চারণজড়তায় আক্রান্ত হয়। বাঙালিরাও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। পবিত্র সরকার বলেন, “সংস্কৃত ঋণশব্দ অর্থাৎ তৎসম শব্দগুলিতে কিছু কিছু যুক্তব্যঞ্জন বাঙালির জিহ্বায় প্রথম থেকেই অসুবিধার সৃষ্টি করেছিল। তবে সচেতন ও পরিশীলিত উচ্চারণে এই অসুবিধা তত প্রকট ছিল না। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই অসুবিধা এড়ানোর জন্য শব্দগুলিকে আদিস্বরাগম, স্বরভক্তি (াড়বিষ রহংবৎঃরড়হ) অর্থাৎ মধ্যস্বরাগম এবং স্বরযোগের দ্বারা সহজ করে নেয়। অনেক ইংরেজি বা বিদেশি আদ্যযুক্তব্যঞ্জনেও এই পরিবর্তন ঘটে। যেমন (স্বরযোগ) স্কুল>ইশ্কুল, স্টেশন>ইস্টিশন, স্ট্রাইক>ইস্ট্রাইক, ¯িপ্রং>ইস্পিরিং। এই ধরণের পরিবর্তন মূলত ঐতিহাসিক পরিবর্তন।”(৪)
‘টাওয়ার’ যখন ‘স্টাওয়ার’ হয়ে যায় তখন এই ‘স্টাওয়ার’ ‘ইস্টাওয়ার’ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় শতভাগ। এইভাবে অনায়াসে ইংরেজি থেকে বাংলাভাষাদেশে প্রবসিত শব্দের ক্ষেত্রে বাঙালিরা চমকপ্রদ সব কৌশল প্রয়োগে দারুণ অভ্যস্ত ও ওস্তাদ। একটি উদাহরণ উদ্ধৃত করে হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, “বিলেতবাসী নিরক্ষর বাঙালিরা অনেক লোকনিরুক্তির ¯্রষ্টা। যেমন : ‘হোটেল ক্যালিডোনিয়া’ তাদের নিরুক্তিতে হয়েছে ‘হোডেল খালিদুনিয়া’। গ্রামের নিরক্ষর মানুষেরা নিয়মিতভাবে লোকনিরুক্তিসাধন করে থাকে।”(৫) তাঁরা মূল ভাষার শব্দটিকে নিজের করে নেওয়ার আগে শব্দটিকে ইচ্ছে মতো আপাদমস্তক ঘষেমেজে, ধোয়েমুছে ও সর্বোপরি দিয়েথুয়ে অর্থাৎ তাতে যোগবিয়োগ করে শব্দটির খোলনলচে পালেট দিতে একদম কসুর করেন না। বাড়তি কীছু যোগ করার কারণে ‘টাওয়ার’ হয়ে যায় ‘স্টাওয়ার’ কিংবা ‘ভেরাইটিজ’ হয়ে পড়ে ‘ভেরাইস্টিজ’ বা ‘ভ্যারাইস্টিজ’ এবং বাসার সামনে দোকানকোঠা তোলে তার কপোলকপালের নামফলকে লিখে দেয় ‘ভ্যারাইস্টিজ ষ্টোর’। যোগ তো চলেই, বিয়োগ যে চলে না এমন নয়। বিয়োগ করার কারণে ‘কলামনিস্ট’, বিশেষ করে শিক্ষিত মহলে হয়ে পড়ে বহুশ্রুত, বহুব্যবহৃত ও যৎপরোনাস্তি ব্যাপক জনপ্রিয় ‘কলামিস্ট’।
এই ‘কলামিস্ট’ শব্দটি এতোই বিখ্যাত যে, বাংলাশব্দসমাজে তাৎক্ষণিক পৈতে পেয়ে যায়, তাবৎ সাংবাদিকরা মূলশব্দটির থেকে বাংলা উচ্চারণে ‘ন’ বর্ণের স্খলনে কিঞ্চিৎও বিচলিত নন, বরং একধরণের রোমাঞ্চ বোধ করেন। এমনকি তাঁরা ব্যাকরণের নিয়মানুযায়ী ‘চন্দ্র’ থেকে ‘ন’-বর্ণটির বিলুপ্তির স্মারকচিহ্ন (অক্কাপ্রাপ্তির চিহ্ন) হিসেবে পূর্ববর্ণ ‘চ’-এর মাথার উপর চন্দ্রবিন্দুর ( ঁ) উদয়ের মতো ‘কলামনিস্ট’-এর ‘ন’-এর স্মারকচিহ্ন হিসেবে ‘ম’-বর্ণের মাথার উপরেও একটি চন্দ্রবিন্দুর ( ঁ) প্রাদুর্ভাব ঘটানোর প্রযতœ (তৎপরতা) থেকে সযতেœ সটকে পড়েছেন। কিন্তু ‘রেস্টুরেন্ট’ শব্দটিকে ‘রেস্তুরাঁ’ করার সময় বর্ণআক্কাপ্রপ্তির চিহ্ন চন্দ্রবিন্দুকে ( ঁ) উপস্থাপিত করতে প্রযতেœর কোনও কার্পণ্য হয় না। বলা বাহুল্য, ইতোমধ্যে ইংরেজি ‘কলামনিস্ট’ শব্দটি ‘কলামিস্ট’ হয়ে গিয়ে যাকে বলে পুরোপুরি আটপৌরে বাংলা হয়ে উঠেছে, যেমন হয়েছে ইংরেজি ‘হস্পিটাল্’ থেকে বাংলা ‘হাস্পাতাল্’। ‘হস্পিটাল্’ ও ‘হাস্পাতাল্’-এর উচ্চারণে উপস্থিত আকাশ পাতাল ফাঁরাফাতকে (ফাঁরাক+তফাত+কে) কাঁচকলা প্রদর্শন করে বাংলাভাষীর সর্বসম্মত স্বীকৃতি ছিনতাই করে নিয়েছে ‘হাস্পাতাল্’ শব্দটি এবং বাস্তবে বাংলাভাষাদেশে বাংলাশব্দের আসন অবলীলায় তার দখলে চলে গেছে। ‘কলামিস্ট’কে শুদ্ধ উচ্চারণের দোহাই পেড়ে আবার ‘কলামনিস্ট’ করার প্রচেষ্টা একেবারেই নি®প্রয়োজন, এত করে বাংলায় শব্দ প্রবসনের স্বাভাবিক রীতির অহেতুক লঙ্ঘন করে অনভিপ্রেত ভাষাব্যভিচার সম্পন্ন হবে এবং এইরূপ প্রকরণ অবলম্বন করে বাংলা হাস্পাতাল্ থেকে ইংরেজি হস্পিটাল্-এ ফিরে যেতে হবে। এইভাবে পেছন ফিরে হাঁটা দেওয়ার (শুনেছি রূপকথার দৈত্যরা এরকম পিছন ফিরে হাঁটে) অবিমৃষ্যকারিতাকে অনুমোদন করা কীছুতেই কোনও যুক্তিতেই সমীচীন নয়, এর সমর্থনে ভাষাতাত্ত্বিক কোনও যুক্তি নেই।
ব্যাকরণে ধ্বন্যাগম বলে একটি কথা (সংজ্ঞার্থ) আছে। ধ্বন্যাগম সম্পর্কে সংসদ ব্যাকরণ অভিধানের উদ্ধৃতি, “এক ধরণের ধ্বনি পরিবর্তন। উচ্চারণের কারণে অনেক শব্দে যে-ধ্বনি নেই তাও এসে গেলে তাকে ধ্বনির আগম বা ধ্বন্যাগম বলা হয়। শব্দের প্রথমে, মধ্যে কিংবা শেষেÑ তিন জায়গাতেই এই আগম হয়। আগত ধ্বনি স্বরধ্বনি হলে তা হয় স্বরাগম ও ব্যঞ্জনধ্বনি হলে ব্যঞ্জনাগম।”(৬) অগ্রে একটি ব্যঞ্জন /স/ যুক্ত হয়ে ‘টাওয়ার’ শব্দটি ‘স্টাওয়ার’ হয়ে উঠেছে। এই /স/-য়ের আগমনটাই একটি ব্যঞ্জনাগমের উদাহরণ।
কোনও বিভাষার শব্দের উচ্চারণ বিকৃতির প্রপন্নতা বাঙালির একটি প্রিয় বাগবৈদগ্ধ্য। উচ্চারণ বিকৃতির প্রপন্নতা (পটুত্বও বলা যায়) ইংরেজদের মধ্যে অনুপস্থিত তাও কিন্তু নয়। তারা যে কয়টি বাংলাশব্দকে তাদের ভাষায় কৃতঋণশব্দের স্বীকৃতি দিয়েছে, তাঁদের সব কটিই কমবেশি তাদের ভাষার উচ্চারণানুরূপ বদলে গেছে। যেমন ‘অবতার’ হয়ে গেছে ‘আবাটার’, ‘জগন্নাথ’ হয়ে গেছে ‘জাগানোট’। ফারসিও এই উচ্চারণ বিকৃতির প্রপন্নতাক্রান্ত ভাষা। সংস্কৃত ‘সিন্ধু’ শব্দটিকে ফারসিতে প্রবসিত করার আগে ‘হিন্দ্’ করে নেওয়া হয়েছে। এই ‘হিন্দ্’ বাংলাভাষায় প্রবসিত হয়ে হয়ে গেছে ‘হিন্দু’ এবং ভাষান্তরিত হয়ে ঘটেছে অর্থান্তরও এবং অর্থান্তরে স্থান হয়ে গেছে ধর্ম।
উচ্চারণ বিকৃতির আর একটি বিশেষ নমুনা দেই। আমাদের জেলার নাম সুনামগঞ্জ, একটি উপজেলার নাম শাল্লা, একটি ব্যবসাকেন্দ্রের নাম সাচনাবাজার। আমাদের উত্তর সীমান্তের প্রতিবেশী আসাম। আসামী ভাষায় এই তিনটি নাম উচ্চারিত হবে যথাক্রমে হুনামগঞ্জ, হাচনাবাজার, হাল্লা। আসামকে বাঙালিরা বলে ‘আসাম’, কিন্তু আসামীরা বলে ‘অহম’। তাছাড়া আমরা সুনামগঞ্জীরা প্রায় ক্ষেত্রে /স/ ব্যঞ্জনটিকে /হ/ উচ্চারণে অভ্যস্ত। যে কারণে সুনামগঞ্জের লোকোচ্চারণে সাপ, সন্ধ্যা, সে, সকল, সাত, সাঁতার, স্বামী, শালা, শালী, শিয়াল ও শৌল ইত্যাদি শব্দ যথাক্রমে হাপ্, হাঞ্জা, হে, হকল, হাত্, হাতার, হাই, হালা, হালী, হিয়াল্ ও হৌল্ হয়ে পড়ে। এটা নাকি হয়, কোনও কোনও ভাষাবিজ্ঞানী বলেন, আহম ভাষার প্রভাবে।
এই যদি হয় ভাষাদেশের নাগরিকদের বদনবদলের বাস্তবিক বাস্তবতা, তা হলে যে-কেউ বলতেই পারেন, ইংরেজি ‘হস্পিটাল্’ যদি বাঙালির উচ্চারণে খোলনলচে বদলে বাংলা ‘হাস্পাতাল্’ হয়ে ইঙ্গ থেকে বঙ্গ হয়ে তারপর সুনামগঞ্জী উচ্চারণে ‘হ>অ’ হয়ে গিয়ে “আস্প’াতাল্”(৭) হয়ে উঠতে পারে তবে ‘টাওয়ার’ কেন ‘স্টাওয়ার’ হবে না ? “আস্প’াতাল্” উচ্চারণের পক্ষে ওকালতি করে শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী বলেছেন, “সিলেটী এবং চট্টগ্রামী বাংলায় সাধারণতঃ শব্দের আদিতে অবস্থিত ‘হ্’ লোপ পায় । এই ‘হ্’-এর সঙ্গে যুক্ত অ-বর্ণটি থাকিয়া যায়।” (৮) একশ’বার এমন হতে পারে, বরং এটাই স্বাভাবিক ও অকৃত্রিম প্রাকৃতিক। প্রকৃতপ্রস্তাবে উচ্চারণ বিকৃতিতে বাঙালি বিশ্বে তুলনারহিত না হলেও কারও চেয়ে কম যায় না। তার প্রমাণ, বাঙালি ইতোমধ্যেই ব্রাহ্মণকে বামন, পুরোহিতকে পুরুইত, চক্রবর্তীকে চক্কত্তি, পুরকায়স্থকে পুরকাইৎ করে নিয়েছে। এমনকি বাঙালি ‘সাগর’কে ‘আওর’ করে দিতে গিয়ে ‘সাগর>হাওর>আওর’-এর ধ্বনিবিবর্তনের পথপরিক্রমায় কোনও ক্লান্তি বোধ করে নি। তাছাড়া বিভাষার শব্দ তো ধ্বনিবিবর্তনের পথ না মাড়িয়ে বাংলাভাষাদেশে প্রবেশের ছাড়পত্র পায় না। তার জলজ্যান্ত প্রমাণ, গ্রামের বাঙালি মুসলমানরা এখনও ‘আহ্মদ্’কে ‘আখ্মদ্’ বলেই অবলীলায় অভ্যস্ত, তাঁরা ‘মসজিদ’কে ‘মজ্জিদ্’ করে নিয়েই অসীম শ্রদ্ধায় অবনত হন। প্রমিত উচ্চারণে ফিরে আসতে তাঁদের আরও সময় ও শিক্ষা দরকার।
তথ্যসূত্র :
১. হুমাযুন আজাদ, তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান, আগামী প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ : মে ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ১১৪।
২. সুভাষ ভট্টাচার্য, আধুনিক বাংলা প্রয়োগ অভিধান, ডি. এম. লাইব্রেরী কলকাতা, দ্বিতীয় সংস্করণ : ১৯৮৬, পৃষ্ঠা : ৮০।
৩. হুমায়ুন আজাদ, তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান, আগামী প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ : মে ১৯৯৫ পৃষ্ঠা : ৯৯।
৪. বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ, প্রথম খ-, বাংলা একাডেমী ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ : ২০১২, পৃষ্ঠা : (১৩৩Ñ১৩৪)।
৫. হুমাযুন আজাদ, তুলনামূলক ও ঐতিহাসিক ভাষাবিজ্ঞান, আগামী প্রকাশনী, দ্বিতীয় সংস্করণ : মে ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ১১৫।
৬. অশোক মুখোপাধ্যায়, সংসদ ব্যাকরণ অভিধান, সাহিত্য সংসদ, পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ : ১৯৯৫, পৃষ্ঠা : ১২৫।
৭. শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, সিলেটী ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা, বাঙ্লা একাডেমী ঢাকা, প্রথশ সংস্করণ : শ্রাবণ ১৩৬৮, পৃষ্ঠা : ১৩।
৮. শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী, সিলেটী ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা, বাঙ্লা একাডেমী ঢাকা, প্রথশ সংস্করণ : শ্রাবণ ১৩৬৮, পৃষ্ঠা : ৩০।
০৮. চিনে নাম চিনা হতেই হবে
নামকরণের ব্যাপারে চিনে কড়াকড়ি আইন আছে যে, ধর্মনির্বিশেষে চিনাভাষা ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় নিজের নাম রাখা যাবে না। চিনে কারও ধর্ম ইসলাম হতে পারে, তাতে কোনও বাধা নেই, কিন্তু ইসলামি নামকরণের অজুহাতে নাম আরবি ভাষার শব্দে হতে পারবে না, চিনাভাষার শব্দেই হতে হবে, এর অন্যথা হতে পারবে না কীছুতেই। চিনারা চেনার (এখানে চেনা কিন্তু ভাষা অর্থে চিনা নয়, আদপে সম্যক পরিচিতি) স্বার্থে চিনা নাম স্বনামরূপে পছন্দ করেন। মাতৃভাষার জানা শব্দে, মানে চিনা ভাষায় নামকরণ চিনাদের পরস্পরের সঙ্গে চেনাজানার সমাজনির্ধারিত ঐতিহ্যিক সূত্র। কোনও ধর্মের সঙ্গে ভাষার সম্পর্ককে চিনারা পাত্তা দিতে নারাজ, কিন্তু নামের সঙ্গে ভাষার প্রত্যক্ষ সম্পর্ককে তাঁরা সমধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, কারণ নামটা ব্যক্তি বিশেষের সামাজিক অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। প্রকৃতপ্রস্তাবে চিনে অনাদিকাল থেকে মানুষের জীবন উৎপাদনসম্পর্কের সামগ্রিক প্রক্রিয়ার ভেতরে শ্রম, চেতনা ও ভাষার পারস্পরিক ওতপ্রোততাকে পরিপূর্ণ মান্যতা দিয়ে পরিচালিত কিংবা নিয়ন্ত্রিত। এই কারণে সেখানে মানুষে মানুষে ভাববিনিময়ের ক্ষেত্রে বস্তুতপক্ষে চলিতকর্মবহির্ভূত কোনও মতাদর্শ পারতপক্ষে মুখ্য হয়ে উঠে না। বিস্মৃত হলে চলবে না যে, মানবপ্রজাতি যৌথকর্মপ্রয়াস ভিন্ন স্বীয় অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে নি, পারে না এবং পারবে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পৃথিবী মৃত্যুপথযাত্রী একটি গ্রহ, তার সুরক্ষা কেবল সমগ্র মানবপ্রজাতির যৌথকর্মপ্রয়াসের সমন্বয়সাধন করেই সম্ভব। মানুষের সমবেত ক্রিয়াকলাপ ও ভাষার অন্বীক্ষণ কিংবা অনুসন্ধান সাপেক্ষে তাই বলা হচ্ছে, “অতএব মানুষের শ্রম তার সচেতনতার সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু সচেতনতা আবার কথা ও ভাষার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত, এই ভাষার সাহায্যেই লোকে মেলামেশা করে, পরস্পরকে নিজেদের মনোভাব জানায়। উচ্চারিত ভাষা কেবল মানুষেরই প্রকৃতিসিদ্ধ এবং প্রত্যেকটি নতুন পুরুষ জীবন শুরু করতে ভাষা আয়ত্ব করতে বাধ্য, এছাড়া কোনো সমবেত ক্রিয়াকলাপ অসম্ভব।”(১) অর্থাৎ ব্যক্তি সমাজের মধ্যে বসবাস করে উৎপাদন সম্পর্কের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠে, সামাজিক যোগাযোগ সম্পন্ন না হলে এই উৎপাদন সম্পর্ক সচল হতে পারে না। তাই অনিবার্যভাবেই সমাজের সকল মানুষের সঙ্গে মেলামেশার সময় বা যোগাযোগ স্থাপনকালে একে অন্যের নামোচ্চারণ করে। এই সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে চিনারা স্বদেশের কোনও ব্যক্তি বিশেষকে স্বকীয় ভাষার নাম ব্যতীত পরকীয় ভাষার নামে সম্বোধন করতে স্বাভাবিকভাবেই কস্মিনকালেও প্রস্তুত নন। ব্যক্তি বিশেষের নামকরণের মাধ্যমে অন্যভাষার শব্দ চিনাভাষায় প্রবিষ্ট হোক তা তাঁদের একান্তই অনভিপ্রেত। চিনারা স্বভাষার পবিত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত রক্ষণশীল। এমন কি চিনারা আজান ও কোরআন পর্যন্ত চিনা ভাষায় দেওয়া ও পাঠ করাকে বিধিবদ্ধ করে রেখেছেন। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন, “পৃথিবীর জনসংখ্যা এখন ছ’শো কোটি ছাড়িয়ে গেছে, তার একতৃতীয়াংশ, অর্থাৎ দুশো কোটিরও বেশি মানুষের বাসস্থান দুটি মাত্র দেশে। চিন এবং ভারত। খ-িত ভারতের তুলনায় চিন আয়তনে এবং জনসংখ্যায় ভারতের চেয়েও বড়, এবং চিনের আরো একটি বিশেষ সুবিধে এই যে, এই বিশাল জনসংখ্যার শতকরা পঁচানব্বই অংশেরই ভাষা এক, ভাষার সূত্রে চিন সমগ্র দেশে ঐক্যবন্ধন বজায় রাখতে পেরেছে। চিনের এই ভাষানীতি এমনই কঠোর যে সেখানে মুসলমানদেরও আরবি নাম গ্রহণ করতে দেওয়া হয় না। পৃথিবীর সমস্ত দেশেই যে সব মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন, তাঁদের সকলকেই আরবি নাম গ্রহণ করতে হয় (যেমন, আমেরিকার প্রখ্যাত মুষ্ঠিযোদ্ধা ক্যাসিয়াস ক্লে হয়েছে মহম্মদ আলি) এবং আজান ও কোরান পাঠ করতে হয় আরবি ভাষায়। একমাত্র চিনে সে অধিকার নেই। সে দেশের সমজিদেও কোরান পাঠ হয় চিনা ভাষায়।”(২) চিনের আরবি বর্জনের এবংবিধ বিধিবিধানকে আমাদের দেশের স্বাভাবিক ধর্মবোধ অনুমোদন করে না। আরবি নাম বর্জন না কারার সে-ধর্মবোধ প্রকৃতপ্রস্তাবে কতটুকু সঙ্গত, সেটা ইসলামি মূল্যবোধের নিরিখে অর্থাৎ কোরআন-সুন্নাহর কষ্ঠিপাথরে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন আছে। তা না হলে বোধোদয় হওয়া অযৌক্তিক কীছু নয় যে, চিনারা মুসলিম হলেও তাঁরা ইসলামিত্বের পরিমিতিতে উন।
ভাষাবিষয়ে এ রকম রক্ষণশীলতার দোষে দুষ্ট একা কেবল চিনারাই নয়, ইংরেজরাও এ ব্যাপারে ভাষার পবিত্রতারক্ষার ছুতোয় কম রক্ষণশীল নয়। কিন্তু বিশ্বে বিরল প্রকৃতির মানবপ্রজাতি বাঙালিদের মধ্যে এ ব্যাপারে বিপরীত লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। বাঙালিদের একাংশ বা অংশ বিশেষ একটা বিশেষ বিষয়ে দারুণ দক্ষ। তাঁরা বাক্যাভ্যন্তরে অবাংলা শব্দ নিপুণ কৌশলে বসিয়ে দিতে সবিশেষ পারঙ্গম ও অভ্যস্ত। এমনকি কেউ কেউ মুখনিসৃত বচনামৃত (প্রকৃতপ্রস্তাবে ভাষাবিচ্ছিন্নতা) রচনার এই রীতি তথাকথিত সাহিত্যসর্জনে প্রয়োগ করতে রীতিমতো পছন্দ করেন এবং কোনও ধরনের দ্বিধা কিংবা হীনম্মন্যতাবোধে আক্রান্ত হন না। বিশ্ববিরল এই অনন্য ভাষাবিচ্ছিন্নতা বোধ করি কেবল বাঙালিদেরই আছে অন্য কারও নেই। সেই কবে মধ্যযুগের কবি আবদুল হাকিম নিন্দিত এই কতিপয় বঙ্গকুলাঙ্গার অতীতে আরবি-ফারসি-উর্দু এবং বর্তমানে ইংরেজি শব্দ ভাষাভ্যন্তরে যত্রতত্র সন্নিবেশিত করে বিশেষ একটি অপকম্ম অর্থাৎ চূড়ান্ত বিচারে ভাষাবিচ্ছিন্নতায় প্রপন্নতার ঐতিহাসিকতাকে বারংবার প্রমাণ করতে জীবনপণপ্রস্তুত ছিলেন এবং এখনও আছেন, বহালতবিয়তেই। বাংলার মাটিতে এই বিশ্বাসঘাতক রক্তবীজের মুত্যু নেই। তাঁরা একদা বিদেশির দ্বারা শাসন-ত্রাসনে দাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিলেন, অর্থাৎ বিশেষ করে ইংরেজের এবং এখনও ‘স্বাধীন-অবস্থায়’ (আসলে কি স্বাধীন ?) সেই দাসত্বের নাগপাশে আবদ্ধ আছেন, অন্তত চিন্তাচেতনায় মেকলেচেলা না হলে তাঁদের পেটের ভাত হজম হয় না। সুতরাং কী আর করা। অন্যভাষার শব্দ স্বভাষায় গ্রহণের ক্ষেত্রে ইংরেজদের মনোভাবটা বাঙালিদের সম্পূর্ণ বিপরীত, বোধ করি এজন্য যে, ইংল্যান্ড কস্মিনকালেও বাংলাদেশের ঔপনিবেশ ছিল না। এ ব্যাপারে ইংরেজদের ভাষ্য, ‘আমরা দুয়ারটাকে একটু ফাঁক রেখেও মাঝে মাঝে একবারে বন্ধ করে দেই।’(৩) আর বাঙালিরা তার সম্পূর্ণ উল্টো, দুয়ারটা একেবারে, যাকে বলে, হাট করে খোলা, বিশেষ করে সাবেক ঔপনিবেশিক ইংরেজির জন্য। ইংরেজির জন্য যৎপরোনাস্তি উদার এই বাঙালিরা মনে করেন, নিজেদেরকে কোনও যুক্তিতেই অন্তত নিমকহারাম করে রাখা সঙ্গত হবে না, যেহেতু একদা ইংরেজরা, যতোই শোষণ করুক, এই দেশের শাসক ছিল। এইরূপ একটি মনোব্যাধির আধিগ্রস্ত হয়ে, তাঁরা এখনও সাবেক ঔপনিবেশিকতার দাসত্ব করার প্রতিজ্ঞায় বদ্ধপরিকর আছেন এবং তাঁরা এই প্রতিজ্ঞাকে পবিত্র বলে গণ্য করেন বিধায় কীছুতেই প্রতিজ্ঞাটি ভঙ্গ করতেও প্রস্তুত নন (চলবে)

  • [১]