ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) সমাজে যেমন তেমনি বস্তুজগতের সর্বত্র বিচ্ছিন্নতা কার্যকর। যেমন বিনাশ, (কাঁঠাল বিচিকে রান্না করার পর বিচির বংশবিস্তারের উযুক্ততা বিলোপ) হজম (প্রাণীদের ভুক্ত বস্তু দেহাভ্যন্তরে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পুষ্টিসাধনের উপযোগী উপাদনে রূপান্তর), রেচন (মল, মূত্র, স্বেদ ত্যাগ) ইত্যাদি যতোসব জৈবাজৈব রাসায়নিক ব্যাপার সবই কোনও না কোনও ধরনের বিচ্ছিন্নতার নমুনা। এমনকি অ্যাটম ও হাইড্রোজেন বোমার সৃষ্টিপ্রকরণটিও বিচ্ছিন্নতার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
সমাজবিকাশের ইতিহাসের পরতে পরতে বিচ্ছিন্নতার বিচিত্র ক্রিয়াকলাপ লক্ষ্য করা যায়। এদিক থেকে বিবেচনায়, বিচ্ছিন্নতা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সভ্যতার অস্তিত্বের প্রতি হুমকিস্বরূপ কোনও ক্রিয়া, ভয়প্রদর্শন, যুদ্ধপ্রস্তুতি, ঠাণ্ডাযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ, অস্ত্রপ্রতিযোগিতা, অস্ত্রব্যবসা, মাদকব্যবসা, সন্ত্রাস, মনোনয়নবাণিজ্য, বিচারবহির্ভূত হত্যা, ধর্মের রাজনীতিক ব্যবহার, বিপ্লব ইত্যাদিও তাত্ত্বিকদের কাছে বিচ্ছিন্নতার নামান্তর মাত্র। একজন ধর্মতাত্ত্বিক কিংবা দার্শনিকের চিন্তায় ঈশ্বর, ভাবাদর্শ, বিশেষ কোনও রাজনীতিক মতবাদ, প্রেম, সম্পত্তি ইত্যাদি থেকে, এই যাকে বলে সাধারণ কথায়, সরে যাওয়ার ব্যাপরটাই বিচ্ছিন্নতা বলে প্রতিভাত হতে পারে। যেমন নাস্তিকতা, শত্রুসম্পত্তি প্রত্যার্পণ, প্রেমিক কর্তৃক প্রেমিকাকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে গণধর্ষণ, বামপন্থী বিপ্লবীর বুর্জোয়ালেজুড়বৃত্তি, রাজাকার কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধার সদন বাগিয়ে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা গ্রহণ, একাত্তরের শান্তি কমিটির কোনও সদস্য কর্তৃক বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির আসন অলংকৃতকরণ ইত্যাদি। অর্থাৎ সার্বিক বিবেচনায় সকল চলিতকর্মের (প্রকৃতি ও সমাজ বদলের কার্যকলাপ) সঙ্গে বিচ্ছিন্নতা অবিচ্ছেদ্য একটি অনুষঙ্গ। প্রকারান্তরে বিচ্ছিন্নতার ইতিহাসই পৃথিবীর ইতিহাস, বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের ইতিহাস।
খ-ন, খণ্ডায়ন, বিভক্তি, বিভাজন, নিরাকরণ ইত্যাদি এইসব শব্দ যে-সব অর্থদ্যোতনা ধারণ করে তার সবকছিুই প্রকৃতপ্রস্তাবে বিচ্ছিন্নতার নামান্তর। উদাহরণগুলো হতে পারে আকাশপাতাল ব্যবধানে সুস্থিত। একটার আরেকটার সঙ্গে কোনও মিল নেই, সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির। এ্যামিবার বংশবিস্তারহেতু দ্বিখণ্ডায়নের জৈবিকতা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ঠাণ্ডাযুদ্ধ এই দুইটি প্রপঞ্চ একরকম নয়, একটি থেকে আর একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভিন্নতার বিষয়টি এতোটাই মূর্তনির্দিষ্ট এবং ব্যবধানটা প্রকৃতপ্রস্তাবে এতোটাই লাউড়ে আর গৌড়ে যে, সেটা কাউকে বুঝিয়ে দেওয়ার দরকার আছে বলে মনে হয় না। এমন উদাহরণের কোনও অভাব নেই। এই যেমন, মারণাস্ত্রের উন্নয়ন বা পারমাণবিক অস্ত্রপ্রতিযোগিতা, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭-য়ে ভারতভাগ, জাতিগত স্বাধিকার অন্দোলনের ভিত্তিতে ১৯৭১-য়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়, যে-কোনও সামাজিক শ্রেণির দ্বারা অপর কোনও সামাজিক শ্রেণির সম্পত্তি দখল অর্থাৎ দখলচ্যুতি, শ্রমিককে তার কাজ থেকে উচ্ছেদ বা বেকারত্ব, উৎপাদনের প্রক্রিয়া থেকে শ্রমিকের বিচ্ছেদ, উৎপাদিত পণ্য থেকে শ্রমিকের বিচ্ছেদ, শ্রমোৎপন্ন পণ্যের মালিকানা থেকে শ্রমিককে উচ্ছেদ, মানুষের আত্মগতবিচ্ছেদ বা নিজের থেকে নিজে আলাদা হয়ে যাওয়া, মানুষ থেকে মানুষের আলদা হয়ে যাওয়া, পরনির্ভরতা, পরাধীনতা, পুঁজির প্রভু হয়ে উঠা, আর্থনীতিক অবরোধ, বাস্তুচ্যুতি, শরণার্থীসঙ্কট ইত্যাদি ইত্যাদি।
গতক’দিন আগে, আলাপ প্রসঙ্গে একজন ধর্মভীরু মুসলমান বললেন, ‘ওমুক ক্ষমতায় থাকলে ইসলাম থকতো না’। অর্থাৎ ইসলাম চলে যাবে। ‘ওমুক’-এর স্থলে যে-কোনও একটি নাম কল্পনা করে নিতে পারেন। বিষয়টা আমার মোটেও বোধগম্য হলো না বললে বোধ করি সঙ্গত হবে না। কেন না বিষয়টা আমি ঠিকই বুঝেছি। এটি সমাজমানসতায় গজিয়ে উঠা একটি ছত্রাক-অধ্যাস। ‘ওমুক’ ক্ষমতায় আছেন দশ বছরেরও অধিক হতে চললো। ইসলামের তিনি কোনও ক্ষতি করেছেন বলে তো মনে হয় না। একসময় জিগির উঠেছিল, ওরা ক্ষমতায় গেলে মসজিদে উলুধ্বনি দেবে, ওরা ঠিকই ক্ষমতায় এলো, অথচ কেউ মসজিদে উলুধ্বনি দিলো না। বাংলাদেশে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ তো আছেই। যে-মসজিদের পাশে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছে সেটির তৃতীয়তলার নির্মাণকাজ চলছে। দেশে কোথাও একটিও মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায় নি। দিনে দিনে মাদ্রাসার সংখ্যা উত্তরোত্তর বাড়ছে। ইসলাম উধাও হয়ে যাবে তার কোনও নমুনা আমার চেতনায় বিধৃত হয় না। কিন্তু এই মুরুব্বির মগজে গজিয়ে উঠা আশঙ্কা এতোটাই প্রবল যে, তিনি উদয়াস্ত রীতিমতো ব্যতিব্যস্ত ও দিশেহারা। মস্তানিস্থান পাকিস্তান আমলেও এই ‘ইসলাম গেল’ জিগির জাগিয়ে রাখা হয়েছিল তক্কেতক্কে তৎকালের পূর্ববঙ্গে এবং সেটাকে শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়েছিল একাত্তরের কালান্তক যুদ্ধকালে ‘ইসলাম রক্ষার নামে’ ত্রিশ লক্ষ মনুষ্যমেধ সম্পন্ন করার কাজে। ইসলাম কিন্তু তখনও তার নিজস্ব স্থানেই সুস্থিত ছিল এখন যেমন আছে। অথচ এই বয়োবৃদ্ধের আত্মগত উপলব্ধি ইসলাম থাকবে না। দীক্ষাগুরু রাজনীতির প্রবল প্রচার মানুষের চেতনায় একটি অধ্যাসের সৃষ্টি করে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে এবংবিধ যাবতীয় যতো কীছু ধারণার জটিল প্রতিরূপ, সবকীছুকেই বিচ্ছিন্নতার অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব। প্রকৃতপস্তাবে, বিশ্ববাস্তবতায় বর্তমান ও জায়মান মূর্তবিমূর্ত কোনও কীছুই বিচ্ছিন্নতার সংজ্ঞাবহির্ভূত নয়, সবকীছুতেই বিচ্ছিন্নতার ব্যাপক বিস্তৃতি। বলতে গেলে, বিচ্ছিন্নতার আকারপ্রকার ভেদাভেদের কোনও অন্ত নেই। এককথায় বিদ্যমান উপরিকাঠামোর যে-কোনও ধরণের পরিবর্তনই প্রকারান্তরে বিচ্ছিন্নতার স্বরূপে আবির্ভূত হতে পারে।
বিচ্ছিন্নতার একটি আর্থসামাজিক দর্শন আছে। এই দর্শন শ্রেণিবিভক্ত সমাজে আবির্ভূত যাবতীয় প্রপঞ্চের স্বরূপবিশ্লেষণের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে যে-কোনও সচেতন মানুষের চিন্তায়। কার্ল মার্কস মনে করেন, সম্পত্তিতে ব্যক্তিমালিকানা উদ্ভবের সঙ্গেই সমাজে বিচ্ছিন্নতা নামক প্রপঞ্চের উদ্ভব ঘটেছে। অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতা সম্পত্তিতে ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠার অনিবার্য ফল। সম্পত্তিতে ব্যক্তিমালিকানা থেকে আর্থনীতিক বৈষম্য, আর্থনীতিক বৈষম্য থেকে শ্রেণিবৈষম্য, শেণিবৈষম্য থেকে শ্রেণিবৈরিতা, শ্রেণিবৈরিতা থেকে শ্রেণিদ্বন্দ্ব বা শ্রেণিসংগ্রাম এবং এই শ্রেণিদ্বন্দ্ব থেকে বিচ্ছিন্নতা নামক আর্থসামাজিক উপসর্গের জন্ম। অমর্ত্য সেন যখন বলেন, “বিশ্বায়িত বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় যে জনগণ প্রবেশ করছেন তাঁদের ওপরে বিশ্বায়নের প্রভাব কীভাবে পড়বে তা অনেকটাই নির্ভর করে দেশীয় ব্যবস্থা উন্নীত করার ওপরে। যেমন, প্রতিযোগিতার তাড়না কিছু বংশানুক্রমিক উৎপাদনকারীদের তাদের প্রথাসিদ্ধ কাজ থেকে বহিষ্কৃত করতে পারে। কর্মচ্যুত এই মানুষগুলি কিন্তু বিশ্বায়িত অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত নতুন প্রকল্পে প্রবেশ করে খুব সহজে নতুন কাজ পাবে না।” (পরিচিতি ও হিংসা, অনুবাদ : ভাস্বতী চক্রবর্তী, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড কলকাতা, তৃতীয় মুদ্রণ : জানুয়ারি ২০১৬, পৃষ্ঠা : ১৪৫)। ‘বিশ্বায়িত বিনিময়ের প্রক্রিয়া’ সম্পর্কে এই বয়ার্ণনা (বয়ান+বর্ণনা) স্বাভাকিবভাবেই প্রতিপন্ন করে যে, প্রকৃতপ্রস্তাবে এখানে কাজ থেকে শ্রমিকের বিচ্ছিন্নতার একটি বয়ার্ণনা উপস্থাপিত হয়েছে। এইভাবে বিবেচনা করলে মানুষের যাপিত জীবনের বাস্তবতায় কিংবা বিশ্বব্যাপী চলিতকর্মের ব্যাপক পরিসরে প্রতিনিয়ত হাজার রকমের বিচ্ছিন্নতার উদ্ভব ঘটছে, যে-গুলোকে সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনায় মনেই হয় না যে, এ-গুলো সত্যি সত্যি বিচ্ছিন্নতার কোনও না কোনও প্রতিরূপ।
নিম্নে বিচ্ছিন্নতার প্রতিরূপ কতোগুলো শব্দ বা শব্দবন্ধ উদ্ধৃত করা হলো, নির্দিষ্ট সমাজবাস্তবতার নিরিখে যে-গুলোর অর্থদ্যোতনাকে, এদিক সেদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, বিচ্ছিন্নতার মূর্তনির্দিষ্ট প্রতিরূপ রূপে বিবেচনা করা সম্ভব। তাছাড়া এই শব্দ কিংবা শব্দজুটগুলো বিচ্ছিন্নতা প্রপঞ্চটির বিস্তৃতির পরিসর ও বহুমাত্রিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে পাঠককে একটা বাস্তব আন্দাজ দিতে পারবে বলে মনে হয়। শব্দ বা শব্দজুটগুলো যে-ভাবে যখন যেটা মনে পড়েছে সে-ভাবেই উদ্ধৃত করা হলো : আত্মবিস্মৃতি, আত্মবিচ্ছিন্নতা, আত্মহত্যা, ব্যক্তিত্বহীনতা, নিজেকে হারানো, উদ্বিগ্নতা, উৎকণ্ঠা, উদাসীনতা, একাকিত্ব, মূল্যহীনতা, সামাজিক বিশৃঙ্খলা, অসামাজিক পেশা, অবৈধ ও নিষিদ্ধ পেশা, পতিতাবৃত্তি, চাঁদাবাজি, দুঃখবাদ, বিমর্ষতা, বিশ্বাস হারানো, বিশ্বাসঘাতকতা, মূল্যবোধ হারানো, হতাশা, মূল্যবোধের সঙ্কট ও অবক্ষয়, যৌথচেতনার ব্যত্যয় ও খণ্ডন, সংহতির সঙ্কট, স্বজাতিবিদ্বেষ কিংবা রাজাকারজীবিতা, মুনাফার জন্য বিজ্ঞাপন, আর্থনীতিক বৈষম্য, সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য, আর্থনীতিক বৈষম্য, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, শোষণ, উদ্বৃত্তশ্রম শোষণ, শ্রেণিদ্বন্দ্ব, শ্রেণিসংগ্রাম, আন্দোলন, অভ্যুত্থান, গণঅভ্যুত্থান, অগণতান্ত্রিকতা, অগণতন্ত্রায়ণ, বিকেন্দ্রিকরণ বিরোধিতা, জাতীয়করণ বিরোধিতা, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, জঙ্গিবাদ, আইনের অপব্যবহার, ধর্মের অপব্যবহার, মেকলেচেলাপনা, ঔপনিবেশিকতার দালালি, অনৈতিকতা, অমানবিকতা, দানবিকতা, বৈরিতা, অবহেলা, উপেক্ষা, কালো আইন, আইনের ফাঁক, শ্রেণিস্বার্থে আইন প্রণয়ন, অপরাজনীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি, ব্যক্তির উপেক্ষণীয় কোনও কীছুতে পরিণত হওয়া, উদ্বাস্তুতা, শিকড়হীনতা, শরণার্থীসঙ্কট, চোরাচালান, মানবপাচার, মানুষের পণ্যায়ন, কণ্ঠরোধ, বাকস্বাধীনতা হরণ, স্বৈরাচার, স্বৈরশাসন, আমলাতান্ত্রিকতা, মতান্ধতা, আইনি নির্যাতন, উন্নতির অভিঘাতে প্রকৃতি ও মানুষের মরণদশা, অপহরণ, আটক, গুম, সরিয়ে নেওয়া, বন্দুকযুদ্ধ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আধিপত্য বিস্তার, দখল, দখলচ্যুতি, বাজারদখল, বিলাসিতা, লোভ, অর্থগৃধœুতা, স্বার্থপরতা, আত্মস্বার্থপরতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, অন্যায়, বিচারহীনতা, জবরদস্তি, অবদমন, নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি, ষড়যন্ত্র, প্রতারণা, কারচুপি, ভোট কিংবা নির্বাচনে কারচুপি, রাজনীতিক অসহিষ্ণুতা ও অস্থিতিশীলতা, জবাবদিহিহীনতা, বিচারবিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংসদের অসংসদীয় আচরণ ও আচরণবিধি লঙ্ঘন (চলবে)