অভিজিৎ চৌধুরী
ইদানিং কোন কিছুতেই মন বসে না বা ভালো লাগে না। চলতে ফিরতে ভালো লাগে না। কোন ভালো মন্দ বলতেও ভালো লাগে না। এমনকি কোন কিছু নিয়ে ভাবতেও ভালো লাগে না। পথ চলতে গেলে মনে হয় আমার চলায় ছন্দপতন হচ্ছে বা আমার চলাফেরা নিয়ে নানান জনে নানান কথাবার্তা বলছে। মনে হয় আমি যেন স্বাধীন ভাবে চলতে পারছি না বা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারছি না।
কোন কিছু স্পষ্ট করেও বলতে পারছি না। স্পষ্ট করে কিছু বললেই কথার মধ্যে অনেকেই কোন মতলব খোঁজে বেড়ায়। কথার উত্তর দিতে দিতে মুখে ফেনা এসে যায়। তাই স্পষ্ট কথাও বলি না। মনে হয় আগে কি দেখলাম কি শোনলাম ? এখন সব কিছুতেই বেসামাল অবস্থা। আমি যেন সবকিছুতেই বেমানান। এরপরেও নিরবে বসলে অতীত ভাবনা এসে মাথায় ভিড় জমায়। তখন মনে হয় এই ভাবনাগুলো লিখে রাখা দরকার। আগামী প্রজন্ম কিছুটা হলেও উপকৃত হবে। আর এখানেই কেউ কিন্তু খুঁজবে না।
আমি ছোটবেলায় অনেক লোককে দেখেছি তারা তাদের মতো করেই চলেছেন। কে কি ভাবল বা বলল তারা তা নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতেন না। তখন অনেকেই এদেরকে বেকার-নিষ্কর্মা ইত্যাদি নানান নামে অভিহিত করতেন। অথচ এখন এই বয়সে দেখি এরাই সমাজের জন্য সংস্কৃতির জন্য সারাটা জীবন নিজেকে বিলিয়েই দিয়ে গেল। কিছু নিয়ে যেতে পারে নাই। আজ আমরা এদের অনেককেই চিনি না বা জানার চেষ্টাও করি না।
আমার আজকের লেখাটা শুধু আমি যাদেরকে দেখেছি বা ভালো করে জেনেছি তাদেরকে নিয়ে। যেমন ধরুন আলিমাবাগের প্রয়াত মনির ভাই। উনাকে যখনই রাস্তায় দেখতাম তখনই দেখতাম উনার হাতে একটা নাটকের স্ক্রিপ্ট অথবা বই আছে। কোন কিছু জিজ্ঞেস করলে বলতেন,‘রিয়ারসেলে আয়।’ ওখানে গেলে দেখতে পেতাম স্টেইজের একদিকে প্রয়াত মিঠু চক্রবর্তী আরেক দিকে মনির ভাই খুব আন্তরিকতার সাথে নাটকের প্রম্ট করে যাচ্ছেন। মনে হতো দু’জনেই যেন অভিনয় করে যাচ্ছেন। আজকে এই রকম জুড়ি দেখাই যায় না। কেই বা তাদের মনে রেখেছে।
প্রয়াত অমিয়েশ চক্রবর্তী, প্রয়াত মহসিন রেজা, প্রয়াত টুনু ভাই প্রয়াত শাহ আবু তাহের বর্তমানে জীবিত ও মৃত আরো অনেকেই ছিলেন যাদেরকে দেখলেই মনে হতো সহসাই বুঝি নাটক মঞ্চস্থ হবে।
প্রয়াত তাহের আমার বন্ধু। সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রধান স্তম্ভ ছিল। তৎকালীন নাট্যাঙ্গনকে বাঁচাতে গিয়ে নিজে একরকম সংসার ত্য্গী হয়ে গিয়েছিল। প্রতি মাসে নাটক করতে গিয়ে স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকা সহ অনেকের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে ২০ টাকা দামের চাঁদা রশিদ (পুশিং সেইল) দিয়ে আসত। এভাবেই সে কষ্টের মাধ্যমে নাটকগুলোর ব্যয় নির্বাহ করতো। আমরা অনেকেই প্রয়াত তাহেরের নাম মুখেও আনি না। তাহের সম্পর্কে আমি পরে লিখার চেষ্টা করবো।
প্রয়াত অমিয়েশ চক্রবর্তী সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন। উনার আচার ব্যবহার চমৎকার ছিল। ভাষায় প্রকাশ করে তা বুঝানো যাবে না। কথায় কথায় উনি শিল্পীদেরকে হাসিয়ে মাতিয়ে রাখতেন। শিল্পীদের আপ্যায়নের জন্য অনেক সময় নিজের পকেট থেকেই খরচ করতেন।
প্রয়াত টুনুভাই সব সময়ই নাটকের কমেডিয়ান হিসেবে সুখ্যাতি লাভ করেছিলেন। টুনু ভাই, অমি দা ও মহসিন রাজা এক জায়গায় বসলেই একজন আরেকজনকে যে খোঁচা খোঁচি করতেন তা দেখেই মানুষ হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়তো।
প্রয়াত মহসিন রাজা চৌধুরী ছিলেন একাধারে নাট্যকার, গীতিকার, শিল্পী অর্থাৎ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ধ্রুবতারা। উনি নাটক লিখতে পারতেন, নিজে খুব ভালো অভিনয় করতে পারতেন। উনি নিজে গান লিখে নিজেই সুর করে বেতারে গাইতে পারতেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন একজন সাধাসিধা মানুষ। চলার পথে উনার খুব একটা চাহিদা ছিল বলে আমার জানা নেই। এক কথায় উনি ছিলেন একজন সাদা মনের মানুষ। এই মানুষটাকেও আমরা ভুলতে বসেছি।
এবার আসি প্রয়াত শিল্পী সাব্বির আহমদ সোহেল সম্পর্কে। সে আমার ঘনিষ্ট বন্ধু ও সহপাঠী ছিল। সৃজনশীল প্রতিভা নিয়ে জন্মেছিল। তার হাতের লেখা খুব সুন্দর ছিল। মাঝে মাঝে সে ছবিও আঁকত। সে সব রকমের গানই ভালো গাইতে পারতো। নিজে খুব ভালো তবলাও বাজাতো। হাছন রাজার গানকেই সে বেশি অগ্রাধিকার দিত। সে গানের সুরও দিতে পারতো। এক অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিল। প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের একটা অনুষ্ঠান থেকে (ঢাকায়) বাড়ি ফেরার পথে রোড এক্সিডেন্টে অকালে সে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেল। আমাদের শিল্পকলার জগতে সে নিবিড় ভাবে জড়িত ছিল। সেই সুরেলো গলা আর শোনা যায় না। খুব বেশি পান প্রিয় ছিল সে। সারাক্ষণই হাতের আঙ্গুলের মধ্যে চুন লাগানো থাকতো। কথাসাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ুন আহমদ হাতে চুন লাগিয়েই তাকে উনার এক অনুষ্ঠানে গান গাইতে বলেছিলেন (টেলিভিশনের জন্য এটি ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছিল)। স্পষ্টবাদী ছিল সে। তাকেও আমরা ভুলতে বসেছি।
আমার আরেক ছোট ভাই হিতাংশু তালুকদার অপু। কি সুন্দর গলা ছিল। সর্বগুণে গুণান্বিত। সে আমার বড় মেয়ে অভিনন্দা চৌধুরী স্বর্ণার গানের শিক্ষকও ছিল (কিছুদিন সে রবীন্দ্র বাবুর কাছে ক্লাসিকেলও শিখেছে)। স্বর্ণা জাতীয় ভাবে চার বার নজরুল গীতিতে প্রথম পুরস্কার হিসেবে স্বর্ণপদক পেয়েছিল। প্রতিবারই পুরস্কার প্রদানের পর অভিনন্দাকে বিচারকবৃন্দ (সুধীন দাসগুপ্ত, সোহরাব হোহেন, শবনম মোস্তারী) মতো গুণী মানুষেরা স্বর্ণার উস্তাদকে দেখতে চাইতেন। কিন্তু কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে হিতাংশু তালুকদার হল থেকে উধাও হয়ে যেতো। সে এতই প্রচারবিমুখ ছিল। ঢাকা টেলিভিশনের বর্তমান সময়ের একজন উদীয়মান গুণী শিল্পী আমার ভাতিজি অনিন্দিতা চৌধুরী সিমি প্রয়াত হিতাংশু তালুকদারের ছাত্রী। হিতাংশু তালুকদারও আমাদেরকে ছেড়ে অকালে চলে গেল। তাকেও আমরা ভুলতে বসেছি।
শিল্পকলার উস্তাদ প্রয়াত এমরান আলী আমারও উস্তাদ ছিলেন। সুরে, লয়ে, তালে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ শিল্পী। উনি হাছন রাজার গান গাইতে গাইতে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলেন। আচার ব্যবহার সহ সব কিছু মিলিয়ে তিনি ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান শিল্পী। এদের প্রত্যেককে নিয়ে আমি আলাদাভাবে লিখার ইচ্ছা রাখি। এরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে গেছেন।
আরেকজন গুণী শিল্পী দ্বিগবিজয় চৌধুরী বর্তমানে অসুস্থ। গান বাজনার জগৎ থেকে একটু দূরেই আছেন। তার সাথে এখন আমার যোগাযোগই হয় না। অথচ সে আমার বন্ধু ও ছোট ভাইও বটে। অনেক বছর আমরা দিবারাত্রি একসঙ্গে গান গেয়েছি, আড্ডা দিয়েছি। এখন আমি তার খবরও নেই না। তার কাছে আমি অপরাধী। ভাবছি এরই মধ্যে একদিন তার বাসায় যাব এবং একসঙ্গে বসেই সংগীত জগৎ নিয়ে কিছু লিখব। বর্তমানে শিল্পকলার যারা কর্ণধার ব্যক্তি আছেন তাদের কাছে আমার একটা বিনীত অনুরোধ, যেভাবেই হোক এই গুণী শিল্পীদের জীবনী সহ এককপি ফটো বাঁধাই করে শিল্পকলায় টাঙিয়ে রাখুন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এদেরকে জানুক। তাহলেই আমরা সবাই গৌরবান্বিত হবো এবং এতে তাদের আত্মাও কিছুটা শান্তি লাভ করবে।