সর্বগ্রাসী ফসল হানিজনিত কারণে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দেড় লাখ পরিবারকে আগামী তিন মাসের জন্য পরিবার পিছু ৩০ কেজি চাল ও নগদ ৫০০ টাকা করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সরকার। ক্ষতির ব্যাপকতার তুলনায় এই সহায়তা অপ্রতুল হলেও প্রাথমিক পর্যায়ে এই সহায়তার ঘোষণা ক্ষতিগ্রস্ত হাওরবাসী কৃষকদের মনে সামান্য স্বস্তি জুগাতে সমর্থ হয়। কিন্তু কৃষকদের এই স্বস্তি মিলিয়ে যেতেও সময় লাগেনি। সরকারি প্রশাসন যে পদ্ধতি ও নীতিমালার আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সংখ্যা নির্ধারণ করেছেন সেটি একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এই পদ্ধতির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারগুলো সরকারি সাহায্যের বাইরে চলে যাবেন। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, জেলা প্রশাসন থেকে বিভিন্ন উপজেলায় সহায়তাপ্রাপ্ত পরিবারের যে সংখ্যা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে তা ফসল হানি জনিত ক্ষয়-ক্ষতির প্রকৃত চিত্রের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে উপজেলার জনসংখ্যার ভিত্তিতে। এই ধরনের যান্ত্রিক পদ্ধতি অনুসরণের ফলে সবচাইতে কম ফসল হানির উপজেলা ছাতকে ২২ হাজার পরিবার এই সহায়তা পাবে। ছাতকে ফসল হানির পরিমাণ ৩৬১০ হেক্টর। অপরদিকে সবচাইতে কম সহায়তা পাবে শাল্লা ও বিশ্বম্ভরপুরে মাত্র আট হাজার পরিবার করে। অথচ ওই দুই উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত বোরো জমির পরিমাণ যথাক্রমে ১৫১১৫ হেক্টর ও ছয় হাজার হেক্টর। জেলার সকল উপজেলার ক্ষেত্রেই এই ধরনের চিত্র বিদ্যমান। আবার উপজেলায় গিয়েও একই ঘটনা ঘটবে। যেসব ইউনিয়নে ক্ষতি কম হয়েছে অথবা আদৌ হয় নি তারাও পাবেন এই সহায়তা। এই ধরনের তালিকা প্রণয়নের কারণ সম্পর্কে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো: ফয়েজুর রহমান মঙ্গলবার জানিয়েছেন, ভিজিএফ নীতিমালা অনুযায়ী এই তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এই ধরনের ব্যাখ্যা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিপর্যয়কর বটে। ভিজিএফ কর্মসূচী হলো সমাজের অতি দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচী, ওই সহায়তাপ্রাপ্তদের কারোরই কৃষক হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অথচ সরকার দেড় লাখ ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের জন্য এই নতুন সহায়তার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সহায়তাপ্রাপ্তদের তালিকা প্রণয়নে এই অবাস্তব প্রক্রিয়া অবিলম্বে সংশোধন করা আবশ্যক বলে আমরা মনে করি।
এবার যেসব কৃষক ফসল হারিয়েছেন তাদের বড় অংশ (বলা যায় প্রায় সকলেই) অতীতে কখনও সরকারের কোন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচীর আওতায় তালিকাভুক্ত ছিলেন না। থাকার প্রয়োজনও ছিল না। এবার ফসল হারানোয় আক্ষরিক অর্থেই তারা চরমভাবে বিপাকে পড়েছেন। তাদের ঘরে একবেলা খাবারের কোন সংস্থান নেই। এখন এইসব পরিবার গবাদিপশু ও আগের সঞ্চিত টাকা খরচ করে কোন রকমে জীবন ধারণ করছেন। কিন্তু আর কয়েক দিন পর এদের হাতে খাদ্য কেনার মত কোনই টাকা থাকবে না। উপরন্তু সামনের মৌসুমে পুনরায় ফসল উৎপাদনের জন্যও তাদের বড় পরিমাণের পূঁজির প্রয়োজন হবে। এই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাথে ভিজিএফধারী দরিদ্রদের মিলানোর কারণ কী তা কারও কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। সরকারি সার্কুলারে এরকম বিধান সংযুক্ত করে দেয়া থাকলে আমাদের জনপ্রতিনিধি বিশেষ করে সংসদ সদস্যগণের জরুরি দায়িত্ব হলো মন্ত্রণালয়কে বুঝিয়ে নীতিমালার সংশোধনী দ্রুত আনা এবং প্রকৃত পক্ষে যারা ফসল হারিয়েছেন শুধুমাত্র তাদেরকেই এই সহায়তাপ্রাপ্তদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা। এ বিষয়ে কালক্ষেপণের কোন সুযোগ নেই। এটি এখনই করতে হবে। নতুবা ফসলহারা কৃষকদের বিড়ম্বনা মুহূর্তে মুহূর্তে বাড়বে। প্রশাসনের প্রতি আমাদের অনুরোধ ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নের এই চরম বৈসাদৃশ্যটি এখনই সরকারের নজরে নিয়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা করুন। নতুবা সরকারের ত্রাণ সহায়তা দেয়ার আসল উদ্দেশ্যটিই ভেস্তে যাবে।