সদর উপজেলার জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নে ভিজিডির তালিকা প্রণয়নে স্বজনপ্রীতি করা হচ্ছে বলে গত বুধবার দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। সংবাদভাষ্য অনুসারে ওই ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভিজিডি প্রাপ্যতার যে তালিকা করা হয় তাতে কয়েকজন স্বচ্ছল ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠে এসেছে। তালিকায় ঢুকানো এইসব ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সরকারি চাকুরিজীবী, ওয়ার্ড মেম্বারের শ্যালক, শ্যালিকা ও ভাগ্না বউ, ব্যাংকারের স্ত্রী, বেসরকারি কোম্পানির কর্মকর্তা, হাইস্কুলের অফিস সহকারি; এরকম লোক। অতিদরিদ্রদের সহায়তা কর্মসূচির তালিকায় উঠা এইসব নাম ও তাদের পরিচয় দেখেই বুঝা যায় কী পরিমাণ অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে। তালিকাটি এতটাই অসঙ্গতিপূর্ণ যে, তালিকাভুক্ত জনৈক সুবিধাভোগীর পিতা প্রতিবেদকের কাছে লজ্জিত হয়ে বলেছেন, ‘আমি স্বচ্ছল ব্যক্তি। পরিবারের দুই ছেলে বিদেশে আছেন। আমাকে না জানিয়ে আমার পরিবারের লোকজনের নাম দরিদ্র তালিকায় দেয়ায় আমার মানসম্মান নষ্ট হয়েছে।’ বুঝাই যায়, সুবিধাভোগীদের অনেকেই তাদের ভিজিডি তালিকাভুক্তির খবর নিজেরাই জানেন না। হয়ত কখনও জানতেও পারতেন না এর পিছনে গণমাধ্যমকর্মী অনুসন্ধান না চালালে। তার অগোচরেই উঠে যেত সহায়তা এবং এই সুবিধা কোন না কোন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি হজম করতেন। ভিজিডি তালিকা নিয়ে এরকম অভিযোগ শুধু জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড নয় সর্বত্রই কম-বেশি শুনা যায়। অতিদরিদ্রদের নামে আসা সরকারি সহায়তা নিয়ে জনপ্রতিনিধিদের এরকম নয়-ছয় কা- দুর্ভাগ্যজনক।
প্রায়ই ভিজিডি কিংবা অনুরূপ কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্বাচনের অনিয়ম নিয়ে পত্রিকায় সংবাদ হয়। এসব তালিকা প্রণয়ন করেন সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের মেম্বার বা সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য। ইউপি চেয়ারম্যানের অনুমোদনের পর উপজেলা পর্যায়ে তালিকা চূড়ান্ত হয়। এর মাঝে তালিকার নাম যাচাই-বাছাইও হয়ে থাকে। কিন্তু এই যে তালিকায় স্বচ্ছল, জনপ্রতিনিধির আত্মীয়-স্বজনের নাম উঠে সেজন্য কখনও কাউকে জবাবদিহি করার খবর পাওয়া যায় না। অথচ নীতিমালার বাইরে যেয়ে কেবল দুর্নীতি করার অভিপ্রায় নিয়ে যেসব জনপ্রতিনিধি এসব নাম তালিকায় ঢুকিয়ে সুবিধা ভোগ করেন, তারা জেনে বুঝেই অন্যায় কর্মটি করে থাকেন। এজন্য দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনসহ প্রচলিত ফৌজদারি আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আছে। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুসারেও এমন নৈতিক স্খলনের জন্য পদচ্যুত করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কখনও এজন্য কোন জনপ্রতিনিধিকে সাজা পেতে হয় না। বিচারহীনতার এমন সংস্কৃতির কারণেই তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেন এবং দরিদ্রের নামে আসা সহায়তা থেকে অবলীলায় চৌর্যকর্মটি করে ফেলার দুঃসাহস দেখাতে পারেন।
সংবাদে বর্ণিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইউপি সদস্য ও চেয়ারম্যান কেউই দায় নিতে চাননি। তারা দোষারূপ করেছেন অন্যদের। উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সুনামগঞ্জ সদর তদন্তস্বাপেক্ষে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন। আমরা চাই একটা দৃষ্টান্ত তৈরি হোক। গরিবের বরাদ্দ নিয়ে যারা ছিনিমিনি খেলেন, অন্তত যেসব খবর গোপন না থেকে প্রকাশিত হয়ে পড়ে; সে-সবের বিচার করা হোক। দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। জনপ্রতিনিধিদেরও এ বিষয়ে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। কারণ সকল জনপ্রতিনিধিই এমন অপকর্ম করেন না। কিছু দুর্বৃত্ত ধরণের জনপ্রতিনিধির কারণে তাঁদের সকলেরই সুনাম নষ্ট হয়। সুতরাং এসব বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সংশ্লিষ্ট সভাগুলোতে তাঁদের কথা বলা উচিৎ। দোষীদের শাস্তি হলে অন্যরা নিবৃত্ত হবে, নিরব থাকলে উৎসাহিত হবে, বাড়বে দুর্নীতিবাজদের সংখ্যা। দুর্নীতি দূর করার এটাই নিয়ম।
জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে ভিজিডির তালিকা তৈরিতে যে অনিয়মের খবর সংবাদপত্রের পাতায় উঠে এসেছে সেই অনিয়মের জন্য দায়ী জনপ্রতিনিধিদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনার দাবি জানাই আমরা।