বিশেষ প্রতিনিধি
ভাটি অঞ্চলের বন্দর হিসেবে খ্যাত সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের সাচনা বাজারের সিঅ্যান্ডবি রোড সংলগ্ন সরকারি হাটরকম খাস ভূমি বরাদ্দে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠেছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বদলে খাস ভূমি বরাদ্দ পেয়েছেন বিত্তশালীরা। পিতাপুত্র, আপন দুই ভাই, প্রবাসী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, বড় ব্যবসায়ী, ভূমি অফিসের কর্মচারী এবং বাজারে একাধিক দোকান ভিট ও বাসাবাড়ির মালিকসহ অন্য উপজেলার মানুষের নাম রয়েছে ভিটা প্রাপ্তির তালিকায়। সি-িকেটধারীরা মোটা অংকের উৎকোচ দিয়ে ভিট বাগিয়ে নেবার অভিযোগ উঠেছে। বন্দোবস্ত গ্রহিতারা সম্প্রতি ভিটে দোকান ঘর তৈরির কাজ শুরু করেছেন।
বরাদ্দকৃত এই খাস ভূমির নাম করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অসৎ কর্মচারীদের হয়ে ভূমি দালালি করছে এরা।
পুনর্বাসনের নিশ্চয়তায় উচ্ছেদকৃত ভাসমানদের ভাগ্যের হেরফের না হলেও লাভবান হয়েছে ভূমিখেকো চক্রসহ সুযোগসন্ধানী অসাধু ব্যক্তিরা। এ নিয়ে সাচনা বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের মাঝে চাপা ক্ষোভ আছে।
জানা যায়, ২০১৮ সালের ৪ মে সাচনা বাজারের গলি খালি করার কঠোর নির্দেশনা জারি করে উপজেলা প্রশাসন। এই প্রেক্ষিতে নিজ উদ্যোগে গলি ছেড়ে বাজারের সৌন্দর্য বর্ধন ও সুশৃঙ্খল যাতায়াতে বড় ভূমিকা রাখে বাজারের ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। সে সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদেরকে পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। উচ্ছেদের প্রায় চার বছরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনকল্পে দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।
সম্প্রতি সিঅ্যান্ডবি রোড লাগোয়া হাট শ্রেণিভুক্ত সরকারি খাস ভূমি বরাদ্দের চুক্তি সংক্রান্ত শর্তাবলী সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে শতাধিক অনুপযুক্ত লোককে লীজ মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে সাচনা বাজারের ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে সুবিধাবাদী ভূমিখেকো চক্রের পকেট ভারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কপাল পুড়েছে ভাসমান ব্যবসায়ীদের।
উচ্ছেদের ৪ বছর পর ব্যবসা সংক্রান্ত ভূমি বন্দোবস্তও পায়নি বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। সাধারণ মানুষের যাতায়াত সুবিধার্থে যানবাহন স্ট্যান্ডও নেই বাজারে। গলি ব্যবসায়ীদের ভিট বন্দোবস্তের জন্য বাজারের সন্নিকটে ১০ বছর আগেই ভূমি খুঁজে পান কর্তৃপক্ষ।
বাজার ভিট বন্দোবস্তের চুক্তিপত্র সংক্রান্ত একটি দলিল ঘেটে দেখা যায়, ২০১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি এই দলিল সম্পাদিত হয়। যার মোকদ্দমা নম্বর বিবিধ ১২(জামাল)/২০১০। সরকারের পক্ষে তৎকালীন উপজেলা সহকারী কশিমনার (ভূমি) ও বন্দোবস্ত গ্রহীতা এ চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন।
চুক্তিপত্রের ১, ৫ ও ১৩ নম্বর শর্তাবলীতে বন্দোবস্ত গ্রহীতা বর্ণিত ভূমি কেবলমাত্র ব্যবসার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করবেন, বন্দোবস্তকৃত ভূমি কারও কাছে ভাড়া বা সাবলীজ দিতে পারবেন না। কিন্তু যাদের নামে ভূমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তাদের অধিকাংশেরই এই ভূমি ব্যবহার করার প্রয়োজনীয়তা নেই। তারা বড় ব্যবসায়ী, বাজারে কারো কারো একাধিক ভিট আছে। বর্তমানে বন্দোবস্তকৃত এই ভূমি বেচাকেনা চলছে বলেও অভিযোগ আছে। মূলত ব্যবসায়ী নয়, কিংবা ব্যবসা থাকলেও বিধি মোতাবেক এই ভূমি বন্দোবস্ত পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন না, তাদের কেউ কেউ সরকারের লিজকৃত ভূমি মোটা অংকের টাকায় অন্য কারও কাছে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
ভূমি অফিসের কর্মচারী, আমেরিকা প্রবাসী, বাজারে বাসা-বাড়ি ও দোকান ভিটের মালিক কিংবা বাজারে যাদের নামে একাধিক ভিট বন্দোবস্ত আছে তারা বন্দোবস্ত পাওয়া এই ভিট শর্ত অনুযায়ী নিজেরা কিভাবে ব্যবহার করবেন, এই প্রশ্ন রেখেছেন বঞ্চিতদের অনেকে।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানিয়েছেন, এখানে যারা ভিট পেয়েছে বাছাই করলে এদের একজনও টিকবে না। তারা কেউ বাজারের বড় ব্যবসায়ী, কেউ নিজস্ব ঘরে ব্যবসা করছেন, কারও বাজারে একাধিক ঘর আছে, তা থেকে মোটা অংকের ভাড়া পাচ্ছেন। এই রকম লোক কি সরকারি খাস ভূমি পাওয়ার উপযুক্ত, এমন প্রশ্ন রেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তিনি।
জানা গেছে, প্রশাসনের সঙ্গে ভিট বন্দোবস্ত গ্রহিতাদের পক্ষ থেকে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন স্থানীয়ভাবে ভূমিখেকো হিসাবে পরিচিত জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের কামলাবাজ গ্রামের তুফাজ্জল হোসেন, সাচনাবাজার ইউনিয়নের পলক গ্রামের আবুল হোসেন এবং একই গ্রামের প্রমতেষ রায়।
অধিক অর্থে ভিট পাওয়াদের একজন জানিয়েছেন, সরকারি এ খাস জায়গা (ভূমি) পেতে তাকে দিতে হয়েছে দেড় লক্ষাধিক টাকা। তার মতো অনেকেই জায়গা পেতে তুফাজ্জল- আবুল-প্রমথেস সিন্ডিকেটের হাতে বড় অংকের টাকা তুলে দিয়েছেন। প্রধান গলির চৌকস ভিটাগুলো ভূমিখেকোদের ঘনিষ্টজনরাই পেয়েছে। এছাড়া নেতা টাইপের যারা আছে তারাও সুবিধাজনক স্থানে ভিট পেয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বঞ্চিত হয়েছে।
সাচনা বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আমির উদ্দিন বললেন, আমার ভাই নাছির উদ্দিন ও আমি দুজনে মিলে সমিতির নেতা শাহাজাহান, ফজলু মিয়া ও প্রমতেষের কাছে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছি, এভাবে দুই আড়াই’শ ক্ষুদ্র দোকানীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে এরা ভিট দেয় নি। ভিট পেয়েছে ধনিরা। স্থানীয়ভাবে এসব অভিযোগ কারো কাছে জানিয়ে ফল পাচ্ছি না।
সাচনাবাজারের পাশের গ্রাম পলক গ্রামের ঠেলা চালক জহুর মিয়া বললেন, আমি ও আমার ভাই আসকর আলী ৬ বছর আগে ৩০ হাজার টাকা দিয়েছি। ভিটের জন্য ঘুরতে ঘুরতে আমার ভাই আসকর আলী ৩ বছর আগে মারা গেছে। সমিতির নেতা শামছুল হক, শাহাজাহান ও প্রমতেষরা বলতেছে নতুন যেখানে ভিট করা হবে, সেখানে তোমরা পাবে।
সাচনাবাজার ছালি-টঙ্গি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ফজলু মিয়া বললেন, জামালগঞ্জের সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রিয়াংকা ম্যাডাম নতুন হওয়া বাজারে ১০-১৫ টি ভিট ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দেবার কথা বলেছিলেন। আমি বলেছি, আমাদের সকলকে ভিট না দিলে আমরা ভিট নিয়ে সমস্যায় পড়বো। নদীর পাশে ভরাট করে ভিট করে দেবার জন্য বলেছি আমি।
ভূমিখেকো চক্রের সদস্য প্রমতেষ রায় বললেন, নতুন হওয়া সিএ-বি রোডের পাশের মার্কেটে ১২-১৩ বছর আগে যারা বন্দোবস্তের আবেদন করেছিল তারা ভিট পেয়েছেন। প্রিয়াংকা ম্যাডামের (সাবেক ইউএনও) সময়কালে ৩০-৩২ জন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে ডেকে নিয়ে ভিট বন্দোবস্ত দেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা নেবার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এই টাকা ভরাট হওয়া মরা পিয়াই নদীতে ভিট ভরাটের জন্য নেওয়া হয়েছিল। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে বাধা দেওয়ায় এই কাজ করা যায় নি। এখনো এই কাজ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমি কোন অন্যায় কাজ করি নি।
সাচনা বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি চিত্ত রঞ্জন পাল বললেন, যাদের ভিট আছে তারা ও অব্যবসায়ীরা ভিট পেয়েছে এমন অভিযোগ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আছে, তবে বন্দোবস্তের বিষয়টি আগের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেখভাল করেছিলেন।
জামালগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি ওয়ালিউল্লা সরকার বললেন, সাচনাবাজারে ভিট বন্দোবস্ত হয়েছে আগের ইউএনও সাহেবের সময়কালে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কিছু বড় ব্যবসায়ীও বন্দোবস্ত পেয়েছে এই অভিযোগের সত্যতা আছে।
জামালগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি অঞ্জন পুরকায়স্থ বললেন, সাচনাবাজারে নিউ মার্কেট নামে একটি মার্কেট ভাসমানদের জন্য করা হয়েছিল। ওখানেও প্রকৃতপক্ষে ভাসমানরা ভিট পায় নি। তিন বছর আগে ৪০৭ নম্বর দাগে ভাসমানদের পুনর্বাসনের জন্য শুনেছি ৮০ টির মতো ভিট বন্দোবস্ত হয়েছে। কাদেরকে ভিট দেওয়া হয়েছে, এই তালিকা ভূমি অফিস বা স্থানীয় প্রশাসন প্রকাশ করেনি। এখানেও প্রবাসী, বড় ব্যবসায়ী, অব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক পরিচয়ে অনেকে ভিট পেয়েছেন। মধ্যস্বত্বভোগী ও স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অসৎ কর্মচারীদের যোগসাজসে এই বিষয়ে একটি সি-িকেট গড়ে ওঠেছে সাচনাবাজারে। এরা বার বারই ঠকাচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা ভাসমান ব্যবসায়ীদের।
তুফাজ্জল হোসেন ও আবুল হোসেনের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় এই বিষয়ে তাদের বক্তব্য জানা যায় নি।
জামালগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ^জিৎ দেব বললেন, সাচনাবাজারে ক্ষুদ্র বা ভাসমান ব্যবসায়ী আছেন ৩০০ জন, ভিট পেয়েছে ১০০ ব্যবসায়ী। যারা পান নি তারা না পেয়ে নানা কথা বলছেন। উপজেলা প্রশাসন ট্রেড লাইসেন্স দেখে নানাভাবে খোঁজ নিয়ে যাদের ভিট নেই বা এর আগে ভিট বন্দোবস্ত পায় নি, তাদের ভিট দিয়েছে। এরমধ্যে বড় ব্যবসায়ীও থাকতে পারেন, বড় ব্যবসায়ীকে ভিট দেওয়া হবে না, এধরণের কোন সিদ্ধান্ত ছিল না, পুরাতন ব্যবসায়ীরা অগ্রাধিকার পেয়েছেন। তবে বাজারে ভিটের মালিক বা এর আগে ভিট বন্দোবস্ত পেয়েছেন, এমন কেউ ভিট পেয়ে থাকলে অবশ্যই তা বাতিল করা হবে। ভিট বন্দোবস্ত কার্যক্রম এখনো চলমান আছে, বন্দোবস্ত প্রদানের কাজ শেষ হলে, কেউ চাইলে বন্দোবস্ত গ্রহিতাদের তালিকা দেওয়া হবে।
জামালগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইকবাল আল আজাদ বললেন, দীর্ঘদিন ধরেই ভিট বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে অনিয়ম হয়ে আসছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের অনেকে ভিট বন্দোবস্ত নিয়ে বিক্রিও করে দিচ্ছে, যা নিয়মের মধ্যে পড়ে না। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা অনেক সময় ভিট বন্দোবস্ত নিয়ে মাটি ভরাট ও গৃহনির্মাণ করার খরচের ভয়ে ভিট বিক্রি করে দেয়। খাসজমি ভরাট করে, গৃহ নির্মাণ করে নির্দিষ্ট মূল্য নির্ধারণ করে, সহনীয় কিস্তিতে টাকা প্রদানের সুযোগ দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ভিট দিতে পারলে ভালো হত।