উজ্জ্বল মেহেদী
সুনামগঞ্জ শহরে গেলে আমি প্রথম চোখ রাখি ‘ভাষা প্রেন্টিং প্রেস’ যেখানটায় ছিল, সেখানে। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল কৌতূহলের ছলে যাপিত ব্যস্ততার এই সাংবাদিকতা। সেই যে শুরু, আর থেমে নেই। পথে পথে কতশত স্মৃতি। জন্মদিনে একটি স্ট্যাটাসের প্রতিক্রিয়ায় আমি বলেছিলাম শহর পিছু পিছু আসে। সুমনের গানের কথা। নীড়ে ফেরার চিন্তা থেকে ভাষা বলেছিল, ‘চলুন, শহরটাকে সামনে আনি। বাবার পত্রিকা বের করি…।’ এই ছিল তার আবদার। আমি বলেছিলাম, ‘তুমি সম্পাদক’। ভাষা বলেছিল, ‘রাজি, তবে আপনাকে পাশে থাকতে হবে।’ আমি তখন নচিকেতার গানের কথায় বলেছিলাম, ‘তুমি যদি চাও সূর্যকে নিয়ে যাবো তোমাদের বাড়ি…’। স্নেহের পরশে এভাবেই কথা হতো। সিরিয়াস বিষয় নিয়েও মজা করতাম। এই করোনাযুদ্ধে সেই পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে গেল।
করোনা কেড়ে নেওয়া কানিজ রেহনুমা রব্বানী ভাষার কথা বলছি। এই যে ‘কথা’ সেখানেও চলে আসে ভাষার মায়া। এই ‘কথা’ শুধু কথা নয়, ভাষার ছোট বোন, পেশায় ডাক্তার। আর তাদের দুজনকে স্মরণের মধ্যে রাখতেই আছে ‘স্মরণ’। তারা দুই বোনের মধ্যমণি এক ভাইটির নাম ‘স্মরণ’। ভাষা-স্মরণ-কথার বাবা প্রয়াত রাজনীতিবিদ ও সাংবাদিক গোলাম রব্বানীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার প্রচেষ্টাকালে। সম্পর্ক প্রগাঢ় হলে পরম্পরায় গড়ায়। ভাষা রেহনুমার সঙ্গে আমার সেই পরম্পরার সম্পর্ক। এই সম্পর্ক এত অল্পতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে, কল্পনাতেই ছিল না। ছোটবেলা তাকে সম্পাদক বলে খেপাতাম। জীবনটা গড়ে পেশার নোঙর ফেলার সময়ও সেই বায়না। সম্পাদক। তাকে তার বাবার সম্পদিত পত্রিকা ‘গ্রাম বাংলার কথা’ সম্পাদক বানাতে চেয়েছিলাম। সব চাওয়ার ঊর্ধে এখন ভাষা। এই শোক সইবার উপায় নেই, নিরুপায়।
আইন পড়া শেষে সিলেট ও সুনামগঞ্জ বারের সদস্য ভাষা রেহনুমা। রাজনীতি ও সাংবাদিকতায় পা রাখা রক্তের টানে। শুধু একটু গুচিয়ে অগ্রগামী হওয়ার কথা ছিল। এই প্রস্তুতির সময়ই সব শেষ। ফুল ফোটার আগেই ঝড়ে পড়া যাকে বলে। তার সঙ্গে যখন পরিচয়, তখন সে কিশোরী। সংবাদকর্মী হিসেবে হাতেখড়ির সেই সময়ে কিশোরী ভাষাকে দেখলে আমার আনা ফ্রাঙ্কের কথা মনে হতো। আঠারোর তারুণ্যে পা রাখার আমার সেই সময়ে ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’ পৃথিবী কাঁপানোর মতো আমাকেও আপ্লুত করত। আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি পড়ার সময়ে পরিচয় ভাষার সঙ্গে। সেই পরিচয়ে একদিন আমার কাছ থেকে আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি নিয়ে পড়েছিল ভাষা। সম বয়সী একজনের বর্বরতায় ভীষণ রকম মন খারাপ হয়েছিল তার। সেই থেকে ভাষা আনা ফ্রাঙ্কের ভক্ত, আমিও তাকে আনা ফ্রাঙ্ক বলতাম।
কিশোরী বড় হয়েছে। বাবা অন্তঃপ্রাণ। কাজে-অকাজে যোগাযোগ ছিল। শুধু যোগাযোগ নয়, হৃৎকলমের টান। আইনজীবী, রাজনীতি, সমাজকর্ম-সব শাখায় বিচরণ ছিল তার। ইচ্ছে ছিল আমার শুরুর সময়কে আবার জাগ্রত করার। আমি যেন সহযাত্রী হই। তার প্রয়াত বাবা রাজনীতিবিদ-সাংবাদিক গোলাম রব্বানী সম্পদিত পত্রিকা ‘গ্রামবাংলার কথা’ আবার নতুন করে প্রকাশনার। আমি সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দিতাম। এই আশ্বাসে একটি স্বপ্ন বড় করে দেখা হয়। ভাষার সেই স্বপ্ন-আশা পূরণ হয়নি। অকালে, অসময়ে তার মধ্যে বেড়ে ওঠা আরও একজনকে নিয়ে ওপারে পাড়ি দিল!
৩০ জুন আমার জন্মদিন নিয়ে পরদিন একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়েছিল ভাষা। আমাকে ট্যাগ করায় সহজে চোখে পড়ে। আমি লেখা পড়ে এতটা আপ্লুত ছিলাম যে, তাকে আর ফোন করতে পারিনি। সেই লেখায় অনেক মন্তব্য। আমিও শেয়ার করি, আমার প্রতিক্রিয়াসমেত। লেখাটি কথাসাহিত্যিক আকমল হোসেন নিপু, রম্যলেখক মাহবুবুল আলম কবীরকেও স্পর্শ করে। নিপুভাই ফোন করে জানতে চান। ভাষা ও তার আশপাশ নিয়ো বলি। তিনিও মু্গ্ধ হন। ভাষা এই বর্ষায় সবাই মিলে আড্ডা দিতে চেয়েছিল। করোনা আক্রান্ত হয়েও চৈতন্য প্রকাশনার কর্ণধার রাজীব চৌধুরীর কাছে ফোন করে সেই সব আকুতিভরা কথা বলেছিল। ইচ্ছে ছিল, করোনা কাটলে একদিন বাসায় গিয়ে জমাট আড্ডা দেব। আজ ফোন করে ঘুম ভাঙাল নিয়ামুল ইসলাম খান। খবরটা জানানোর পর বিমূঢ় আমি; নাটাই হাতে পড়ে রইল, ইচ্ছের ঘুড়িটা কাটা পড়ল! আহারে জীবন!
আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরির সূচনার কথা বলছি, তাতে লেখা আছে, ‘ঠিক তেরো বছর বয়সের এক সদ্য কিশোরী। ডায়েরি লেখার শুরু সেই বয়সেই। পনেরো বছর দুই মাস বয়স পর্যন্ত লিখতে পেরেছিল সেই কিশোরী। ডায়েরির পাতায় শেষ আঁচড় টানার ঠিক সাত মাস পরে এই পৃথিবীর জল-মাটি-হাওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল তার।… চলে গেছে সে কিন্তু রেখে গেছে তার কালজয়ী অমর দিনলিপি।’
ভাষা যখন সংবাদ-সাংবাদিকতা রপ্ত করেছিল, তখন তার বয়স ১০-১২ বছর। তার বাবা রিডিং পড়া শেখাতেন পত্রিকা পাঠ করে। এভাবে পাঠ করতে করতে একদিন দেখা গেল, ছাপার ভুল ধরতে পারদর্শী ভাষা। অত্যুক্তি হলেও বলছি, তার জীবনে শেষ লেখা স্ট্যাটাসটা আমার কাছে আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরির মর্যাদায় থাকল। স্ট্যাটাসের সঙ্গে আমার একটি পুরোনো ছবি দিয়েছিল। ফেসবুকে এখনো ঘুরছে। সেই ছবির দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে, তার সঙ্গে আমার ওই পোশাকে সম্ভবত ওই দিনই সর্বশেষ দেখা হয়েছিল। এরপর আর দেখা হয়নি। কিন্তু ফোন যোগাযোগ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মেহেদী কাবুল শোক-কাতরতায় একটি স্কিনশট দিয়ে ভাষার সেই লেখাটি ইনবক্সে দিলেন। ‘একটা মানুষ মৃত্যুর আগে কিভাবে এতো সুন্দর কথা বলতে পারে। এতো দূরে থেকেও তাঁর চলে যাওয়া মেনে নিতে পারছি না!’ ভেজা চোখে লিখেছেন কাবুল।
আমার কাছে ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’ সমাদরে থাকবে ভাষার শেষ লেখাটি। আনা-ভাষায় অদ্ভুত একটা মিল। যুদ্ধকালে দুজনেই অকালে পাড়ি দিল। আমাদের ভাষা এই করোনাযুদ্ধে, আর আনা ফ্রাঙ্ক বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী নাৎসীদের বর্বরতায়। আনা যদি বেঁচে থাকত, নাৎসীদের সেই বর্বরতার সচিত্র বর্ণনা পৃথিবীর মানুষ শুনতে পেত। আর আমাদের ভাষা যদি করোনাযুদ্ধে জয়ী হয়ে পূর্ণ জীবন পেত, এই জগৎ পেত একটি সুন্দর নেতৃত্ব। সেটা হতে পারত আইনপেশায়, সাংবাদিকতায়, রাজনৈতিক অথবা সামাজিকতায়। কী করে বলি বিদায়! বলছি, তুমিই আমার আনা ফ্রাঙ্ক!
লেখক : সিলেটে প্রথম আলো’র নিজস্ব প্রতিবেদক