ইকবাল কাগজী
(পূর্ব প্রকাশের পর) বর্ণবিদ্বেষ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ে।”(২)
৩. “উপনিবেশগুলোতে ঔপনিবেশিক সমাজকাঠামোয় এমন একটি শ্রেণি তৈরি করা হয় যারা উপনিবেশ-পরবর্তী সময়েও সাম্রাজ্যবাদি শক্তির সুবিধায় কাজ করে এবং তাদের জ্ঞানতত্ত্ব প্রচার করে বেড়ায়। এদের দ্বারা কখনও জাতিয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব না বরং এদের সমূলে ধ্বংস করাই জাতিয় সংস্কৃতি ও মুক্তিসংগ্রামের জন্য জরুরি।”(৩)
৪. “উপনিবেশকাররা তাদের স্বার্থে এমন মানুষ ক্ষমতায় বসায় যারা জনসাধারণের মধ্যে কমবেশি জনপ্রিয় কিন্তু তাঁবেদার। উপনিবেশকাররা এই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মানুষদের এ জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়, যেমন তাদের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করে, এদের এমন অবস্থানে বসায় যা তারা আগে কখনও ভোগ করেনি।”(৪)
৫. “উপনিবেশিকরা তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উপনিবেশের ইতিহাসে প্রবেশ করতে চায় এবং সংস্কৃতি ধ্বংস করতে চায়, উপনিবেশের সংস্কৃতিকে নিচু ও বর্বর সংস্কৃতি হিসেবে উপস্থাপন করে। উপনিবেশের অনেক মানুষ নিজেদের খাটো মনে করে হতে চায় উপনিবেশ স্থাপনকারী প্রভুদের মতো।”(৫)
মাতৃভাষা-উপনিহিতকরণরূপ ব্যাধিতে আক্রান্ত বাঙালি মুসলমান কিন্তু শত্রুসম্পত্তি, অর্পিতসম্পত্তি বা অর্পিতসম্পত্তি প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত আইনি জটিলতা ঠিকই উত্তমরূপে বুঝেন। পরস্বকে নিজস্ব মনে করার মানসিকতায় তাঁরা ভীষণ দড়, ধর্মবিধিবহির্ভূতভাবে হলেও আগেভাগেই পরস্বতে নিজস্বতাবোধগ্রস্ত হতে তাঁরা যৎপরোনাস্তি পারদরঙ্গম (পারদর্শী+পারঙ্গম)। সম্পত্তি সংক্রান্ত এ সব ব্যাপারে তাঁরা হিন্দুধর্মের নিছক অজুহাত তোলে জাগতিক সম্পদ উপনিহিতকরণের (অন্যের নিকট সংরক্ষণ, গচ্ছিত বা ন্যস্তকরণ) রোগে আক্রান্ত হন না। হিন্দুসম্পদ আত্মসাৎ বা লুণ্ঠনকল্পে গজনীর সুলতান মামুদ ভারতবর্ষ সতেরো বার আক্রমণ করেছিলেন। হিন্দুর সম্পত্তি গ্রাস করার সময় ধর্ম কোনও বাধা হয়ে দাঁড়ায় না, যেভাবে ‘জল’ শব্দটি উচ্চারণ করতে গেলে ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আসলে ধর্ম দাঁড়ায় না ধর্মকে দাঁড় করানো হয়, এই দাঁড় করানোর পেছনে ধর্মের কোনও সমর্থন নেই, সমর্থন আছে সাম্প্রদায়িক চেতনাপ্রসূত অধার্মিকতার। মানুষ কোনও না কোনও সময় ধর্মকে মানববিদ্বেষী আয়ুধে পরিণত করে, এই ঐতিহাসিক সত্য নিহিত আছে মানুষের মানববিদ্বেষী ও বিরোধী আচরণে। ভারতবর্ষকে ভাগ করার ষড়যন্ত্র সার্থক করতে মানুষ ধর্মকেই ব্যবহার করেছে। ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর দিকে অভিযাত্রীদের একজন লিখেছেন, আমেরিকায় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল, “ঈশ্বরের এবং সম্রাটের সেবা করার জন্য এবং নিজেরাও ধনী হওয়ার অভিপ্রায়ে।”(৬) আদপে অনায়াসে হৃদয়ঙ্গম হয় : দাস আহরণ, সম্পদলুট ও দেশদখলে বেরিয়ে নির্মম নরনিধন চালানোর কাজেও মানুষ ধর্মের ব্যবহার ভুলে যায় নি, ধর্মকে আয়ূধ রূপে সঙ্গে নিয়ে ব্যবহার করেছে অব্যর্থ কৌশলে।
যবনস্পর্শিত (মুসলমানের ছোঁয়া) হাঁড়িপাতিল হিন্দু ফেলে দেয়, কিন্তু যবনস্পর্শিত বামন তার শরীরের একটি লোমও ফেলে না, স্নান করে নেয়। নজরুল লিখেছেন, “মাজায় বেঁধে পৈতে বামুন রান্না করে কার না বাড়ি,/ গা ছুঁলে তার লোম ফেলে না, ঘর ছুঁলে তার ফেলে হাঁড়ি।”(৭) এই রকম অদ্ভুত প্রকরণে (আদপে প্রকরণটি যুক্তিমাফিক হওয়া উচিৎ চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া। যেহেতু ‘গা ছুঁয়া’ অর্থে চামড়াকে স্পর্শ করা বোঝায়।) ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করে অর্থাৎ ঐকান্তিক মানবিক প্রয়াসে আনুপূর্বিক নিয়ন্ত্রিত ধর্মের দ্বারা মানব স্বয়ং নিয়ন্ত্রিত হয়।
হিন্দুর সম্পত্তি দখল করার ক্ষেত্রে সম্পত্তিতে কোনও ধর্মারোপ করা হয় না, যেমন দেখা যাচ্ছে ভাষার উপর ধর্মারোপের কারণে প্রতিটি ভাষিক শব্দেরও ধর্ম থাকে এবং সুবিধামত বর্জন করা হয়। মস্তানিস্তান পাকিস্তান (নজরুল বলেছেন ফাঁকিস্তান) আমলে রাধা, রাই, কৃষ্ণ, কদমতলা, বাঁশি, বৃন্দাবন ইত্যাদি শব্দসহ রাষ্ট্র প্রকারান্তরে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথকে বর্জন করে নিষিদ্ধ করে রেখেছিলো। এই একবিংশ শতাব্দীতে উপনীত হয়েও বাঙালি মুসলমানের ভাষামানসতার মধ্যে ভাষার ধর্মভেদজনন থেকে উদ্ভূত ভাষা-উপনিহিতকরণরূপ ব্যাধির সংক্রমণ জায়মান আছে, তাই বাংলা শব্দে নাম রাখা হলে বঙ্কিমনেত্রে দৃকপাত কিংবা উষ্মা প্রকাশে সমাজ সদাসর্বদা অকুণ্ঠিত, এমনকি কটাক্ষ-তিরস্কার প্রক্ষেপণেরও ঘাটতি হয় না। এক সময় তো ধর্মপরিচয় নিশ্চিত করার অজুহাতে বাংলাভাষার ‘মুসলমানি কাম’ (খতনা) করার দুরভিসন্ধিতে হাজাম (মুসলমান নরসুন্দর) নিয়োগ করা হয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাভাষাকে ইসলামি ভাষায় রূপান্তরিত কারার অদ্ভুত একটি জবরদস্তিমূলক প্রক্রিয়া প্রয়োগ করে বাংলাভাষাভা-ারে আরবি-ফারসি-উর্দু শব্দের প্রক্ষেপণ ঘটানো হয়েছিল। উখিয়া-সাতক্ষিরার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পত্তির, এমন কি কোনও বিধর্মী নারীর কোনও ধর্ম নেই, সুতরাং নির্বিচারে আত্মসাৎ, গ্রহণ ও উপগত হওয়া বা ধর্ষণ, এমন কি দলধর্ষণ করাও বৈধ, এসব ক্ষেত্রে ধার্মনৈতিকতা বা ধর্মবোধ কোনও কার্যকর ভূমিকা পালন করে না। মানুষে মানুষে এই অন্ধ সংঘাতের পক্ষে কোনও বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই, বরং আছে ভয়ঙ্কর দানবীয় হিংস্রতা। এই ভয়াবহতার ভাষ্যরচনা করতে গিয়ে একজন লিখেছেন, “এই অন্ধ সংঘাতের নিদারুণ ফলশ্রুতি শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনই নয়, তার চেয়েও বহুগুণ মর্মান্তিক অযুত নিযুত মানুষের প্রাণবলি, মাতৃভূমি থেকে নির্মম উচ্ছেদ, দুর্বিষহ লাঞ্ছনা এবং অবর্ণনীয় আর্থিক ও সামাজিক দুরবস্থা। ধর্মান্ধতার বন্যায় ছিন্নপত্রের মতো যে অগণিত অসহায় মানুষ নিরুদ্দেশে ভেসে গেছে, কোনও শাস্ত্রের কোনও ভাষ্য দিয়ে তাদের সে বিরাট ট্র্যাজেডিকে বিবেকগ্রাহ্য করে তোলা সম্ভব নয়। ইতিহাসের আদিকাল থেকে ধর্মের অত্যাচারে মানুষের যত চোখের জল ঝরেছে, (চলবে)