সমাজের বহু ধনাঢ্য ব্যক্তি দ্না-খয়রাত করে নাম কেনার চেষ্টা করেন। তারা এটি করেন ইতিহাসে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিয়ে রাখার জন্য। আমরা আগে দানবীর রণদাপ্রসাদ সাহার নাম শুনতাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে পাটের ব্যবসা ও সরবরাহ ব্যবসার মাধ্যমে তিনি প্রভূত অর্থ উপার্জন করে বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হন। রনদাপ্রসাদ উপার্জিত অর্থ দিয়ে সমাজ হিতকর বহু প্রতিষ্ঠান গড়ে গেছেন। তাঁর সেইসব অম্লান স্মৃতির নিদর্শন হিসাবে কুমুদিনী স্কুল এবং দাতব্য হাসপাতাল আজও জনসেবায় নিয়োজিত রয়েছে। দুর্ভাগ্য আমাদের, রণদাপ্রসাদ সাহাকে ১৯৭১ সনে পাকিস্তানি ও তাদের এদেশীয় দোসররা নির্মমভাবে হত্যা করে। রণদাপ্রসাদের পর আরেক দানবীরের নাম আমরা জানতে পারি আশির দশকের গোড়া থেকেই। তিনি সিলেট অঞ্চলের মানুষ। সিলেটের প্রাণকেন্দ্র বন্দরবাজারের ঐতিহ্যবাহী একটি পাঠশালার জায়গা দখল করে বিশাল মার্কেট বানানোর মূল হোতা হিসাবে মানুষ যার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছে, দেখা গেল তিনিই পরে বিশাল দানবীর বনে গেছেন। তার নামে দেদারছে গড়ে উঠছে স্কুল, কলেজ, ক্লাব, সংগঠন ইত্যাদি। চারিদিকে তার জয়জয়কার। সমাজে তার বিশাল প্রতিপত্তি, প্রশাসনে প্রভাব অফুরন্ত। প্রভাব আর প্রতিপত্তির জুরে তিনি ভুয়া দলিল সৃজনের মাধ্যমে দখল করে নেন তারাপুর চা বাগান। চা বাগানের কিয়দংশে গড়ে তুলেন রাগীব-রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজ। আদালতের রায়ে তার জাল-জালিয়াতি ধরা পড়েছে এবং তারাপুর চা বাগানের মালিকানাসত্ব মূল মালিককে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এহেন দানবীরের নতুন সুখ্যাতি দেখা গেল বুধবারের জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোয়। গুলশানে অবস্থিত মূল্যবান জায়গার মালিক বনে যান তিনি একই কায়দায় জাল দলিল সৃজনের মাধ্যমে। মালিক বনে তিনি ওই জায়গা আরেক ব্যক্তির নিকট বিক্রি করে দেন। আদালতে সেই জারিজুরিও ফাঁস হয়েছে। দানবীর নামের কোন মহৎ ব্যক্তির এমন কা-কীর্তির খবর শুনে আমরা স্তম্ভিত, বিষ্ময়ে হতবাক। অবৈধ উপায়ে কাড়ি কাড়ি টাকা লুপাট করে এর কিয়দংশ বিলিয়ে যদি নাম কেনা যায় তাহলে কে অমর হতে চাইবে না বলুন? দানবীর সেজে জনগণের চোখে ধুলো দেওয়া যায়, আয়কর ফাঁকি দেয়া যায় সর্বোপরি নিজের একটি পাহাড়সমান ইমেজ তৈরি করা সম্ভব হয়। তবু শেষ রক্ষা হলো না। আদালতের সদাসজাগ চোখকে ফাঁকি দিতে পারেননি তিনি। নতুবা ইতিহাসের একটি অধ্যায় তাঁর নামেই উৎসর্গিত হতো নিঃসন্দেহে।
ওই বিখ্যাত দানবীরের কথা বাদ দিন। আমাদের আশপাশে এমন বহু হাতেমতাইর সন্ধান মেলে যারা অনৈতিক সংশ্রবের কারণে রাতারাতি সম্পদশালী বনে অবৈধ উপার্জনের ছিটেফোটা সাধারণ্যে বিলিয়ে মহান হওয়ায় চেষ্টায় ব্রতী হন। এইসব ব্যক্তিদের ছড়ানোছিটানো খুদকুড়ো কুঁড়িয়ে অনেকে তাদের নামকে অক্ষয় করার চেষ্টায় নিয়োজিত হন। এদের পাপকর্ম ঢাকা পড়ে যায় সমাজসেবার মিথ্যা মোড়কে। সকলেই বুঝেন কিন্তু কিছু বলেন না। এরা আমাদের সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করছে। যুগ যুগ ধরে যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা আমরা দেখে আসছিলাম এরা তাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। এরা অন্যায় কানেকশনের মাধ্যমে নিজেরা সরকারি সম্পদ লুটে সমাজে বৈষম্য তৈরি করছে। এরা ভাল আর মন্দের প্রভেদরেখাকে মিলিয়ে দিতে চাইছে। সিলেটের মুখোশধারী দানবীরের চেহারা উন্মোচনের পর এবার পাতি দানবীরদেরও মুখোশের পর্দা উঠানোর সময় এসেছে। তবে সব মুখোশ খুলতেই যে আদালতের নির্দেশনা পাওয়া যাবে তা নয়। মানুষকেও দায়িত্ব নিতে হবে। সারা জীবন মানব কল্যাণে কিংবা মহৎকাজে ব্যয় করেও এখন নাম করা যায় না। এরকম সমাজ আমাদের ছিল না। এখানে ভালমানুষদের এখন বোকা মনে করা হয়। আর ঠাটবাটের মহাশয়দের ভালমানুষের তকমা দিয়ে দেওয়া হয়। এই অদ্ভূত অবস্থা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে হবে।