হোসেন তওফিক চৌধুরী
একুশ মানেই প্রতিবাদ-প্রতিরোধ। একশ মানেই স্বাধিকার, স্বায়ত্বশাসন-স্বাধীনতা। একুশ ও স্বাধীনতার ইতিহাস একসূত্রে গাঁথা। একুশ না হলে আমরা বাঙালিরা স্বাধীনতা সচেতন হতাম না। একুশের পথ ধরেই আমাদের পথ পরিক্রমা। মহান একুশের অবিনশ্বর কালজয়ী চেতনাই বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার জন্য উজ্জীবিত করেছ্।ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির এক অবিনশ্বর আন্দোলন। বাংলা ভাষার স্মৃতি বিজড়িত মাস ফেব্রুয়ারি। ভাষার প্রশ্নে বীর বাঙালিরা জীবন দিয়ে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিশ্বের ইতিহাসে ভাষা প্রতিষ্ঠার জন্য কোন জাতি এর আগে ত্যাগ স্বীকার করেনি। ভাষা আন্দোলন নিছক ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছিল না। ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতির অগ্রগতির আন্দোলন। ভাষা আন্দোলন থেকেই স্বাধীকার, স্বায়ত্বশাসন এবং স্বাধীনতা চেতনার জন্ম। রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বিশ্বের এক অনন্য আন্দোলন। এই আন্দোলনে বাঙালি জাতি জেগে উঠে-ফুঁসে ওঠে। নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেন হয়। এই সচেতনতাই ‘একুশের চেতনা’ বলে খ্যাত। এই চেতনাই বাঙালি জাতিকে পরিচালিত করেÑ এই চেতনারই উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালি জাতি পরিচালিত হয়েছে। এই চেতনা মৃত্যুঞ্জয়ী। এই চেতনাই বাঙালি জাতির পথ নির্দেশিকা। অতীতে যেমনি এই চেতনা বাঙলি জাতিকে পথ নির্দেশ দিয়েছে। ভবিষ্যতেও এই চেতনাই পথ নির্দেশ দেবে। এই চেতনার মৃত্যু নেই। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম গণআন্দোলন ভাষা আন্দোলন। বাঙালির মুখের ভাষা কেড়ে নিয়ে উর্দু চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে প্রতিরোধে সংগঠিত হয় গণবিষ্ফোরণ। ভাষা প্রতিষ্ঠার দাবি সার্বিক দাবিতে পরিণত হয়। জাতি হয় আত্মসচেতন। পরবর্তী সকল আন্দোলনে এই অবিনাশী চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে, শিক্ষা-দীক্ষা, চাকুরি ক্ষেত্রে বাঙালিরা ছিল অধিকার বঞ্চিত। একই রাষ্ট্রের অধিবাসী হলেও বাঙালিরা তাদের ন্যায্য অধিকার সম অধিকার পায়নি। তারা ছিল বঞ্চিত এবং উপেক্ষিত। এতে বাঙালিরা আত্মসচেতনতা ফিরে পেয়ে জাগ্রত ও সোচ্চার হয়। তদানীন্তন পাকিস্তানের রাজনীতি কূটিল ও জটিল পথে আবর্তিত হয়েছে। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আসে ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়। নির্বাচনে স্বাধিকার চেতনার বিজয় অর্জিত হয়। আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের তদানীন্তন কূটচক্রী মহল এই বিজয় এবং বাঙালি জাতির গণরায়ের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। শুরু করে ঢালবাহানা। জনগণের ন্যায় সঙ্গত দাবিকে স্বীকৃতি দানের বদলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী জনগণের স্বাধীকার চেতনাকে সমূলে ধ্বংস করে দিতে উদ্যত হলে জনগণ জীবন মরণ সংগ্রাম করে নয় মাসের সশস্ত্র লড়াইয়ের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে। এক সাগর রক্ত পেরিয়ে স্বাধীনতা অর্জিত হয়। এভাবেই ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে শুরু হওয়া সংগ্রাম স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে।
লেখক:- আইনজীবী-কলামিষ্ট