- সুনামগঞ্জের খবর » আঁধারচেরা আলোর ঝলক - https://archive.sunamganjerkhobor.com -

ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা

(পূর্ব প্রকাশের পর)
একরকম নয়, নিরন্তর বদলে গিয়ে /অ/, /আ/, /অ্যা/, /এ/, /্যা/ হয়ে যাচ্ছে। /প/’র উচ্চারণ সবসময় /ক/ আছে। কিন্তু /ফ/’র উচ্চারণ ক্ষেত্র বিশেষে /দ/ কিংবা /ড/ হয়ে যাচ্ছে। /ব/’র উচ্চারণ /ই/ কিংবা /এ/ হয়ে যাচ্ছে। /ু/’র উচ্চারণ /ই/ কিংবা /ঈ/ হয়ে যাচ্ছে। ইংরেজি ধপধফবসু শব্দটির বাংলা প্রতিবর্ণীবয়ন অনিবার্যভাবে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে বহুরূপী হয়ে উঠছে, বানানসমতা আদপেই সম্ভব হচ্ছে না। এরকম বহুল প্রচলিত একটি আরবি শব্দ ‘মুহাম্মদ’। এই শব্দটির বাংলা বানানবৈভিন্ন্য অপরিসীম।
সার্বিক বিবেচনায়, এতক্ষণ বর্ণিত বানানবৃত্তান্তের তাৎপর্য এই দাঁড়ায় যে, অধুনা প্রতিষ্ঠিত অতৎসম শব্দের বানানে /ঈ/ এবং / ী/-কার বর্জনের নীতিনির্ধারক বানানবিধির সূত্রপাতের প্রমাণ বিধৃত আছে সংশ্লিষ্ট দৃষ্টান্তবাক্যটিতে, যদিও একই বাক্যে ‘একাডেমি’-’র পাশেই (ব্যবধান দুই শব্দের) ‘পারী’ শব্দটি বিধিসম্মতভাবে ‘পারি’ হতে পারতো। ‘পারী’-কে ‘পারি’ না করার পশ্চাতে বিদ্যাসাগরের একটি যুক্তি হয় তো ছিল এই যে, ‘পারি’ লিখলে শব্দটি একটি বাংলা ক্রিয়াশব্দ হয়ে যায়, বিদেশি শব্দ থাকে না। বাংলা একাডেমিকৃত ‘বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান’টি একটি বিশেষ লক্ষ্যাভিমুখী বা বিবর্তনমূলক অর্থাৎ সশব্দপুরাবৃত্তের আকর বিশেষ বিধায় বৈকল্পিক বানানের ব্যাপক মঙ্গলজনক সন্নিবেশন এ অভিধানে অপরিহার্য, যা বাংলা ভাষায় অভূতপূর্ব।
একাডেমি শব্দটির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে অন্তত একটি বিষয়ে পূর্ণনিশ্চয়তার উদ্ভব ঘটে। বিষয়টি এই যে, অতৎসম (বিদেশি বা বহিরাগত ও তদ্ভব) শব্দের বানানে দীর্ঘ ও হ্রস্ব স্বর বা কারের (/ /ি, / ী/, / ু /, / ূ /) ব্যবহার সম্পর্কিত অথবা বিকল্পবানান বিশিষ্ট অন্য যে-কোনও একটি শব্দের বানান নির্দিষ্টকরণকল্পে সর্বসম্মত বৈয়াকরণসূত্র প্রণয়ন করা, দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও, বাংলাভাষীদের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে নি। বিদ্যাসাগর যেটা ১৮৬৩-তে করতে পেরেছিলেন, বাংলা একাডেমির পক্ষে সত্যিকার অর্থে সেটা করে উঠতে অর্থাৎ ধপধফবসু’র প্রতিবর্ণীকৃত বানানে /ঈ/ স্থানে /ই/ প্রয়োগ করে আধুনিক হয়ে উঠতে এতোটাকাল লেগে গেলো, ১৮৬৩ থেকে ২০১৩ খ্রি., অর্থাৎ একেবারে পুরোপুরি সার্ধশতাব্দ।
১৯৩৬ সালে বাংলাভাষার বানান সংস্কার শুরু হয়েছিল, এখন ২০১৪ সাল চলছে, মাঝখানে দু’বছর কম আট দশকের বিশাল সময়সমুদ্র। পরিবর্তনের দিকে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও আমরা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সহজে-স্বচ্ছন্দে পথ মাপি নি। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে (আসলেই কি অজ্ঞাত ? না কি কারণটা শাসন-শোষণের আদি-অকৃত্রিম ব্যবস্থাটাকে প্রতিষ্ঠিত রাখার ফন্দি ?) কচ্ছপগতিসম্পন্ন এমন দেশে /এ/ থেকে /অ্যা/ কিংবা /আ/ অথবা /ড/ থেকে /দ/ পর্যন্ত যেতে অর্থাৎ সরকারি অনুমোদন (পড়–ন আমলাতান্ত্রিক আমড়াগাছি অথবা আঁতলামো অথবা আমলামি) সাপেক্ষে অপেক্ষাকৃত আধুনিক বানান ‘অ্যাকাডেমি’ বা ‘আকাদেমি’-র দ্বারপ্রান্তে পদার্পণ করতে মনে হয় আরও আশি বছর বা পুরো এক শতাব্দ লেগে যাবে। আর এ রকম যদি চলতেই থাকে, স্থবিরতা (পড়–ন ভীষণ ভীমরতিগ্রস্ত আমলাতান্ত্রিক আলসেমি বা আমলামি) নিরাকরণের লক্ষণ আপাতত দৃষ্টিসীমার বাইরে আছে, তেকারণে দেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন তথা প্রগতিশীল একটি সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হতে আরও হাজার বছর লেগে যাবে বলে মাঝে মাঝে মনের কোণে শঙ্কা জাগ্রত হয়। যদিও মনে মনে জানি, নির্যাতন এতোটা দীর্ঘ হতে পারে না। মানুষ বিশ্বব্যাপী দানবিকতার বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াবেই। বাংলা একাডেমি যেমন /ী/ থেকে //ি-য়ে উত্তীর্ণ হয়েছে।
সে অনেক পুরনো কথা, ‘ধর তক্তা মার পেরেক’-এর তড়িৎরঙ্গ বঙ্গভূমিতে রমণীরমণভিন্ন অন্যতে নৈবচ। তেকারণে অতিসত্তর শোষণহীন সমাজব্যবস্থার স্বপ্নে বিভোর বামপন্থীদের সাম্প্রতিক পরিকল্পনা অদূর ভবিষ্যতে বাস্তবায়ন এখানে আকাশকুসুুম বলেই আবারও প্রতিপন্ন হবে বলে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সংবিধান করে দিয়েছিলেন ১৯৭২-য়ে। সে-সংবিধানে সমাজতন্ত্রের নীতি বিধৃত ছিল। অথচ এখানে ১৯৭৫-য়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে পর্যায়ক্রমে বাজার অর্থনীতির সোপান তৈরি করেছে কায়েমি স্বার্থান্বেষীরা। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সমাজতন্ত্রের সে-স্বপ্নকল্পনার রূপকল্পটিকে সংবিধানে আবার ফিরিয়ে এনেছেন, কিন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতির অভিমুখ তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সমাজতন্ত্রের দিকে ফিরিয়ে দিতে পারছেন না। পদে পদে প্রতিপন্ন হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষকে সে স্বপ্নের বাস্তবায়নের অভিপ্রায়ে অপেক্ষার তিক্ত স্বাদ চাকতে হবে। অতীব আশাবাদী আহমদ শরীফের মতো স্থবির বসে থাকতে হবে অনন্তকাল না হোক, অন্তত একটি অনির্দিষ্টকালের বাহুবন্দি হয়ে, যে-কালখ-ের পরিমাপ কারও জানা নেই। তিনি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ বিদগ্ধ ভাষাবিন্যাসে একটি অবশ্যম্ভাবী কথা বলেছেন, “রাজনীতি সম্পৃক্ত সাম্প্রদায়িকতা ও দাঙ্গা-হাঙ্গামা-হত্যাও একটা আধি-ব্যাধি মাত্র। এ যুগে সব আধি-ব্যাধির প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হচ্ছে, ঔষধ মিলছে, এর প্রতিষেধক উদ্ভাবিত হবেই। কারণ মানুষের ব্যবহারিক জীবনের মতোই মানস উৎকর্ষও ঘটছে। […] মানুষ সহ ও সমস্বার্থে, সংযমে, সহিষ্ণুতায়, সহযোগিতায়, সৌজন্যে, সহাবস্থানে দায়বদ্ধ হবেÑ এ আশায়, আশ্বাসে ও প্রত্যাশায় থাকবে ও বাঁচবে মানুষ।”(৩) বাঙালি শরীফের এই স্বদেশ-স্বজাতিসহ বিশ্বকল্যাণবিলাসী সুস্বপ্নটা অনেকটা ম্যাক্সিম গোর্কিমার্কা এক রুশভাষী সমাজতন্ত্রী সাহিত্যিকের আশাবাদ প্রকাশের প্রায় অবিকল নকল অথবা টুক্লিফায়িং না হলেও প্রকারান্তরে সমবুলির রকমফের বা বাকবিস্তার বটে, সত্তর বছরের মাথায় সমাজতন্ত্রের মোড়কে লেনিনপ্রতিষ্ঠিত যে স্বপ্নদর্শনের বাস্তবতার অপমৃত্যু প্রত্যক্ষ করেছে বিশ্ববাসী। কোথায় যেনো পড়ে ছিলাম আর খাতার পাতায় যতœ করে টুকেও রেখেছিলাম, কখনও কখনও প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে উদ্ধৃতও করেছি, লেখক বলেছিলেন, “মানুষ তখন বাঁচবে সত্য ও স্বাধীনতার মাঝে সুন্দরের জন্য, যারা পৃথিবীকে আরও গভীরভাবে ভালোবাসবে, আরও গভীরভাবে আলিঙ্গন করবে তারাই শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হবে।”
বাংলা একাডেমি ইতোমধ্যে বিবর্তনমূলক বাংলা ভাষার অভিধান ও প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ উপহার দিয়েছে। তারপরও আশঙ্কা থেকে যায়, কোনও ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতায় নিমগ্ন কেউ একজনÑ তিনি হয় তো কোনও স্বনামধন্য সাংবাদিক, যার বাংলাভাষার সঙ্গে রাতবিরেতে নিত্যদিনের উঠাবসাÑ অন্য একজনকে মুঠোফোনে বলবেন, ‘দাস পার্টির পার্টি বানানে হ্রস্বইকার হবে না দীর্ঘ ইকার হবে ?’ বাঙালির ভাষাংসাস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা এমনই, ধর্তব্যে অযোগ্য কিন্তু অসংখ্য ছোট ছোট ভুলের যোগফল বৃহৎ মন্দার পর্বত মস্তকে নিয়ে হনুমানের মতো পথ চলছে তো চলছেই। সেটা হোক ব্যাকরণ কিংবা অর্থনীতির ভুলের পাহাড়। কুচ পরোয়া নেই, প্রয়োজনে আর একটা একাত্তরের যুদ্ধ লড়তে তারা পিছ পা হবে না, এটাও একটি ধ্রুব সত্য।
তথ্যসূত্র :
১. …, বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (সম্পাদনা : ড. মুহম্মদ এনামুল হক, শিবপ্রসন্ন লাহিড়ী ও স্বরোচিষ সরকার), বাংলা একাডেমী ঢাকা, ষোড়শ পুনর্মুদ্রণ : নভেম্বর ২০১২, পৃষ্ঠা : ১২২০।
২. কাজী দীন মোহাম্মদ, গোলকচন্দ্রের আত্মকথা, ওস্মানিয়া বুক ডিপো ঢাকা, দ্বিতীয় সংস্করণ : অগ্রহায়ণ ১৩৬৩ (নভেম্বর ১৯৫৬), পৃষ্ঠা : (৪১Ñ৪২)।
৩. আহমদ শরীফ, প্রগতির বাধা ও পন্থা, সন্দেশ, বইমেলা ১৯৯৪, পৃষ্ঠা : ১৩।
১০. ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার সংস্কৃতি ও আবুল ফজলের পিতামহোদয়
আশরাফসুলভ দাম্ভিকতা বাঙালি মুসলমানদের এখনও, এই একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক পেরুবার পরও, তাড়িত করে বেড়াচ্ছে অহরহ। একদা এই দাম্ভিকতা কারও কারও মধ্যে ছিলো ষোল আনার উপরে আঠারো আনা, তারা দেশটাকেই বদলে দিতে চেয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের আদলে। সেজন্যে অন্যান্য আর্থসামাজিক আক্রমণের সঙ্গে সবচয়ে জঘন্যতম আক্রমণ শানিত হয়েছে বাঙালির ভাষাকে তাক করে, যার মূল দুরভিসন্ধি ছিল ভাষাকে হত্যা করে বাঙালি জাতিসত্তার মৃত্যু নিশ্চিত করা। তারা জানতো, ভাষাহীন জাতিকে সহজে বশ করা যায়, দাস বানানো যায়। কিন্তু স্বাধীনচেতা বাঙালিকে কখনও দাস বানানো যায় নি, ইতিহাস তার সাক্ষী। এই স্বাধীনচেতা বাঙালি স্বৈরতান্ত্রিক ঔপনিবেশিকতাবিরোধী গণআন্দোলনের (১৯৪৮Ñ১৯৭১) বৃহৎ পরিসরে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন (১৯৫২), গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৮-১৯৬৯০), মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) করেছে, সৃষ্টি করেছে চর্যাপদ থেকে শুরু করে এই হাল আমলের শহীদুল জহির পর্যন্ত কালজয়ী সাহিত্যসম্ভার। এই নাদান ইকবাল কাগজীও সেই সাহিত্যসম্ভারের একজন নগণ্য শরিক।
কথার শুরু কিংবা প্রসঙ্গ ছিল আশরাফি দাম্ভিকতা। খতরনাক এই দাম্ভিকতার বশবর্তী হয়ে বাঙালিমুসলমান একদিকে মধ্যপ্রাচ্য সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে ধর্মকে করে তুলেছে জাগতিক স্বার্থোদ্ধারের রাজনীতিক হাতিয়ার এবং দেশের মানুষকে করে তুলতে চেয়েছে অদৃষ্টবাদী। বাংলাদেশের সার্বিক আর্থসামাজিক বিন্যাসের অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা করে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে এসে একজন চিন্তক বলেছেন, “এ অবস্থায় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন শক্তিশালী প্রচার মাধ্যম কায়মি স্বার্থের তাগিদে জনসাধারণকে অদৃষ্টবাদী করে তোলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশের ভেতরকার কায়েমি স্বার্থবাদীরা আর বাইরের আধিপত্যবাদীরা জনসাধারণকে শোষণ করার উদ্দেশ্যে হাতে হাত মিলিয়ে একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করছে। কায়েমি স্বার্থবাদীরা জনসাধারণের ন্যায়স্বার্থকে পদদলিত করে নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ধর্মের জঘন্যতম অপব্যবহার ঘটিয়ে চলেছে। রাজনীতিতে ধর্মের এই অপব্যবহারের প্রক্রিয়ায় একদিকে সক্রিয় আছে কায়েমি স্বার্থবাদী ধর্মব্যবসায়ীরা এবং অপরদিকে আছে প্রগতির মুখোশধারী হীন-স্বার্থান্বেষী উস্কানিদাতারা। হীন উদ্দেশ্যে ধর্মের রাজনীতিক ব্যবহারের যে রূপ আমরা দেখেছি, তাতে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, ‘এক হাতে তালি বাজে না’।”(১)
অখ- ভারতের তৎকালীন বাংলাদেশে আশরাফসুলভ দাম্ভিকতা সম্পন্ন মানুষ বাঙালি মুসলমান সমাজে দুর্লভ ও দুর্লক্ষ্য কীছু ছিল না বরং নিতান্ত স্বাভাবিক ছিল। ঔপন্যাসিক আবুল ফজল সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক লেখায় একজন মাতৃভাষাদ্বেষী বাংলাভাষী অর্থাৎ বিভাষাপ্রেমী বাঙালি মুসলমানের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে, যার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটি ছিল আশরাফসুলভ দাম্ভিকতার তাপতেজে কানায় কানায় পূর্ণ। তিনি স্বয়ং আবুল ফজলের পিতামহোদয়। যদিও তিনি মার্কসবাদী তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর কথিত ‘উচ্চশ্রেণীর মুসলমান’(২) ও ইতিহাসসন্ধিৎসু অমলেন্দু দে কথিত ‘আশরাফ’ (শরিফ অথবা সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশ্রেণির মুসলমান) ছিলেন অথবা যথার্থ অর্থে ছিলেন না, তা নিয়ে যৎকিঞ্চিৎ আলোচনা-সমালোচনা হতেই পারে। কারণ অমলেন্দু দের ভাষ্যানুসারে আশরাফদের পরে মুসলিম সমাজে মুসলমানদের বৃহৎ অবশিষ্টাংশ ‘আজলাফ’ (আতরাফ অথবা নি¤œশ্রেণির মুসলমান), ‘আরজাল’ (অবনমিত শ্রেণির মুসলমান) এই দু’টি অধস্তন শ্রণিতে বিভক্ত ছিলেন। তিনি বলে, “ইসলামী তত্ত্বে জাতিভেদ বা বর্ণষৈম্য না থাকলেও কার্যতঃ জাতিভেদ দেখা দেয়। সামাজিক জীবনে মুসলমানরা তিনটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েন, যথাÑ …”(৩) এবং তৎপর এই তিন শ্রেণির মুসলমানেদের যৎকিঞ্চিৎ বয়ার্ণনা উপস্থিত করেন। সার্বিক অবস্থা, বিশেষ করে নি¤œশ্রেণির আর্থনীতিক সমৃদ্ধিসঞ্জত উচ্চশ্রেণিতে অরোহণের প্রবণতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে, পর্যালোচনা করলে এই সর্বজনবিদিত সত্য উৎঘাটিত হয় যে, স্বঘোষিত আশরাফদের উপস্থিতি বাংলাদেশে যত্রতত্র বিস্তর পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ “নি¤œশ্রেণির মুসলমানেরা তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের নামের সঙ্গে বড় বড় পদবী সংযোজন করেন”(৪) এবং সমাজে যথারীতি নি¤œশ্রেণি থেকে “উচ্চ শ্রেণিতে উঠার প্রবণতা”র(৫) ধারা মজায়মান থাকে। তাঁরা সৈয়দ ও শেখ থেকে শুরু করে আফগান, পাঠান, তুর্কি, খোরাসানি, বুখারি, বলখি ইত্যাদি অনেক কীছুই হয়েছেন কিংবা হতে চেয়েছেন এবং এখনও সে-প্রয়াস সমাজস্তরবিশেষের গভীরে ভিন্ন ভাব-প্রকরণ-প্রকৃতিতে ফল্গুধারাসন্নিভ অব্যাহত আছে। তাছাড়া আর্থসামাজিক বিন্যাসের পরিসরসঞ্জাত বুনিয়াদি দৈত্য চৌধুরী তালুকদাররা তো আছেনই। সমগ্র বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জের মাঠে-ময়দানে তাঁদের কোনও অভাব নেই।
আবুল ফজলের পিতা যদি স্বঘোষিত আশরাফ হন তবে তিনি ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতায় নিমজ্জনের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। আর যদি তিনি স্বয়ং মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রবসিতজন বা অভিবাসী (সিলেটি আঞ্চলিক ভাষায় সাধারণত যাকে ‘আবাদি’ বলে অভিহিত করা হয়) হন তবে তিনি তাঁর মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি অনুরক্ত নন এই অবিহিত দোষে অবশ্যই দুষ্ট হতে পারেন না, কারণ বাঙলাদেশ তাঁর মাতৃভূমি নয় উপনিবেশ এবং বাংলাভাষা তাঁর মাতৃভাষা নয় বিভাষা। কিন্তু তিনি যদি মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশে কোনও এক প্রবসিতজনের বংশোদ্ভূত উত্তরসূরি হন তবে তিনি অবশ্যই বাঙালি, বাংলাদেশ তাঁর মাতৃদেশ, বাংলাভাষা তাঁর মাতৃভাষা এবং বাংলাভাষা পরিহার করে যে-কোনও পরদেশি ভাষাকে তাঁরদ্বারা মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করার অবিমৃষ্যকর সংস্কৃতিটি অবশ্যই ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা (ধষরবহধঃরড়হ) বলেই বিবেচিত হবে।
ভারতীয় হিন্দুদের উচ্চবর্ণ থেকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী মুসলমানকেও আশরাফ বা উচ্চশ্রেণীর বলে গণ্য করা হয় কিন্তু বর্তমান প্রসঙ্গের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আশরাফরা ভারতীয় কেউ নন, তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের বা মধ্যপ্রাচ্যবংশোদ্ভূত মানুষ। ভারতীয় উপমহাদেশে তথা বাংলাদেশে এক প্রকার প্রতারক আশরাফ শ্রেণি/সম্প্রদায়ের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, যাঁরা বংশগতভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত নন, কিন্তু তাঁরা নিজেদেরকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত অথবা তাঁদের বংশধর বলে সর্বাবস্থায় জাহির করেন এবং মধ্যপ্রাচ্যীয় পরিচয়ে সমাজে প্রতিষ্ঠা অর্জনে ব্রতী হতে সদাসর্বদা নিরতিশয় সচেষ্ট থাকেন। তাঁরা এমন একটা মুসলিম সংস্কৃতির প্রতিনিধি ও প্রবল প্রবক্তা, যে-সংস্কৃতির সঙ্গে একমাত্র ধর্ম ব্যতীত বঙ্গসংস্কৃতির বিশাল ব্যবধান ও বৈপরীত্য আছে কিন্তু অন্য কোনও যোগ বা সামঞ্জস্য নেই। এই উচ্চশ্রেণির মুসলমান প্রকৃতিগতভাবে অধ্যাসাক্রান্ত। তাঁরা তাঁদের জাতিসত্তার প্রশ্নে এমন একটা অযৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিকে অঙ্গীকার করে বসে আছেন যেটিকে কাকের ময়ূরপুচ্ছ ধারণের মতো পরকীয় সংস্কৃতিগ্রাহী মানসতা ভিন্ন অন্য মহৎ কীছু বলে ধারণা করা যায় না। মাটির সঙ্গে সম্পর্কহীন অন্তঃসারশূন্যতায় অন্তর্লীন হয়ে থাকা এক শ্রেণির মুসলমানদের এই আত্মম্ভরিতাকে বিবৃত করতে গিয়ে বদরুদ্দীন উমর বলেছেন, “[…] বাংলাদেশে এবং সারা ভারতবর্ষে কোন মুসলমান পরিবার যখনই নিম্ন অবস্থা উর্ত্তীর্ণ হয়ে অর্থ-সামর্থ্য ও প্রতিপত্তি অর্জন করেন তখনই তাদের মধ্যে দেখা দেয় নিজেদেরকে বিদেশাগত আরবী, ইরানী, তুর্কী পূর্বপুরুষদের বংশধর বলে প্রচার করার প্রবণতা। এ দেশের উচ্চশ্রেণীর মুসলমানরা যে এ দেশের মাটির মানুষ নয়, এ কথা যেন মুসলমানদের অন্তরে ভালভাবে প্রোথিত হয়ে আছে। কাজেই কোন মুসলমান পরিবার যখনই নিম্ন অবস্থা থেকে আর্থিক এবং সামাজিক উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে থাকেন তখনই এ দেশের মাটির সঙ্গে নিজেদের পরিচয়কে ছিন্ন করে তারা নিজেদেরকে ঘোষণা করেন আরবী, ইরানী, তুর্কী, বাল্খী এবং বাদাখ্শানী পূর্বপরুষদের বংশধর বলে।”(৬) এঁরা নিজেকে সেই সব মুসলমানদের বংশধর বলে চি‎ি‎হ্নত করতে চান, যাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এ দেশে প্রবসিত। বিশেষ করে আরব-ইরাক-ইরান-তুরস্ক থেকে ভাগ্যান্বেষণে, সোজা কথায় পেটের দায়ে, ভারতবর্ষে এসেছিলেন, তৎপর থিতু হয়ে পড়েছেন এবং এঁরা স্বশ্রেণিচারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে একধরণের ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার প্রাপঞ্চিক কল্পবৃত্তে আবদ্ধ থেকে নিজেদেরকে এ দেশের সাধারণ মানুষের তুলনায় মানে-গুণে-মর্যাদায় পৃথক প্রতিপন্ন করার অভিপ্রায়ে ভীষণ অবিমৃষ্যকরভাবে অভ্যস্ত। তথাকথিত এই আশরাফ বা উচ্চশ্রেণীর প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রতারক সংস্কৃতি বিশেষের উদ্ভবের পেছনে নিঃসন্দেহে ধর্ম কোনও অনুঘটক নয়, প্রকৃত অনুঘটক আর্থনীতিক স্বার্থচেতনা, অর্থাৎ ধর্মকে সম্পদ ও ক্ষমতা লাভের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র। অন্তত বদরুদ্দীন উমরের পরিবেশিত আশরাফ সংস্কৃতির ঔপপত্তিক বিবরণ নির্দেশ করে যে, বাঙালি মুসলমান সমাজে আশরাফ সম্প্রদায়ের উদ্ভবের মূল কারণ ‘নিম্ন অবস্থা উর্ত্তীর্ণ হয়ে অর্থ-সামর্থ্য ও প্রতিপত্তি অর্জন’ অর্থাৎ সন্দেহাতীতভাবে আর্থনীতিক, ধর্মপ্রীতির ভূমিকা মাত্র হাতিয়ারের।
ভারতবর্ষে মুসলিম আধিপত্যের উদয় থেকে শুরু করে অস্ত পর্যন্ত এই প্রবসিতরা আমির, ওমরাহ, উচ্চপদে আসীন ফৌজি কর্মকর্তা ইত্যাদি পদে কর্মরত থাকার সুবাদে উচ্চশ্রেণির মুসলমান সম্প্রদায় হিসেবে নিজেদেরকে ভারতীয় সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেন। এখানকার তথা বাংলাদেশের উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেরা এই প্রবসিত মধ্যপ্রাচ্য সংস্কৃতিকে গ্রহণ করে বাঙালিত্বকে বিসর্জন দিয়ে পরিণত হয়েছিলেন জনবিচ্ছিন্ন এক সংখ্যালঘু অথচ সমাজ-নিয়ন্ত্রক সম্প্রদায়ে। তাঁদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মধ্যপ্রাচ্যীয় কোনও না কোনও ভাষা আরবি-ফারসি অথবা খিচুড়িভাষা উর্দু। উদাহরণস্বরূপ আহমদ ছফার মন্তব্য উদ্ধৃত করা যায়। তিনি লিখেছেন, “দূর অতীতের কথা বলে লাভ নেই। ফরিদপুরের নবাব আবদুল লতিফও মুসলমান সমাজের শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে উর্দুভাষার সুপারিশ করেছিলেন। জনাব আবুল কাশেম ফজলুল হক যিনি ছিলেন বাংলার প্রথম আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ, তিনিও বাড়িতে উর্দুভাষায় কথা-বার্তা বলতেন।”(৭) সমাজনিয়ন্ত্রক সম্প্রদায় হিসেবে তাঁদের চূড়ান্ত শক্তিমত্তার ঐতিহাসিক বহিঃপ্রকাশ পরিলক্ষিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ কর্তৃক পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারূপে উর্দু যখন ঘোষিত হয় তখন। বিষয়টিকে একটু বিশদ ও স্পষ্ট করার অভিপ্রায়ে একেবারে অখ্যাত, যিনি কেউকেটা কেউ নন, একজন নিতান্ত সাধারণ বাঙালির একটি লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছি। তিনি এক পত্রে লিখেছেন, “তার (জিন্নাহর) এই ঘোষণা এ দেশের মানুষকে প্রথমে বিস্মিত এবং তারপরে ক্রোধান্বিত করে। কারণ হলো উর্দু কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম দুই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের ভাষা নয়। এটা মূলত হলো মোজাহির অর্থাৎ যারা ভারতের দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, বিহার এসব অঞ্চল থেকে পাকিস্তানে গিয়ে বসতি গড়েছেন তাদের ভাষা। তাদের সংখ্যা সমগ্র জনসংখ্যার ছয় শতাংশও নয়। পাকিস্তানের চারটি প্রদেশে পাঞ্জাবি, সিন্ধু, বেলুচি এবং পশতু ভাষা প্রচলিত। আর বাঙালিরা ছিল গোটা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার শতকরা ছাপ্পান্ন ভাগ। এই ৫৬ শতাংশ লোকের মধ্যে শতকরা ৯৯ শতাংশ লোকের মাতৃভাষাই ছিল বাংলা।”(৮) পাকিস্তানের ঘাড়ে উড়ে এসে জুড়ে (পড়–ন জোরে চড়ে কিংবা আরোঢ় হয়ে) বসা সিন্ধুবাদের ভূতের মতোন এই সংখ্যাল্প উর্দুভাষী ও তাঁদের অনুগামী স্থানীয় মুষ্টিমেয় লোক মিলে গঠিত একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, নিজেদের পারিবারিক বলয়ে ভাববিনিময়ের ভাষা বাংলার বদলে উর্দুকে বেছে নিয়েছিলেন, বাংলাভাষার কোনও স্থানই ছিল না তাঁদের জীবনের কোনও পর্যায়েই। উমর বলেছেন, “[…] উনিশ শতকে বাঙলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত এবং অবস্থাপন্ন মুসলমানেরা বাঙলাকে নিজেদের ভাষা বলে বিবেচনা করতেই প্রস্তুত ছিলেন না। তারা সাধ্যমত উর্দু ফারসীতে কথা বলতেন এবং বাঙলা ভাষা চর্চা থেকে বিরত থাকতেন।”(৯) সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখায় বাংলা ভাষাকে অবদমনের যে আভাস পাওয়া গেছে এবং ‘ধর্মের ও উর্দু ভাষার যে দেওয়াল রচনা করে বাঙালী জীবনের মূল প্রবাহ থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা মুসলমান নেতৃবৃন্দ করেন’ (১০) অমলেন্দু দে বিবৃত এই মূল্যায়নেও, সেই অবদমননীতি প্রয়োগেরই সমর্থন মেলে। বাংলা ভাষার উপর তৎকালের মুসলিম নেতৃবৃন্দের চাপিয়ে দেওয়া এই নীতি স্পষ্টত ইসলাম ধর্মের কোনও অনুশাসন থেকে উদ্ভূত হয় নি। কোরান-হাদিসের কোথাও এমন কোনও নীতি-অনুশাসনের উল্লেখ নেই। অন্য ভাষাকে ঘৃণা করা বা অন্য ভাষার উপর আগ্রাসন চালানোর বা অন্যভাষী কোনও জনগোষ্ঠীকে ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিতার শিকারে পরিণত করার অনুমোদনের ইঙ্গিতমাত্রও ইসলামি শাস্ত্র-বিধানের কোথাও লেখা আছে বলে মনে হয় না, তবে যদি থাকে, কেউ জানালে তা জানিয়ে দিন, লোকজন তাতে উপকৃত হবেন। কিন্তু ইসলামের নামে ভারতীয় উপমহাদেশের এক শ্রেণির মুসলমান বাংলাভাষাহননের পরিকল্পিত কার্যক্রম পর্যন্ত পরিচালনা করেছে। সেটা ছিল স্রেফ এক শ্রেণির উচ্চবিত্ত মুসলমানের শ্রেণিস্বার্থের রাজনীতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কর্মসূচি, ইসলাম প্রচার-প্রসারের কীছু নয়, বরং ইসলামের ভেকধারী এই বিশেষ সুবিধাবাদী শ্রেণিটি ধর্মের অধর্মসুলভ ব্যবহার করে ধর্মনীতিকে কলঙ্কিত করেছে। এদেরকেই ইসলামি শাস্ত্রানুসারে মোনাফেক বা ভ- বলা হয়। বদরুদ্দীন উমর বলেন, “কাজেই ধর্মের ভিত্তিতে সংস্কৃতিকে হিন্দু এবং মুসলিম সংস্কৃতিরূপে বিভক্ত করলেও তথাকথিত মুসলিম সংস্কৃতির সত্যিকার পরিচয় নিহিত আছে ইসলামের মধ্যে নয়, সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধের মধ্যে। অর্থাৎ মুসলিম সংস্কৃতি নামে পরিচিত সংস্কৃতিটির স্বরূপচরিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, তার মধ্যে ইসলামের প্রভাব খুবই ক্ষীণ ও দুর্বল এবং মুগল যুগের ক্ষয়িষ্ণু সামন্ততান্ত্রিক প্রভাবেরই জয়জয়কার।’’(১১) আগেই বলেছি এই পেটুকদাস শ্রেণিটি মূলত ইরাক-ইরান-তুর্কিস্তান থেকে ভাগ্যান্বেষণে, সোজা কথায় হালুয়ারুটির সন্ধানে, এসেছিল ভারতবর্ষে। তাঁরা বিশেষ করে মুগল আমলে রাজদরবারসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সামরিক বিভাগে কর্মকর্তা-কর্মচারি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েন। ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির বাংলা অধিকারের (১২০৫ খ্রি.) পর তাঁরা বঙ্গদেশের খ-াংশে এসে শাসনতান্ত্রিক পদগুলোতে নিজেদেরকে অধিষ্ঠিত করেন। আবুল ফজলের পিতা এসব অভারতীয় কারও উত্তরপুরুষ বা যাঁরা তৎকালে সমাজে নিজের বংশমর্যাদা বৃদ্ধি করতে বা আভিজাত্য ফলাতে বঙ্গভারতীয় পরিচয়কে মুছে দিয়ে নিজেকে আরব-ইরানি-তুর্কির উত্তরসূরি বলে পরিচয় দিতেন, তাঁদের একজন ছিলেন কি না জানি না। তবে সাংস্কৃতিক চরিত্রটা ছিল তাঁর ‘আভিজাত্য ফলাতে বঙ্গভারতীয় পরিচয়কে মুছে দিয়ে নিজেকে আরব-ইরানি-তুর্কির উত্তরসূরি’ প্রতিপন্ন করার সম্পূর্ণ অনুবর্তী।
আবুল ফজল তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘জীবন-পথের যাত্রী’ লেখেন ১৯৩৩ সালে। অর্থাৎ তিনি তখন পুরোদস্তুর একজন লেখক বনে গেছেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ইত্যকার বিষয়াদি সম্পর্কে লিখেছেন, “[…] বাল্যশিক্ষা শুরু হয় গ্রামের মক্তবে। সেখানে বাংলার চল ছিল না, ছিল আরবির। পরে চট্টগ্রামে এসে ভর্তি হন মাদ্রাসায়। সৌভাগ্য ভর্তি হবার বছর খানেক পরেই ঐ মাদ্রাসা বদলে রূপ নিল নিউ স্কিম মাদ্রাসায়। ‘রেখাচিত্রে’ তিনি লিখেছেন, “সাবেকী মাদ্রাসা শিক্ষায় আকস্মিক পরিবর্তন না ঘটলে ইংরেজি-বাংলার যে বাতায়নটুকু আমার মনের সামনে খুলছিল তা আদৌ খুলত কি না সন্দেহ। খুলা দূরে থাক, হয়ত ভালো করে বাংলা পড়ার সুযোগও জুটত না’’। পিতা উৎসাহী ছিলেন না এই নতুন শিক্ষায়। পরে যখন শুনলেন পুত্র লিখতে চান, পিতা তখন বলেছিলেন, উর্দুতে লিখবে, আরবী-ফারসীতে যদি নাই পারো। বলা বাহুল্য পিতৃনির্দেশ পালন করেন নি তিনি। […]’’(১২) এই সব বর্ণনা থেকে অবগত হওয়া যায় যে, বাংলাভাষা ব্রিটিশ আমলে সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসনিক ভাষা ইংরেজির ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের কবলে পড়েছিল, কিন্তু কেনিয়া যতোটা নির্মম ভাষাহননপ্রবণ আক্রমণ-আগ্রাসনের শিকারে পরিণত হয়, বাংলাভাষা ততোটা জিঘাংসু আক্রমণের শিকার হয়নি। কিন্তু সমাজ পরিসেরে বিদ্যমান সামাজিক বাস্তবতায় বাংলাভাষা প্রতিনিয়ত আক্রান্ত ছিল ও এখনও আক্রমণের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ নামক অনন্য বৈশিষ্ট্যের এক জাতিরাষ্ট্রের (যদিও অন্যান্য জাতিসত্তার নিতান্ত স্বল্পসংখ্যক নাগরিকের উপস্থিতির প্রসঙ্গ ভুলে যাওয়া সমীচীন হবে না) স্থপতিজাতি আমরা বাঙালিরা, ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার কালো থাবার নিচেই আছি এখনও, বেরিয়ে আসতে পারি নি।
যেহেতু আক্রমণ শানানোর ধরণটা এরকম যে, বাংলাকে পরিহার করে আরবি-ফারসি-উর্দুকে গ্রহণ কারার প্রবল চাপ প্রয়োগের প্রবণতা সমগ্র কর্মপরিকল্পনার দ্বারা সব সময় বলবৎ থাকে। অথচ এই চাপ প্রদানকারী ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বা শ্রেণির মাতৃভাষা প্রায় ক্ষেত্রে বাংলা। তাদের ধর্মীয় ভাষা আরবি হলেও তারা সাম্রাজ্যবাদী প্রশাসনিক ভাষা ফারসি (মুগল আমলে) এবং উর্দুকেও (পাকিস্তান আমলে) অযৌক্তিভাবে ধর্মীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবল প্রচেষ্টা সমগ্র সমাজপরিসরে জারি রাখে। এই কারণে ‘অযৌক্তিভাবে ধর্মীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবল প্রচেষ্টা’ সঞ্জাত সংস্কৃতি ভারতে মধ্যপ্রাচ্যের আগন্তুক সংস্কৃতির দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত। এই আক্রমণাত্মক, আগ্রাসী, প্রতারক ও বিশ্বাসঘাতক সংস্কৃতিকে কীছুতেই ইসলামী সংস্কৃতি বলা সামগ্রিক বিচারে সঙ্গত নয়। আরবদের ইসলাম এবং পাঠান মোগলদের ইসলাম ধর্মতত্ত্বানুসারে এক হলেও সাংস্কৃতিকভাবে পৃথক প্রকৃতির। কারণ আরব থেকে বঙ্গদেশ পর্যন্ত এসে পৌঁছাতে ইসলামকে একটা দীর্ঘ সময় ও পথ অতিক্রম-পরিক্রমণ করে আসতে হয়েছে। প্রবহমান নদী নিজের মধ্যে একটি গ্রহণক্রিয়া জারি রাখে। তেমনি বঙ্গদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে হতে কালে কালে ইসলামের প্রক্ষিপ্ত অর্জনও একবারে কম ছিল না। ভারতবঙ্গে ইসলামের আগমনের বিষয়ে সমাজ-সংস্কৃতির অধুনাতন এক বিশ্লেষক বলেন, “এরপর এ অঞ্চলে ইসলামের প্রবেশ ঘটে। তবে এ ইসলাম হযরত মুহাম্মদ (স.) প্রবর্তিত অবিকৃত ও নির্ভেজাল ইসলাম নয়। প্রবর্তিত হওয়ার প্রায় ৬০০ বছর পর এ দেশে আসার সময় ইসলাম ইরান, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তানের বহু লোকাচার সঙ্গে নিয়ে আসে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়Ñ সুফিগিরি, দরবেশী ইত্যাদি আদি ইসলামে নেই। সুফি-দরবেশদের অধিকাংশই ছিলেন মানবতাবাদী ও বিভিন্ন ধর্মের সমন্বয়কারী। […] ফলে মানবতাবাদী, প্রেমভক্তিতে পূর্ণ পরিবর্তিত ইসলাম ধর্ম জনগণের মধ্যে আবেদন সৃষ্টি করে। তবে জনগণ ধর্মান্তরিত হলেও হাজার বছরের ঐতিহ্য ও অনুষঙ্গসমূহের সঙ্গে নতুন ধর্মের সমন্বয় করে নিয়েছে।”(১৩) বলাবাহুল্য এই সমন্বয়ই স্বাভাবিক। এখানে এই সমন্বয় (‘হাজার বছরের ঐতিহ্য ও অনুষঙ্গসমূহের সঙ্গে নতুন ধর্মের সমন্বয়’) নিঃসন্দেহে একটি সাংস্কৃতিক মিথষ্ক্রিয়া। এই মিথষ্ক্রিয়া ঘটেছে মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের মধ্যে এবং পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার (ধষরবহধঃরড়হ) শিকার হয়েছে উভয় সংস্কৃতি। এদিকে এই প্রপঞ্চকেও তো অস্বীকার করা যায় না যে, নৃতাত্ত্বিক ও প্রাকৃতিক জৈবিক সংস্কৃতি থেকে মানুষকে সহজে উৎখাত করা যায় না। ভুলে গেলে চলবে না যে, আরবে উদ্ভব হওয়া ধর্মকে বরণ করে নিয়ে ভারতের মানুষের নৃতাত্ত্বিকতা আরব নৃতাত্ত্বিকতায় পরিবর্তিত হয়ে যায় নি।
ইরাক-ইরান-তুরস্ক অঞ্চলের মানুষেরা আরবি ভাষাকে গ্রহণ করে নি। আরবি ‘আল্লাহ’ ও ‘সালাত’-এর ফারসি শব্দপ্রতীক যথাক্রমে ‘খোদা’ ও ‘নামাজ’ এবং সে অনুসারে এ দু’টি ফারসি শব্দ আমাদের বাংলাভাষায়ও ধর্মীয় শব্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, লোকসাধারণের মধ্যে বহুল প্রচলিত এবং যে কোনও বাংলা অভিধানেই এই শব্দ দু’টিকে পাওয়া যায়। এমনকি ‘নামাজ’ গ্রামের হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে আবালবৃদ্ধবনিতার কাছে যেভাবে সুপরিচিত ‘সালাত’ তার শতভাগের এক ভাগও নয়। ইদানিং আলেম-ওলামারা ‘সালাত’-কে সাধারণ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে তৎপর হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের তথ্য থেকে অবগত হওয়া যায়। “সম্প্রতি কোনো কোনো বাংলা সংবাদপত্রে প্রচলিত ফারসী শব্দের পরিবর্তে আরবী শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এইসব সংবাদপত্র ‘নামাজের’ পরিবর্তে ‘সালাত’, ‘রোজা’র পরিবর্তে ‘সীয়াম’, ‘খোদা’র পরবির্তে ‘আল্লাহ’ ব্যবহারকে শ্রেয়োজ্ঞান করছে। সংবাদপত্রে ব্যবহৃত কোনো কোনো জলসা সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনের অর্থ উদ্ধার কষ্টসাধ্য। রমজান মাসে এই ধরনের আধিক্য ঘটে।”(১৪) যদিও চর্বিতচর্বণ হয়ে যাচ্ছে, তবু বলছি, ইরাক-ইরান-তুরস্কের ভাগ্যান্বেষী কীছু মানুষ ভারতবর্ষে এসে ক্ষমতালোভী হয়ে ওঠে বাংলাভাষার উপর আক্রমণকারী শক্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। তারা জানতো যে, কোনও জাতিকে তাঁবে রাখতে হলে, জাতিগতভাবে দাসে পরিণত করতে হলে অর্থাৎ কোনও জাতির উপর যুগ যুগ ব্যাপী শাসন-শোষণক্রিয়া অব্যাহত রাখার সামাজিক-রাজনীতিক বাস্তবতা সৃষ্টি করতে হলে প্রথমেই সেই জাতিকে জাতিগতভাবে হত্যা করতে হয়। আর এই জাতিগত হননক্রিয়া বাস্তবায়নের উত্তম পন্থা হলো, সংশ্লিষ্ট জাতিটিকে সর্বাগ্রে মাতৃভাষা ও স্বসংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করা। মোদ্দাকথা ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করা। বিশেষ করে পাকিস্তানি শাসনামলের পুরো কালপর্বের প্রতিটি মুহূর্ত নিবরচ্ছিন্ন ও খতরনাক ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতার রাজনীতিক আক্রমণের মুকাবেলা করে বাঙালিকে বেঁচে থাকতে হয়েছে এবং বাঙালি ঠিকই হৃদয়ঙ্গম করতে পেরেছিল পশ্চিমা শাসকদের দুরভিসন্ধি, তাই বাঙালির গানে পাই, ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’। সে আক্রমণের দগদগে ঘা দুরারোগ্য ব্যাধি হয়ে রয়ে গেছে সমাজের পরতে পরতে রন্ধ্রে রন্ধ্রে, প্রকৃতিগত সুস্থতার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সেখানে কাজ করছে না, পাকিস্তানপন্থি বাঙালি বাংলাদেশে এখনও একেবারে দুর্লক্ষ্য ডুমুরের ফল নয়।
প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রাচ্যের প্রতি প্রতীচ্যের দুরভিসন্ধিমূলক আচরণ-কার্যক্রমের কোনও শেষ নেই। সেই কার্যক্রম চারিত্র্যলক্ষণে অবশ্যই আপাদমস্তক রাজনীতিক, সেই সঙ্গে সহিংস ও আত্মসাৎব্রতী (শোষক)। ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের সে রাজনীতি বৃথা যায় নি। তার অনিবার্য ফল, ভারতবর্ষ শোষিত হয়েছে, এখন তিন তিনটি টুকরোয় বিভক্ত, কাশমির দু’খ-ে দখলিকৃত, এই খ-িত ভারত কখনওই এক হয়ে একক শক্তিধর রাজনীতিক পরাশক্তিতে পর্যবসিত হতে পারবে এল মনে হয় না এবং নয়া উপনিবেশবাদী শোষণের নীতি উপমহাদেশের উপর কার্যকর থাকবে, আধিপত্য করবে।
পূর্ববঙ্গে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিকতার বিস্তার এই প্রতীচ্যদুরভিসন্ধির একটি উপউৎপাদন, লক্ষ্যার্থ বাঙালির বাঙালিত্বের বিনাশসাধন। পাকিস্তানিরা জানতো যে, ভাষাবিচ্ছিন্নতা মানুষকে সংস্কৃতিহীন করে আর সংস্কৃতিহীন মানুষ মানেই সর্বার্থে নিঃস্ব এক মানুষ। তার কোনও স্বাধীনতা থাকে না, সে তার চিত্তের স্বকীয়তা ও চিন্তার নিজস্বতাকে হারায়, সে কেবল আপদমস্তক পরাজিত ও দাসত্বের নিগড়বন্দি রক্তমাংসে গড়া এক সচল-সজীব মাংসপি-, যৎকিঞ্চিৎ বাদপ্রতিবাদেও চেতনারহিত। এমন ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতাক্রান্ত মানবিক অস্তিত্বকে শাসন-শোষণ করা সহজ।
ভারতবঙ্গে আগন্তুক মধ্যপ্রাচ্যের ভাগ্যান্বেষীরা ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টির সহজ পথে হাঁটতে শুরু করেছিল। ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতা ভাষাসাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতারই একটি শক্তিশালী ও ব্যাপকার্থে কার্যকর প্রকরণ। ইতিহাস বলে, পরিকল্পিত কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনায় তাদের কোনও ত্রুটি ছিল না, উদ্যম ছিল সর্বাত্মক ও সর্বব্যাপী। আর এই আক্রমণকারীদের আগ্রাসন ও ধর্মীয় কূপম-ুকতার মিথষ্ক্রিয়া থেকে উদ্ভূত আরবি-ফারসি-উর্দুপ্রীতির সামাজিক উপউৎপাদন ক্ষুদ্র একটি ধর্মাশ্রয়ী গোষ্ঠী বাংলাভাষার জমিতে ভাষা-ঔপনিবেশিকতার বীজতলা তৈরি করে বাঙালির মনের মাটিতে অঙ্কুরিত ঔপনিবেশিক বিচ্ছিন্নতার সাংস্কৃতিক বিষবৃক্ষের মূলে জলসিঞ্চন করে চলেছে অবিরত, জিইয়ে রাখছে সুদূরপ্রসারী প্রতিক্রিয়াশীল সমাজমানসতার পরিবেশদূষণের অবস্থা-পরিপ্রেক্ষিত। এবংবিধ প্রসঙ্গালোচনায় অবতীর্ণ হয়ে অবশ্যই বিস্মৃত হলে চলবে না যে, ভারতবর্ষে আরবি তার ধর্মের খোলস বর্জন করে কখনও প্রশাসনিক ভাষা বা রাষ্ট্রভাষারূপে আবির্ভূত হয় নি বা হবার সুযোগ পায় নি। বোধ করি এর কারণটা এই যে, আরবিভাষী জাতিসত্তার প্রতিভূরা এখানে ইংরেজদের মতো সশরীরে উপনিবেশ স্থাপন করে নি। সেই সঙ্গে এও বিস্মৃত হলে চলবে না যে, বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা এ যেমন সত্যি, তেমনি সত্যি বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় ভাষা আরবি। বাংলাভাষীদের মধ্যে প্রথমে ফারসি, পরে ইংরেজি, তারপরে উর্দু, তারওপরে এক্ষণে আবার ইংরেজিপ্রীতিরূপ সেই একই বিভাষাপ্রীতির পালাবদলের সঙ্গে একটিই অনুঘটক নিহিত আছে, সেটি হলো, সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রশক্তির পদলেহন অর্থাৎ কিনা পুঁজির দাসত্ব করে পার্থিব স্বার্থোদ্ধারের মতলব। দেশ উচ্ছন্নে যায় যাক কিংবা জাহান্নামে, তাতে কার কী ? এই উচ্ছন্নে যাওয়ার সঙ্গে শ্রেণিস্বার্থের ঐহলৌকিক (আর্থিক) সংশ্লিষ্টতা ব্যতীত পারলৌকিক (ধর্মীয়) কোনও কারণ যুক্ত নয় এবং কখনওই ছিল না।
প্রাযুক্তিক উন্নয়ন, মুৎসুদ্দিপুঁজি কিংবা বাণিজ্যপুঁজির প্রবল বিস্তার, সামরিকায়ন, সম্পদের মালিকানার অসমবণ্ঠন, চাহিদার আকাশ পাতাল ব্যবধান ইত্যাদি সাংস্কৃতিক (সামাজিক-রাজনীতিক) প্রপঞ্চ সমাজে ও পরিবারে বিচ্ছিন্নতার (ধষরবহধঃরড়হ) সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করেছে। এমতাবস্থা সর্জনের পশ্চাৎভূমিকা পুঁজিবাদেরই, পুঁজিবাদই বিচ্ছিন্নতার মূল উৎস। এই বিচ্ছিন্নতার পরম প্রতিমূর্তি হয়ে পৃথিবীতে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী, যাদেরকে বলি বুদ্ধিবণিক, দিব্যি বেঁচেবর্তে থাকে। এই ভূখ-ে (পূর্বেকার পূর্ববঙ্গ এবং এখনকার বাংলাদেশ) এরা মুগলামলে মুগলদের দাদাগিরি, ইংরেজ আমলে ইংরেজদের দাদাগিরি, পাকামলে উত্তর ভারত থেকে আগত উর্দুওয়ালাদের দাদাগিরির দাসত্বকে অন্ধের মতো শিরোধার্য করে নিয়েছে, কোনও বাড়তি গাঁইগুঁই করে নি, বরং সর্বসময়ে সর্বাবস্থায় এইসব ঔপনিবেশিকদের সঙ্গে পরম সখ্যসূত্রে বাঁধা ছিল। সোজা কথায় এরা ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিক পরিপ্রেক্ষিতে বহিরাগত ঔপনিবেশিক শাসককে মুর্শিদ মেনেছে। এই দিকদৃষ্টি থেকে বিবেচনা করলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, শাসকগোষ্ঠীর গোলামির গৌরব ভিন্ন ইতিহাসনির্দিষ্ট অন্য কোনও কর্তব্যপ্রসূত পরিচয় এই শ্রেণির ইতর বুদ্ধিবৈশ্যদের নেই, কখনও ছিল না। এরা ভাষাআন্দোলন (১৯৫২), গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৮-১৯৬৯), মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) কিংবা একাত্তরোত্তর বিভিন্ন গণআন্দোলনের বাইরে থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রের লেজুরবৃত্তির একান্ত চরিতার্থতায় নিমজ্জিত ছিল। আনতোনিও গ্রামশি বুদ্ধিজীবীদের অর্গানিক (যান্ত্রিক/জৈব) ও ট্র্যাডিশনাল (ঐতিহ্যিক/প্রথাগত) এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করেছেন। বুদ্ধিবণিক বলি যে বুদ্ধিবাদীদের, তারা গ্রামশির সংজ্ঞানুসারে ‘জৈব’ বুদ্ধিজীবী, চিন্তাচর্চায় স্বাধীন-স্বনির্ভর প্রথাগত বুদ্ধিজীবীভুক্ত শ্রেণির কেউ নয়, তিন পতাকার (ব্রিটিশ, পাকিস্তান, বাংলাদেশ) তলেই আমরা তাদের দর্শন পেয়েছি। এদেরকেই, অর্থাৎ আবুল ফজলের পিতার বুদ্ধিজীবীসুলভ চরিত্রের বিকশিত রূপ এইসব উত্তরসূরি বুদ্ধিজীবীদেরকেই, ‘অর্গানিক’ বুদ্ধিজীবী বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন গ্রামশি, যারা রাজনীতিক অনিবার্যতার নিয়মে রাষ্ট্রছায়াতলে প্রপন্ন ও বিকশিত হয়।
আবুল ফজলের পিতার জীবিতাবস্থার (আবুল ফজলের প্রথম উপন্যাস ‘জীবন-পথের যাত্রী’ লেখার সময়ে অর্থাৎ ১৯৩৩ সালে তাঁর পিতা জীবিত ছিলেন ধরে নিয়ে) পূর্বাপর কালপরিসর থেকে মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) পর্যন্ত বিস্তৃত সময়সীমাটি কম করে হলেও পৌনে একশ’ বছরের বেশি তো হবেই। তারও প্রায় চার দশক পরে এসে তৎকালের সময়পরিসর আর বর্তমানের সময়পরিসর তুলনায় কোনওদিক থেকেই বা কোনওভাবেই এক নয়, বরং ফাঁরাফাত (ফাঁরাক+তফাত) বিস্তর। একটি উদাহরণ দেওয়াই যথেষ্ট, তখন মুঠোফোন ছিল না, এখন মুঠোফোন আছে। এই মুঠোফোন থাকা না-থাকাটাই দুই কালের মধ্যে প্রকৃত ও বাস্তবিক তফাৎ, পরাধীনতা থেকে স্বাধীনতায় উত্তরণ নয়। কারণ এই স্বাধীনতার অভ্যন্তরে পরাধীতার রক্তবীজের ফল্গুধারা প্রবহমান, এক অর্থে আমরা স্বাধীনতার আলখাল্লার অভ্যন্তরে জাতিগতভাবে আরও পরাধীন হয়েছি, পিছিয়ে পড়েছি মাত্র, প্রকৃত বাস্তবতা এটাই। টেংরাটিলার গ্যাসবিনষ্টিকা- কিংবা টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্যবিনষ্টির মহোৎসব ও রাজনীতিক হত্যাকা-ের উত্তরোত্তর ব্যাপকতা ইত্যাদি ইত্যাদি। দেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলে সংঘটিত দু’টি আলোড়ন সৃষ্টিকারি ঘটনার প্রমাণ ছাড়াও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে আরও অনেক অনেক মূর্তনির্দিষ্ট জায়মান বিষয়প্রপঞ্চ বিদ্যমান আছে যে-গুলো কোনও স্বাধীন দেশে সংঘটিত হওয়া একেবারেই অসম্ভব। চূড়ান্ত বিবেচনায় এর নির্গলিতার্থ এই যে, আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি সত্য, কিন্তু মুক্তি আমাদের মেলে নি, পশ্চাৎপদতা আমাদের পিছন পড়ে রয়েছে। মুজিবহত্যা ও রাজাকারের সাংসদ হওয়া তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। অক্টোবর বিপ্লবের (১৯১৭) পর বিপ্লবের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিবিপ্লবীদের দমনে দস্তুরমতো গৃহযুদ্ধের ভেতর দিয়ে রাশিয়াকে অতিক্রম করতে হয়েছিল, অথচ বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের পর তেমন কীছু হয় নি। কারও কারও ধারণা, এই ‘কীছু হয় নি’র কৌশলে প্রকৃতপ্রস্তাবে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের আত্তীকরণ সম্পন্ন হয়েছে এবং আবুল ফজলের পিতার কালটি হুবহু আগের মতো না থেকে একটু রূপান্তরিত হয়েছে।
আর্থসামাজিক বিন্যাসের বিভিন্ন রকমফের ও রূপান্তরের ব্যাপকতার নিরিখে আবুল ফজলের পিতার কালটি ছিল সামন্ত-পুঁজিবাদী-সা¤্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ শাসনাধীন এবং এখনও সেই একই সামন্ত-পুঁজিবাদী-সা¤্রাজ্যবাদের আধিপত্যর বিস্তৃতিই জায়মান। অতীত বর্তমানের আর্থসামাজিক বিন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে ফাঁরাফাত কেবল এইটুকু যে, শাসনটা হয়ে গেছে পরোক্ষ কিংবা তাঁবেদারনির্ভর, অর্থাৎ চূড়ান্ত বিচারে পুঁজিপ্রভুর কারিন্দার কারসাজি, নয়া উপনিবেশবাদের নয়া রাজনীতিক কারুকাজ। জনকাক্সক্ষা ছিল শোষণ বন্ধ হবে, আত্মসাৎ রহিত হবে, সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার প্রসার লাভ করবে, মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে উঠবে কিন্তু এসব কীছু হয় নি, হয়েছে তার পুরোপরি বিপরীত। ‘যত পড়ে ততো জানে, যতো জানে ততো কম মানে’ হিরক রাজার এই শিক্ষাসূত্র শিরোধার্য করে কার্যত শিক্ষা সঙ্কোচননীতিই দেশে কার্যকর আছে। আগে বিদেশিরা শোষণ করতো এখন করে স্বদেশিরা। তাৎপর্য অবশ্য একটা আছে, সেটা এই যে, বৈভীষণিক এই শোষণের রকম-মাত্রটাও নতুন, আরও তীব্র, খতরনাক ও বলতে গেলে নির্বিঘœ। প্রতিবাদী সুর উঠলেও প্রতিরোধ উঠছে না, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ নিরসনের আইন হচ্ছে প্রতিনিয়ত । সময়ের এই পরিসরে জায়মান আত্মসাৎকেন্দ্রিক পুঁজিতান্ত্রিকতার মহোৎসবের ফাঁকতালে আবুল ফজলের পিতার উত্তরসূরিরা আছেন বহালতবিয়তেই। ব্যতিক্রম বাদে তাঁরা (এখন কেউ কেউ আবার বুদ্ধিজীবী হয়ে উঠেছেন) আবুল ফজলের পিতার মতোই আছেন তুষ্ট ও ভঙ্গিতে সদাশয়, উপদেশ বিতরণে আরও আরও প্রবলভাবে প্রাণিত-তৎপর ও পুুুঁজির তুখুড় তাঁবেদার, তদুপরি শোষেণের সবল যন্ত্র রাষ্ট্রের লেজুড়বৃত্তিতে ভীষণ লিপ্ত হয়ে তারা এখন তন্নিষ্ট রাজনীতিক জৈবিকতার শক্তিশালী অংশ। এই বিবেচনায় মূর্তনির্দিষ্ট আর্থসামাজিক ব্যবস্থার তেমন কোনও ফাঁরাফাত (ফাঁরাক+তফাত) ঘটে নি। মাদ্রাসার সংখ্যা বেড়েছে অনেক, বিজ্ঞানমনস্কতার বিস্তার প্রতিষ্ঠ না হয়ে হয়েছে প্রতিষ্টন্ত। এমনই হয়, এইটাই সমাজ বিকাশের দ্বান্দ্বিকতার নিয়ম।
এই নিয়ম অনুসারেই যে-কোনও আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী মূলত শাসকশোষক শ্রেণির অনিবার্য যান্ত্রিক লেজুড়রূপে আবির্ভূত হয়, লেজুড়রূপে কাজ করে এবং পরাশ্রয়ী এই বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মূলত এটাই বৃত্তি। তারা একদিকে বৌদ্ধিকভাবে অস্বনির্ভর, অন্যদিকে পরপ্রপন্ন ও সুনির্দিষ্টভাবে শাসকগোষ্ঠীর পদলেহী বুদ্ধিবণিক। বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে মার্কসবাদী চিন্তক আনতোনিও গ্রামশি যথার্থই বলেছেন, “প্রত্যেক নতুন শ্রেণি তার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গেই যে ‘জৈব’ বদ্ধিজীবীদের সৃষ্টি করে এবং তার নিজ বিকাশের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যাদের সম্প্রসারিত করে তারা মুখ্যত নতুন শ্রেণির দ্বারা প্রতিস্থাপিত নতুন সামাজিক বর্গের আদি ক্রিয়ার অংশ বিশেষে ‘কৃতবিদ্য’।(১৫) ১৯৭১-য়ে মুক্তবুদ্ধিচর্চার উর্বর সময়েও আবুল ফজলের পিতার উত্তরসূরিরা মওদুদির শিষ্য গোলাম আজম থেকে গেছে এবং মুক্তিযুদ্ধে এরাই জিন্নাহর ভাবশিষ্য হয়ে আবির্ভূত হয়ে বাংলাদেশকে বধ্যভূমিতে পরিণত করে এবং নির্দ্বিধায় ত্রিশ লক্ষাধিক বাঙালিকে হত্যা করার নাটক মঞ্চায়নে পরিচালকের দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করে, তৎপর মুক্তিযুদ্ধোত্তর কালে যথারীতি হয়ে গেছে সাকা, জিয়া কিংবা বাংলাভাই। তাদের কোনও বুদ্ধিমুক্তি ঘটে নি।
তথ্যসূত্র :
১. আবুল কাসেম ফজলুল হক, রাজনীতি ও সংস্কৃতি : সম্ভাবনার নবদিগন্ত, এ্যডার্ন পাবলিবেশন : ফেব্রুয়ারি ২০০২, পৃষ্ঠা : ১৭।
২. বদরুদ্দীন উমর ॥ ধমর্, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িকতা ॥ চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা ॥ প্রথম প্রকাশ : আগস্ট ১৯৯৩ ॥ পৃষ্ঠা : (১৮২-১৮৩)।
৩. অমলেন্দু দে, বাঙালী বুদ্ধিজীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, দ্বিতীয় মুদ্রণ : জুলাই ১৯৯১/বি, পৃষ্ঠা : ১২২Ñ১২৩।
৪.ঐ, পৃষ্ঠা : ১২৪।
৫. ঐ. পৃষ্ঠা : ১২৪।
৬. বদরুদ্দীন উমর ॥ ধমর্, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িকতা ॥ চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা ॥ প্রথম প্রকাশ : আগস্ট ১৯৯৩ ॥ পৃষ্ঠা : (১৮২-১৮৩)।
৭. আহমদ ছফা, বাঙালি মুসলমানের মন, খান ব্রাদার্স এ- কোম্পানি, ফেব্রুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা ; ৩১।
৮. ডা. নওশের (বারডেম, ঢাকা), মহান ভাষা আন্দোলন ও একটি ইমেইলের জবাব, মুক্তকথা : পাঠক চোখে দেশের জন্য ভালোবাসা, সপ্তাহের বাংলাদেশ সাপ্তাহিক, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৪, বর্ষ ৬ সংখ্যা ৩৮, পৃষ্ঠা : ৩১, স্তম্ভ : ২।
৯. বদরুদ্দীন উমর ॥ ধমর্, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িকতা ॥ চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা ॥ প্রথম প্রকাশ : আগস্ট ১৯৯৩ ॥ পৃষ্ঠা : ১৭৮। ১০. অমলেন্দু দে, বাঙালী বুদ্ধিীবী ও বিচ্ছিন্নতাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, দ্বিতীয় মুদ্রণ : জুলাই ১৯৯১/বি, পৃষ্ঠা : ১২৫।)
১১. বদরুদ্দীন উমর ॥ ধমর্, সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িকতা ॥ চিরায়ত প্রকাশন, কলকাতা ॥ প্রথম প্রকাশ : আগস্ট ১৯৯৩ ॥ পৃষ্ঠা : ১৮৬।
১২. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাঙালি কাকে বলি, আহমদ পাবলিশিং হাউস, প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮, পৃষ্ঠা : ২৩।
১৩. বাঙালির সংস্কৃতি, আহমাদ মোস্তফা কামাল, ২০০০ ঈদ সংখ্যা ২০০৯, পৃষ্ঠা: ৩০৪, স্তম্ভ : (২-৩)।
১৪. মনসুর মুসা, বিদেশী শব্দের ব্যবহার, সংবাদপত্রে বাংলা ভাষা, সম্পাদক : আবদুল্লাহ আল-মুতি ও আনিসুজ্জামান, পিআইপি প্রকাশনা, ১৫ জুন, ১৯৮৯, পৃষ্ঠা : ৪৮।
১৫. আনতোনিও গ্রামশি, নির্বাচিত রচনাসংগ্রহ, সম্পাদনা ও অনুবাদ : সৌরীন ভট্টাচার্য ও শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্ল পাবলিশার্স কলিকাতা : জুলাই ১৯৯৩, পৃষ্ঠা : ১৫৭।
সুনামগঞ্জ ॥ ০৪.০৪.২০১৪ ॥ শুক্রবার
বাংলা ভারোপীয় (<ভারতীয়+ইউরোপ+ঈয়) বা ইংরেজি ংহধৎশ (<ংহধশব+ংযধৎশ)।
(সমাপ্ত)

  • [১]