স্টাফ রিপোর্টার
হাওরের বোরো ফসল হারিয়ে কৃষক যখন দিশেহারা তখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কৃষকদের জন্য ১০০ দিনের জন্য বিশেষ ভিজিএফ কর্মসূচি চালু করেন। ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে ১০০ কেজি ৩ মাসে ৫০০ করে দেড় হাজার টাকা প্রদান করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ক্ষতিগ্রস্তদের দ্বিতীয় কিস্তির ভিজিএফ বিতরণের আগে ট্যাক্স আদায়, ভিজিএফ কার্ডের চাল বিতরণে ওজনে কম দেয়া ও ভিজিএফের ৫০০ টাকা থেকে আবারও হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
জেলার তাহিরপুর সদর, জামালগঞ্জের ভীমখালী ও ফেনারবাঁক ইউনিয়ন পরিষদের বিরুদ্ধে হাওরের দুর্যোগেও হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করার অভিযোগ উঠেছে। ত্রাণের টাকা থেকেও ট্যাক্স আদায় করা হচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের ট্যাক্স আদায়ের প্রমাণস্বরূপ জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক,ভীমখালী তাহিরপুর সদর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি ট্যাক্সের রশিদ দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর অফিসে পাঠিয়েছেন স্থানীয় এলাকার লোকজন। হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়ের বিষয়ে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে কড়া সমালোচনা করছেন অনেকেই।
জানা যায়, তাহিরপুর সদর ইউপিতে ৫০ টাকা, ভীমখালীতে ১০০ টাকা ও ফেনারবাঁক ইউপিতে ৩০০ টাকা করে ইউনিয়ন পরিষদের হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় করা হচ্ছে।
ফেনারবাঁক ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামের খোয়াজ আলীর ছেলে রেজুয়ান আলীর কাছ থেকে গত ৯ জুন ৩০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। ভীমখালী ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামের শাহীন মিয়ার কাছ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার ১০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। ট্যাক্স আদায়ের ক্রমিক নং-১৪৬৫। একইভাবে ইউনিয়নের কির্তনপুর গ্রামের আব্দুল হকের ১০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। ট্যাক্স আদায়ের ক্রমিক নং-১২২৩। হাসনাবাজ গ্রামের দনঞ্জয় দাসের কাজ থেকে
১০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। ট্যাক্স আদায়ের ক্রমিক নং-২০৯৮। ভীমখালী গ্রামের জহির মিয়ার কাছ থেকেও ১০০ টাকা আদায় করা হয়েছে। ট্যাক্স আদায়ের ক্রমিক নং-১৪৮৭। তাহিরপুর সদর ইউপির মধ্য তাহিরপুর গ্রামের শ্রীদাম বর্মনের কাছ থেকে গত ৪ জুন ৫০ টাকা ট্যাক্স আদায় করা হয়েছে, তার ট্যাক্স আদায়ের রশিদ নং- ২৫৫৯।
জামালগঞ্জের ফেনারবাঁক ইউনিয়নের লক্ষীপুর গ্রামের সমাজকর্মী দিল আহমদ নিজের ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন,‘ সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলা ফেনারবাঁক ইউনিয়নে চলছে মরার উপর খাড়ার ঘা। সম্প্রতি হাওর তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মাঝে চরম হতাশা বিরাজ করছিল কৃষকরা অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। এলাকায় মানুষেরা যখন চরম খাদ্য সংকটে তখনই বর্তমান সরকার ভিজিএফ-ভিজিডি, ওএমএস চালু করায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছে। ঠিক তখুনি ফেনারবাঁক ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের কৃষকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে বকেয়া ১৪ বছরের হোল্ডিং ট্যাক্স। সরকার ক্ষুধার্ত মানুষের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করে। জেলে কৃষক শ্রমিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের ভয় দেখিয়ে ৩০০ শত টাকা আদায় করা হচ্ছে। আর বলা হচ্ছে তোমরা সবাই যদি ট্যাক্স না দাও তাহলে সরকারিভাবে কোনও সহায়তা পাবেনা। যাদের ভিজিডি ভিজিএফ তালিকায় নাম রয়েছে তারা বাদ পরে যাবে। অসহায় দরিদ্র কৃষকদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। নিজে না খেয়ে হলেও অন্যের কাছ থেকে ধার করে দিচ্ছে বকেয়া হোল্ডিং ট্যাক্স।’
ভীমখালী ইউনিয়নের হাসনাবাজ গ্রামের বাসিন্দা সায়েক রাজা তার ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন,‘ ৫০০ টাকা ৩৮ কেজির চালের মধ্যে সাড়ে ২৮ কেজি চাল, ৪০০ টাকা দেয়া হচ্ছে। এটা কি নতুন নিয়ম।’
ভীমখালী ইউপির বিছনা গ্রামের স্যানিটারী ব্যবসায়ী সিকন্দর আলী বলেন,‘ এই বছর হাওরের সব বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। সরকার ভিজিএফ কার্ডের মাধ্যমে ৩০ কেজি চাল ও নগদ ৫০০ করে টাকা দিচ্ছে। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদ সবাইকেই চাল ওজনে কম দিচ্ছে। ৩০ কেজির স্থলে কাউকে ২৬ কেজি, আবার কাউকে ২৭-২৮ কেজি করে দিচ্ছেন।’
ভীমখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দুলাল মিয়া বলেন,‘অনেকের কাছেই ইউনিয়ন পরিষদের ট্যাক্সের টাকা বকেয়া রয়েছে। যাদের বকেয়া আছে তাদের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করা হচ্ছে। এখন সুযোগ হয়েছে তাই ট্যাক্স আদায় করা হচ্ছে, এখন না হলে আর আদায় করা সম্ভব হবে না। ’
ফেনারবাঁক ইউপি চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু তালুকদারের সাথে কথা বলতে চাইলে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তাহিরপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান বুরহান উদ্দিন বলেন,‘ ট্যাক্সের জন্য আমরা কাউকে তাগিদ বা জোর করছি না। যাদের ৩-৪শ’ টাকা ট্যাক্স বকেয়া আছে তারা ইচ্ছে করেই ৫০ টাকা করে ট্যাক্স দিচ্ছেন। ভিজিএফ কার্ডধারী ছাড়াও অনেকেই ট্যাক্স প্রদান করছেন। ’
জেলা স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন,‘ ভিজিএফ-এর টাকা থেকে কোনভাবেই ইউনিয়ন পরিষদের ট্যাক্সের টাকা রাখা যাবে না। কেউ যদি কোন অভিযোগ করেন বা বিষয়টি আমাদের নজরে আনেন আমরা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। ’
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বলেন,‘ হাওরে দুর্যোগকালীন সময়ে কারো কাছ থেকে টাকা আদায়ের কোন আইন বা সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদকে এই কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দেয়া হবে।’