- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা

ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) যদিও তাঁরা স্বজাতির প্রতি অবিশ্বস্ত হয়ে ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ করতে সর্বাবস্থায় একপায়ে খাড়া থাকায় অভ্যস্ত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁরা ত্রিশ লাখ বাঙালি নিধনের নাটক মঞ্চায়নের ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁরা তখন বারোশ’ মাইল দূরের পাকিস্তানী জাতীয়তাকে স্বজাত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে বাঙালি জাতিসত্তানিধনে সুস্থিত ছিলেন। নমস্য মাহমুদ আলী পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন, কিন্তু যাঁরা যেতে পারেন নি তাঁদের ক্ষেত্রে, বস্তুতপক্ষে কার্যব্যপদেশে প্রমাণিত যে, এখনও সেই সুস্থিতির কোনও ব্যত্যয় ঘটে নি। বিস্মৃত হওয়ার কোনও অবকাশ নেই যে, বঙ্গবন্ধুকে নিহত হতে হয়েছে, সাম্যবাদী আব্দুল হককে জন্মভূমির মাটিতে অন্তরিত জীবন কাটিয়ে যেতে হয়েছে এবং এখন বাংলাদেশকে উগ্র জঙ্গিবাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়তে হচ্ছে, শেখ হাসিনার উপর ক্রমাগত আক্রমণ অব্যাহত আছে।
একজন লেখক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় ‘ঔপনিবেশিকতার দাসত্ব করার প্রতিজ্ঞায় বদ্ধপরিকর’ নন। তিনি ১৯৬৭ সনে একবার ‘লেখার সময় বাক্যের ভিতরে অবাংলা শব্দ বিশেষ করে ইংরেজি শব্দ’ ব্যবহারের বিপদে পড়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, “জুভেনাইল ডিলিংকোয়েন্সি-এর বাংলা অনুবাদ কী হবে ? তারুণ্যসুলভ আপরাধ ? নাকি আর একটু সহজ ভাষায় বলা যাবে, ‘বালকোচিত বাঁদরামো’ ? একটা লাগসই পরিভাষা নিশ্চিয় আছে, কিন্তু হাতের কাছে ঠিক এই মুহূর্তে সেটা খুঁজে পাচ্ছি না। জুভেনাইল ডিলিংকোয়েন্সি দু’টোই যখন চালু তখন ওদেরই আপাতত ব্যবহার করা যাক। আশা করি, আমার এই দাস-মনোভাবের জন্যে আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন।”(৪) নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় বাংলা বাক্যের মধ্যে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতে বাধ্য হয়ে পাঠকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছেন বিশ শতকের ষাটের দশকের শেষে (লেখা প্রকাশের তারিখটি : ৩০ অক্টোবর ১৯৬৭)। এখনের সঙ্গে তখনের ফাঁক একেবারে কম নয়, বলতে গেলে প্রায় অর্ধশতাব্দী। এই ফাঁকে বাংলা সাহিত্যের জগত যেমন চমকপ্রদ ও বিস্ময়কর অনেক শিল্পসৃষ্টির সম্ভারে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে, তেমনি ভাষা ভাবপ্রকাশে হয়ে উঠেছে আরও বেশি স্বনির্ভর ও আরও বেশি পারঙ্গম। বাংলা ভাষায় বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ এখন আর আগের মতো সূচিশিল্পের উল্টো পিঠের মতো বিসদৃশ ফিকে-ম্লান ব্যর্থসৃষ্টি হয়ে উঠে না, বরং মূলের ভাব প্রতিস্থাপনের পারদরঙ্গমতায় (পারদর্শী+পারঙ্গম+তা) মহৎ হয়ে উঠে পারতপক্ষে।
বাক্যাভ্যন্তরে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার বিষয়ে আলোচনায় সাময়িক বিরতি টেনে অপাতত ‘এখনের সঙ্গে তখনের ফাঁক’টুকু (১৯৬৭- ২০১৪) ভরাট হয়ে যওয়ার বর্ণানা প্রদান করা অনিবার্য হয়ে উঠেছ। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এই ফাঁকটুকু এককথায় বিশ্বমানের পরিপেক্ষিতেও সাহিত্যশিল্পসৃষ্টির বিস্ময়কর স্বর্ণযুগ, বহরে-বৈচিত্র্যে বিশাল-বিচিত্র ও অতুলনীয়। এমন বক্তব্যের সমর্থন মেলে দিকপাল সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায়। বিংশশতাব্দীর শেষার্ধের ও পরের প্রায় দেড়দশকের সাহিত্যসম্ভারের উচ্চমান নিয়ে তাঁর সুচিন্তিত মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, “নিজের ভাষার সাহিত্য নিয়ে গর্ববোধ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বিশ্বের পরিপ্রেক্ষিতে নির্মোহ বিচার করাও প্রয়েজনীয়। বিভূতিভূষণ-মানিক-তারাশঙ্কর-সতীনাথ ভাদুড়ির বিশেষ কিছু কিছু রচনা এবং জীবনানন্দ দাশের কাব্য (একালেও সমরেসশ বসু-মহাশ্বেতা-সুভাষ মুখাপাধ্যায়ের সৃষ্টি) অনেক নোবেল-পুরস্কৃত গ্রন্থের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। বরং কোনও কোনওটি আরও কয়েক ধাপ উন্নীত, একথা বলতে দ্বিধা নেই। নোবেল-পুরস্কার পাক বা না পাক, বাংলা সাহিত্যের যে উচ্চমান বজায় আছে, এই উপলব্ধিই আমাদের কাছে আনন্দের বিষয়। টাকার অঙ্ক ছাড়া নোবেল কমিটির বিচারকে তেমন গুরুত্ব দেওয়ার কোনও প্রয়াজন নেই।”(৫) তাৎপর্যপূর্ণ ও প্রোজ্জ্বল এই ফাঁকটিকে ভরাট করে রেখেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী, অদ্বৈত মল্লবর্মণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যজিত রায়, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নন্দী, আবু ইসহাক, রমাপদ চৌধুরী, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আলাউদ্দিন আল আজাদ, মহাশ্বেতা দেবী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, দেবেশ রায়, সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, আবুল বাশার, অমিয়ভূষণ মজুমদার, শওকত ওসমান, সুবোধ ঘোষ, বনফুল, মনোজ বসু, সৈয়দ ওয়ালি উল্লাহ, সত্যেন সেন, আহমদ শরীফ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শামসুর রাহমান, আহমদ ছফা, শহীদুল জহির, বিনয় মজুমদার, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, শিবনারায়ণ রায়, সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী, শক্তি চট্টেপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, জয় গোস্বামী, হাসান আজিজুল হক, আবদুশ শাকুর, সেলিনা হোসেন, নাসরিন জাহান, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক, যতীন সরকার প্রমুখের মতো বিখ্যাতবিখ্যাত সাহিত্যশিল্পীরা। এইসব দিকপাল কথাশিল্পীর কতিপয় ব্যতীত অধিকাংশই না ফেরার দেশে চলে গেছেন এবং এখানে অনেকের নামই অনুল্লেখিত রয়ে গেছে, বিশেষ করে কয়েকজন বাদে বিখ্যাতসব কবিদের নাম।
এখানে কেবল একটি কথা বলে রাখি, সালমান রুশদির স্যাটানিক ভার্সেজ নোবেল পেয়েছে অথচ এই উপন্যাসের তুলনায় অনেক বাংলা উপন্যাস গুণেমানে ও শৈল্পিক দার্ঢ্যে বহুবিধ দিক থেকে উচ্চাঙ্গের, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। যেমন তিতাত একটি নদীর নাম, ডুড়াই চরিতমানস, অন্তর্জলী যাত্রা’ পথের পাঁচালী, হাজার চুরাশির মা, চাঁদের অমাবস্যা, খোয়াবনামা, তিস্তাপারের বৃত্তান্ত, জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রদোষে প্রাকৃতজন ইত্যাদি। ১৯১৩ সনে সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তির পর বাংলাভাষা বন্ধ্যা হয়ে পড়েছে, এমন তো নয়, বরং রবীন্দ্রযুগের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থেকেছে ও উত্তরোত্তর আরও বেগবান, সৃষ্টিশীল ও সমৃদ্ধ হয়েছে।
ইতোমধ্যে একুশ শতকের অনধিক দেড়দশক বিগত হয়েছে এবং ইতোমধ্যে বাংলাসাহিত্যের মানচূড়া নিঃসন্দেহে হয়ে উঠেছে বিশ্বমানের শিল্পাঢ্যস্পর্শী। তার প্রদীপ্ত প্রকাশ ঘটেছে শিল্পসমৃদ্ধ ও সর্জনশীলতায় উচ্চমানের যে-সব উপন্যাসে তার কয়েকটির নাম ইতোমধ্যেই বলে দিয়েছি। তা ছাড়া যে-কটার নাম করা যায় সেগুলো হলো : বিবর, দেখি নাই ফিরে, গঙ্গা, খারিজ, অরণ্যের অধিকার, সেই সময়, রাজনগর, অলীক মানুষ, রাহু চণ্ডালের হাড় ইত্যাদি। বাংলাসাহিত্যের এই সমৃদ্ধির ফিরিস্তি উপস্থিত করে এই সহজ প্রসঙ্গটির অবতারণা করার সদিচ্ছা প্রকাশ করছি যে, বাংলাভাষা ইতোমধ্যে সৃষ্টিশীলতার বিশ্বমানে ঈর্ষণীয় উচ্চতায় পৌঁচেছে। ভাষা হিসেবে বাংলাভাষা এমন একটি মাত্রা পর্যন্ত বিকাশ লাভ করেছে যে, এ ভাষাটিকে ভাবপ্রকাশের উনতার দোষে দুষ্ট প্রতিপন্ন করা যাবে না কোনও যুক্তিতেই, বরং এমনটা করতে গেলে নিজের মূর্খতাকেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে এবং সেই সঙ্গে আত্মগত বিচ্ছিন্নতার ব্যাধি থেকে উদ্ভিন্ন রাজাকারজীবিতার প্রকাশ ঘটবে । এমনকি এখন বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখার চূড়ান্ত জটিল বিষয়ভাবনাকে অনুবাদেও এ ভাষা পরিপূর্ণরূপে পারঙ্গম ও দক্ষ।
একটু দীর্ঘ প্রসঙ্গান্তরের পর, বাক্যাভ্যন্তরে ইংরেজি শব্দের ব্যবহারের আলোচনায় প্রত্যাবর্তনের আগে বলে নেওয়া প্রয়োজন বোধ করছি যে, এই প্রসঙ্গান্তরের একটি নির্দিষ্ট কারণ ছিল। উপর্যুক্ত আলোচনায় অন্য কীছু প্রসঙ্গের মতো বাংলাভাষার ভাবপ্রকাশের উৎকর্ষতার প্রসঙ্গটি ইঙ্গিতে হলেও প্রতিভাত হয়েছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে হাজির করা এইসব উৎকর্ষতার চূড়াস্পর্শী উপন্যাস ভাবপ্রকাশের শক্তিতে দুর্বল ভাষা দিয়ে সম্ভব হতো না। এই উপন্যাসগুলোর নির্মাণ প্রতিপন্ন করেছে যে, যে-কোনও ধরণের ভাবপ্রকাশে বাংলাভষা পারঙ্গম ও দক্ষ, অর্থাৎ ভাবপ্রকাশের জন্যে বাংলাভাষাকে অন্য ভাষার মুখাপেক্ষী হতে হয় না। সুতরাং ‘বাক্যাভ্যন্তরে ইংরেজি শব্দের ব্যবহারের’ প্রতি কারও কারও অনাবশ্যক অনুরাগের অসারতা ও অকারণ প্রীতির দুর্বলতা তাঁদের প্রাতিস্বিক রাজাকারিত্বকেই প্রতিপন্ন করে।
বাংলাভাষার কোনও লেখক যদি বাক্যের ভেতরে ইংরেজি শব্দ সন্নিবেশিত করে বাক্য রচনা করতে বাধ্য হন, তা আদপে তাঁর প্রাতিস্বিক দুর্বলতা মাত্র বা তাঁর শ্রৈণিচরিত্র্যের মজ্জাগত পশ্চাদপদতার পাঁক থেকে অর্জিত ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার দুরারোগ্য ব্যাধি, কিংবা যাকে বলা যায়, তাঁর পরভাষাপ্রীতি প্রকাশের পরাকাষ্ঠা। অকারণ পরভাষাপ্রীতির এই প্রবণতা নিঃসন্দেহে একধরণের হীনম্মন্যতারই নামান্তর। প্রকৃতপ্রস্তাবে বাক্যের ভেতরে যত্রতত্র যখন তখন অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দ সন্নিবেশনের ভাষিক কৌশলকে কোনও কোনও লেখক সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে শৈলীরূপে প্রতিপন্ন করতে অতীব উৎসাহী হয়ে উঠেন। যদি সেটা সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজস্বতার পরিচায়ক হতে পারে বা হয়, অন্তত তর্কের খাতিরে এমন ধরে নেওয়া হয়, তাহলেও বিস্মৃত হওয়া বোধ করি চলে না যে, বাক্যাভ্যন্তরে এইরূপ অপ্রয়োজনীয় ইংরেজি শব্দসন্নিবেশনের ভাষিক কৌশল সাহিত্যসৃষ্টির শৈল্পিক দার্ঢ্যতা কিংবা শিল্পসৌন্দর্যের গরিমা-মহিমা-সুষমাকে প্রকটিত ও প্রতিপন্ন করে না। ভাষার পরিপক্কতা থেকে এ-ভাষিক প্রযুক্তি শতহস্ত দূরে অবস্থান করে বরং সাহিত্যিকের একধরণের স্বভাষাবিচ্ছিন্নতার ব্যাধিকে প্রকট করে মাত্র, যা প্রকারান্তরে লেখকের চেতনাগত ঔপনিবেশিক দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ। তাছাড়া ভাষাভ্যন্তরে বিদেশি শব্দ প্রক্ষেপণের এই প্রসঙ্গটির (বাংলাবাক্যের অভ্যন্তরে ইংরেজি শব্দের অকারণ প্রবসন, যা ভাষাকে কুষ্ঠাক্রান্ত দেহের মতো বিশ্রী করে তোলে) সঙ্গে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার মতো একটি হীনম্মন্যতাসন্নিভ ব্যাধিগ্রস্ততা সংলগ্ন হয়ে আছে কেবল নয়, এই প্রবণতা ভাষার শৈল্পিক সৌন্দর্য ও সক্ষমতাকে প্রকৃতপ্রস্তাবে কৌন্দর্যমণ্ডিত অক্ষমতায় পর্যবশিত করে তোলে।
এক ভাষার ভেতরে অন্য ভাষার শব্দ প্রক্ষেপণ নারীগর্ভে শুক্রাণু প্রবিষ্টকরণের প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে সন্তানোৎপাদন করার সঙ্গে অনেকটাই তুলনীয়। একটি গল্প পড়েছিলাম। গল্পটির উপজীব্য ছিল, পুরুষের বন্ধ্যত্বের কারণে নারীর নলজাতক (টেস্টটিউভ বেবি) গ্রহণের সামাজিকসাংস্কৃতিক জটিলতার মনোদৈহিক প্রতিক্রিয়া থেকে উদ্ভিন্ন দ্বন্দ্বের সমাধান। গল্পের নায়কের ভাবনায় পদ্ধতিটা গাভীকে পাল খাওয়ানোর মতো জঘন্য ঠেকেছিল। নায়িকা ডাক্তারি পরিভাষায় ‘আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন’-এর বদলে ‘ন্যাচারাল ইনসেমিনেশন’ পছন্দ করেছে এবং শেষ পর্যন্ত এক সুযোগে পরিচিত এক পুরুষের সঙ্গে একান্ত সঙ্গোপনে উপগত হয়ে সঙ্কটবিমোচনে উত্তীর্ণ হয়েছে। গল্পে নায়িকার মনোভাব ব্যক্ত হয়েছে এভাবে, “সব শুনে কাঠ হয়ে থাকে বসুধা। পরপুরুষের শুক্রাণু দিয়ে গর্ভধানের কথা ভাবতে গিয়ে শিউরে উঠে ও। ওর মনে হয় এ ব্যবস্থা ন্যায়সঙ্গত নয়। জানাজানি হলে কেলেঙ্কারি হবে। তা ছাড়া সে তো এ পরিবারের বংশধর হবে না, তার বংশাণুগতি আলাদা হবে। সারারাত ধরে নিজের মনের সঙ্গে যুদ্ধ করে বসুধা। ভোরের দিকে ওর মাতৃসত্তার জিৎ হয়। হার মানে সমস্ত ন্যায়-অন্যায় যুক্তি-তর্ক। যেন-তেন প্রকারেণ মা হতেই হবে ওকে।”(৬) নায়কের মনোভাব ব্যক্ত হয়েছে ডাক্তারের সঙ্গে আলাপচারিতার অনুষঙ্গে। “আসলে এটা একটা প্রসেস। ডোনারের স্পার্মটি নিয়ে আপনার মিসেসের শরীরে ইনজেক্ট করে দেওয়া হবে।” ডাক্তারের এই কথা শুনে “বিতৃষ্ণায় ভরে উঠে কুশলের মনটা। তার মনে হয় বসুধা যেন একটা গাভী। ওকে পাল খাওয়াতে নিয়ে এসেছে কুশল। রি রি করে উঠে ওর মন।”(৭) পুরুষ প্রজননে অক্ষম হলে নিয়োগপ্রথা অবলম্বন করে ক্ষেত্রজ সন্তান গ্রহণের রীতি অতি প্রাচীন। মহাভারতের বিখ্যাত ধৃতরাষ্ট্র, পা-ু, বিদুর ও পঞ্চপা-ব প্রত্যেকেই ক্ষেত্রজ। প্রকৃতপ্রস্তাবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রাচীন ক্ষেত্রজ সন্তানোৎপাদনের প্রথাকেই গালভরা নাম দিয়েছে ‘আর্টিফিশিয়াল ইনসেমিনেশন’। কিন্তু যখন কোনও কথাকার বাংরেজ হয়ে উঠার ফালতু আগ্রহে বাংলাভাষাদেশে অবাংলা শব্দ প্রবসনের ঠিকেদারি করে বেড়ান, বলতেই হয় প্রয়োজন ছাড়াই তিনি ‘ডোনারের স্পার্ম’ নেওয়ার দালাল হয়ে উঠে মাতৃভাষাকে অনর্থক পাল দেওয়া গাভীতে পর্যবশিত করেন এবং প্রকারান্তরে বাংলাভাষার বংশধারাকে বিকৃত করার ষড়যন্ত্রে ব্যাপৃত থাকেন। তাঁর এই অবিমৃষ্যকারিতাকে মেনে নেওয়া যায় না সহজে। বোধ করি এর চেয়ে বড় ও জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা আর নেই।
একবিংশ শতকের প্রথম দশকের সোপান পেরিয়ে লেখকেরা বাংলাবাক্যে নির্দি¦ধায় ইংরেজি শব্দ সন্নিবেশিত করে চলেছেন, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো কোনওরূপ ‘দাস-মনোভাব’-এর হীনতার ছিটেফোঁটাও তাঁদেরকে স্পর্শ করে না। কেন জানি না, দ্বিধাহীনচিত্তে মাতৃভাষাকে অনবরত পাল দেওয়া গাভীতে পর্যবশিত করার দায়িত্ব তাঁরা পালন করেই চলেন। কেউ লিখছেন, (ক) “রিলেশন হয়! […] সেক্সি হয়ে আছ তুমি এখন! নাইট-ড্রেস পরে লেপ্টে আছ বিছানায়। […] কী ফিগার কুহু, কী দেখতে! […] হাইট অবশ্য একটু কম। […] কিন্তু খুব গ্ল্যামারাস, […]। […] প্রেম করেনি, আনটাচড, এরকমটা হয় ?”।(৮) আবার কেউ লিখেছেন, “চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা। গা থেকে ভুরভুর করে আসছে দামি পারফিউমের গন্ধ। […] ঠোঁটে নেচারাল কালারের লিপিস্টিক। […] বোঝা যায় খুবই স্টাইলিস্ট মহিলা। সাইজে ছোট হলেও জাঁদরেল সুন্দরী ছিলেন এককালে। […] চারজনেরই শরীর-স্বাস্থ্য, হাইট, পোশাক-আশাক প্রায় একরকম। চারজনই মোটা টাইপের এবং বেটে। […] কিন্তু আপনি তো ঠিকই আপনার ফিগার মেনটেইন করছেন দিদি। […] অর্থাৎ প্রেম-ভালোবাসা সংক্রান্ত জেলাসি।”(৯) বাক্যাভ্যন্তরে ইংরেজি শব্দের প্রক্ষেপণ, প্রকারান্তরে বাংলাভাষাকে বাংরেজভাষা করে তোলার বিশেষ এক মানসতারই বিকট ভাষাসাংস্কৃতিক প্রকাশ, বিশেষ এক শ্রেণির বাঙালি লেখকরা ঘটিয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত, তাঁদের যাবতীয় লেখালেখিতে এবং বলা বাহুল্য, এটা তাঁরা করছেন একদার প্রভু ইংরেজদের মাতৃভাষা ইংরেজিকে বাংলাভাষার ভেতরে গলিয়ে (পদার্থ বিজ্ঞানীরা বলেন ফিউশন) দেওয়ার ব্যভিচারে প্রমত্ত হয়ে। ইতোমধ্যেই যথেষ্ট যুক্তি-প্রমাণ মিলেছে যে, ভাষাবিচ্ছিন্নতারূপ ব্যাধিতে অক্রান্ত হয়ে বিভাষা-স্বভাষার মিশ্রণে চমৎকার ভাষিক জগাখিচুড়ি তৈরি করে মাতৃভাষার পবিত্রতা হরণের কর্মনিপুণতা প্রদর্শনে এই বিশেষ শ্রেণির বাঙালি বাবুরা ভীষণ কর্মপটু ও করিতকর্মা। এ দেশের একজন মন্ত্রী যখন ‘উই লুকিং ফর শত্রুজ’ বলে জাতিকে বিজাতীয় ভাষায় আশ্বস্ত করতে চান, তখন বাঙালির ইংরেজিয়ানার পটুত্বের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শিত হয়, তা শ্রবণ করে পারলৌকিক জগতের অধিবাসী স্বয়ং শেক্সপিয়রেরও নিশ্চিন্ত চক্ষু চড়কগাছ হয়ে পড়ে। সাংস্কৃতিক জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এতাদৃশ বিচ্ছিন্নতারূপ ব্যাধিতে সহজ সংক্রমণপ্রবণতা এই সব বাঙালি বাবুদের মজ্জাগত ব্যাধির আধি (বিপদ)। ঔপনিবেশিকতার উৎপাদ এই সব ইংরেজি জানলেওয়ালা ও স্বীয় ইংরেজিনবিসির কারণে যৎপরোনাস্তি দাম্ভিক বাবুবৃন্দ সদাসর্বদা ভুলে থাকতে ভালোবাসেন যে, বাঙালির একটি ভাষা আন্দোলনের ও একটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের উত্তরাধিকার আছে। কিন্তু বিশেষ শ্রেণির এই বাঙালি বাবুরা সবকীছু ভুলে যেতে পারেন কিন্তু ‘ঔপনিবেশিক কালের দাসত্বের গৌরব’কে কীছুতেই ভুলে যেতে পারেন না। বাঙালি কোনও অকৃতজ্ঞ জাতি নয়, পৃথিবীকে এই প্রমাণ দিতেই জাতির পক্ষ থেকে ইংরেজিপ্রীতিসহ পাকিস্তানপ্রীতি প্রদর্শনার্থে তাঁরা যেনো পবিত্র দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েছেন। অথচ এই ইংরেজিপ্রীতি প্রদর্শন কারও পক্ষ থেকে তাদের প্রতি কোনও প্রদত্ত দায়িত্ব নয়, এটি প্রকৃতপ্রস্তাবে বিশেষ এক শ্রেণির বাঙালির রক্তে রাজাকারজীবিতার রক্তদোষ সংমিশ্রণজনিত এক প্রকার ঔপনিবেশিক দাসত্বের সাংস্কৃতিক রূপায়ণ বা স্বপ্রণোদিত স্বভাবসুলভ বশংবদতা কিংবা একটু ভিন্নভাবে বললে বলতে হয়, শ্রেণিস্বার্থে অনুপ্রাণিত হয়ে জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। বিভিন্ন ঐতিহাসিক কালপর্বে এই শ্রেণির মুষ্ঠিমেয় বাঙালি ঔপনিবেশিকতার পক্ষে তাঁদের ইতিহাস-নির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে এতটুকুও কার্পণ্য করেন নি। রাজা রামমোহন রায় থেকে শুরু করে, দ্বারকানাথ ঠাকুর, খানবাহাদুর আবদুল লতিফ, ইসমাইল হোসেন সিরাজী, ফজলুর রহমান, সৈয়দ আলী আহসান, খাজা শাহাবুদ্দিন, মোনায়েম খান, ফজলুল কাদের চৌধুরী, ফররুখ আহমদ, মেজর জিয়াউর রহমান, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, গোলাম আজম, খন্দকার মোস্তাক আহমদ প্রমুখ প্রত্যেকেই তাঁদের নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন, তাঁদের স্বকীয় শ্রেণিগত বলয়ের স্বস্ব রাজনীতিক-সাংস্কৃতিক অবস্থান থেকে। রাজা রামমোহন রায়কে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তাঁরই উত্তরসূরি বুদ্ধিজীবীদের ব্যতিক্রমী কেউ কেউ। রসিক আবদুশ শাকুর সাহিত্যরসসর্জনের ফাঁকে এই সত্যটির উন্মোচন করতে কসুর করেন নি। তাঁর রচনা থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বৈঠকী আলাপচারিতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করছি, “[…] ‘প্রথমত, শব্দটা রাজাকার নয়, রেজাকার। দ্বিতীয়ত, শব্দটার অর্থের মধ্যেই মহত্ব নিহিত রয়েছেÑ অর্থ হল দেশ ও জাতির স্বেচ্ছাসেবক।’
‘কিন্তু এদেশে রাজাকার কথাটি তো গালিÑ ’
‘গালি এজন্যে যে ক্যাডারটি আক্রান্ত বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবক না-হয়ে হানাদার পাকিস্তানের স্বেচ্ছাসেবক হয়েছিল।’
‘রামমোহন কি তাই হয়েছিলেন?’
‘হুবহু তাই। তিনি পরাধীন ভারতবর্ষের স্বেচ্ছাসেবক না-হয়ে ইংরেজদের স্বেচ্ছাসেবক হয়েছিলেন।’ […]”(১০) বৈঠকী আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে রামমোহনকে রাজাকার প্রতিপন্ন করার পক্ষে সম্যক বিশ্লেষণ সমুপস্থিত করা হয়েছে। আলাপচারিতাটি এরকম, “[…] ‘রামমোহন সবচেয়ে খতরনাক উপনিবেশের সবচেয়ে খতরনাক পর্বের অনুকূল পরিবেশ সৃজনে অবদান রেখেছিলেন, যে রেডিমেড কাঠামে মেকলে এসে কেবল ‘আদর্শগত রক্তমাংস’ ঠেসেছিলেনÑ’
‘ডবল খতরনাক?’
শেগুফ্তার সাগ্রহ প্রশ্ন।
‘হা ডবল। প্রথমটা সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ, যেটা সামরিক এবং আর্থনীতিক সাম্রাজ্যবাদের চেয়ে বেশি খতরনাক উপনিবেশ। দ্বিতীয়টা আংলিজম তথা প্রাচ্যবাদÑ যেটা ক্রেডেনশ্যালিজম অর্থাৎ শংসাবাদ এবং ওরিয়েন্টালিজম অর্থাৎ প্রাচ্যবাদের চেয়ে বেশি খতরনাক পর্ব, কলোনাইজেশন গেমের।’ […]”(১১) শাকুর রামমোহনকে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম রাজাকারের মর্যাদায় আসীন করেছেন। তাঁর এই বিবেচনাকে শিরোধার্য করে নিলে তৎকালের ঐতিহাসিক বাস্তবতার নিরিখে রামমোহনের পরেও অনেক প্রথিতজনের নাম অনায়াসে রাজাকারের তালিকান্তর্গত হতে পারে, যাঁরা ঐতিহাসিক প্রমাণ সাপেক্ষে সে শিরোপার দাবিদার। বিশেষ করে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ও উনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বাংলার একশ্রেণির সম্পদলোভী ভারতীয় ইংরেজদের সঙ্গে মিত্রতাসূত্রে আবদ্ধ হয়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গোমস্তাগিরি ও ব্রিটিশ এজেন্সি কোম্পানির দালালি বাগিয়ে বিপুল বিত্তভৈববের অধিকারী হয়ে উঠে শেষ পর্যন্ত জমিদার কিংবা পুঁজিপতিতে অর্থাৎ প্রকারান্তরে ব্রিটিশদের দ্বারা ভারতবর্ষকে শাসনের ও শোষণের সহায়ক শ্রেণিশক্তিরূপে কিংবা বলা যায়, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশশক্তির রাজাকাররূপে (বাংলা ‘সেচ্ছাসেবক’ শব্দের ফারসি প্রতিশব্দ ‘রাজাকার’, ১৯৭১-এর যুদ্ধকালে বাংলাভাষায় অপকৃষ্টার্থে প্রবসিত) আবির্ভূত হন। এঁদের মধ্যে প্রখ্যাত ছিলেন রামদুলাল দে, আশুতোষ দে, প্রমথনাথ দে প্রমুখ। ইংরেজদের সঙ্গে মিলে এমনকি মতিলাল শীল, রুস্তমজি কাওয়াসজি ও দ্বারকানাথ ঠাকুর যৌথ মালিকানায় এজেন্সি কোম্পানির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এঁরা কারা ছিলেন এবং এঁদের স্বরূপটা, অর্থাৎ এইসব ব্যক্তির ব্যক্তিগত আনুগত্য দেশের প্রতি কিংবা দেশের মানুষের প্রতি নয়, বিদেশী ঔপনিবেশিক শাসক-শোষক ঔপনিবেশিক তস্করদের প্রতি সম্পূর্ণ ন্যস্ত ছিল অর্থাৎ এঁদের কোনও দেশপ্রেম বলে কীছু ছিল না।
রাজাকারের দেশদ্রোহিতা ও ঔপনিবেশিকতার প্রতি নির্দ্বিধ মিত্রতার একটা উদাহরণ দেওয়া যাক ঔপন্যাসিক শহীদুল জহিরের উপন্যাস থেকে। তখন (১৯৭১) যুদ্ধ শুরুর ‘তিন মাস নয় দিন পর’ বদু মওলানার সাক্ষাৎ হয়েছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাপ্টেন ইমরানের সঙ্গে। এই দু’জনের একজন পাকিস্তানের পূর্বাংশ অর্থাৎ পূর্বপাকিস্তান নামক উপনিবেশের এক মওলানা, অন্যজন পাকিস্তানের পশ্চিমাংশ পশ্চিম পাকিস্তান নামক ঔপনিবেশিক শক্তির সামরিক আততায়ী। অথচ কী এক কুদরতে একে অন্যকে মিত্র বলে চিনে ফেলতে এক লহমাও বিলম্ব ঘটে না, কোনও ভুল হয় না এবং কিশোর আলাউদ্দিনের লাশ ‘বাড়ির সমানে রাস্তায় চিৎ হয়ে আছড়ে পড়ে’। (চলবে)

  • [১]